Mar 31, 2025 | প্রকৃতি কথা
নারীর হাত ধরে কৃষির সূচনা হলেও বর্তমান রাসায়নিক কৃষি ব্যবস্থায় পুরুষের নিয়ন্ত্রণ ও আদিপত্য ক্রমশ বাড়ছে। কারণ, কৃষি এখন অনেকটাই বাজারনির্ভর। যেহেতু বাজারে নারীদের অভিগম্যতা নেই বললেই চলে তাই কৃষিতেও নারীদের অভিগম্যতা দিন দিন কমছে। উদাহরণস্বরূপ বীজের কথাই ধরা যাক। কৃষক পরিবারে বীজ সংরক্ষণের কাজটি ছিল মূলত নারীদের। এই বীজ সংরক্ষণের মাধ্যমেই নারীরা ফসল চাষের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় জড়িয়ে পড়তেন। তা ছাড়া, একসময় বাংলাদেশের কৃষি ছিল একটি সমন্বিত ব্যবস্থা যার অধিকাংশ কাজই ছিল গৃহস্থালীকেন্দ্রিক। যেমন: চাষের গরুটিকে দেখাশুনা করা, গরুর গোবরটা জমিতে দেওয়ার জন্য সংরক্ষণ করা এসব কাজ করতে গিয়ে নারী সংসারে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতেন। যদিও পুরুষতান্ত্রিক ব্যবস্থায় তার কাজের যথাযথ মূল্যায়ন বা স্বীকৃতি তখনও ছিল না তবুও গুরুত্ব ছিল এখনকার চেয়ে অনেক বেশি। বর্তমানে নারীর কাজ প্রধানত শস্য মাড়াই, ঝাড়াই আর শুকিয়ে বাজারের জন্য প্রস্তুত করে দেওয়া যেখানে নারী নিছক একজন শ্রমিকের ভূমিকা পালন করে থাকে। ফলে, বর্তমান চাষ ব্যবস্থায় নারী-পুরুষের বৈষম্য বা জেন্ডার বৈষম্য বাড়ছে বলেই মনে হয়।
জেন্ডার (Gender) কি?
যে কোন দেশে যে কোন সমাজে অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক ও ঐতিহ্যগতভাবে নারী ও পুরুষের কাজের ভিন্নতা রয়েছে। সমাজে নারী ও পুরুষের এই ভিন্নমূখী ভূমিকা ও দায়িত্ব পালন তাদের দৈহিক কাঠামোগত পার্থক্য দ্বারা নির্ণীত হয় নি, বরং সমাজ আরোপিত আচার-আচরণ, মুল্যবোধ ও নিয়মনীতি দ্বারা নির্ধারিত হয়েছে। সমাজ ও সংস্কৃতি দ্বারা নির্ধারিত নারী পুরুষের এরূপ ভিন্নতাকেই জেন্ডার বলা হয়। জন্মগত ও দৈহিকভাবে নারী পুরুষের পার্থক্যকে নির্ণয় করা হয় পুলিঙ্গ ও স্ত্রীলিঙ্গ হিসাবে। পক্ষান্তরে, জেন্ডার হচ্ছে নির্দিষ্ট সমাজের সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়ার ধারাবাহিকতা। যেমন: সামাজিক ও সাংস্কৃতিকভাবে নারী মায়ের দায়িত্ব পালন, ঘর গৃহস্থালীর কাজ ও সেবা শুশ্রুষা দায়িত্ব পালন করে থাকে। অন্যদিকে, পুরুষের জন্য থাকে পরিবারের বাইরের কাজ, সমাজ ও রাষ্ট্রের নেতৃত্বদানের কাজ, পরিবার পরিচালনা ও কর্তাব্যক্তি হিসেবে দায়িত্ব পালন ইত্যাদি। কাজ বা দায়দায়িত্বের এরূপ বিভাজন শুরু হয় জন্মলগ্ন থেকেই; একটি মেয়ে শিশু ও একটি ছেলে শিশুর প্রতি পৃথক আচরণ করার মাধ্যমে। যেমনঃ শৈশবে খেলাধুলার সরঞ্জাম হিসেবে একটি ছেলে শিশুকে যখন দেওয়া হয় বন্দুক, সাইকেল, টেনিস বল বা ক্রিকেট ব্যাট তখন একটি মেয়ে শিশুকে দেওয়া হয় পুতুল, রান্নার হাড়ি-পাতিল ইত্যাদি। এভাবেই পরিবার বা সমাজ নির্ধারিত গুণাবলী ও বৈশিষ্ট্য নিয়ে ছেলে শিশুটি বলবান পুরুষে ও মেয়ে শিশুটি দুর্বল, কোমলমতি ও সেবাধর্মী নারীতে পরিণত হয়। তাই ঐতিহ্যগতভাবেই সমাজ নির্ধারণ করে দেয় নারী ঘর গৃহস্থালির কাজ করবে এবং পুরুষ বাইরের কাজ এবং পরিবার ও সমাজ পরিচালনার কাজ করবে। সামাজিকভাবে আরোপিত নারী ও পুরুষের এরূপ শ্রম বিভাজন সমাজ পরিবর্তনের সাথে সাথে ক্রমান্বয়ে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করেছে।
নারী-পুরুষের দৈহিক ভিন্নতাকে কেন্দ্র করে সামাজিক শ্রম বিভাজন প্রাতিষ্ঠানিক রূপলাভ করেছে যা নিম্নরূপঃ-
১. উৎপাদনমুখী ও আয়বর্ধক কাজ
বাণিজ্যিকভাবে বা এককভাবে গৃহের চাহিদার জন্য যে সকল উৎপাদনমূলক কাজ করা হয় যেমনঃ জমিতে ফসল উৎপাদন, মাছ ধরা, হাস-মুরগী ও গরুছাগল পালন ইত্যাদি। এসব কাজে নারী ও পুরুষ উভয়েরই অংশগ্রহণ থাকে।
২. পুনঃউৎপাদনমুখী কাজ
ঘর-গৃহস্থালী এবং পরিবারের সদস্যদের দেখা শোনা, সন্তান ধারণ ও লালন পালন, রান্নাবান্না, পানি ও জ্বালানী সংগ্রহ, পরিবারের সদস্যদের সেবা-শুশ্রুষা ইত্যাদি কাজগুলোর অধিকাংশই নারী করে থাকে এবং এর মধ্যে সন্তান ধারণ এককভাবেই নারীর কাজ।
৩. সামাজিক কাজ
সামাজিক কাজের মধ্যে পড়ে বিভিন্ন সামাজিক উৎসব উৎযাপন, সমাজ উন্নয়নমূলক কাজ, স্থানীয় রাজনীতি প্রভৃতি। এসব কাজে পুরুষের অংশগ্রহণ তুলনামুলকভাবে অনেক বেশি থাকে।
উপরে বর্ণিত কাজগুলোর দিকে লক্ষ্য করলে দেখা যায় যে, এই কাজগুলিতে নারী-পুরুষ, বালক-বালিকা সকলের আংশগ্রহণ ঘটলেও নারী পুনঃউৎপাদনশীল কাজের প্রায় পুরোটাই এবং কোন কোন ক্ষেত্রে উৎপাদনমূলক কাজের অর্ধেকেরও বেশি সম্পন্ন করে থাকে। উৎপাদন ও পুনঃউৎপাদন এই দুটি ক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ অধিক থাকায় নারীকে পুরুষের চেয়ে অধিক শ্রম দিতে হয় এবং অনেক বেশি কাজ করতে হয়। শস্য উত্তোলন পরবর্তী কাজগুলো (যেমন: শস্য ও বীজ প্রক্রিয়াজাতকরণ, সংরক্ষণ ইত্যাদি) সাধারণত নারীই করে থাকে। দীর্ঘদিন থেকে এ কাজে সম্পৃক্ত থাকার ফলে এই বিষয়ে তার দক্ষতা ও অভিজ্ঞতাও বেশি থাকে।
সামাজিক অবস্থান, নিয়মনীতি, চিন্তা-চেতনা ও মুল্যবোধ নারী ও পুরুষকে ভিন্নতা দান করেছে। স্থানীয় সম্পদ ব্যবহারের সুযোগের ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের সমান অধিকার থাকে না। ভূমি, পানি, মজুরী, অর্থ, নেতৃত্ব, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, তথ্য প্রভৃতির উপরও নারী-পুরুষের সমান নিয়ন্ত্রণ থাকে না। নারী ও পুরুষের শ্রম বিভাজন এবং সম্পদের উপর অসম নিয়ন্ত্রণের ফলে তাদের আকাঙ্খা, চাহিদা, জ্ঞান, দক্ষতা ও অভিজ্ঞতাসমূহও ভিন্ন হয়।
স্থায়িত্বশীল কৃষিতে নারীর ভূমিকা
স্থায়িত্বশীল কৃষিতে ব্যবহৃত উৎপাদন উপকরণগুলো মূলত স্থানীয় সম্পদনির্ভর যা কৃষক পরিবারের ভিতরেই থাকে। এখানে বাইরের উপকরণ যেমন: বীজ, রাসায়নিক সার ও কীটনাশক প্রভৃতি ব্যবহার করা হয় না। কৃষক পরিবারের নিজস্ব গোবর বা জৈব সার, বীজ প্রভৃতি নারীরা রক্ষণাবেক্ষণ করে থকে। ব্যাপকভাবে স্থায়িত্বশীল কৃষির সম্প্রসারণ ঘটলে নারীদের কাজের মাত্রা আরও বেড়ে যাবে। সেক্ষেত্রে পুরুষদেরকেও নারীদের কাজের প্রতি সহানুভূতিশীল ও সহমর্মী হতে হবে এবং পরস্পর কাজ ভাগ করতে হবে। খামারের কার্যাবলী বিশ্লেষণ থেকে দেখা যায় যে, খামার পরিচালনায় নারী পুরুষ (বালক/বালিকা) সকলের অংশগ্রহণ থাকলেও খামারটি পরিচালনায় নারীর ভূমিকা অত্যন্ত নগণ্য হয়। স্থায়িত্বশীল কৃষিতে নারী-পুরুষের অংশগ্রহণ সমান বা ক্ষেত্রবিশেষে বেশি। কাজেই, নারীর কাজের যথাযথ মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি দান অত্যন্ত জরুরী।
প্রশিক্ষণের প্রয়োজনীয়তা
স্থায়িত্বশীল কৃষিতে নারীদের অংশগ্রহণ শ্রম-ঘন্টা হিসেবে অনেক বেশি ইতিমধ্যে তা জানা গেছে। কৃষিতে নারীর এরূপ অংশগ্রহণকে আরও দক্ষভাবে ব্যবহার করতে হলে প্রয়োজন সঠিকভাবে এর কলাকৌশল সর্ম্পকে জানা। এ লক্ষ্য অর্জনে প্রয়োজন প্রশিক্ষণ। কৃষক নারী তার দীর্ঘদিনের প্রচলিত জ্ঞান অনুযায়ী বীজ সংরক্ষণ করেছে তার মূল্যায়ন দরকার তবে সেই সাথে প্রয়োজন আধুনিক কলাকৌশল সম্পর্কে তাকে অবহিত করা। এজন্য পুরুষের পাশাপাশি নারী প্রশিক্ষণের বিষয়টিকেও অধিক গুরুত্ব দিতে হবে।
সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারীর অংশগ্রহণের প্রয়োজনীয়তা
স্থায়িত্বশীল কৃষিতে নারীর অংশগ্রহণকে আরও কার্যকর করতে হলে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার কোন বিকল্প নেই। কিন্তু বাস্তবক্ষেত্রে দেখা যায়, পরিবার পরিচালনা, ফসল নির্বাচন, গৃহস্থালীর জন্য প্রয়োজনীয় ক্রয়-বিক্রয়, সন্তান ধারণ ইত্যাদি সিদ্ধান্তগুলো গ্রহণ করার ক্ষেত্রে পুরুষের একক আধিপত্য বজায় থাকে। ফলে, সিদ্ধান্তগ্রহণ প্রক্রিয়ায় নারীর অংশীদারিত্ব না থাকায় একজন নারী যতখানি ভালো ফলাফল দিতে পারতো তা দিতে পারে না।
সম্পদের উপর নারীর নিয়ন্ত্রণ
সম্পদের উপর নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে ভিন্নতার কারণে মানুষের সেই সম্পদ ব্যবহার করার ইচ্ছা, শক্তি ও মানসিকতাতেও ভিন্নতা আসে। যেমনঃ একজন বর্গাচাষী বর্গাকৃত জমিতে গোবর বা জৈব সার ব্যবহার, চারিদিকে স্থায়ি গাছ লাগানো ইত্যাদির মতো জমির দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থাপনায় কখনও উৎসাহিত হবে না। কারণ, এক্ষেত্রে দীর্ঘদিন জমি তার অধিকারে থাকবে এমন কোন নিশ্চয়তা নেই। তাই সে চাইবে যত অল্প সময়ে জমি থেকে যতবেশি লাভ তুলে নেওয়া যায়। ফলে, বর্গাকৃত জমিতে অধিক রাসায়নিক সার, বালাইনাশক প্রভৃতি ব্যবহার হয়ে থাকে যা দীর্ঘমেয়াদে জমির উপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে।
কৃষিতে নারী শ্রম দেয় কিন্তু জমি ও উৎপন্ন ফসলের উপর তার নিয়ন্ত্রণ থাকে না। অন্যদিকে, বাজারে নারীর প্রবেশাধিকার না থাকায় উৎপাদিত ফসল বিক্রিত অর্থের উপরও তার কোন নিয়ন্ত্রণ থাকেনা। উৎপাদিত ফসলের উপর নারীর অধিকার ও নিয়ন্ত্রণ না থাকায় সমস্ত মন, মেধা ও শ্রম দিয়ে উৎপাদন করার ক্ষেত্রে তার উৎসাহ অনেক সময় কমে যায়। এরূপ উৎসাহ কমে যাওয়ায় সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্থ হয় কৃষি। কৃষি থেকে অধিক উৎপাদন পেতে হলে পুরুষের পাশাপাশি নারীকেও সম্পদের নিয়ন্ত্রণ ও অধিকার দিতে হবে। সম্পদের নিয়ন্ত্রণে সমতা এলে নারীর সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতাও বৃদ্ধি পায় যা কৃষির জন্য প্রয়োজনীয়। সমাজের অর্থনৈতিক কাঠামোর তিনটি স্তরের সম্পদ নিয়ন্ত্রণ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া বিশ্লেষণ করলে সম্পদের উপর নারীর নিয়ন্ত্রণের একটি চিত্র পাওয়া যাবে। নিম্নের ছকে বিষয়টি উপস্থাপন করা হল।
| চাষী পরিবার |
উৎপাদন কাজে শ্রমদান |
সম্পদের উপর নিয়ন্ত্রণ |
সিদ্ধান্ত গ্রহণ ক্ষমতা |
| বড় চাষী |
দেয়না |
নেই |
নেই |
| মাঝারী চাষী |
দেয় |
নেই |
সামান্য |
| ক্ষুদ্র চাষী/দিনমজুর |
দেয় |
সামান্য |
মোটামুটি |
সুতরাং দেখা যাচ্ছে যে, বড় চাষী পরিবারে নারীরা সাধারণতঃ উৎপাদন কাজে শ্রম দেয়না এবং তাদের সম্পদের উপর নিয়ন্ত্রণ নেই তাই সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতাও নেই। মাঝারী চাষী পরিবারে নারীরা সাধারণতঃ উৎপাদন কাজে শ্রম দেয় কিন্তু সম্পদের উপর নিয়ন্ত্রণ নেই তাই সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতাও সামান্য। পক্ষান্তরে, ক্ষুদ্র চাষী/দিনমজুর পরিবারে নারীরা সাধারণতঃ উৎপাদন কাজে শ্রম দেয় এবং তাদের সম্পদের উপর সামান্য হলেও নিয়ন্ত্রণ থাকে তাই সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতাও মোটামুটি থাকে।
তাই স্থায়িত্বশীল কৃষি ব্যবস্থায় নারীর অংশগ্রহণকে অধিক কার্যকর করতে হলে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ক্ষমতা ও সম্পদের উপর নিয়ন্ত্রণ নারীকে দিতে হবে। এজন্য প্রয়োজন-
ক. বনায়ন, নার্সারী প্রতিষ্ঠা, হাঁস-মুরগী পালন, গরু-ছাগল পালন ইত্যাদি আয়বর্ধক ক্ষুদ্র উদ্যোগগুলোতে নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধি করা;
খ. নারীদের উৎপাদিত দ্রব্য বাজারজাতকরণের সুযোগ সৃষ্টির লক্ষ্যে বাজারে নারীর প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা;
গ. পুরুষকে নারীর কাজের প্রতি সহানুভূতিশীল ও অংশীদার হতে উদ্বুদ্ধ করা;
ঘ. বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক পদে নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধিতে সহায়তা করা;
ঙ. স্থায়িত্বশীল কৃষিতে নারীর দক্ষতা বৃদ্ধিতে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা;
চ. নারীর দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতাকে স্বীকৃতি দেওয়া এবং অভিজ্ঞতা বিনিময় করা।
Mar 31, 2025 | প্রকৃতি কথা
ইতোপূর্বেই আলোচিত হয়েছে যে, কৃষি এখন বিশ্ব বাণিজ্যের উদীয়মান সেক্টর প্রতিশ্রুতিশীল শিল্প। এই শিল্পের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির জন্য বিশ্বব্যাপি সবুজ বিপ্লব প্রযুক্তির ব্যাপক বিস্তারের মাধ্যমে যে কৃষি ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে তাকে রাসায়নিক কৃষি বলা হয়। ইতোপূর্বে এটাও আলোচিত হয়েছে যে, এই রাসায়নিক কৃষির প্রভাবে নিঃশেষ হচ্ছে মাটির প্রাণশক্তি ও প্রাকৃতিক সম্পদ, ধ্বংস হচ্ছে পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য এবং কৌলিক বৈচিত্র্য (জেনেটিক ডাইভারসিটি) যা স্থায়িত্বশীল উন্নয়নের জন্য মারাত্মক হুমকিস্বরূপ। পাশাপাশি, চলমান রাসায়নিক কৃষি উৎপাদনশীলতার উপরও দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতিকর প্রভাব ফেলছে যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের খাদ্য নিরাপত্তাকে মারাত্মক হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। পরিবেশগত বিপর্যয় রোধ এবং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের মাধ্যমে স্থায়িত্বশীল উন্নয়নের (Sustainable Development) প্রতিজ্ঞা নিয়ে ১৯৯২ সালের জুন মাসে ব্রাজিলের রিও ডি জেনিরোতে জাতিসংঘ আয়োজিত ধরিত্রী সম্মেলন (ঊধৎঃয ঝঁসসরঃ) অনুষ্ঠিত হয় যেখানে বাংলাদেশও অন্যতম প্রতিজ্ঞাবদ্ধ দেশ। স্থায়িত্বশীল উন্নয়ন বলতে চলমান কোন উন্নয়ন উদ্যোগ বা প্রক্রিয়াকে বুঝায় যা গতি না হারিয়ে টিকে থাকতে সক্ষম। কৃষিপ্রধান বাংলাদেশের স্থায়িত্বশীল উন্নয়নের জন্য স্থায়িত্বশীল কৃষি ব্যবস্থা গড়ে তোলার কোন বিকল্প নেই।
স্থায়িত্বশীল কৃষির ধারণা
স্থায়িত্বশীল কৃষি (Sustainable Agriculture) বলতে এমন এক কৃষি ব্যবস্থাকে বুঝায় যা উৎপাদনের মৌলিক ভিত্তি যেমন: মাটি, পানি, পরিবেশ ইত্যাদি সংরক্ষণ করে উৎপাদনশীলতা বজায় রাখতে সক্ষম। অর্থাৎ স্থায়িত্বশীল কৃষি ব্যবস্থা হল এমন একটি কৃষি ব্যবস্থা যা প্রাকৃতিক সম্পদের যথাযথ ব্যবহারের মাধ্যমে পরিবেশের ভারসাম্য ও জীববৈচিত্র্য বজায় রেখে ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার জন্য খাদ্য, পুষ্টি ও অন্যান্য চাহিদা পূরণে সক্ষম হবে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের চাহিদা মেটানোর মতো প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ করবে। স্থায়িত্বশীল কৃষি ব্যবস্থা মানুষের প্রয়োজনের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ স্থানীয় সম্পদভিত্তিক ব্যয়সাশ্রয়ী কৃষি প্রযুক্তিনির্ভর এবং কৃষকের সামর্থ্য ও নিজস্ব জ্ঞানভিত্তিক এমন একটি সমন্বিত উদ্যোগ ও ব্যবস্থাপনা যা হবে পরিবেশসম্মত, অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক, সামাজিকভাবে ন্যায্য ও সমদর্শী, সাংস্কৃতিকভাবে যথাযথ, যথোপযুক্ত প্রযুক্তিনির্ভর, সামগ্রিক বিজ্ঞানভিত্তিক এবং সমগ্র মানবিক উন্নয়নে সহায়ক। অর্থাৎ যে কৃষি ব্যবস্থা পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রেখে প্রাকৃতিক সম্পদের পরিমিত ব্যবহার ও সংরক্ষণের মাধ্যমে মানুষের পরিবর্তনশীল চাহিদা পূরণে সক্ষম এবং সেইসাথে ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠায় সহায়ক তাই স্থায়িত্বশীল কৃষি। নিন্মে স্থায়িত্বশীল কৃষির মৌলিক ধারণাসমূহের উপর আলোকপাত করা হল।
ক) পরিবেশবান্ধব
স্থায়িত্বশীল কৃষি ব্যবস্থা প্রকৃতি, মাটি ও মানুষের ক্ষতি না করে পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখতে সহায়ক হবে। অর্থাৎ স্থায়িত্বশীল কৃষি ব্যবস্থায় এমন কৃষি প্রযুক্তির ব্যবহার হবে যা প্রাকৃতিক সম্পদের ক্ষতিসাধন না করে সার্বিক প্রতিবেশের (ফসল, গাছ, মাছ, মানুষ থেকে শুরু করে মাটিস্থ অনুজীবসমূহ) সজীবতা সংরক্ষণ করবে। এটা তখনই সম্ভব হবে যখন জৈব প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মাটি ব্যবস্থাপনা ও ফসল উৎপাদন করা যাবে। পাশাপাশি পুনরুৎপাদন ও ব্যবহার করা যায় না এমন শক্তি-সম্পদ (খনিজ কয়লা, পেট্রোল, ডিজেল ইত্যাদি) এবং রাসায়নিক প্রণালীতে প্রস্তুতকৃত কৃত্রিম উপকরণ যথাসম্ভব পরিহার করে স্থানীয় সম্পদ, জৈব উপকরণ এবং লোকজ জ্ঞান ও প্রযুক্তির এমনভাবে সমন্বয় ও সদ্ব্যবহার করা যেন সকল প্রকার দূষণ এড়ানো যায় এবং শক্তি ও সম্পদের অপচয় ও অপব্যবহার কমানো সম্ভব হয়। অর্থাৎ স্থায়িত্বশীল কৃষি ব্যবস্থায় পুনরুৎপাদনশীল সম্পদ ব্যবহারের উপর গুরুত্ব দেওয়া খুবই জরুরি।
খ) অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক
স্থায়িত্বশীল কৃষি ব্যবস্থায় স্থানীয় ও পুনরুৎপাদনশীল সম্পদ এবং লোকজ জ্ঞান ও প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে তা অর্থনৈতিকভাবেও লাভজনক হবে। কারণ, এতে করে উৎপাদন খরচ হবে সর্বনিম্ন যা প্রকৃত লাভকে বাড়িয়ে দিবে। তা ছাড়া, অর্থনৈতিক লাভালাভ শুধুমাত্র উৎপাদনের ক্ষেত্রেই নয় বরং প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ, সামগ্রিক ও দীর্ঘমেয়াদি উৎপাদনশীলতা বজায় রাখা এবং পরিবেশ, স্বাস্থ্যগত ও অর্থনৈতিক ঝুঁকি নিরসনের নিরিখে দেখতে হবে।
গ) সামাজিকভাবে ন্যায্য ও সমদর্শী
স্থায়িত্বশীল কৃষি ব্যবস্থায় সম্পদ ও ক্ষমতা এমনভাবে ব্যবহৃত হবে যা সমাজের নারী পুরুষ নির্বিশেষে সকল মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণে সক্ষম হবে এবং ভূমিতে তাদের অধিকার, উৎপাদনের জন্য পর্যাপ্ত অর্থ প্রাপ্তি, কারিগরি সহায়তা প্রাপ্তি এবং বাজার ব্যবস্থায় প্রবেশাধিকার ইত্যাদি নিশ্চিত করবে। পপশাপাশি, কর্মক্ষেত্রে এবং সমাজে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকল মানুষের সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ থাকবে।
ঘ) সংস্কৃতিকভাবে যথাযথ
সবুজ বিপ্লবের নামে রাসায়নিক ও ভারী যান্ত্রিক প্রযুক্তি প্রচলনের সাথে সাথে পরিবর্তিত হয়েছে কৃষি ব্যবস্থা ও ঐতিহ্যবাহী গ্রামীণ খাদ্য ও পুষ্টি গ্রহণের ধরন এবং আবহমান গ্রামীণ সংস্কৃতি। কিন্তু স্থায়িত্বশীল কৃষি ব্যবস্থায় কৃষি প্রযুক্তি ও ব্যবস্থাপনা এমন হবে যা কৃষকের নিজস্ব জ্ঞান ও সংস্কৃতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে।
ঙ) লাগসই প্রযুক্তিনির্ভর
স্থায়িত্বশীল কৃষি ব্যবস্থায় প্রযুক্তি উদ্ভাবন, উন্নয়ন ও ব্যবহার ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা শ্রেণী স্বার্থে না হয়ে তাতে সার্বজনীন বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গি ও মূল্যবোধের প্রতিফলন ঘটে। এতে যথোপযুক্ত প্রযুক্তির উন্নয়ন ও সঠিক ব্যবহার সার্বিক উন্নয়নে অবদান রাখে। সকল অবস্থায় প্রযুক্তি একরকম না হওয়াই স্বাভাবিক এবং কোন একটি প্রযুক্তি একস্থানে সফলতা আনলেও অন্যত্র অকার্যকর হতে পারে। কোন প্রযুক্তি তখনই যথার্থ লাগসই বিবেচিত হবে যদি তা নির্দিষ্ট এলাকার ফসল, জমি বা মাটি, জলবায়ু, কৃষকের দক্ষতা ও ব্যবস্থাপনাগত সামর্থ্য এবং সংস্কৃতির সাথে খাপ খায় এবং গণস্বার্থ সংরক্ষণে অন্যান্য নীতির বিরদ্ধে ব্যবহৃত না হয়।
চ) সম্পূর্ণ বিজ্ঞান ভিত্তিক
কৃষির স্থায়িত্বশীলতার জন্য সম্পূর্ণ বৈজ্ঞানিক ভিত্তি একটি প্রধান বিবেচ্য বিষয়। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় বর্তমান অসম্পূর্ণ বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি ফসলকে রোগ-বালাই প্রতিরোধ ক্ষমতাসম্পন্ন করতে কৌলিক প্রতিস্থাপনের (Genetic Transformation) উপর নির্ভরশীল। বিকল্প হিসেবে বিজ্ঞানীদের উপলদ্ধি করা দরকার কিভাবে প্রকৃতির সম্পূর্ণ বিজ্ঞানে পরিবেশগত অবস্থা, ফসলের আন্তঃপরিচর্যা, মাটির উর্বরতা বৃদ্ধির কৌশলসমূহ ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সহযোগী উপাদানের পারস্পরিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও সহযোগিতায় প্রকৃতিগতভাবে ফসলে প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়।
ছ) সমগ্র মানবিক উন্নয়নে সহায়ক
কৃষি কেবল ফসল উৎপাদন ব্যবস্থা নয় এটি একটি জীবন ব্যবস্থা। কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থা কৃষিনির্ভর একজন ব্যক্তি বা জনগোষ্ঠীর জীবন-যাপন পদ্ধতি, কৃষ্টি, সংস্কৃতি ইত্যাদি সবকিছুর সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। কাজেই, স্থায়িত্বশীল কৃষির চূড়ান্ত লক্ষ্য হল সার্বিক মানবিক উন্নয়নের মাধ্যমে সভ্যতার বিকাশ সাধন। কাজেই, সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য কৃষি ব্যবস্থাকে অবশ্যই মানুষের ব্যবহার উপযোগী ও কল্যাণকর হতে হবে। স্থায়িত্বশীল কৃষি ব্যবস্থায় সকল জীবকেই (গাছ, মানুষ ও অন্যান্য প্রাণী) মর্যাদা ও শ্রদ্ধার সাথে বিবেচন করা হয়। এতে সকল মানুষের (ধর্ম, বর্ণ, গোত্র, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে) দক্ষতা ও মৌলিক মর্যাদার স্বীকৃতি থাকবে এবং মানুষের সম্পর্কে পারস্পরিক সততা, আত্মসম্মান, সহযোগিতা এবং সমবেদনার মতো মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠিত থাকবে।
স্থায়িত্বশীল কৃষির নীতিমালা
যদি রাসায়নিক কৃষির দ্বারা সৃষ্ট সমস্যাগুলো বুঝতে পারা যায় তা হলে একটি বিকল্প স্থায়িত্বশীল কৃষি পদ্ধতির প্রয়োজনীয়তার কথা আন্তরিকভাবে অনুভব না করে পারা যায় না। যাহোক, রাসায়নিক কৃষির ঋণাত্মক প্রভাবসমূহ সফলভাবে মোকাবিলা করতে হলে স্থায়িত্বশীল কৃষি পদ্ধতির ক্ষেত্রে যেসব মূলনীতিগুলো অবশ্যই মেনে চলা আবশ্যক সেগুলো নিম্নরূপ:
১. প্রাকৃতিক পরিবেশের কোনরূপ ক্ষতি সাধন না করা;
২. কোন নির্দিষ্ট এলাকার আর্থ-সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও পরিবেশগত অবস্থার সাথে সামঞ্জস্য রেখে ফসল বা পশুপাখির জাত বা প্রজাতি নির্বাচন করা;
৩. শস্য ও পশুপাখি এবং কৃষিচর্চার বহুমুখীকরণ করা যাতে কৃষি খামারের জৈবিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বাড়াবে;
৪. মাটির মান বজায় রাখতে মাটি ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন;
৫. উপকরণের দক্ষ ও মানবিক ব্যবহার নিশ্চিত করা;
৬. প্রযুক্তি বা পদ্ধতি ব্যবহারে কৃষকের সামর্থ্য থাকবে এবং প্রযুক্তিটি টেকসই হবে;
৭. কৃষকের নিজস্ব উপকরণনির্ভর হবে অর্থাৎ বাহ্যিক উপকরণের উপর কম নির্ভরশীল থাকবে;
৮. কৃষকের লক্ষ্য এবং জীবনাচারের পছন্দ বিবেচনায় নেওয়া;
অন্যদিকে, রাসায়নিক কৃষির বিকল্প কৃষি ব্যবস্থা হিসেবে স্থায়িত্বশীল কৃষি ব্যবস্থার প্রবর্তন করা দরকার, যার ভিত্তি হল প্রাকৃতিক বনভূমির অভ্যন্তরীণ পরিবেশ পদ্ধতি (ইকোসিস্টেম)। উদ্ভিদের জন্ম, বৃদ্ধি, উৎপাদন, পুনরুৎপাদন, টিকে থাকা থেকে শুরু করে মাটি, পরিবেশ ও ইকোসিস্টেম সংরক্ষণ ইত্যাদির ক্ষেত্রে প্রাকৃতিক বনভূমিতে একটি নিখুঁত স্থায়িত্বশীল পদ্ধতি বা সিস্টেম দেখা যায়। সুতরাং স্থায়িত্বশীল কৃষির মূল বৈশিষ্ট্যসমূহ প্রাকৃতিক বনভূমি থেকেই সনাক্ত করা যেতে পারে যা নিম্নরূপঃ
১. জীববৈচিত্র্য (Biodiversity) অর্থাৎ বৈচিত্র্যময় উদ্ভিদ ও প্রাণির উপস্থিতি;
২. সজীব মাটি (Living Soil) বা অনুজীবসমৃদ্ধ মাটি;
৩. পুনরাবর্তন (Recycling) বা পুষ্টি চক্রের সক্রিয়তা;
৪. বহুস্তর বিশিষ্ট গঠন (Multi-tier System) বা ভূমির বন্ধুরতা অনুসারে ফসলবিন্যাস;
৫. বহন/সহ্য ক্ষমতা (Bearing Capacity) বা উৎপাদনের সাথে ভোক্তা সংখ্যার সাম্যাবস্থা।
নিম্নে বৈশিষ্ট্যসমূহ বিস্তারিতভাবে আলোচিত হল।
১. জীববৈচিত্র্য
প্রাকৃতিক অরণ্যে উদ্ভিদের রোগ-বালাই জনিত সমস্যা নেই বললেই চলে। অনুজীব, প্রাণি এবং উদ্ভিদের প্রজাতি ও জাতসমূহের বৈচিত্র্যই এর কারণ। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় প্রাকৃতিক অরণ্যের প্রতি একর জমিতে প্রায় ১০০টি প্রজাতির উদ্ভিদ বর্তমান। কিন্তু এক একর কৃষি জমিতে প্রজাতির বৈচিত্র্য খুবই কম। বর্তমানে একক ফসল চাষের ফলে এই সংখ্যা একটিতে এসে পৌঁছেছে। শুধুমাত্র বৈচিত্র্যই পরিবেশের ভারসাম্য নিশ্চিত করে। পক্ষান্তরে, একক ফসলের আবাদ পরিবেশের ভারসাম্য বিঘিœত করে এবং উদ্ভিদের রোগ-বালাইয়ের প্রাদুর্ভাব ঘটিয়ে পরিবেশের ক্ষতি সাধন করে থাকে। সুতরাং কৃষি খামারের স্থায়িত্ব নিশ্চিত করতে জীববৈচিত্র্যকে সর্বাধিক গুরত্ব দেওয়া প্রয়োজন। এ ছাড়াও খামারের বৈচিত্র্য আয়ের উৎস বাড়ায় যা ঐ খামারের ফসলহানির ঝুঁকি কমায়। ফসল বৈচিত্র্য নিশ্চিতকারী খামার পদ্ধতি নিম্নরূপঃ
- ফসল বৈচিত্র্য বা বহুমুখী ফসলের আবাদ (Crop diversification)
- মিশ্র ফসলের চাষ (Mix cropping)
- শস্য পর্যায় বা শস্য আবর্তন অবলম্বন (Crop Rotation)
- খামারের চারপাশে বহুব্যবহার উপযোগী স্থায়ী গাছ লাগানো
- মাছ চাষ ও বিবিধ প্রাণিসম্পদ পালন (গবাদিপশু, মৌমাছি ইত্যাদি) ।
২. সজীব মাটি
সজীব মাটির অর্থ হল মাটিতে প্রচুর সংখ্যক অণুজীবের উপস্থিতি। মাটির উর্বরতা এবং ফসল চাষের উপযোগিতা অনুজৈবিক কার্যাবলী দ্বারা নির্ধারিত হয়। যেহেতু অনুজীবের জন্য খাদ্য ও যত্নের প্রয়োজন সেহেতু মাটির জন্যেও খাদ্য ও পরিচর্যার প্রয়োজন। নিম্নলিখিত বিষয়াবলী সজীব মাটির নিশ্চয়তা দেয়:
- মাটিতে নিয়মিত জৈব পদার্থের যোগান দেওয়া;
- মাটির ক্ষয় রোধের জন্য মাটির উপরিভাগ ঢেকে রাখা বা মালচিং করা;
- রাসায়নিক সার, আগাছা নাশক ও কীটনাশক ইত্যাদি ক্ষতিকর পদার্থ মাটিতে প্রয়োগ না করা।
৩. পুনরাবর্তন
প্রাকৃতিক অরণ্যে পুষ্টি-চক্রের মাধ্যমে পুষ্টি উপাদান বা শক্তির পুনরাবর্তন সম্পন্ন হয়। সব কিছুই মাটি থেকে আসে এবং মাটিতেই ফিরে যায়। এভাবে আবর্তিত হয় বলে বিশ্বপ্রকৃতির কোন কিছুই অপ্রয়োজনীয় নয়। পালাক্রমে সবকিছুই প্রয়োজনীয় হয় এবং কাজে লাগে। প্রাকৃতিক সম্পদের যথাযথ ও সঠিক ব্যবহারের জন্য এই আবর্তন অপরিহার্য। কিন্তু বর্তমান কালের কৃষি অনুশীলনে এই আবর্তন ধারা সর্বদাই বিঘ্নিত হয় বলে বিভিন্ন সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে। পুষ্টির আবর্তন ধারা সম্পর্কে যথেষ্ট জ্ঞান না থাকা এবং সবকিছুর সাথে সম্পর্কের কথা বিবেচনা না করে সাময়িক লাভের জন্য কোন একটি বিশেষ বিষয়ের উপর গুরুত্ব দেওয়ার প্রবণতার জন্য এসব সমস্যাবলীর সৃষ্টি করছে। সুতরাং সমস্যা সমাধান করতে আবর্তন ধারা সম্পর্কে জ্ঞান এবং একই সাথে কৃষিচর্চায় কিভাবে তা পুনরাবর্তন করা যায় সে সম্পর্কে জানা ও তার প্রয়োগ অত্যন্ত জরুরি। খামারের প্রতিটি উপাদান থেকে লাভবান হওয়ার জন্য পুনরাবর্তন এসব উপাদানগুলির মধ্যে কার্যকর সম্পর্ক গড়ে তোলে। বাহ্যিক উপকরণের ব্যবহার কমিয়ে স্থানীয় সহজলভ্য সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহারের মাধ্যমে খামারকে লাভজনক করতে তাই পুনরাবর্তন অপরিহার্য।
৪. বহুস্তরবিশিষ্ট গঠন
কৃষিতে উৎপাদনের প্রকৃত উৎস হল সূর্যের আলো এবং বৃষ্টির পানি। সব সময়ই প্রাকৃতিক অরণ্যে বায়োমাস উৎপাদন কৃষির তুলনায় বেশি। এর কারণ অরণ্যে বনানীর বহুস্তর বিশিষ্ট কাঠামো যা সূর্যালোক ও বৃষ্টির পানিকে সর্বোচ্চ মাত্রায় কাজে লাগাতে পারে। সচরাচর কাঠমোগতভাবে ফসলের মাঠ আনুভূমিক যা উক্ত প্রাকৃতিক সম্পদ সর্বোচ্চ মাত্রায় কাজে লাগাতে পারে না। কৃষি জমিতে সূর্যালোক ও বৃষ্টির পানি যথাযথভাবে ব্যবহৃত হলে তা ফসলের জন্য সুফল বয়ে আনতে পারে। যদি এমনটি না হয় তা হলে সূর্যালোক ও বৃষ্টির পানি খরা ও ভূমিক্ষয়ের প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়ায়। যে সমস্ত বিষয়াবলী একটি খামারকে বহস্তরবিশিষ্ট কাঠামোতে রূপদান নিশ্চিত করে তা নিম্নরূপঃ
- খামারের চারিদিকের আইলে বিভিন্ন প্রজাতির স্থায়ী গাছ লাগানো এবং নিচে ছায়া পছন্দকারী ফসলের আবাদ করা;
- সুষ্ঠু-বিন্যাসের মাধ্যমে ফসলের ক্ষেতে বহুব্যবহার উপযোগী গাছ লাগানো এবং বিভিন্ন উচ্চতার ফসল আবাদ করা।
৫. বহন/সহ্য ক্ষমতা
প্রতিটি ব্যবস্থারই একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ বহন/সহ্য ক্ষমতা থাকে। যেমনঃ একটি মোটর সাইকেলের দুইজন মানুষ বহন করার ক্ষমতা রয়েছে। ঐ মোটর সাইকেলটিতে পাঁচজন মানুষ কখনই বহন করা যাবে না। অনুরূপভাবে মাটির একটা নির্দিষ্ট বহন/ধারণ ক্ষমতা রয়েছে। যেমনঃ এক একর জমিতে যে ফসল উৎপাদন হয় তাতে পাঁচজন মানুষের সারা বছর চলে। কিন্তু এক একর জমি থেকে দশ জন মানুষের সারা বছর চলবে না। জনসংখ্যার দ্রুত বৃদ্ধির সাথে পরিবেশের ভারসাম্যের একটি নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। তাই বিশ্বব্যাপী জনসংখ্যাকে বহন ক্ষমতার মধ্যে রাখার জন্য সাধ্যমতো চেষ্টা করতে হবে। যদিও এ কাজটি সহজ নয়, তাই নিম্ন লিখিত ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে এটিকে ভারসাম্য অবস্থায় রাখা যেতে পারে।
- জনগণের মধ্যে জনসংখ্যা ও ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণ, নিরাপদ মাতৃত্ব ইত্যাদি বিষয়ে শিক্ষা ও সচেতনতা বৃদ্ধি করা;
- জন্ম নিয়ন্ত্রণ উপকরণের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করা;
- উন্নততর স্বাস্থ্য ও পুষ্টি সুবিধা নিশ্চিত করা ইত্যাদি।
রাসায়নিক ও স্থায়িত্বশীল কৃষি ব্যবস্থার তুলনামূলক আলোচনা
| রাসায়নিক কৃষি ব্যবস্থা |
স্থায়িত্বশীল কৃষি ব্যবস্থা |
| প্রযুক্তি ও রাসায়নিক উপকরণের ব্যবহার বিশেষজ্ঞদের জ্ঞান ও প্রযুক্তিনির্ভর। |
স্থানীয় জ্ঞান ও প্রযুক্তিনির্ভর তাই কৃষক সহজেই অনুশীলন করতে পারে এবং প্রযুক্তি উন্নয়নে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করতে পারে। |
| একক ফসল আবাদের কারণে জমি অনুর্বর হয় ফলে বর্ধিত হারে রাসায়নিক সার ব্যবহার করতে হয়। এতে কৃষকের অতিরিক্ত খরচ বাড়ে ও পরিবেশ নষ্ট করে। উৎপাদন পদ্ধতি পরিবেশসম্মত নয়। |
বহুফসল ও শস্য পর্যায় অনুসরণ করা হয় এবং জৈবসার ও প্রাকৃতিক পদ্ধতিতে বালাই ব্যবস্থাপনা করা হয়। কোন প্রকার রাসায়নিক সার ও বিষ ব্যবহার করতে হয় না বিধায় উৎপাদন পদ্ধতি পরিবেশসম্মত। |
| কৃষককে বীজের জন্য বাজারের উপর বা বিদেশী বহুজাতিক কোম্পানির উপর নির্ভর করতে হয়। অধিকাংশ সময়ে কৃষক তাঁর পছন্দমতো ও মানসম্মত বীজ পায় না এবং অনেক সময় কৃষক প্রতারিত হয়। |
কৃষকের খামারে বীজ উৎপাদন ও সংরক্ষণ করা হয়, সে কারণে কৃষক তার প্রয়োজনে পছন্দমতো মানসম্পন্ন বীজ ব্যবহার করতে পারে। |
| প্রায় সব উপকরণ বাজার থেকে বেশি মূল্যে কিনতে হয় এবং অধিকাংশ সময়ে প্রয়োজনমতো পাওয়া যায় না। ফলে, উৎপাদন খরচ ও পরনির্ভরশীলতা বাড়ে। |
প্রয়োজনীয় উপকরণের বেশিরভাগ খামারের অভ্যন্তরে তৈরি বা স্থানীয়ভাবে সংগ্রহ করা হয়। ফলে, প্রয়োজনমতো মানসম্মত উপকরণ ব্যবহার করা যায়। এতে খরচ কম হয় এবং স্বনির্ভরতা বাড়ে। |
| প্রাথমিক পর্যায়ে ফলন বাড়লেও পরবর্তীতে ফলন ক্রমান্বয়ে হ্রাস পেতে থাকে। |
ফলন কোন পর্যায়ে কমে না বরং বছর বছর বাড়তে থাকে বা উৎপাদনশীলতা বজায় থাকে। |
| উৎপাদন ব্যয় যে হারে বাড়ে নির্দিষ্ট একক জমিতে উৎপাদন ও উৎপাদিত ফসলের মূল্য সে হারে বাড়ে না। ফলে কৃষিতে লাভ ক্রমান্বয়ে কমতে থাকে। |
উৎপাদন ব্যয় কম এবং ফলন বাড়তে থাকে তাই বাজার মূল্য তেমন প্রভাব ফেলতে পারে না। কৃষি কাজে ঝুঁকি থাকে না বললেই চলে। বহুফসল আবাদের ফলে চাষাবাদ সব সময় লাভজনক হয়। |
| অল্প সংখ্যক ফসল উৎপাদনের ফলে পারিবারিক পুষ্টির যোগান ও আয়ের উৎস কমে। রাসায়নিক বিষ ব্যবহার করা হয় বলে উৎপাদিত ফসলে বিষ ক্রিয়া থাকে যা স্বাস্থ্যসম্মত নয়। ফলে স্বাস্থের ঝুঁকি বাড়ে। |
বহুবিধ ফসল উৎপাদনের ফলে পারিবারিক পুষ্টি ও আয়ের উৎস বাড়ে। পরিবেশসম্মত প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয় বলে উৎপাদিত ফসলের গুণগত মান ভাল থাকে যা স্বাস্থ্য সম্মত হয় এবং স্বাস্থ্যহানির ঝুঁকি কমে। |
| বিষ প্রতিরোধক্ষমতা বাড়ায় রাসায়নিক বিষ পোকা নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে না। বন্ধু/উপকারী পোকা/প্রাণী মারা যায় ফলে পোকার আক্রমণ দিন দিন বাড়তে থাকে। |
উপকারী প্রাণী, কীট-পতঙ্গ সংরক্ষিত হয়। ফলে, প্রাণী জগতের ভারসাম্য বজায় থাকে এবং প্রাকৃতিকভাবে কীট-পতঙ্গ নিয়ন্ত্রণের মধ্যে থাকে। |
| ব্যবহৃত রাসায়নিক সার ও বিষ মাটি, পানি ও বায়ু দূষণের মাধ্যমে পরিবেশ দূষণ ঘটায়। |
টেকসই প্রযুক্তি ও জৈব উপকরণ ব্যবহার করে চাষাবাদ করা হয় বলে পরিবেশ দূষণের কোন সম্ভাবনা থাকে না। |
| বিষ নাড়াচাড়া ও ব্যবহারে কৃষকের স্বাস্থ্য হানি ঘটে। |
বিষ ব্যবহার করা হয় না বলে বিষজনিত স্বাস্থ্য সমস্যা থাকেনা। |
সুতরাং কোন যুক্তিতেই বাইরের বা বাজারের উপকরণনির্ভর ও ব্যয়বহুল রাসায়নিক কৃষি ব্যবস্থা স্থায়িত্বশীল নয়। এই কৃষি ব্যবস্থা সর্বদাই কৃষি ও কৃষককে ঝুঁকি ও নাজুক পরিস্থিতির মধ্যে রাখে। অতএব কৃষিনির্ভর, প্রযুক্তিগতভাবে দুর্বল ও দরিদ্র এ দেশে প্রচলিত রাসায়নিক কৃষির প্রচলন মোটেই সুবিবেচনাপ্রসূত নয়। তাই স্থায়িত্বশীল কৃষি ব্যবস্থা দ্বারা এর প্রতিস্থাপন একান্ত জরুরি।
স্থায়িত্বশীল কৃষি আধুনিক পরিবেশ বিজ্ঞানের দৃঢ় ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত। এ কৃষি ব্যবস্থায় কৃষকদের জ্ঞানকে শ্রদ্ধা করা হয় এবং কৃষকের অংশগ্রহণমূলক গবেষণার উপরই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়ে থাকে। পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর কোন রাসায়নিক উপকরণ ব্যবহার না করে, প্রকৃতির নিজস্ব উৎপাদন দক্ষতা বৃদ্ধিতে সহায়তা দানের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় উপকরণ খামারের অভ্যন্তরেই তৈরি ও ব্যবহার করা হয় কিংবা স্থানীয়ভাবে সংগ্রহ করে ব্যবহার করা হয়। এভাবে মাটির উর্বরতা ও উৎপাদন ক্ষমতাকে সর্বোচ্চ মাত্রায় বজায় রেখে লাভজনকভাবে চাহিদাভিত্তিক ফসল উৎপাদন করাই স্থায়িত্বশীল কৃষি। এটি একটি স্থায়িত্বশীল উৎপাদন পদ্ধতি যা কৃষক নিজে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে এবং পারিবারিক খাদ্য নিরাপত্তাসহ স্বনির্ভর উন্নয়ন ঘটাতে পারবে। পরিশেষে, আব্রাহাম লিংকনের গণতন্ত্রের সংজ্ঞার মত করে বলা যায় স্থায়িত্বশীল কৃষি হল কৃষকের জন্য, কৃষকের দ্বারা, কৃষকের কৃষি। তাই স্থায়িত্বশীল কৃষিকে নিছক একটি চাষ পদ্ধতি বা ব্যবস্থা হিসেবে না দেখে একটি সমগ্রিক উন্নয়ন দর্শন হিসেবে দেখাই শ্রেয়।
উপসংহার
বাংলাদেশে বিভিন্ন উন্নয়ন সংস্থা কর্তৃক বাস্তবায়িত স্থায়িত্বশীল কৃষি কর্মসূচি-র অভিজ্ঞতা থেকে অর্জিত ইতিবাচক ফলাফলসমূহ প্রচলিত রাসায়নিক কৃষির বিকল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার ইঙ্গিত বহন করছে। স্থায়িত্বশীল কৃষির ফলাফল গ্রামীণ দরিদ্র জনগোষ্ঠীর আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করার ক্ষেত্রে উলেখযোগ্য ভূমিকা রাখবে বলে সংশ্লিষ্ট অভিজ্ঞ মহল আশাবাদ ব্যক্ত করছেন। স্থায়িত্বশীল কৃষি ব্যবস্থা টেকসই বা স্থায়িত্বশীল উন্নয়ন ধারণা প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি দারিদ্র বিমোচন, পরিবেশ উন্নয়ন ও দরিদ্রদের ক্ষমতায়ন প্রক্রিয়ায় সহায়তা করছে।
এতদসত্ত্বেও হালের কৃষি ব্যবস্থায় রাসায়নিক কৃষি যেভাবে ডাল-পালা-শিকড় বিস্তার করে এক মহীরূহ রূপ লাভ করেছে তা সমূলে উৎপাটন করে বিকল্প হিসেবে স্থায়িত্বশীল কৃষির প্রবর্তন রাতারাতিই সম্ভব হবে এমনটা প্রত্যাশা করা সমীচীন হবে না। সমাজের ক্রম-বিবর্তনের ইতিহাসে কৃষির ধারা বিশ্লেষণে দেখা যায় যে, প্রতিটি কৃষি ব্যবস্থারই কতকগুলো ধাপ রয়েছে। স্থায়িত্বশীল কৃষি প্রবর্তনেও আমাদেরকে তাই ধাপে ধাপে এগিয়ে যেতে হবে। চলমান কৃষি ব্যবস্থায় একটি বৈপ্লিবিক পরিবর্তন আনতে হবে। আর এজন্য প্রয়োজন-
- সম্প্রসারণ কার্যক্রম জোরদারকরণ ও বিভিন্নমুখী প্রচার মাধ্যম (রেডিও, টেলিভিশন, সংবাদপত্র, পোস্টার ইত্যাদি) ব্যবহার করে স্থায়িত্বশীল কৃষি বিষয়ে গণচেতনা সৃষ্টি করা;
- কৃষিক্ষেত্রে নারীর শ্রমের অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় উদ্যোগ গ্রহণ;
- টেকসই কৃষি প্রযুক্তি বাছাই বা চিহ্নিতকরণ ও উন্নয়নে কৃষকদের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণে গবেষণাকর্ম পরিচালনা করা;
- কৃষকদের মাঠকে স্থায়িত্বশীল কৃষি খামার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা;
Mar 31, 2025 | প্রকৃতি কথা
বাংলাদেশে বালাইনাশকের ব্যবহার
১৯৫৬ সালে তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের প্ল্যান্ট প্রোটেকশন উইং প্রথমবারের মতো বর্তমান বাংলাদেশ ভূখণ্ডে বালাইনাশকের আমদানি করে। সেসময় বিনামূল্যে এসব বালাইনাশক কৃষককে দেওয়া হয়েছে। স্বাধীনতাউত্তর বাংলাদেশ সরকারও ১৯৭৪ সাল পর্যন্ত বালাইনাশকের ক্ষেত্রে শতকরা ১০০ ভাগ ভর্তুকী দিয়েছে। ১৯৭৯ সালে ভর্তুকীর পরিমাণ কমিয়ে ৫০ শতাংশে নামানো হয়। বিশ্বব্যাংকের কাঠামোগত সংস্কার কর্মসূচির আওতায় সরকারি ভর্তুকী প্রত্যাহার এবং বেসরকারি খাতে বালাইনাশক আমদানির অনুমতি দেওয়া হয় ১৯৮০ সালে। ভর্তুকি প্রত্যাহার করা সত্তে¡ও ১৯৮৫ সাল থেকে ৯০ সালের মধ্যে দেশে বালাইনাশকের ব্যবহার দ্বিগুণ বেড়েছে যা বালাইনাশকের উপর কৃষকের অত্যধিক নির্ভরশীলতাকেই নির্দেশ করে। ১৯৮৫-৮৬ সালে ব্যবহৃত বালাইনাশকের পরিমাণ ছিল ৩০০০ মেট্রিক টন যা ১৯৯০ সালে বেড়ে দাড়ায় ৬০০০ মেট্রিক টন। পরবর্তীকালে বালাইনাশকের ব্যবহারের হার দ্রুত থেকে দ্রুততর হয়। ১৯৯৫-৯৬ সালে ব্যবহৃত বালাইনাশকের পরিমাণ ছিল ১৬,০০০ মেট্রিক টন এবং ২০০৩ সালে ২০,০০০ মেট্রিক টন। বিদেশ থেকে আমদানি করা এসব বালাইনাশকের শতকরা ৮০ ভাগই ব্যবহার করা হয ধান উৎপাদনের ক্ষেত্রে। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, বর্তমানে দেশে ৯১ লাখ হেক্টর কৃষি জমির ৮০ ভাগই ধান উৎপাদনের জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ নিষিদ্ধ বালাইনাশকের অবাধ বাজার
বালাইনাশকের উপর কৃষকদের অত্যধিক নির্ভরশীলতা এবং সরকারি নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার দুর্বলতার সুযোগকে কাজে লাগিয়ে কোম্পানিগুলো পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর এবং শিল্পোন্নত দেশে নিষিদ্ধ বালাইনাশক বাংলাদেশে আমদানি ও বাজারজাত করে আসছে। দেশে আমদানিকৃত ও ব্যবহৃত বালাইনাশকের মধ্যে কয়েকটি অতি উচ্চমাত্রায় বিষাক্ত যেগুলো মানুষ ও পরিবেশের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। এই শ্রেণীর অন্তর্ভূক্ত বালাইনাশকগুলো ‘ডার্টি ডজন’ নামে পরিচিত। এ ধরণের বালাইনাশকের বর্তমান সংখ্যা ১৭টি। ডিডিটি, হেপ্টাক্লোর, কোরডেন, এনড্রিন, ডাইএলড্রিন, অরড্রিন, কেমকেবোর, লিনড্রেন, বিএইচসি, প্যারাথিয়ন, ডাইব্রোমো-ক্লোরোপেনটিন, প্যারাকোয়াট, টক্সাফেন, ২-৪ডি, এলডিকার্ব, পেন্টাক্লোরোফেনল, মিথক্সি-ইথাইল, মার্কারি ক্লোরাইড এবং ইথাইলিন ডাইব্রোমাইড। শিল্পোন্নত বিভিন্ন দেশে এই সবগুলো বালাইনাশকই নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এমনকি যেসব দেশ এসব বালাইনাশক উৎপাদন করে সেসব দেশেও এগুলোর ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে। অথচ দুঃখজনক হলেও সত্য যে, এসব বালাইনাশকের অনেকগুলোই বৈধ বা অবৈধভাবে আমাদের দেশে দেদারছে চলছে। আরও হতাশাজনক ব্যাপার হল, এসব বালাইনাশকের ব্যবহার বন্ধ করার জন্য কার্যকর কোন পদক্ষেপও নেওয়া হচ্ছে না।
যাহোক, এসব বালাইনাশক ব্যবহারের ফলে বাংলাদেশের মানুষের স্বাস্থ্য, পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য, মৎস্যসম্পদ ইত্যাদি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। নিম্নে এসব ক্ষতিকর প্রভাবগুলো সংক্ষেপে আলোচিত হল।
১. মানব-স্বাস্থের উপর প্রভাব
আজকাল প্রায় সব ফসলেই বিষাক্ত বালাইনাশক প্রয়োগ করা হচ্ছে যা আমরা প্রতিদিন জেনে বা না জেনে খাচ্ছি। আমাদের পুষ্টির জন্য সবুজ শাক-সব্জি ও রঙ্গিন ফলমূল খাওয়া অত্যন্ত জরুরী। কিন্তু আমরা যেসব শাক-সব্জি ও ফলমূল খাচ্ছি সেগুলোর উৎপাদন প্রক্রিয়া থেকে শুরু করে সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণ পর্যন্ত প্রতিস্তরে এসব বিষ প্রয়োগ করা হচ্ছে। বিষাক্ত বালাইনাশক প্রয়োগ করে উৎপাদনের পর এসব শাক-সব্জি এবং ফলমূল যেমনঃ আম, কাঁঠাল, কলা, লিচু, পেঁপে, টমেটো ইত্যাদি পাকানো ও টাটকা রাখা এবং ক্রেতাদের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য প্রয়োগ করা হচ্ছে কার্বাইড ও ইথারেল নামক বিষাক্ত পদার্থ। এসব রাসায়নিক পদার্থের একটি অংশ ফলের খোসার শুক্ষè ছিদ্র দিয়ে ভিতরে প্রবেশ করে। পরবর্তীতে এ ফল কেউ খেলে এসব বিষাক্ত পদার্থ তার দেহে প্রবেশ করে যা লিভার ও কিডনিসহ মানব দেহের বিভিন্ন ধরণের ক্ষতি সাধন করতে পারে। অথচ, প্রতিদিনই আমরা সেই বিষাক্ত ফল-ফলাদি ও শাক-সব্জি খাচ্ছি এবং আমাদের শিশুদেরকে খাওয়াচ্ছি। এসব বিষের প্রভাবে একদিকে যেমন দেখা দিচ্ছে নানান রোগ-বালাই অন্যদিকে তেমনি জীবনী শক্তিও হ্রাস পাচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসী অনুষদের অধ্যাপক চৌধুরী মাহমুদ হাসানের মতে, এসব রাসায়নিক পদার্থ রান্নাতেও দূর হয় না এবং তা লিভার ও কিডনির জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। কাজেই নীরব ঘাতকের মতো এসব আকর্ষণীয় খাদ্য আমাদেরকে নিশ্চিত মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
বিষাক্ত বালাইনাশক শুধু যে ফসল চাষেই ব্যবহৃত হচ্ছে তাই নয়, বিভিন্ন খাদ্যসামগ্রী প্রক্রিয়াজাতকরণ, সংরক্ষণ ও গুদামজাত করার কাজেও ব্যবহৃত হচ্ছে। আমাদের দেশে শুটকি মাছ প্রক্রিয়াজাত ও গুদামজাত করার জন্য নির্বিচারে ডিডিটি, নকরোজ, নগস, বাসুডিন প্রভৃৃতি অত্যন্ত ক্ষতিকারক বালাইনাশক ব্যবহার করা হয়। বাংলাদেশ আণবিক শক্তি কমিশনের গবেষণাগারের পরীক্ষায় দেখা গেছে যে, শুটকি মাছে যেসব বিষাক্ত বালাইনাশক ব্যবহার করা হচ্ছে সেগুলোর বিষাক্ত উপাদান গরম পানিতে ধোয়ার পরও শুটকি মাছে প্রচুর পরিমাণে থেকে যায়। অর্থাৎ রান্না করা শুকটি মাছ কোনভাবেই বিষমুক্ত হচ্ছে না। ফলে তা চুড়ান্তভাবে মানুষের খাদ্যচক্রে প্রবেশ করছে। বিজ্ঞানীদের দাবী বাংলাদেশে মানব দেহে গড়ে ১২.৫ পিপিএম ডিডিটি রয়েছে যা ইংল্যাণ্ডের মানুষের তুলনায় ৫ গুণ বেশি। বাংলাদেশে ১৪ বছর আগে ডিডিটি নিষিদ্ধ করা হলেও অদ্যাবধি এর ব্যবহার বন্ধ হয়নি।
ব্রাজিল, হংকং ও মেক্সিকোসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গবাদি পশুর দুধে এমনকি মায়ের দুধেও ক্যান্সার সৃষ্টিকারী বালাইনাশকের অবশেষ পাওয়া গেছে। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের সুদূর গ্রামাঞ্চলে মায়ের বুকের দুধে বালাইনাশকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। লন্ডনভিত্তিক সংগঠন উইমেনস এনভাইরোনমেন্টাল নেটওয়ার্কের মতে, এসব বালাইনাশক বিষ একেবারে মাতৃগর্ভ থেকে শিশুর মারাত্মক ক্ষতি সাধন করে থাকে। গবেষকদের দাবী খাদ্যে বালাইনাশকের অবশেষ শিল্পোন্নত দেশগুলোতে ব্যাপক স্তন ক্যান্সার সৃষ্টির জন্য দায়ী। এসব দেশে ৩৪-৫৪ বছর বয়সের মহিলাদের মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ হল স্তন ক্যান্সার।
স¤প্রতি জাতিসংঘের ইউরোপভিত্তিক অর্থনৈতিক কমিশন বলেছে উচ্চ বিষাক্ততাযুক্ত ১২টি বালাইনাশকের বিরূপ প্রতিক্রিয়ায় গত ৫০ বছরে পুরুষের সন্তান উৎপাদন ক্ষমতা শতকরা ৪২ ভাগ কমে গেছে। এর কারণ হিসেবে ধারণা করা হচ্ছে যে, চাষাবাদে ব্যবহৃত রাসায়নিক সারসহ বিষাক্ত কীটনাশক ব্যবহার করে উৎপাদিত ফলমূল, শাক-সব্জি এবং অন্যান্য ফসল দূষিত হয়ে পড়ছে যা খেয়ে মানুষ দীর্ঘমেয়াদি এ ধরণের বিরূপ প্রতিক্রিয়ার শিকার হচ্ছে।
ওয়ার্ল্ড রিসোর্স ইনস্টিটিউট-এর মতে, কৃষি খামার শ্রমিকদের মধ্যে এবং উন্নয়নশীল দেশে অধিকাংশ মৃত্যুর ঘটনা এবং বিশেষ করে ক্যান্সার, বিভিন্ন সংক্রামক ব্যাধি ও অন্যান্য অসুস্থতা বালাইনাশকের কারণে ঘটছে। তাদের মতে, বালাইনাশক শরীরের স্বাভাবিক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা নষ্ট করে দেয়।
কৃষকরা জমিতে জিঙ্ক ও অক্সি সালফেট অধিকহারে ব্যবহার করে থাকে। অথচ জিঙ্ক ও অক্সি সালফেটে রয়েছে বিষাক্ত ক্যাডমিয়াম ও সীসা। খাদ্যচক্র বা পানির মাধ্যমে ক্যাডমিয়াম এবং সীসা মানবদেহে প্রবেশ করলে ক্যান্সার, উচ্চ রক্তচাপ এবং ফুসফুসের জটিল রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। বালাইনাশকের প্রতিক্রিয়ায় মানুষের বমি বমি ভাব, অন্ত্রে ব্যথা, শারীরিক দুর্বলতা, দীর্ঘমেয়াদী মাংসপেশী সংকোচন ও শ্বাসকষ্ট, ফুসফুসের রোগ, মাথা ব্যথা, ডায়রিয়া প্রভৃতি অসুবিধা দেখা দেয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার শ্রেণীবিন্যাস অনুসারে অত্যন্ত বিষাক্ত হিসেবে চিহ্নিত হেপ্টাক্লোর পাখি ও মানুষের জন্য অধিক ক্ষতিকর। এই বালাইনাশকের সংস্পর্শে এলে মানুষ লিউকোমিয়ায় আক্রান্ত হতে পারে। তা ছাড়া, মাতৃগর্ভস্থ শিশুর মৃত্যু ও বিকলাঙ্গ হওয়ার আশঙ্কা থাকে। বালাইনাশকের কারণে মানবদেহে যেসব স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদী স্বাস্থ্য সমস্যা দেখা দেয় সেগুলো নিম্নের ছকে তুলে ধরা হল।
| স্বল্পস্থায়ী সমস্যা |
দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা |
| স্নায়ুবিক সমস্যা |
| শারীরিক দুর্বলতা, মাথা ধরা, বমি বমি ভাব, জ্বর, অতিরিক্ত ঘাম, লালা ঝরা, মুর্ছা যাওয়া ইত্যাদি |
প্যারালাইসিস, অবশ, বিষন্নতা |
| চোখের সমস্যা |
| জ্বালাপোড়া, চোখ দিয়ে পানি ঝরা, চোখে চুলকানি। |
চোখে ক্ষত হওয়া, চোখ নষ্ট হওয়া, চোখের বল নষ্ট হওয়া |
| হার্টের সমস্যা |
| নাড়ী দুর্বলতা, হার্ট এ্যাটাক |
বুকে ব্যথা |
| ফুসফুসের সমস্যা |
| স্বাসকষ্ট |
এ্যাজমা, ব্রংকাইটিস, ফুসফুস ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া |
| মূত্র ও প্রজনন সমস্যা |
| ঘন ঘন প্রস্রাব, বাচ্চা নষ্ট হয়ে যাওয়া |
কিডনি নষ্ট হওয়া, বন্ধাত্ব |
| ত্বক, মাংসপেশী ও হাড়ের সমস্যা |
| চুলকানি, ফুসকা পড়া |
ত্বক ঝুলে পড়া, পেশি শক্তি কমে যাওয়া, মাংস পেশিতে খিচুনি, একজিমা |
| পাকস্থলির সমস্যা |
| প্রচণ্ড পিপাসা, বমি, পেটে ব্যথা, ডাইরিয়া |
অরুচি, ওজন হ্রাস, অন্ত্রে রক্তক্ষরণ |
| লিভারে সমস্যা |
| নেক্রোসিস |
জণ্ডিস |
| অন্যান্য সমস্যা |
| ক্লান্তি, অবসাদ, দুশ্চিন্তা |
ক্যান্সার, স্তন ক্যান্সার, স্মৃতি শক্তি ও মনযোগ লোপ পাওয়া |
২. মৎস্যসম্পদ ও জলজ প্রাণীর উপর প্রভাব
একসময় আমাদের নদী-নালা, খাল-বিল, হাওড়-বাওড়, জলাশয়ে প্রচুর মাছ ছিল। “মাছে-ভাতে বাঙ্গালী” – এটি ছিল একটি সর্বজনবিদিত প্রবাদ। আজকাল ফসলের মাঠে প্রচুর পরিমাণে বালাইনাশক প্রয়োগ করা হচ্ছে যেগুলো বৃষ্টি ও সেচের পানির সাথে মিশে নদী-নালা, খাল-বিল, পুকুর, ডোবা ইত্যাদি জলাশয়ে চলে যাচ্ছে। ফ্লাড এ্যাকশন প্লান (ফ্যাপ) এবং পরিবেশ অধিদপ্তর যৌথভাবে ১৯৯২-৯৩ সালে এ বিষয়ে এক সমীক্ষা চালায়। দেশের বিভন্ন অঞ্চলের বিল যেমনঃ গাইবান্ধার বিল, কুমিলার নিগার বিল এবং নোয়াখালির বেগমগঞ্জের বিল থেকে পানি সংগ্রহ করে ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা করা হয়। এতে দেখা যায় যে, বিলের পানিতে বিষাক্ত বালাইনাশক ডাইএলড্রিন-এর অবশেষ প্রতিলিটারে ০.৬৪ মাইক্রোগ্রাম যেখানে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত সহনীয় মাত্রা হচ্ছে ০.১৯ মাইক্রোগ্রাম। অর্থাৎ সহনীয় মাত্রার চেয়ে তিনগুনেরও বেশী। অপর একটি বিষাক্ত বালাইনাশক লিনড্রেন এর অবশেষ প্রতিলিটারে ০.২৩১ থেকে ০.৫৪৭ মাইক্রোগ্রাম পাওয়া যায়। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা অনুষদের এক গবেষণায় দেখা গেছে যে, মাছে ডায়জিনন, ফোরাডান ও বাসুডিনের অবশেষ ক্ষতিকর মাত্রায় উপস্থিত। এসব বালাইনাশকের বিষক্রিয়ায় বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে মাছ মারা যাচ্ছে এবং মাছের বংশ বৃদ্ধির হারও কমে যাচ্ছে। বালাইনাশক এবং রাসায়নিক সারের মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহারের ফলে নদ-নদী, পুকুর এবং জলাশয়ের পানির দূষণ আশঙ্কাজনকহারে বেড়ে যাওয়ায় মাছসহ অনেক জলজ প্রাণী আজ বিলুপ্তির পথে।
৩. ফসলের উপকারী পোকামাকড় ও পশুপাখির উপর প্রভাব
সাধারণত ফসলের মাঠে যত ধরণের ক্ষতিকর পোকা থাকে উপকারী পোকামাকড় থাকে তার থেকে বেশি। এসব উপকারী পোকামাকড় ক্ষতিকর পোকামাকড় ধরে খায়, ফলে এরা বাড়তে পারেনা এবং ফসলের বেশি ক্ষতিও করতে পারে না। যখন জমিতে বালাইনাশক বিষ দেওয়া হয় তখন ক্ষতিকর পোকার চেয়ে উপকারী পোকা অনেক তাড়াতাড়ি মারা যায় এবং সাথে সাথে কেঁচো, ব্যাঙ ইত্যাদি উপকারী প্রাণীও মারা যায়। ক্ষতিকর পোকামাকড় এরূপ প্রতিকূল অবস্থায় টিকে থাকতে পারলেও উপকারী পোকামাকড় তা পারে না। এভাবে অনেক উপকারী পোকামাকড় আমাদের পরিবেশ থেকে বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে।
৪. জীববৈচিত্র্যের উপর প্রভাব
ইতোপূর্বেই বলা হয়েছে যে, জমিতে বালাইনাশক বিষ দেওয়ার ফলে আমাদের জমিতে নানারকম জীব যেমনঃ কেঁচো, সাপ, ব্যাঙ, শামুক ইত্যাদি মরে মরে ক্রমেই বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে এসব বিষ খাদ্য শিকলের মাধ্যমে গোটা জীবজগতে ছড়িয়ে গিয়ে ধ্বংস করে দিচ্ছে আমাদের অত্যন্ত সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্যকে। আমাদের চারপাশের নানা রকম জীব একে অপরকে খেয়ে বেঁচে থাকে। যেমনঃ পোকা গাছের বিভিন্ন অংশ খায়, সে পোকাকে খায় ব্যাঙ, ব্যাঙকে খায় সাপ, সাপকে খায় বাজপাখি। এভাবে এক জীব অন্য জীবকে খাওয়ার ফলে একটি চেইন বা শিকল সৃষ্টি হয় যাকে খাদ্য শিকল বলা হয়। এ খাদ্য শিকলের একটি জীব মারা গেলে তার উপর নির্ভরশীল অন্য জীবও খাদ্যের অভাবে বেঁচে থাকতে পারে না। কাজেই ক্ষতিকর পোকা মারার জন্য বিষ দিলেও সে বিষ খেয়ে খাদ্য শিকলের অন্যান্য প্রাণীও মরে যাচ্ছে। তা ছাড়া, পোকা না থাকলে ব্যাঙ খাবে কি? ব্যাঙ না থাকলে সাপ খাবে কি? সাপ না থাকলে পাখি খাবে কি? এভাবে খাদ্যের অভাবে অনেক জীবই ক্রমশ বিলুপ্তির পথে। আর এভাবেই প্রতিনিয়ত ধবংস হচ্ছে আমাদের এককালের অত্যন্ত সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্য।
৫. পরিবেশের ও ইকোসিস্টেমের উপর প্রভাব
আমাদের পরিবেশে যে সকল উপাদান যে পরিমাণে থাকলে উদ্ভিদ ও প্রাণী স্বাভাবিকভাবে বাস করতে পারে সেগুলো যদি কোন পরিবেশে সঠিক পরিমাণে থাকে তবে তাকেই আমরা বলব বিশুদ্ধ পরিবেশ। পরিবেশে কোন ক্ষতিকর উপাদান থাকলে অথবা কোন উপাদান স্বাভাবিক মাত্রার চেয়ে কম বা বেশি থাকলে সে পরিবেশকে বিশুদ্ধ বলা যাবে না। আজ আমাদের পরিবেশের বিভিন্ন উপাদান যেমনঃ মাটি, পানি, বাতাস মারাত্মকভাবে দুষিত হয়ে যাচ্ছে যার জন্য রাসায়নিক কৃষি অনেকাংশে দায়ী।
এই পৃথিবীতে একমাত্র সবুজ উদ্ভিদই নিজের খাদ্য নিজে তৈরি করতে পারে। মাটি থেকে পানি ও বিভিন্ন খনিজ লবণ এবং বাতাস থেকে কার্বন-ডাই-অক্সাইড গ্রহণ করে সূর্যালোকের সাহায্যে সালোক-সংশ্লেষণ প্রক্রিয়ায় গাছ এ খাদ্য তৈরি করে। এ খাদ্য খেয়ে উদ্ভিদ নিজে বেঁচে থাকে, বড় হয় এবং বংশ বিস্তার করে এবং পৃথিবীর তাবৎ প্রাণীকূলকে বাঁচিয়ে রাখে। যেহেতু কোন প্রাণীই নিজের খাদ্য নিজে তৈরি করতে পারে না তাই সকল প্রাণীই তার খাদ্যের জন্য প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে উদ্ভিদের উপর নির্ভরশীল। যেমনঃ উদ্ভিদভোজী প্রাণী উদ্ভিদকে খায়, মাংসভোজী প্রাণী উদ্ভিদভোজী প্রাণীকে খায়, অন্যান্য প্রাণী আবার মাংসভোজী প্রাণীকে খায়। শেষ পর্যন্ত এসব প্রাণী ও উদ্ভিদ যখন মারা যায় তখন তাদের মৃত দেহের উপর শুরু হয় এক জৈব-রাসায়নিক ক্রিয়া যাকে বলা হয় পঁচন। ব্যাকটেরিয়ার মত অসংখ্য অনুজীব উদ্ভিদ বা প্রাণীর মৃতদেহকে পঁচিয়ে মাটির সাথে মিশিয়ে দেয় যেগুলোকে গাছ আবার খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে থাকে। এভাবেই খাদ্যচক্রের মাধ্যমে খাদ্যশক্তি এক জীব আর এক জীবে বাহিত হয়।
পরিবেশের উদ্ভিদ, প্রাণী ও অনুজীব একে অন্যের উপর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে নির্ভরশীল। এরূপ নির্ভরশীলতার ফলে যে অবিচ্ছিন্ন সিস্টেমের সৃষ্টি হয় তাকে বলা হয় ইকোসিস্টেম। প্রাণী হিসেবে মানুষও এই সিস্টেমের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। অনাদিকাল থেকেই এরূপ সিস্টেম বিরাজমান যা প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলেছে। কিন্তু রাসায়নিক সার ও বালাইনাশক ব্যবহারের ফলে এই ইকোসিস্টেম ও প্রাকৃতিক পরিবেশ আজ মারাত্মকভাবে বিপর্যস্ত।
জমিতে বিষ দিলে ক্ষেতের ফসলের ভিতর সে বিষ প্রাণীদেহে প্রবেশ করে। এ ফসল পোকায় খাচ্ছে ফলে পোকার দেহেও যাচ্ছে। আবার, এসব পোকাকে অন্য প্রাণী ধরে খাচ্ছে ফলে, পোকার দেহেও যাচ্ছে। আবার, এসব পোকাকে অন্য প্রাণী ধরে খাচ্ছে ফলে, সে প্রাণীর দেহেও বিষ যাচ্ছে। বিষ দেওয়া ধানের খড় গরু খায় এতে গরুর দেহেও বিষ যাচ্ছে, গরুর মাংস, দুধ আমরা খাচ্ছি ফলে এ বিষ আবার আমাদের দেহে চলে আসে। আবার সে বিষ পানি, বাতাসে মিশছে এবং তা মানুষ ও অন্যান্য প্রাণীর দেহে প্রবেশ করছে। এভাবে জমিতে দেওয়া বিষ খাদ্যচক্রের মাধ্যমে ইকোসিস্টেমের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে বিষাক্ত করে তুলছে আমাদের পরিবেশ।
পোকামাকড় দমনে কীটনাশকই শেষ সামাধান নয়
কীটনাশক প্রয়োগ করেও আজকাল অনেক ক্ষেত্রেই পোকামাকড় দমন করা যাচ্ছে না। অব্যাহতভাবে অতিরিক্ত মাত্রার কীটনাশক ব্যবহারের কারণে একদিকে যেমন উপকারী ও প্রয়োজনীয় কীট-পতঙ্গ বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে অন্যদিকে তেমনি নতুন প্রজাতির পোকা-মাকড়ের জন্ম হচ্ছে যা প্রচলিত মাত্রার কীটনাশক দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। বেগুনের কাণ্ড ও ফল ছিদ্রকারী পোকা-এর জলন্ত উদাহরণ। বর্তমানে বেগুন চাষীরা কয়েক জাতের কীটনাশক দিনে দুইবার করে প্রয়োগ করার পরও এ পোকা দমন করতে পারছে না। এর কারণ মূলত দুটো-
একঃ সাধারণত ফসলের মাঠে যত ধরণের ক্ষতিকর পোকামাকড় থাকে তার চেয়ে অনেক বেশি ধরণের উপকারী পোকামাকড় থাকে। এসব উপকারী পোকামাকড় ক্ষতিকর পোকামাকড় ধরে খায় বা নানাভাবে ধবংস করে থাকে। ফলে, এসব ক্ষতিকর পোকামাকড় বেশি বাড়তে পারে না এবং বেশি ক্ষতিও করতে পারে না। অথচ আমরা যখন জমিতে বিষ দিই তখন ক্ষতিকর পোকার চেয়ে উপকারী পোকা অনেক তাড়াতাড়ি মারা যায় এবং সাথে সাথে কেঁচো, ব্যাঙ ইত্যাদি উপকারী প্রাণীও মারা যায়। কিন্তু ক্ষতিকর পোকামাকড় সহজে মারা যায় না। কীটনাশক প্রয়োগ করার পরও যেসব পোকামাকড় বেঁচে থাকে সেগুলো তখন আরও দ্রুত ও ব্যাপকভাবে বেড়ে উঠে। কারণ, তখন তাদের জন্য ফাঁকা মাঠ, কোন শত্র“ মাঠে নেই। এমতাবস্থায়, একটি কম ক্ষতিকর পোকাও বেশি ক্ষতিকর হয়ে উঠতে পারে।
দুইঃ জমিতে কীটনাশক প্রয়োগ করা হলেও একেবারে সব পোকা মারা যায় না। কারণ, সব পোকার দেহে সমানভাবে কীটনাশক বিষ প্রবেশ করেনা। যেসব পোকার দেহে অল্প মাত্রায় কীটনাশক বিষ প্রবেশ করে তারা বেঁচে থাকে। এভাবে বিষ খেয়েও বেঁচে থাকা পোকার দেহে এক ধরণের প্রতিরোধ ক্ষমতা জন্মায়। তখন এসব পোকার দেহে কোন বিষই আর কাজ করে না, এমনকি বেশি মাত্রায় বারবার দিলেও না। যে সমস্যা বর্তমানে বেগুনের ফল ও ডগা ছিদ্রকারী পোকাসহ অনেক পোকার ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে।
১৮৭৪ সালে জার্মান রসায়নবিদ মিঃ থাইডলার ডিডিটি আবিষ্কার করেন। এই ডিডিটি যখন কীটনাশক হিসেবে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হতে থাকে তখন অল্পদিনের মধ্যেই দেখা গেল যে, কীটপতঙ্গেরা নিজেদের দেহের মধ্যে এ্যান্টি ডিডিটি তৈরি করে ফেলেছে। পরবর্তীকালে ডিডিটি-এর সূত্র ধরে আরো নানা ধরণের শক্তিশালী কীটনাশক বিষ তৈরি হয় যেগুলো এখন ব্যাপকভাবে পৃথিবীব্যাপী ব্যবহৃত হচ্ছে।
উপরোক্ত কারণগুলো বিবেচনায় নিলে নির্দ্বিধায় বলা যায় যে, কীটনাশক সব সময়, সব ক্ষেত্রে পোকামাকড় দমনের নিশ্চয়তা দিতে পারে না। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে বর্তমানে ৩০০টিরও অধিক প্রজাতির পোকা একাধিক কীটনাশক প্রতিরোধে সক্ষম। অর্থাৎ প্রচলিত কীটনাশকে এসব পোকা দমন করা সম্ভব হচ্ছে না।
পক্ষান্তরে, আজ একটা ব্যাপার গভীরভাবে ভাববার সময় এসেছে, সেটা হল, এই পৃথিবীতে কি মানুষ একাই বেঁচে থাকবে? পৃথিবীতে অন্য জীবজন্তু বিশেষ করে বন্য জীবজন্তু ও পশুপাখি যেগুলো সরাসরি মানুষের কাজে লাগেনা, তাই মানুষ যেগুলোকে লালন-পালনও করেনা, সেগুলো কি টিকে থাকতে পারবেনা! বিষয়টা কি এমন দাড়াবে যে, যেসব পশুপাখির বাণিজ্যিক মূল্য আছে কেবল সেগুলোই মানুষ পুষবে বা লালন পালন কররে আর অন্য সব প্রাণী বিলুপ্ত হবে! কারণ, মানুষ তার ফসল রক্ষার জন্য প্রথম ভোক্তা বা পোকামাকড় বিষ প্রয়োগ করে মেরে ফেলছে। আর এই বিষ ছড়িয়ে যাচ্ছে গোটা ইকোস্টিমে। ফলে, খাদ্য শিকল ধ্বংস হচ্ছে। আর প্রতিনিয়ত বিলুপ্ত হচ্ছে হাজারও প্রজাতির প্রাণী। কাজেই, মানব-স্বাস্থ্য, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের উপর বালাইনাশকের ক্ষতিকর প্রভাবসমূহ বিবেচনায় নিলে বালাইনাশকের ব্যবহার বন্ধ করার কোন বিকল্প নেই।
Mar 31, 2025 | প্রকৃতি কথা
বিশ্বব্যাপী কৃষি প্রযুক্তির বিস্তার এবং তার ফলস্বরূপ দানাদার খাদ্যশস্যের উৎপাদন বৃদ্ধির সাফল্যকে প্রকাশ করতে সবুজ বিপ্লব পরিভাষাটি ১৯৬৮ সালে প্রথম ব্যবহার করেন ইউনাইটেড স্টেটস এজেন্সি ফর ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট (ইউএসএআইডি)-র তৎকালীন পরিচালক উইলিয়াম গাউড। ১৯৪৩ সাল থেকে সত্তরের দশকের শেষাবধি চলমান গবেষণা ও উন্নয়ন এবং প্রযুক্তি সম্প্রসারণ কর্মকান্ড যা কৃষির উৎপাদন অনেকগুণ বাড়িয়ে দেয় তাই সবুজ বিপ্লব নামে খ্যাত। এসব কর্মকান্ডের মধ্যে ছিল প্রধানত দানা শস্যের উচ্চ ফলনশীল জাতের প্রবর্তন, সেচ অবকাঠামোর উন্নয়ন ও ভূগর্ভস্থ পানিনির্ভর সেচ ব্যবস্থার প্রচলন, রাসায়নিক সার ও বালাইনাশক এবং কৃষি যন্ত্রপাতির বিস্তার ইত্যাদি। সবুজ বিপ্লবের জনক হিসেবে খ্যাত এবং শান্তিতে নোবেল পুরষ্কার বিজয়ী বিজ্ঞানী নরম্যান বোরলগ ১৯৪৩ সালে মেক্সিকোতে উচ্চফলনশীল গমের জাত প্রবর্তনের মাধ্যমে গমের উৎপাদন বৃদ্ধিতে যে সাফল্য অর্জন করেন তা পরবর্তী কালে মার্কিন প্রতিষ্ঠান রকফেলার ফাউন্ডেশন সারা বিশ্বে বিস্তারের পরিকল্পনা গ্রহণ করে। এরই ধারাবাহিকতায় এশিয়া অঞ্চলে ধানের উচ্চফলনশীল জাত প্রবর্তনের লক্ষ্যে মার্কিন প্রতিষ্ঠান ফোর্ড ও রকফেলার ফাউন্ডেশন ১৯৬০ সালে ফিলিপাইনে আন্তর্জাতিক ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ইরি) প্রতিষ্ঠা করে। ১৯৬৬ সালে ইরি আইআর-৮ নামের একটি উচ্চফলনশীল জাত আবিষ্কার করে যা অতিদ্রুত ভারতীয় উপমহাদেশসহ এশিয়ার অনেক দেশে বিস্তার ঘটানো হয়। এখানে উল্লেখ্য যে, ফোর্ড ও রকফেলার ফাউন্ডেশন বিশ্বব্যাংক, ফুড এন্ড এগ্রিকালচারাল অর্গানাইজেশন (এফএও), (ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন ফর এগ্রিকালচারাল ডেভেলপমেন্ট (ইফাদ) এবং (ইউনাইটেড নেশনস ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম (ইউএনডিপি)-র সহযোগিতায় ১৯৭১ সালে ‘কনসালটেটিভ গ্রুপ অন ইন্টারন্যাশনাল এগ্রিকালচারাল রিসার্চ (সিজিআইএআর)’ নামক কৃষি গবেষণার একটি বিশ্বব্যাপী নেটওয়ার্ক গড়ে তুলে যা পরবর্তীতে সারা বিশ্বে বহু গবেষণা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলে। এসব গবেষণা প্রতিষ্ঠান সারা বিশ্বে বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে সবুজ বিপ্লব প্রযুক্তি বিস্তারে মুখ্য ভূমিকা পালন করে। এখানে প্রসঙ্গক্রমে স্মরণ রাখা প্রয়োজন যে, গবেষণা ও উন্নয়ন কার্যক্রম বিস্তারের পাশাপাশি বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশসহ বিশ্বব্যাপী সরকারি পর্যায়ে কৃষি সম্প্রসারণ সেবা ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং কাঠামোগত সংস্কার কর্মসূচি বাস্তবায়নের মাধ্যমে সবুজ বিপ্লব প্রযুক্তির বাজারজাতকরণে বহুজাতিক কোম্পানির পথ সুগম করে।
যাহোক এটা অনস্বীকার্য যে, সবুজ বিপ্লব প্রযুক্তির ব্যাপক বিস্তারের ফলে বিশ্বব্যাপী দানাদার শস্যের উৎপাদন অনেকগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে তা বিশ্বের কোটি কোটি দরিদ্র জনগোষ্ঠীর খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কতটা ভূমিকা রেখেছে তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। কারণ, গুটিকয়েক জাতের গম, ভূট্টা বা ধানের একক চাষের মাধ্যমে শর্করা জাতীয় খাদ্যশস্যের উৎপাদন বাড়লেও পুষ্টির জন্য অপরিহার্য অন্যান্য ফসলের উৎপাদন বরং হ্রাস পেয়েছে যা ভিটামিন ও আয়রনের মতো অত্যাবশ্যক পুষ্টি উপাদানগুলোর প্রাপ্যতাকে হ্রাস করেছে। আজও বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশগুলোতে পাঁচ বছরের কম বয়সে মুত্যুবরণকারী শিশুদের প্রায় ৬০% মারা যায় এসব পুষ্টি উপাদানের অভাবে। অন্যদিকে, ব্যাপকভাবে রাসায়নিক সার ও বালাইনাশক প্রয়োগ করার মাধ্যমে উৎপাদিত বিষাক্ত বাড়তি দানাদার খাদ্যও মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করেনা। বিশ্বের ক্ষুধা নিয়ে ১৯৮৬ সালে স্বয়ং বিশ্বব্যাংক পরিচালিত এক গবেষণায় এই চরম সত্যটিকে স্বীকার করা হয়েছে যে, খাদ্য উৎপাদন বাড়লেই খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়না। অবশ্য বিকল্প হিসেবে বিশ্বব্যাংক দরিদ্র মানুষের ক্রয় ক্ষমতা বাড়ানোর সুপারিশ করেছে। শুধু সুপারিশই করেনি এজন্য বিশ্বব্যাপী ক্ষুদ্র ঋণ বিস্তারের মাধ্যমে মানুষের খাদ্য ক্রয়ের অর্থ যোগানোর বন্দোবস্তও করেছে।
বাংলাদেশের কৃষিতে সবুজ বিপ্লবের প্রভাব
কৃষিপ্রধান বাংলাদেশে ১৯৬০ এর দশকে খাদ্যের অভাব পূরণের জন্য সবুজ বিপ্লব প্রযুক্তিনির্ভর বর্তমান কৃষি ব্যবস্থার প্রচলন করা হয়। ব্যয়বহুল এই কৃষি ব্যবস্থায় মূলত দানা জাতীয় শস্য যেমন: ধান, গম ইত্যাদি উৎপাদনের ব্যাপক উদ্যোগ গৃহীত হয়। সার্বিকভাবে দানা জাতীয় শস্যের উৎপাদন বৃদ্ধি পেলেও জমির উর্বরতা ও উৎপাদনশীলতা কমে যাচ্ছে। অন্যদিকে, অধিক হারে উচ্চ মূল্যে ক্রয়কৃত বিষাক্ত রাসায়নিক সার ও বালাইনাশক প্রয়োগের ফলে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে এবং লাভ কমে যাচ্ছে। দানা জাতীয় ফসল উৎপাদনের এলাকা বাড়াতে গিয়ে আমিষ ও ভিটামিন সরবরাহকারী নিত্য প্রয়োজনীয় খাদ্য যেমন: ডাল, সরিষা (তেল), পেঁয়াজ, রসুন অন্যান্য মসলাজাতীয় ফসল এবং শাক-সব্জি ইত্যাদির চাষ কমেছে যা বর্তমানে কৃষকদেরকে উচ্চ মূল্যে বাজার থেকে কিনতে হচ্ছে। আজ বিদেশী ডাল, পেঁয়াজ, রসুন ইত্যাদি এসে আমাদের বাজার ছেয়ে যাচ্ছে। এগুলো বিদেশ থেকে আমদানি করতে হচ্ছে বা চোরাই পথে আসছে। এতে আমাদের পরনির্ভরশীলতা বাড়ছে, অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অন্যদিকে, এসব ফসল মাটি থেকে ধানের চেয়ে অনেক কম খাদ্য গ্রহণ করে যা মাটির উর্বরতা বজায় রাখতে সাহায্য করে। কাজেই একই জমিতে উপর্যুপরি শুধু ধান চাষের ফলে জমির উর্বরতা দিন দিন কমে যাচ্ছে। বহুবিধ ফসলের পরিবর্তে একক ফসল চাষের ফলে বিলুপ্ত হচ্ছে এ দেশের সমৃদ্ধ ফসল ও জীববৈচিত্র্য। হারিয়ে যাচ্ছে কৃষিভিত্তিক সমাজ ব্যবস্থা, গ্রামীণ সংস্কৃতি ও সভ্যতা। পরিবেশ দূষণের ফলে মৎস্য ও জলজ সম্পদ, গবাদী পশু-পাখি, বন্যপ্রাণী ও মাটিতে অবস্থানকারী অনুজীব তথা মাটির প্রাণ ধ্বংস হচ্ছে। মাটি, পানি, বাতাস ও খাদ্য দূষণের ফলে মানুষের স্বাস্থ্য সমস্যা বাড়ছে, বাড়ছে প্রাকৃতিক বিপর্যয়। যাহোক, সবুজ বিপ্লব বাংলাদেশের কৃষিতে যে বৈপ্লবিক রপান্তর ঘটিয়েছে তার প্রভাবসহ সংক্ষিপ্ত আকারে নিম্নে তুলে ধরা হল।
১. মাটির জৈব পদার্থ ও উর্বরতা হ্রাস
বর্তমানে জমিতে প্রচুর পরিমাণে রাসায়নিক সার যেমন: ইউরিয়া, ফসফেট, পটাশ, জিপসাম, দস্তা সার ইত্যাদি প্রয়োগ করা হচ্ছে। কোন সারের কি কাজ এবং কোন সার কি পরিমাণে প্রয়োগ করা প্রয়োজন এসব সঠিকভাবে না জেনেই কৃষকরা যথেচ্ছা রাসায়নিক সার প্রয়োগ করে যাচ্ছে। এসব সার একদিকে যেমন মাটির স্বাভাবিক রাসায়নিক গঠনকে নষ্ট করে দিয়ে মাটিকে বিষাক্ত করে তুলে, অন্যদিকে তেমনি মাটির জৈব পদার্থ এবং অনুজীবের ক্রিয়া কমিয়ে দিয়ে জমির উর্বরতা হ্রাস করে।
সবুজ বিপ্লবের আগে জমিতে বছরে দুই-একটা ফসল ফলানো হতো এবং বাকি সময় জমি পতিত থাকতো। ফলে, পতিত জমিতে আগাছা এবং বিভিন্ন গাছ-গাছড়া জন্মাত। এগুলো মাটিতে মিশে যোগ হতো জৈব পদার্থ। তা ছাড়া সব কৃষকের বাড়িতেই প্রচুর গোবর, ছাই ও অন্যান্য জৈব আবর্জনা থাকতো যা তারা জমিতে প্রয়োগ করত। বর্তমানে শুধু রাসায়নিক সার প্রয়োগ করা হচ্ছে। তাই মাটির জৈব পদার্থ দিন দিন কমে নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে। একটি উর্বর মাটিতে কমপক্ষে ৫% জৈব পদার্থ থাকা অত্যাবশ্যক কিন্তু আমাদের অধিকাংশ মাটিতে তা ১% এর নিচে নেমে গেছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে একসময় হয়ত মাটি জৈব পদার্থশূন্য হয়ে পড়বে। তখন এই মাটিতে কোন ফসল ফলানোই অসম্ভব হয়ে পড়বে।
২. উচ্চ ফলনশীল ও হাইব্রিড জাতের চাষ বৃদ্ধি
বর্তমানে অধিক ফলন পাওয়ার জন্য ব্যাপকভাবে উচ্চ ফলনশীল ও হাইব্রিড জাতের চাষ করা হচ্ছে। এসব উচ্চ ফলনশীল ও হাইব্রিড জাত মাটি থেকে কম ফলনশীল দেশীয় জাতের চেয়ে অধিক হারে খাদ্য উপাদান গ্রহণ করে থাকে। ফলে, যত বেশি উচ্চফলনশীল ও হাইব্রিড ফসলের আবাদ করা হচ্ছে জমির খাদ্য ভাণ্ডার তত দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে।
৩. একক ফসলের আবাদ বৃদ্ধি
সব ফসলের শিকড় সমান বড় নয় এবং মাটির সমান গভীরতায় বিস্তার লাভ করে না। কাজেই, একই জমিতে ক্রমাগত একই ফসলের আবাদ করা হলে সে ফসল মাটির একটি নির্দিষ্ট স্তর থেকে খাদ্য গ্রহণ করে থাকে। ফলে, মাটির সেই নির্দিষ্ট স্তরের উর্বরতা দ্রুত হ্রাস পায়। যেমন: ধানের শিকড় মাটির খুব বেশি গভীরে যায় না। কাজেই, একই জমিতে বারবার ধান চাষ করা হলে উপরের দিকের মাটি থেকে ধান খাদ্য গ্রহণ করার ফলে উপরের স্তরের মাটি অধিক অনুর্বর হয়ে পড়ে। অন্যদিকে, পানিতে ধুয়ে যে খাদ্যোপাদান নিচে চলে যায় তা আর ধানের কোন কাজে লাগে না। এভাবে প্রয়োগকৃত সার এবং মাটির খাদ্যোপাদানেরও অপচয় ঘটে।
৪. শস্য চাষের নিবিড়তা বৃদ্ধি
এ দেশে মানুষ যখন কম ছিল তখন খাদ্যের চাহিদাও ছিল কম। তখন বছরে দু’একটা ফসল ফলানো হতো এবং বাকি সময় জমি পতিত থাকতো। বর্তমানে প্রায় সকল জমিতেই বছরে ৩-৪টি ফসল ফলানো হচ্ছে। বর্তমানে ফসল চাষের নিবিড়তা শতকরা প্রায় ২০০%-এ পৌছে গেছে। জমিকে কোনরকম বিশ্রামই দেওয়া হচ্ছে না। এভাবে ফসল চাষের নিবিড়িতা যত বাড়ছে মাটির খাদ্য ভাণ্ডারও তত দ্রুত নিঃশেষ হয়ে মাটি অনুর্বর হয়ে পড়ছে।
৫. পাটের চাষ হ্রাস
পাটকে একসময় সোনালি আঁশ বলা হতো। পাটের মৌসুমে মাঠে মাঠে শোভা পেত শুধু পাট আর পাট। পাট চাষে কোন রাসায়নিক সার, বালাইনাশক বা সেচের প্রয়োজন হতোনা। বীজ ও জমি চাষের খরচ ছাড়া অতিরিক্ত খরচ বলতে ছিল শুধু নিড়ানি খরচ। এভাবে প্রায় বিনা খরচে কৃষকেরা পাট ফলাত যা ছিল অত্যন্ত লাভজনক। তাছাড়া, পাট মাটি থেকে ধানের চেয়ে অনেক কম খাদ্য গ্রহণ করে। অন্যদিকে, পাটের পাতা পঁচে মাটিতে যোগ হতো জৈব পদার্থ যা মাটির উর্বরতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখত। আজকাল ধানের উৎপাদন বাড়াতে গিয়ে পাট চাষ গুরুত্ব হারিয়েছে। পাশাপাশি, নিজেদের সীমাহীন দুর্নীতি ও লুটপাট এবং ভারতের সাথে প্রতিযোগিতায় মার খেয়ে আমরা সারা বিশ্বে পাটের বাজার হারিয়েছি। একসময়ের সোনালি আশ গলার ফাঁসে পরিণত হয়েছে। লোকসানের যুক্তি সামনে রেখে মূলত বিশ্বব্যাংকের চাপে আদমজীসহ দেশের অনেকগুলো পাটকল একে একে বন্ধ করা হয়েছে। পাট ও পাটজাতদ্রব্যের রপ্তানি কমে যাওয়ায় পাটের মূল্য কমেছে। ফলে, কৃষকেরা পাট চাষ বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছে।
৬. রবিশস্যের চাষ হ্রাস
একসময় এ দেশের কৃষকের কাছে রবিশস্যের চাষ ছিল খুবই জনপ্রিয় এবং অপরিহার্য। সরিষা, তিল, তিষি ইত্যাদি তেলজাতীয় ফসল; মসুর, খেসারি, ছোলা, মুগ, মটর, মাসকলাই ইত্যাদি ডালজাতীয় ফসল ইত্যাদি রবিশস্যের চাষ মাটির জন্য খুবই উপকারী। কেননা, এগুলো মাটি থেকে ধানের চেয়ে অনেক কম পরিমানে খাদ্য গ্রহণ করে থাকে। কাজেই, জমিতে শুধু ধান চাষ না করে এসব ফসলের চাষ মাটির উর্বরতা রক্ষায় খুবই সহায়ক। অথচ বর্তমানে কৃষকেরা অধিক লাভের আশায় শুধু ধান চাষ করতেই বেশি আগ্রহী।
৭. সেচের সংখ্যা ও খরচ বৃদ্ধি
বর্তমানে বোরো মৌসুমে ধানের জমিতে প্রায় প্রতিদিন বা একদিন পর পর সেচ দিতে হচ্ছে। এমনকি বর্তমানে সেচ ছাড়া আমন ধান চাষও সম্ভব হচ্ছে না। এর প্রধান কারণ হল একদিকে, আধুনিক উচ্চফনশীল ও হাইব্রিড জাতগুলোর পানির চাহিদা খুব বেশি অন্যদিকে, জৈব পদার্থ খুব কমে যাওয়ায় মাটির পানি ধরে রাখার ক্ষমতাও কমে গেছে। কারণ, জৈব পদার্থ মাটির পানি ধরে রাখার ক্ষমতা বাড়ায়। কাজেই, সেচ দেওয়ার পর তা দ্রুত নিচের দিকে চলে যায়। আবার ডিজেলের দাম দিন দিন বেড়েই চলেছে। সুতরাং একদিকে সেচের চাহিদা বৃদ্ধি অন্যদিকে ডিজেলের মূল্য অত্যাধিক বৃদ্ধি, প্রধানত এই দুই কারণে বর্তমানে সেচ বাবদ প্রচুর অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। কোন কোন এলাকায় উৎপাদিত ফসলের একতৃতীয়াংশ শুধু সেচ খাতেই ব্যয় হচ্ছে।
৮. খরায় ফসলহানি এবং পানীয় জলের সংকট বৃদ্ধি
আমাদের অনেক দেশী জাত ছিল যেগুলোর খরা সহ্য করার ক্ষমতা ছিল বেশি এবং সেচের পানির প্রয়োজনও হতো কম। পক্ষান্তরে, উফশী ও হাইব্রিড জাতগুলো অতিমাত্রায় সেচনির্ভর। আজকাল খরা মৌসুমে নদী নালায় সেচের জন্য পর্যাপ্ত পানি থাকছে না। পাশাপাশি, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে বর্ষাকালেও পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত হচ্ছে না বিধায় আমন মৌসুমেও সেচ দিয়ে ধান চাষ করতে হচ্ছে। তাই গভীর ও অগভীর নলকূপের সাহায্যে মাটির নিচের পানি তুলে সেচ দিতে হচ্ছে। ক্রমাগতভাবে সেচের চাহিদা বৃদ্ধির ফলে ভ‚গর্ভস্থ পানি উত্তোলনের মাত্রা ক্রমাগত বেড়েই চলেছে যার ফলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ক্রমশ নিচে নেমে যাচ্ছে। ফলে, সেচের ভরা মৌসুমে দেশের অনেক স্থানে গভীর ও অগভীর নলকূপে পর্যাপ্ত পানি উঠছে না। তাই সেচকাজ ব্যাহত হওয়ায় ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। অন্যদিকে, শুষ্ক মৌসুমে টিউবয়েলে পানি উঠছেনা। দেখা দিচ্ছে পানীয় জলের সংকট। পাশাপাশি, ভূগর্ভস্থ পানির অত্যধিক ব্যবহারের কারণে অনেক স্থানে দেখা দিয়েছে আর্সেনিক সমস্যা।
৯. বন্যায় ফসলহানির ঝুঁকি বৃদ্ধি
আামাদের কিছু দেশী জাত ছিল যেগুলো বন্যার পানির সাথে সাথে বেড়ে উঠতো। নিচু জমিতে যেখানে বন্যার পানি উঠে সেখানে এগুলোর চাষ করা হলে ফলন কিছুটা কম হলেও ফসল নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি ছিল কম। কিন্তু বর্তমান জাতগুলোর সে ক্ষমতা নেই। তাই প্রতিবছর বন্যায় প্রচুর ধান নষ্ট হয়। তাছাড়া, বর্তমানে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বন্যার তীব্রতা ও স্থায়িত্ব বাড়ছে যা আরও বাড়বে বলে বিজ্ঞানীরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। আজ তাই বন্যা সহনশীল জাতগুলোর চাহিদা নতুন করে অনুভূত হচ্ছে। কিন্তু উফশী জাতের ব্যাপক প্রসারের ফলে এই জাতগুলো আজ বিলুপ্তপ্রায়।
১০. পোকামাকড় ও রোগবালাইয়ের আক্রমণ বৃদ্ধি
আমাদের দেশী জাতে রোগ-বালাই ও পোকার আক্রমণ হতো কম। কারণ, তখন ইকোসিস্টেমের মধ্যে ভারসাম্য বজায় ছিল বলে ক্ষতিকর পোকা প্রাকৃতিকভাবেই দমিত থাকতো। কিন্তু এখন নির্বিচারে রাসায়নিক বালাইনাশক প্রয়োগের ফলে ফসলের মাঠের ইকোসিস্টেম আজ ধ্বংসপ্রাপ্ত। অন্যদিকে, আধুনিক উচ্চফলনশীল জাতগুলোতে রোগ-বালাই ও পোকার আক্রমণ দিন দিন এত বাড়ছে যে, দফায় দফায় বালাইনাশক প্রয়োগ করেও তাদের দমন করা যাচ্ছে না। ফলে, বালাইনাশক বাবদ প্রচুর খরচ করেও ফসল রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়ছে। তা ছাড়া, বর্তমানে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ফসলের রোগব্যাধি ও পোকামাকড়ের আক্রমণ বাড়ছে। এরূপ অবস্থার সাথে খাপ খাওয়ানোর জন্য রোগ ও পোকা প্রতিরোধী জাতগুলো আবার গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। কিন্তু সেসব জাতের অনেকগুলোই আজ বিলুপ্ত।
১১. ফসলবৈচিত্র্য হ্রাস
একসময় কৃষকরা দানাদার ফসল, ডালজাতীয় ফসল, তেল জাতীয় ফসল, মসলা জাতীয় ফসল এবং নানারকম শাক-সব্জি ইত্যাদি বৈচিত্র্যময় ফসল চাষ করতেন। অথচ, আজকাল হাতেগোনা কয়েকটি জাতের শস্য চাষ করা হচ্ছে যা আমাদের সমৃদ্ধ ফসলবৈচিত্র্যকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। অন্যদিকে, কৃষকদেরকে উচ্চ মূল্যে এসব শস্য বাজার থেকে কিনতে হচ্ছে। তাছাড়া, এসব ফসল মাটি থেকে ধানের চেয়ে অনেক কম খাদ্য গ্রহণ করে যা জমির উর্বরতাও দিন দিন কমে যাচ্ছে। পাশাপাশি, ধবংস হচ্ছে জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশ।
১২. কৃষকরে সমস্যা ও সংকট বৃদ্ধি
সম্পূর্ণ বাজারনির্ভর বর্তমান রাসায়নিক কৃষি কৃষককে নানাবিধ সংকটে নিপতিত করেছে। বীজ, সার, বালাইনাশক, ডিজেল ইত্যাদি সকল কৃষি উপকরণের মূল্য দিন দিন বেড়েই চলেছে। অনেক সময় উচ্চ মূল্য দিয়েও কৃষক এসব কিনতে পারে না। কারণ, বাজারে পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকেনা। তা ছাড়া, অতি মুনাফালোভী ব্যবসায়ীরা অনেক সময় কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে এসব উপকরণের মূল্য বাড়িয়ে দেয়। অন্যদিকে, ভেজাল বীজ, সার ও কীটনাশকে আজ বাজার সয়লাব। এসব ভেজাল উপকরণ ব্যবহার করে কৃষক একদিকে যেমন আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে অন্যদিকে তেমনি ফসলটাও নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এরূপ নানা সমস্যা ও সংকটের কারণে কৃষকেরা আজ দিশেহারা।
১৩. কৃষকের নিজস্ব জ্ঞান ও প্রযুক্তির বিলুপ্তি
হাজার বছর ধরে এ দেশের কৃষকেরা তাদের নিজস্ব জ্ঞান ও প্রযুক্তি ব্যবহার করেই চাষবাস করে আসছে। তারা বংশানুক্রমে পূর্বপুরুষের কাছ থেকে বা তাদের নিজস্ব অভিজ্ঞতা থেকে এসব জ্ঞান লাভ করেছে। একসময় এ দেশে যে ১২,৫০০ জাতের ধান চাষ করা হত তার সবই ছিল কৃষকের নিজের আবিষ্কার। কৃষক যেমন ফসলের ভাষা বুঁঝতো তেমনি ফসলও বুঁঝতো কৃষকের মনে কথা। ফসলের কখন কি দরকার সবই ছিল তাদের নখদর্পনে। আজ যেসব প্রযুক্তি আসছে তার কলাকৌশল কৃষকের অজানা। তারা এর-তার কাছ থেকে শুনে সেসব প্রযুক্তি ব্যবহার করতে গিয়ে প্রায়শই ক্ষতির শিকার হচ্ছে। সার ও কীটনাশকের ডিলার বা ব্যবসায়ীর কাছ থেকে পরামর্শ নিতে গিয়ে তাঁরা প্রায়শই প্রতারিত হচ্ছে। আগে ফসল উৎপাদনের জন্য বীজ, সার, বালাইনাশক বা অন্য কোন উপকরণের জন্য কৃষকের বাজারমুখী হতে হতোনা, নিজস্ব সম্পদ ও প্রযুক্তি দিয়েই ফসল ফলাত। নিজে বীজ উৎপাদন ও সংরক্ষণ করত। সারের প্রয়োজন ছিল না কারণ, তাদের ছিল প্রচুর জৈব সার। আর কীটনাশকের প্রয়োজনই হতো না। কৃষক ছিল স্বয়ংসম্পূর্ণ ও আত্মনির্ভরশীল। আজ কৃষক সবদিক থেকেই পরনির্ভরশীল হয়ে পড়ছে যা তাদের জন্য খুবই বিপদজ্জনক।
যাহোক, একথা সত্য যে সবুজ বিপ্লব প্রযুক্তিনির্ভর রাসায়নিক কৃষি দেশের খাদ্য উৎপাদন অনেকগুণ বাড়িয়েছে। কিন্তু এতে দেশের সংখ্যাগরিষ্ট ক্ষুদ্র, প্রান্তিক ও ভূমিহীন কৃষকের কতটুকু লাভ হয়েছে তা ভেবে দেখার যথেষ্ট অবকাশ রয়েছে। এ দেশের মাটি, পানি, পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য, মানবস্বাস্থ্য ইত্যাদি বিভিন্ন দিকে রাসায়নিক কৃষির উপরে বর্ণিত ক্ষতিকর প্রভাবগুলোকে বাদ দিয়ে যদি শুধু কৃষকের প্রত্যক্ষ লাভটাকেই বিবেচনায় নেয়া হয় তবুও যে চিত্র পাওয়া যাবে তা মোটেও আশাব্যঞ্জক নয়। বাস্তব সত্য এই যে, সবুজ বিপ্লবের কল্যাণে কৃষির যে প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে তার সিংহভাগই চলে গেছে বহুজাতিক কোম্পানি, তাদের দেশীয় এজেন্ট এবং ব্যবসায়িদের পকেটে। হিসেব করে দেখা গেছে যে, ধানের উৎপাদন খরচের সাথে কৃষকের নিজস্ব শ্রম ও জমির মূল্য বিবেচনায় নিলে ধান চাষে লাভ দুরে থাকুক উৎপাদন খরচটাই কৃষক উঠাতে পারে না। অন্যান্য ফসলের ক্ষেত্রেও এটাই সত্য। এভাবে লোকসান দিয়েই কৃষক এই জাতির মুখে অন্ন তুলে দিচ্ছে। অথচ, রাতারাতি ফুলে-ফেঁপে উঠেছে সার-বীজ-বালাইনাশক ও কৃষি যন্ত্রপাতি বিক্রেতা কোম্পানি ও ব্যবসায়ি এবং মধ্যস্বত্বভোগীরা।
আজ রাসায়নিক সারের ক্রমবর্ধমান চাহিদার কারণে ব্যাঙের ছাতার মতো গজাচ্ছে ভেজাল সারের কোম্পানি। কৃষকের ফসল ক্ষতিগ্রস্ত করে তারা দেদারছে মুনাফা লুটছে। দেশে গড়ে উঠেছে অসংখ্য বালাইনাশক ও বীজ কোম্পানি। তারা দেদারছে ব্যবসা করে যাচ্ছে। পক্ষান্তরে, কৃষক ধার-দেনা করে, নিজের সর্বস্ব খুইয়ে সার, ডিজেল, বালাইনাশক কিনে যে ফসল ফলাচ্ছে তারও ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। মৌসুমে কম দামে ফসল বিক্রি করে ধার-দেনা শোধ করতে গিয়ে নিজের খাওয়ার মতো ধানও ঘরে রাখতে পারছে না। ডাল, তেল, পেয়াজ, রসুন – এসব কিনতে গিয়ে সে আরও দেনাদার হচ্ছে। এটাই যদি হয় দেশের সংখ্যাগরিষ্ট ক্ষুদ্র, প্রান্তিক ও ভূমিহীন কৃষকের প্রকৃত অবস্থা তবে কেন এই রাসায়নিক কৃষি, কেনইবা নিজের পকেটের পয়সা খরচ করে নিজের বিপদ ডেকে আনা – তা গভীরভাবে ভেবে দেখা দরকার।
রাসায়নিক সারের ক্ষতিকর প্রভাব
বিজ্ঞানীগণ পরীক্ষা করে দেখেছেন যে, যেকোন ফসলের জন্য ১৬টি পুষ্টি উপাদান অত্যাবশ্যক। অর্থাৎ এই ১৬টি পুষ্টি উপাদানের যে কোন একটিরও যদি অভাব ঘটে তবে সে ফসল আশানুরূপ ফলন দিতে পারবে না। যেমনঃ মানুষের জন্য আয়রন একটি অত্যাবশ্যক পুষ্টি উপাদান। কারও শরীরে এই আয়রনের অভাব হলে সে সুস্থ থাকতে পারে না; রক্তশূণ্যতায় ভোগে। বেশি অভাব হলে মারাও যেতে পারে। গাছের বা ফসলের অত্যাবশ্যক পুষ্টি উপাদানগুলো হল কার্বন, হাইড্রোজেন, অক্সিজেন, নাইট্রোজেন, ফসফরাস, পটাশিয়াম, সালফার, ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম, ম্যাঙ্গানিজ, দস্তা, লৌহ, মলিবডেনাম, বোরন, কপার ও ক্লোরিন। এ ছাড়া ডাল জাতীয় ফসলের জন্য একটি অতিরিক্ত পুষ্টি উপাদান প্রয়োজন হয়, তা হল কোবান্ট। এগুলোর মধ্যে কার্বন, হাইড্রোজেন ও অক্সিজেন বাতাস ও পানি থেকে গাছ পেয়ে থাকে। বাকি ১৩ টি পুষ্টি উপাদান গাছ নেয় মাটি থেকে। অর্থাৎ কোন মাটিতে এই ১৩ টি পুষ্টি উপাদানের একটিরও অভাব থাকলে সে মাটি থেকে ভাল ফসল পাওয়া সম্ভব নয়।
কোন মাটিতে ফসলের চাহিদা মোতাবেক সব ধরণের পুষ্টি উপাদান সুষম মাত্রায় বিদ্যমান থাকলে তাকে উর্বর মাটি বলা হয়। আর যদি কোন একটি পুষ্টি উপাদানেরও ঘাটতি থাকে তবে তাকে উর্বর মাটি বলা যায় না। অনেকে বলেন যে, এ দেশের মাটি খুব উর্বর যা বর্তমানে মোটেও সত্য নয়। কারণ, এ দেশের প্রায় সব মাটিতেই এযাবৎ নাইট্রোজেন, ফসফরাস, পটামিয়াম, সালফার, দস্তা ও বোরন – এই ছয়টি পুষ্টি উপাদানের মারাত্মক অভাব দেখা দিয়েছে। কোন কোন জমিতে এই ছয়টি ছাড়াও অন্য আরও কয়েকটি পুষ্টি উপাদানের ঘাটতি দেখা যাচ্ছে। কাজেই, এসব পুষ্টি উপাদানগুলো রাসায়নিক সার হিসেবে কৃত্রিমভাবে মাটিতে দিয়ে ফসল ফলানো হচ্ছে। এমন দিন দূরে নয় যখন মাটিতে ১৩টি পুষ্টি উপাদানেরই ঘাটতি দেখা দিবে। তখন ফসল চাষ করতে গেলে তের রকম সার প্রয়োগ করতে হবে। তবে একথা অবশ্যই সত্য যে, এক সময় এ দেশের মাটি অত্যন্ত উর্বর ছিল। তখন মাটিতে কোন পুষ্টি উপাদানের ঘাটতি ছিল না। তখন কোন সার ছাড়াই ফসল ফলানো সম্ভব ছিল।
আমরা জমিতে যেসব সার দিই সেগুলোতে এক বা একাধিক অত্যাবশ্যক পুষ্টি উপাদান থাকে। যেমনঃ ইউরিয়া সারে থাকে নাইট্রোজেন, টিএসপি সারে থাকে ফসফরাস, এমপি সারে থাকে পটাশিয়াম, জিপসাম সারে থাকে ক্যালসিয়াম ও সালফার ইত্যাদি। এভাবে গাছের প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান যোগান দেওয়ার জন্য বাইরে থেকে যেসব রাসায়নিক দ্রব্য আমরা জমিতে দিই তাই রাসায়নিক সার। তবে, শুধু কোন একটি পুষ্টি উপাদানকে সরাসরি মাটিতে প্রয়োগ করা যায়না। যেমনঃ নাইট্রেজেন এক প্রকার গ্যাসীয় পদার্থ। বাতাসের শতকরা প্রায় ৭৮ ভাগই নাইট্রোজেন। কিন্তু এই নাইট্রোজেন গাছ সরাসরি গ্রহণ করতে পারে না বা এটাকে সার হিসেবে মাটিতে দেওয়া যায় না। তাই নাইট্রোজেন মাটিতে দেওয়া হয় ইউরিয়া আকারে। এই ইউরিয়ায় নাইট্রোজেন থাকে মাত্র শতকরা ৪৬ ভাগ। বাকী শতকরা ৫৪ ভাগে থাকে কার্বন, হাইড্রোজেন ও অক্সিজেন। কাজেই কোন জমিতে যদি ১০০ কেজি ইউরিয়া সার প্রয়োগ করা হয় তবে ৪৬ কেজি নাইট্রোজেনের সাথে সাথে ৫৪ কেজি কার্বন, হাইড্রোজেন ও অক্সিজেন মাটিতে যুক্ত হয়। আমরা ইতোমধ্যেই জেনেছি যে, কার্বন, হাইড্রোজেন ও অক্সিজেন গাছ বাতাস ও পানি থেকে নিয়ে থাকে। কাজেই, ইউরিয়ার সাথে যে কার্বন, হাইড্রোজেন ও অক্সিজেন মাটিতে যুক্ত হয় তা মাটিতেই জমা থাকে। এভাবে অপ্রয়োজনীয় রাসায়নিক উপাদান মাটিতে জমে জমে মাটির স্বাভাবিক রাসায়নিক গঠনকে পাল্টে দেয় যা মাটির জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর।
রাসায়নিক সারকে কৃত্রিম ঔষধের সাথে তুলনা করা যায়। ভিটামিন বা আয়রনসমৃদ্ধ খাদ্য থেকেই আমরা আমাদের শরীরের প্রতিদিনকার চাহিদামত ভিটামিন বা আয়রন পেয়ে থাকি। কিন্তু যদি কখনও শরীরে ভিটামিন বা আয়রনের অভাব দেখা দেয় তবে ঔষধের দোকান থেকে কেনা ভিটামিন বা আয়রন সিরাপ খেয়ে সে অভাব পূরণ করা যায়। এখন যদি কেউ মনে করে যে, সে ভিটামিন বা আয়রনসমৃদ্ধ খাদ্য না খেয়ে শুধু সিরাপ খেয়েই বেঁচে থাকবে তবে সেটা কি সম্ভব হবে না সুবিচেনাপ্রসূত কাজ হবে? নিশ্চয়ই না। কাজেই, আমরা যেমন শুধু সিরাপ খেয়ে বেঁচে থাকতে পারব না তেমনি রাসায়নিক সার খাইয়েও মাটিকে বেশি দিন বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব নয়। মাটিকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে প্রয়োজন খাদ্যের। আর মাটির এরূপ খাদ্য হল জৈব সার।
আমাদের মাটিতে যেটুকু জৈব পদার্থ এখনও অবশিষ্ট আছে তা থেকে উপরোক্ত ছয়টি ছাড়া বাকি খাদ্য উপাদাগুলো এখনও গাছ পাচ্ছে, তাই সেগুলো সার হিসেবে প্রয়োগ করা ছাড়াই এখনও ফসল ফলানো সম্ভব হচ্ছে। কিন্তু বর্তমান অবস্থা চলতে থাকলে এমন দিন দূরে নয় যখন মাটি জৈবপদার্থশূন্য হয়ে পড়বে। আর তখন ১৩ প্রকার সার দিয়েও আশানুরূপ ফসল ফলানো সম্ভব হবে না।
বর্তমানে সারের পরিমাণ বাড়ানোর পরও ফসলের ফলন স্থবির রয়েছে বা দিন দিন কমছে। এরূপ দিন দিন সার বেশি লাগা এবং ফলন কমে যাওয়ার মূল কারণ হল মাটির জৈব পদার্থ কমে যাওয়া। আগে যেসব ফসল চাষ করা হত, যেমন লম্বা জাতের ধান, সেগুলোর একটা বড় অংশ মাঠেই থেকে যেত যা জমিতে জৈব পদার্থ যোগ করত। পাশাপাশি, জমিতে বছরে দুএকটা ফসল ফলানো হতো এবং বাকি সময় জমি পতিত থাকতো। ফলে পতিত জমিতে আগাছা এবং বিভিন্ন গাছ-গাছড়া জন্মাত। এগুলো মাটিতে মিশে যোগ হতো জৈব সার। তা ছাড়া সব কৃষকের বাড়িতেই প্রচুর গোবর ও ছাই হতো যা তারা জমিতে প্রয়োগ করত। কিন্তু আজকাল যান্ত্রিক চাষাবাদ করতে গিয়ে গবাদি পশুপাখির সংখ্যা ব্যাপকভাবে হ্রাস পেয়েছে। ফলে, জৈব সারের প্রধান উৎস গোবরের সহজলভ্যতা অনেক কমেছে। গোবর যেটুকু আছে জ্বালানির অভাবে তাও রান্নার কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। ফলে, জমিতে জৈব সারের ব্যবহার মারাত্মকভাবে হ্রাস পেয়েছে। বর্তমানে জমিতে প্রচুর পরিমাণে রাসায়নিক সার যেমনঃ ইউরিয়া, টিএসপি, এমপি, জিপসাম, দস্তা সার ইত্যাদি প্রয়োগ করা হচ্ছে। এসব সার মাটির স্বাভাবিক রাসায়নিক গঠনকে নষ্ট করে দিয়ে মাটিকে বিষাক্ত করে তুলছে। ফলে, মাটির জৈব পদার্থ এবং অনুজীবের ক্রিয়া কমে গিয়ে জমির উর্বরতা মারাতœভাবে হ্রাস পাচ্ছে। উর্বর মাটিতে কমপক্ষে ৫% জৈব পদার্থ থাকা দরকার কিন্তু আমাদের দেশের মাটিতে তা ১%-এরও নীচে নেমে গেছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে একসময় মাটি জৈব পদার্থশূন্য হয়ে পড়বে। তখন এ মাটিতে কোন ফসল ফলানো সম্ভব হবে না। কারণ-
১. জৈব পদার্থ মাটিতে গাছের জন্য খাদ্যের ভাণ্ডার বা গোলা হিসেবে কাজ করে। আমরা যেমন গোলায় ধান বা চাল জমা করে রাখি এবং সারাবছর সেখান থেকে প্রয়োজনমতো নিয়ে নিয়ে খাই ঠিক তেমনি জৈব পদার্থও মাটিতে গাছের জন্য খাদ্য জমা করে রাখে এবং গাছ সেখান থেকে তার প্রয়োজনমতো খাদ্য নিয়ে খায়। জমিতে যে সার দেওয়া হয় সেটাও গাছের জন্য সহজলভ্য হতে গেলে মাটিতে পর্যাপ্ত জৈব পদার্থ থাকা প্রয়োজন। কাজেই মাটিতে জৈব পদার্থ না থাকলে প্রয়োগকৃত সেসব সারের বেশির ভাগ অংশই মাটি থেকে পানির সাথে ধূয়ে নীচের দিকে চলে যায়।
২. জৈব পদার্থ মাটির পানি ধরে রাখার ক্ষমতা বাড়ায়। যে মাটিতে পর্যাপ্ত জৈব পদার্থ থাকে সে মাটিতে পানি দিলে তাতে অনেক দিন পর্যন্ত পানি থাকে। মাটির পানি ধরে রাখার ক্ষমতা কমে গেলে সে মাটিতে ভাল ফসল ফলানো সম্ভব নয়।
কাজেই জৈবপদার্থশূন্য মাটিতে ভাল ফসল ফলানো সম্ভব নয়। উদাহরণস্বরূপ, বেলে মাটির কথা ধরা যাক। বেলে মাটি পানি ধরে রাখতে পারে না তাই এরূপ মাটিতে ফসলও ভাল হয়না। এর একমাত্র কারণ হল বেলে মাটিতে জৈব পদার্থ থাকে খুবই কম।
জৈব পদার্থ মাটির প্রাণ। জৈব পদার্থ কমতে কমতে আমাদের মাটি ক্রমেই নিষ্প্রাণ হয়ে যাচ্ছে। আমরা শুধু কৃত্রিম স্যালাইন (রাসায়নিক সার) খাইয়ে মাটিকে বাঁচিয়ে রেখেছি। আজ আমাদেরকে ভাবতে হবে, আমরা আমাদের মাটিকে যে পর্যায়ে নিয়ে এসেছি তা আমাদের ভবিষ্যৎ বংশধরদের খাদ্যের যোগান দিতে পারবে কিনা। যেখানে ২০২০ সালে এ দেশের জনসংখ্যা বেড়ে দাড়াবে ১৮ কোটি অথচ এখনই ফলন কমতির দিকে। মাটির প্রাণ যদি মারা যায়, যতই রাসায়নিক সার আর উন্নত জাত চাষ করা হউক না কেন ফলন কিছুতেই বাড়বেনা, বরং কমবে। তা হলে আগামী বংশধরদের খাবার আসবে কোথা থেকে? সময় থাকতে বিষয়টি ভেবে দেখা অত্যন্ত জরুরী।
Mar 30, 2025 | প্রকৃতি কথা
খাদ্য নিরাপত্তা শুধু ক্ষুধা মেটানোর জন্য পর্যাপ্ত খাদ্য সহজলভ্য করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। প্রতিটি মানুষের পুষ্টি চাহিদা পুরণের জন্য প্রয়োজনীয় দুষণমুক্ত খাদ্য পাওয়ার নিশ্চয়তাই হচ্ছে খাদ্য নিরাপত্তা। অর্থাৎ একটি দেশের খাদ্য নিরাপত্তা তখনই নিশ্চিত হবে যখন সে দেশের প্রতিটি নাগরিক সুস্বাস্থ্য নিয়ে বেঁচে থাকার জন্য রাসায়নিক সার ও বালাইনাশক এবং অন্য কোন দুষণ থেকে মুক্ত পর্যাপ্ত পরিমাণ খাদ্য পাবে। অন্যদিকে, খাদ্য শুধু একটি পণ্য নয় বরং এটি কোন একটি জনগোষ্ঠীর নিজস্ব কৃষ্টি, সংস্কৃতি তথা জীবনাচারের সাথে সম্পৃক্ত বিষয়। কাজেই খাদ্য নিরাপত্তাকে অনেকে একটি স্থিতিশীল খাদ্য উৎপাদন ও সুষম বন্টন ব্যবস্থা, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং সর্বোপরি একটি শান্তিময় সমাজ প্রতিষ্ঠার সাথে সম্পৃক্ত বিষয় হিসেবে দেখে থাকেন। এরূপ খাদ্য উৎপাদন ব্যবস্থায় উৎপাদন সংশ্লিষ্ট সকল বিষয়ের (যেমনঃ কৃষি জমি, বীজ, সার, পানি, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি, জ্ঞান ইত্যাদি) উপর উৎপাদকের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ও অধিকারকে নিশ্চিত করবে। অথচ আজকাল বাংলাদেশে খাদ্য নিরাপত্তা বলতে কেবল দানাদার খাদ্যশস্যের সহজলভ্যতাকেই বুঝানো হচ্ছে। শুধু দানাদার খাদ্য দিয়ে যেমন মানুষের পুষ্টির চাহিদা মেটানো সম্ভব নয় তেমনি বর্তমান রাসায়নিক কৃষির মাধ্যমে বিষমুক্ত খাদ্যের যোগান দেওয়াও সম্ভব নয়। পক্ষান্তরে অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয় এই যে, বর্তমান কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থায় প্রাকৃতিক সম্পদ, কৃষিজমি, বীজ, সেচের পানি, কৃষকের নিজস্ব জ্ঞান ও প্রযুক্তি এবং অন্যান্য উপকরণ ইত্যাদি সবই আজ কোম্পানির একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণে চলে যাচ্ছে। প্রকারান্তরে গোটা কৃষি ব্যবস্থাই আজ কৃষকের হাতছাড়া যাচ্ছে যা শুধু কৃষকেরই নয় গোটা দেশের খাদ্য নিরাপত্তাকে মারাতœক হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
কৃষি ও খাদ্যের বাণিজ্যিকীকরণ কার স্বার্থে
খাদ্য, পানি ও স্বাস্থ্য এসবই মানুষের মৌলিক অধিকার। ধনী-গরীব নির্বিশেষে এ পৃথিবীর প্রতিটি মানুষেরই সুস্বাস্থ্য নিয়ে বেঁচে থাকার মত ন্যুনতম পুষ্টি চাহিদা পুরণের জন্য প্রয়োজনীয় নিরাপদ খাদ্য ও পানি পাওয়ার অধিকার আজ বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত। অথচ প্রায় ৬০০ কোটি জনসংখ্যা অধ্যুষিত এ পৃথিবীর ১০০ কোটির বেশি মানুষই তাদের খাদ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত। তদুপরি, আজ খাদ্যের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ চলে যাচ্ছে গুটিকয়েক বহুজাতিক কোম্পানির হাতে। খাদ্যের উপর কোম্পানির একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হলে কোম্পানির মুনাফার অনন্ত ক্ষুধার আগুনে কোটি মানুষের খেয়ে বাঁচার অধিকার যে দগ্ধ হবে তাতে সন্দেহের অবকাশ নেই।
খাদ্য প্রকৃতির অবিচ্ছেদ্য উপাদান। আর মানুষ প্রকৃতিরই সন্তান। সকল যুগেই এই বিশ্বের সকল মানুষ এবং অন্য সকল প্রাণির জন্য প্রয়োজনীয় খাদ্য প্রকৃতির মধ্যেই ছিল, প্রকৃতির মধ্যেই আছে। কিন্তু খাদ্যের অসম বন্টন ব্যবস্থার কারণেই সকল দেশে সকল যুগে বিপুল সংখ্যক মানুষ খাদ্য থেকে বঞ্চিত থেকেছে। একসময় মানুষ কোনরূপ উৎপাদন ছাড়াই প্রকৃতি থেকে তার প্রয়োজনীয় খাদ্য সংগ্রহ করতো। কিন্তু জনসংখ্যার ক্রমবৃদ্ধির কারণে মানুষকে খাদ্য উৎপাদন শুরু করতে হয়েছে এবং কালক্রমে তা বাণিজ্যের পণ্য হয়ে উঠেছে। আগে বাংলাদেশের মত স্বল্পোন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোতেই অধিকাংশ খাদ্য উৎপাদিত ও ক্রয়-বিক্রয় হত। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে খাদ্য উৎপাদন ও বাণিজ্যে নাটকীয় পরিবর্তন ঘটেছে। বর্তমানে খাদ্য শুধু নিছক বাণিজ্যের পণ্য নয় বরং আন্তর্জাতিক রাজনীতিরই একটি বড় নিয়ামক শক্তি হয়ে উঠেছে। কৃষিপ্রধান দেশ না হয়েও খাদ্যপণ্যের আন্তর্জাতিক বাজারে একচ্ছত্র কর্তৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্য উঠেপড়ে লেগেছে উত্তরের ধনী দেশগুলো। আর এ কাজে মূল ভূমিকা পালন করছে বৃটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির নতুন সংস্করণ সেসব দেশের বহুজাতিক কোম্পানিগুলো। যেহেতু কোম্পানির একমাত্র লক্ষ্য হলো মুনাফা অর্জন তাই খাদ্যের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণভার এসব বহুজাতিক কোম্পানির হাতে ছেড়ে দিয়ে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে কি-না তা নিয়ে সন্দেহের যথেষ্ট অবকাশ রয়েছে।
বাংলাদেশে খাদ্য উৎপাদন ও বন্টন পরিস্থিতি
এদেশে খাদ্য বলতে শুধু দানাজাতীয় খাদ্যকেই (চাল ও গম) হিসেবের মধ্যে ধরা হয় যা একটি চরম ভ্রান্ত ধারণা। কারণ, দানাদার খাদ্যশস্য মানুষের প্রধান খাদ্য হলেও খাদ্য নিরাপত্তার প্রশ্নে মানবদেহের পুষ্টির জন্য অত্যাবশ্যক সকল খাদ্যকেই বিবেচনায় নেওয়া জরুরী। তদুপরি, দেশের দানাজাতীয় খাদ্যের চাহিদা ও উৎপাদনের পরিসংখ্যানগত তথ্য নিয়েও মারাতœক বিভ্রাট লক্ষ করা যায় যা খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সঠিক পরিকল্পনা প্রণয়ন ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে প্রধান অন্তরায়। প্রথমতঃ হালনাগাদ তথ্যের প্রাপ্যতা বিশেষ করে খাদ্য চাহিদাগত তথ্য মোটেও সহজলভ্য নয়। মজার ব্যাপার হচ্ছে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের খাদ্য ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের ওয়েব সাইট, কৃষি মন্ত্রণালয়ের ওয়েব সাইট, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ওয়েবসাইট এমনকি স্বাস্থ্য মন্ত্রণায়ের ওয়েবসাইটের কোথাও খাদ্য ও পুষ্টির চাহিদাগতÍ কোন তথ্য সহজলভ্য নয় যা এদেশের পরিকল্পনা প্রণয়নে দৈন্যদশার চিত্রই ফুটে উঠে। দ্বিতীয়তঃ যা কিছু তথ্য পাওয়া যায় সেখানে কোন একটি উৎসের তথ্যের সাথে অপর কোন উৎসের তথ্যের ব্যাপক পার্থক্য লক্ষ করা যায়। তৃতীয়তঃ নির্দিষ্ট বছরের জনসংখ্যা এবং মাথাপিছু খাদ্যের চাহিদা থেকে দেশের মোট খাদ্য চাহিদা হিসাব করা হয়। কিন্তু, জনসংখ্যা ও মাথাপিছু খাদ্য চাহিদা নিয়েও রয়েছে বিরাট তথ্য বিভ্রাট। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যমতে ২০১০ সালে দেশের জনসংখ্যা ১৪ কোটি ৬০ লক্ষ যদিও অনেকের মতে এটা ১৫ কোটি, কারও মতে ১৬ কোটি। অন্যদিকে, বিশ্ব খাদ্য ও কৃষি সংস্থার আদর্শ মান অনুসারে মাথাপিছু দানাদার খাদ্যের চাহিদা প্রতিদিন ৩৯৭ গ্রাম এবং প্রকৃত গ্রহণ ৫০০ গ্রাম। পক্ষান্তরে, বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির হিসেবমতে বাংলাদেশের মানুষ মাথাপিছু ৫০৪ গ্রাম (যদি মোট ২৪০০ কিলোক্যালরির ৭৫% দানাদার খাদ্য থেকে পেতে হয়) দানাদার খাদ্য গ্রহণ করে থাকে যদিও কোন কোন হিসাব মতে এই পরিমাণ আরও অনেক বেশি। এখন আমরা যদি দেশের জনসংখ্যা ১৬ কোটি এবং মাথাপিছু দানাদার খাদ্যের চাহিদা ৫০৪ গ্রাম ধরি তবে ২০০৯-১০ অর্থ বছরের জন্য দেশের খাদ্য চাহিদা দাড়ায় ২৯৬ লক্ষ মেট্রিক টন। অথচ, বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০১০ অনুসারে ২০০৯-১০ অর্থ বছরে দেশে খাদ্য উৎপাদন ছিল ৩৬৯ লক্ষ মেট্রিক টন। অর্থাৎ ৭৩ লক্ষ মেট্রিক টন খাদ্য উদ্বৃত্ব থাকার কথা। অথচ ঐ বছরেই আরও প্রায় ২৪ লক্ষ মেট্রিক টন দানাদার খাদ্যশস্য আমদানী করা হয়েছে এবং বিদেশী সাহায্য হিসেবে এসেছে আরও ৬০ হাজার মেট্রিক টন খাদ্য। অর্থাৎ ২০০৯-১০ অর্থবছরে দেশে দানাদার খাদ্যের প্রাপ্যতা ছিল সর্বমোট ৩৯৩.৬ লক্ষ মেট্রিক টন। অর্থাৎ এই পরিমাণ খাদ্য যদি বাংলাদেশের মানুষ খেয়ে থাকে তবে প্রত্যেক মানুষ প্রতিদিন ৬৭৪ গ্রাম খাদ্য গ্রহণ করেছে যা থেকে প্রত্যেকে ২৪০৬ কিলোক্যালরি খাদ্যশক্তি পাওয়ার কথা যেখানে দারিদ্রসীমা হল ২১২২ কিলোক্যালরি !!! এই হিসাব যদি সত্য হয় তবে বাংলাদেশের দারিদ্র সত্যি সত্যিই যাদুঘরে চলে যাওয়ার কথা। কিন্তু তবুও পরিসংখ্যানের হিসাবে বাংলাদেশের কমপক্ষে ৪০% মানুষ দারিদ্রসীমার নিচে অবস্থান করছে। খাদ্যের অসম বন্টন ব্যবস্থাই এর মূল কারণ। সুতরাং এটা আর বলার অপেক্ষা রাখে না যে, খাদ্য থাকলেই সব মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না। কাজেই এ মুহুর্তে যেকোন প্রকারে রাসায়নিক সার ও কীটনাশক বিষযুক্ত দানাদার খাদ্যের উৎপাদন বৃদ্ধির চেয়ে বন্টন ব্যবস্থাকে ক্রুটিমুক্ত করা এবং শস্য বহুমুখীকরণের দিকে অধিক গুরুত্ব দেওয়া উচিত। কারণ, দানাদার খাদ্যশস্য উৎপাদনের উপরোক্ত হিসাব যদি সঠিক হয় তবে আগামী ৩০-৩৫ বছর উৎপাদন না বাড়লেও সমস্যা হওয়ার কথা নয়।
আমাদের খাদ্যাভ্যাস ও খাদ্য নিরাপত্তা
আমাদের খাদ্যাভ্যাস অত্যন্ত অবিবেচনাপ্রসূত, অবৈজ্ঞানিক ও হাজারো ভুল অভ্যাসে ঠাসা। যদিও খাদ্য গ্রহণের প্রধান বিবেচ্য বিষয় হওয়া উচিত দেহের পুষ্টি চাহিদা পূরণ করা, কিন্তু এ দেশের মানুষ খাদ্য গ্রহণ করে একেবারেই উদরপূর্তি ও রসনা তৃপ্তিকে প্রাধান্য দিয়ে। পুষ্টি সংক্রান্ত জ্ঞানের অভাবে যথেষ্ট সুযোগ থাকা সত্তে¡ও এদেশের মানুষ পুষ্টিহীনতায় ভোগে। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় এই যে, শিক্ষিত এমনকি উচ্চশিক্ষিত মানুষের মধ্যেও পুষ্টি জ্ঞান ও পুষ্টি সচেতনতার অভাব লক্ষণীয়।
আমরা ভেতো বাঙ্গালি, খাদ্য বলতে শুধু ভাতকেই বুঝে থাকি। বার্মা ও ভিয়েতনামের পর আমরা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ভাতখেকো জাতি। অন্যান্য দেশ, যেখানে ভাত প্রধান খাদ্য, সেখানেও মানুষ ভাত বেশি খায় তবে আমাদের থেকে অনেক কম। ইন্দেনেশিয়ায় একজন লোক বছরে গড়ে ১৫২ কেজি, ফিলিপাইনে ১১০ কেজি, চীনে ১০৩ কেজি এবং ভারতে ৭৯ কেজি চালের ভাত খায়। আর আমরা খাই ১৮৩ কেজি চালের ভাত। আমাদের খাদ্য গ্রহণের প্রধান লক্ষ্য থাকে কী করে মুখরোচক উপকরণ মিশিয়ে উদরপূর্তি করে ভাত খাওয়া যায়। আমাদের দানাদার খাদ্যের চাহিদা প্রতিদিন মাথাপিছু ৩৯৭ গ্রাম চালের ভাত অথচ আমরা খাই ৫০৪ গ্রামেরও বেশী। অন্যদিকে, আমাদের শাক-সব্জির চাহিদা প্রতিদিন মাথাপিছু ২১৩ গ্রাম অথচ আমরা খাই মাত্র ৫৩ গ্রাম। এক্ষেত্রে শুধু শাক-সব্জির অভাব বা দারিদ্রতা নয়, আমাদের সচেতনতার অভাবই প্রধানত দায়ী।
পুষ্টিকর ভাল খাদ্য বলতে আমরা মাছ, মাংস, ডিম, দুধ, বিদেশী জাতের শাক-সব্জি ও ফলমূল ইত্যাদি দামী খাবারকেই বুঝে থাকি যা একবারেই সঠিক নয়। আমরা যেদিন ভাল খাবারের আয়োজন করি সেখানে মাছ, কয়েক ধরণের মাংস, ডিম, দুধ বা দই এসবকিছু একসাথে খেয়ে উদর ঠেসে পূর্ণ করি যা একদিকে অর্থের অপচয় অন্যদিকে তেমনি স্বাস্থ্যের জন্যও ক্ষতিকর। এই ভ্রান্ত ধারণা থেকেই আমরা মনে করে থাকি যে, বাংলাদেশের দরিদ্র মানুষের পক্ষে এসব খাবার কিনে খাওয়া সম্ভব নয় তাই তারা পুষ্টিহীনতায় ভোগে। প্রকৃত প্রস্তাবে, পুষ্টিকর খাদ্য বা ক্রয় ক্ষমতার অভাব নয় বরং পুষ্টি সম্পর্কে আমাদের চরম অজ্ঞতা ও অসচেতনতা এবং মিথ্যা আভিজাত্যের ভড়ংই এদেশের মানুষের পুষ্টিহীনতার প্রধান কারণ। খাদ্য সাহায্যের জন্য বিদেশীদের কাছে ভিক্ষা মাগতে আমাদের লজ্জাবোধ হয়না কিন্তু কচুর মত অত্যন্ত পুষ্টিকর শাক খেলে আমাদের মান-সন্মান থাকে না। বিভিন্ন প্রকার কচু ছাড়াও গ্রামাঞ্চলে থানকুনি, তেলাকুচা, পিপুল, আমরুল, সজনে পাতা, বথুয়া, পুনর্ণভা, শান্তি শাক, নটে শাক, হেলেঞ্চা, গনোরি, কলমি, গ্যাটকল ইত্যাদি অসংখ্য শাক-সব্জি পাওয়া যায় যেগুলো চাষ করতে হয়না এবং এসব শাক-সব্জিতে কোন প্রকার ক্ষতিকর রাসায়নিক সার বা কীটনাশকও থাকে না। অথচ পুষ্টি মানের দিক থেকে যেকোন দামী শাক-সব্জি থেকে এগুলো কোন অংশে কম নয়। তদুপরি এগুলোর রয়েছে ঔষধি গুণাগুণ। অথচ, আজ এদেশের মানুষের ভিটামিনের অভাব দূর করে অন্ধত্বের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য ধানের মধ্যে ভিটামিন-এ ঢুকিয়ে আমাদের ভিটামিনের অভাব দূর করার এক হাস্যকর যুক্তি দেখিয়ে ‘গোল্ডেন রাইস’ তৈরি করা হচ্ছে। গোল্ডেন রাইসের ভাত খেয়ে যদি ভিটামিন-এ এর অভাব দূর করতে হয় তবে একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষের দৈনিক গড়ে প্রায় ৭.৫ কেজি চালের ভাত খেতে হবে তাও যদি শরীর সবটা হজম করতে পারে। প্রতি ১০০ গ্রাম গোল্ডেন রাইস থেকে মাত্র ৩০ মাইক্রোগ্রাম বিটাক্যারোটিন বা ভিটামিন-এ পাওয়া যাবে। অথচ, আমাদের দেশী জাতের লাল চালেও এর চেয়ে আনেক বেশি বিটাক্যারোটিন আছে যেসব ধান আজ বিলুপ্তির পথে। বনে-বাদাড়ে অবহেলায় পড়ে থাকা ১০০ গ্রাম হেলেঞ্চা শাকে ১৩৭০০ মাইক্রোগ্রাম, থানকুনি শাকে ১৩১০০ মাইক্রোগ্রাম, কলমী শাকে ১০৭৪০ মাইক্রোগ্রাম, কালোকচু শাকে ১২০০০ মাইক্রোগ্রাম এবং সবুজকচু শাকে ১০২৭৮ মাইক্রোগ্রাম বিটাক্যারোটিন আছে। যেসব গ্রামীণ দরিদ্র জনগোষ্ঠীর কথা চিন্তা করে গোল্ডেন রাইস তৈরি করা হচ্ছে তাদের আশেপাশে ভিটামিন-এ সমৃদ্ধ এরূপ অসংখ্য খাদ্যবস্তু রয়েছে যা অসচেতনতার জন্য মানুষ খায়না।
অনুরূপভাবে আতা, শরিফা, বেল, কদবেল, পেয়ারা, আমড়া, কামরাঙ্গা, কাঠাল, পেপে, জাম, জামরুল, সফেদা, আমলকি, তেতুল, কুল, ডালিম ইত্যাদি বহু ধরণের দেশী ফল পুষ্টিমানের বিচারে কমলা, আপেল, আঙ্গুর, বেদানা ইত্যাদি যেকোন বিদেশী ফল থেকে কোন অংশেই কম নয়। তা ছাড়া এসব বিদেশী ফলমূল সংরক্ষণে প্রচুর পরিমাণে বিষাক্ত রাসায়নিক দ্রব্য প্রয়োগ করা হয় যা আমরা সবাই জানি। অথচ আমরা আভিজাত্যের মিথ্যা অহংকার দেখাতে গিয়ে এসব দেশী ফলগুলোকে হেলাফেলা করি যা একবারে মুর্খতা ছাড়া আর কিছুই নয়। আজ এরূপ মিথ্যা অহংকারভরা মুর্খতা আমাদের মন-মগজে চেপে বসেছে যা আমাদের খাদ্য নিরাপত্তাকে অযথাই হুমকির মধ্যে ফেলে দিচ্ছে, তুলে দিচ্ছে কোম্পানির হাতে। কাজেই আজ সর্বাগ্রে প্রয়োজন মানুষের পুষ্টি সচেতনতা সৃষ্টি ও খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তনের উপর সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া।
খাদ্যের ঘাতক রূপ এবং খাদ্য নিরাপত্তা
যে খাদ্য আমাদেরকে সুস্থ্য রাখবে, আমাদের জীবন বাঁচাবে সে খাদ্যই আজ আমাদের নানারকম রোগ-ব্যাধি ও প্রাণনাশের বড় কারণ হয়ে দেখা দিয়েছে। আমাদের দেহের পুষ্টির চাহিদা মিটানোর জন্য প্রতিদিন পর্যাপ্ত পরিমাণ শাক-সব্জি ও ফলমূলসহ সুষম খাদ্য গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরী। কিন্তু আমরা খাদ্য গ্রহণের নামে প্রতিদিন জেনে বা না জেনে বিষ সেবন করে চলেছি। কারণ, শাক-সব্জি ও ফলমূলসহ এসব খাদ্যে উৎপাদন পর্যায় থেকে শুরু করে বাজারজাতকরণ পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ে মিশানো হচ্ছে নানাবিধ বিষাক্ত কীটনাশক ও রাসায়নিক দ্রব্য। আধুনিক জাতের উচ্চফলনশীল, হাইব্রিড ও জিএম শাক-সব্জিসহ অন্যান্য ফসল ও ফলমূল উৎপাদন করতে গিয়ে দফায় দফায় প্রয়োগ করা হচ্ছে বিষাক্ত কীটনাশক, মাকড়নাশক, ছত্রাকনাশক, আগাছানাশক ইত্যাদি। খাদ্যের সাথে এসবই আমাদের দেহে ঢুকছে। আবার, এসব শাকসব্জি ও ফলমূল দীর্ঘদিন সংরক্ষণ এবং ফলমূল পাকানোর জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে কার্বাইড ও ইথারেলসহ নানাবিধ বিষাক্ত পদার্থ। মাছ সংরক্ষণের জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে বিষাক্ত ফরমালিন। ক্রেতাদের আকৃষ্ট করার জন্য শাকসব্জি ও ফলমূলে মেশানো হচ্ছে বিষাক্ত রঞ্জক দ্রব্য। ফলে, একদিকে যেমন আমাদের দেহে নানাবিধ রোগ-ব্যাধি দেখা দিচ্ছে অন্যদিকে জীবনী শক্তি ও আয়ুষ্কালও হ্রাস পাচ্ছে। আজ আমরা বাধ্য হচ্ছি বাবা বা মা হয়ে প্রাণপ্রিয় সন্তানের মুখে স্বহস্থে বিষ তুলে দিতে-এর চেয়ে অসহায় অবস্থা আর কী হতে পারে!
পানির বাণিজ্যিকীকরণ খাদ্য নিরাপত্তার জন্য আরেক হুমকি
খাদ্যের একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হচ্ছে পানি। তাই, খাদ্য নিরাপত্তার নিশ্চিত করতে পর্যাপ্ত নিরাপদ পানি পাওয়ার নিশ্চয়তা বিধান করাও জরুরী। অথচ, নিরাপদ পানির ক্রমবর্ধমান সংকট আজ সারাবিশ্বে কোটি কোটি মানুষের জীবন-মরণ সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। চিন্তাবিদদের এই আশংকা মোটেই অমূলক নয় যে, পৃথিবীতে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ বাধলে তা হবে পানি নিয়েই। প্রকৃতির পানিকে দুষিত করে বিত্তশালীরা এখন মিনারেল ওয়াটারের দিকে ঝুঁকছে। আগামী দিনে পানিই হবে মহামূল্যবান পণ্য। এই গরীব দেশেই পানি আজ দুধের দামকেও ছাড়িয়ে যাচ্ছে। যে মানুষ পেটের দায়ে নিজের গাভীর দুধ নিজেই খেতে পারেনা সে উচ্চমূল্যে পানি কিনে খেতে পারবে এমনটা ভাবাই অবান্তর। অথচ বাস্তবে তাই ঘটতে যাচ্ছে। বর্তমানে আর্সেনিক দুষণ সারাদেশে ছড়িয়ে পড়েছে যে পানি গ্রামীণ জনগোষ্ঠী প্রতিনিয়ত খাচ্ছে। দুষিত পানি পান করে ধুকে ধুকে মরা অথবা পানিবিহীন মরা অর্থাৎ মৃত্যুই যেন আমাদের নিশ্চিত পরিণতি।
পানি সংকট এখন জলবায়ুগত ও রাজনৈতিক ইস্যু। বিজ্ঞানীদের ধারণা বিশ্বব্যাপী পানি স্বল্পতার শতকরা ২০ ভাগের জন্য দায়ী হবে জলবায়ু পরিবর্তন। বনভূমি ও জলাভূমি ধ্বংসের কারণে পৃথিবীর অনেক দেশেই নিরাপদ পানির মারাতœক সংকট দেখা দিবে। নিরাপদ পানি স্বল্পতার আর একটি প্রধান কারণ পরিবেশ দুষণ। কারণ, প্রতিবছর দুই মিলিয়ন টন শিল্পবর্জ্য ও রাসায়নিক দ্রব্য, মানববর্জ্য, রাসায়নিক সার ও কীটনাশক পানিতে মিশছে (ইউএন/ডব্লিওডব্লিওএপি ২০০৩)। গরীবরা এক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ। কারণ, উন্নয়নশীল দেশের প্রায় অর্ধেক জনগোষ্ঠীই এই দুষিত পানি ব্যবহার করছে।
বর্তমানে পানি ব্যবসায়ী কোম্পানীগুলো বিশ্বের মাত্র ৫% জনসংখ্যার পানির চাহিদা মেটাচ্ছে আর তাতেই মাত্র চারটি বৃহৎ কোম্পানির ২০০১ সালের মোট আয় ছিল ২৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। তাই সারা বিশ্বের পানিখাত বেসরকারীকরণের জন্য উঠেপড়ে লেগেছে বহুজাতিক কোম্পানির পৃষ্ঠপোষক সংস্থা বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ ও বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা। উন্নয়নশীল দেশসমূহের পানি নীতিকে বেসরকারীকরণের অনুকূল করার জন্য ঋণের সাথে বিভিন্ন শর্ত জুড়ে দিয়ে এসব সংস্থা ক্রমাগত চাপ সৃষ্টি করছে। আর সেবাখাত উদারীকরণ চুক্তির (গ্যাটস) মাধ্যমে পানিখাত বেসরকারীকরণের সকল বাধা দূর করছে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা। বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ-এর চাপে মোজাম্বিক, বেনিন, নাইজার, রুয়ান্ডা, তাঞ্জানিয়া, ক্যামেরুন এবং কেনিয়াসহ বেশকিছু দেশ ইতোমধ্যেই তাদের পানিখাত বেসরকারীকরণ করতে বাধ্য হয়েছে। কাজেই, এ ব্যাপারে সময়মত সাবধান হওয়া আমাদের জন্য অত্যন্ত জরুরী।
খাদ্য নিরাপত্তা ও স্থায়িত্বশীল কৃষি
আজ এদেশের কৃষি ও কৃষকের এরূপ সংকট মোকাবেলা করা এবং বর্তমান ও ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য পুষ্টিকর ও নিরাপদ খাদ্য প্রাপ্তির নিশ্চয়তা অর্থাৎ খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজন একটি স্থায়িত্বশীল কৃষি ব্যবস্থা গড়ে তোলা যার কারিগরি কৌশল হবে জৈব কৃষি চর্চা। কিন্তু বাংলাদেশের মত একটি জনবহুল দেশের ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার খাদ্যের জোগান দেওয়া জৈব কৃষির পক্ষে আদৌ সম্ভব কি-না তা নিয়ে দেশের নীতিনির্ধারক মহল থেকে শুরু করে অনেকের মাঝেই যথেষ্ট সন্দেহ লক্ষ করা যায়। এক্ষেত্রে, গত ৩-৫ মে ২০০৭ জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (ঋঅঙ) আয়োজিত “ঙৎমধহরপ অমৎরপঁষঃঁৎব ধহফ ঋড়ড়ফ ঝবপঁৎরঃু” শীর্ষক একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে বিশেষজ্ঞদের অভিব্যক্তি প্রনিধানযোগ্য। সেখানে বলা হয়েছে যে, জৈব কৃষি সারা বিশ্বের প্রতিটি মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সক্ষম। বিজ্ঞানী ইধফমষবু বঃ. ধষ. ২০০৭; এবং ঐধষনবৎম বঃ. ধষ. ২০০৬ সা¤প্রতিককালে একটি তাত্তি¡ক মডেল দিয়েছেন যাতে দেখানো হয়েছে যে, এই মডেলের ব্যবহার দক্ষতার উপর ভিত্তি করে বর্তমানের মোট আবাদী জমির পরিমান ও ফলন না বাড়িয়েও জৈব কৃষির মাধ্যমে বিশ্বের প্রতিটি মানুষের জন্য প্রতিদিন ২৬৪০ থেকে ৪৩৮০ কিলোক্যালরি খাদ্য যোগান দেওয়া সম্ভব।
জৈব কৃষি চর্চার মাধ্যমে এদেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয় – এমন ধারণা যারা পোষণ করেন তারা প্রকৃতপক্ষে চলমান ভোগবাদী আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থার প্রেক্ষাপটেই এমনটি করেন। যেমনঃ রোজার শিক্ষা হল সংযম বা ভোগকে নিয়ন্ত্রণ করা। তাই যদি হয় তবে সঙ্গত কারণেই রমজান মাসে ভোগ কম হওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে আমরা দেখি, রমজান মাসে আমাদের ভোগের মাত্রা আরও বেড়ে যায়। ভোগ্যপণ্যের চাহিদা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধির ফলে বাজারে দ্রব্যমূল্যের আগুন ছড়িয়ে পড়ে। আর তাই দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ নিয়ে চারিদিকে হৈচৈ পড়ে যায়। অথচ দ্রব্যমূল্য নিয়ে হৈচৈ করার চেয়ে আমাদের ভোগ নিয়ন্ত্রণ করা অধিক জরুরী।
অন্যদিকে, আমরা জানি, উদ্ভিদই কেবল নিজের খাদ্য নিজে তৈরি করতে পারে। কাজেই এই বিশ্বভ্রহ্মান্ডের সকল জীবই প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে তার খাদ্যের জন্য উদ্ভিদের উপর নির্ভরশীল। এখন যে পোকামাকড় এই উদ্ভিদ (মাঠ ফসল, ফলজ ও বনজ বৃক্ষ ইত্যাদি) থেকে খাদ্য শিকলে খাদ্য সরবরাহের কাজটি করে তাকে শক্রু জ্ঞান করে কীটনাশক প্রয়োগ করে ধ্বংস করার ফলে গোটা খাদ্য-জাল বিঘ্নিত হচ্ছে। ধ্বংস হচ্ছে বিশ্বভ্রহ্মান্ডের জীববৈচিত্র্য। কাজেই, ফসল রক্ষার প্রচলিত ধ্যান-ধারণা থেকে আমাদেরকে বেরিয়ে আসতে হবে। আমাদেরকে বুঝতে হবে, উদ্ভিদ যে খাদ্য তৈরি করছে তা একমাত্র মানুষের ভোগের জন্যই নয়। কাজেই, স্থায়িত্বশীল কৃষি প্রকৃতপক্ষে একটি দর্শন যা সাদামাটাভাবে ফসলের ফলন বা পরিমানগত উৎপাদন দিয়ে বিচার করলে চলবে না।
তা ছাড়া, জৈব কৃষি চর্চায় ফসলের ফলন কমবে সে ধারণাও অমূলক। আজকে যারা জৈব কৃষিকে অসম্ভব মনে করছেন তারা আসলে বর্তমান প্রচলিত কৃষির ফলে সৃষ্ট সমস্যা ও সংকটের প্রেক্ষাপটেই এমন ধারণা পোষণ করে থাকেন। গত প্রায় অর্ধ-শতাব্দী ধরে রাসায়নিক কৃষি চর্চার ফলে আমাদের মাটি, পরিবেশ, ইকো-সিস্টেম এবং আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থার যে রূপান্তর ঘটেছে সেখানে শুধু টনের হিসেবে জৈব সার প্রয়োগ করেই রাতারাতি ফলাফল প্রত্যাশা করাটাই অযৌক্তিক। এজন্য একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আমাদের মাটির স্বাস্থ্যের উন্নয়ন ও ফসলের ইকোসিস্টেম পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে হবে। জৈব কৃষি চর্চায় উৎপাদনশীলতা নির্ভর করে ফসলের সার্বিক ব্যবস্থাপনাগত দক্ষতার উপর। মাটির স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা, ফসল ব্যবস্থাপনা, সেচ ব্যবস্থাপনা, পোকা-মাকড় ও অন্যান্য বালাই ব্যবস্থাপনা ইত্যাদি কাজগুলো দক্ষতার সাথে করতে পারলে জৈব কৃষিতে শুধু স্থায়িত্বশীল ফলনই নিশ্চিত হবেনা, উৎপাদনশীলতা এবং সার্বিক লাভও বৃদ্ধি পাবে। আর এজন্য প্রয়োজন একটি সমন্বিত উৎপাদন ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং তার জন্য সঠিক পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করা।