Mar 30, 2025 | প্রকৃতি কথা
বীজ কেবল ফসল চাষের একটি উপকরণই নয় বরং তা সমগ্র কৃষি ব্যবস্থা এবং কৃষক জনগোষ্ঠীর জীবনাচার, সংস্কৃতি ও কৃষ্টিসহ সমগ্র জীবন ব্যবস্থার সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। কাজেই, বীজের উপর নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নটি এ দেশের কৃষক এবং হাজার বছরের ঐতিহ্যবাহী স্বনির্ভর কৃষি ব্যবস্থার অস্তিত্বের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কৃষিপ্রধান এ দেশের বীজের বিশাল বাজার দখলের মাধ্যমে গোটা কৃষি ব্যবস্থার উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার সুদুরপ্রসারী লক্ষ্য নিয়ে বহুজাতিক কোম্পানিগুলো প্রবর্তন করছে তাদের প্যাটেন্ট করা হাইব্রিড ও জেনিটিক্যালি মডিফাইড (জিএম) বীজ।
বিশ্বের ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার জন্য খাদ্য উৎপাদন বাড়ানোর কথা বলে আজ বহু কোম্পানি হাইব্রিড ও জিএম বীজ বাজারজাত করছে। হাইব্রিড, জিএম ও টার্মিনেটর বীজ (টার্মিনেটর প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরিকৃত বন্ধ্যা বীজ) বর্তমান বিশ্বের বিশেষ করে তৃতীয় বিশ্বের কৃষিতে এক দানবীয় রূপে আর্বিভূত হয়েছে। সারা বিশ্বের কৃষি ও খাদ্য নিয়ে একচেটিয়া ব্যবসা করা ও কাড়ি কাড়ি মুনাফা লুটার ফন্দি এটেছে বহুজাতিক কোম্পানিগুলো। এসব বীজ বাজারে ছাড়ার পেছনে কোম্পানির মূল লক্ষ্য হল কৃষকের নিজস্ব বীজগুলোকে সরিয়ে দিয়ে তাদের বীজের একচেটিয়া ব্যবসা প্রতিষ্ঠা করা। এক্ষেত্রে তৃতীয় বিশ্বের কৃষিপ্রধান দেশগুলোর দিকে কোম্পানিগুলোর নজর পড়েছে। কারণ, প্রযুক্তির দিক থেকে দূর্বল এসব দেশগুলোই হতে পারে তাদের একচেটিয়া ব্যবসার অবাধ ক্ষেত্র।
যতই খাদ্য নিরাপত্তার বুলি আওড়ানো হউক না কেন, কোম্পানির মূল লক্ষ্য নিশ্চয় মুনাফা অর্জন। আর কোম্পানির মুনাফা অর্জনের পথ তখনই নিরঙ্কুশ হবে যখন কৃষক প্রতি বছর সে কোম্পানির বীজ কিনবে। কোম্পানি যদি এমন বীজ বাজারে ছাড়ে যে বীজ থেকে কৃষক নিজে বীজ উৎপাদন ও সংরক্ষণ করে পরের বছর চাষ করতে পারবে সেরকম বীজ দিয়ে কোম্পানির মুনাফা অর্জনের পথ নিরঙ্কুশ হবে না। কারণ, ঐতিহ্যগতভাবেই এ দেশের কৃষক পরস্পরের মধ্যে বীজের আদান-প্রদান করে থাকে। ধরা যাক, একটা গ্রামে একজন কৃষক কোম্পানির কোন একটি জাতের বীজ বাজার থেকে কিনে এনে চাষ করল। এখন ধরা যাক, সেই কৃষকের কাছ থেকে বীজ নিয়ে পরের বছর আরও ১০ জন কৃষক ঐ জাতটি চাষ করল। তার পরের বার সেই ১০ জন থেকে আরও ১০০ জন কৃষক ঐ বীজ নিয়ে চাষ করবে। এভাবে পর্যায়ক্রমে কৃষকদের মাধ্যমে সারা গ্রামেই সে বীজ ছড়িয়ে পড়বে। কোম্পানির কাছ থেকে প্রতিবছর কৃষক আর বীজ কিনবে না। ফলে, কোম্পানির বীজ ব্যবসাও আর জমবে না।
তাই কোম্পানির ব্যবসা নিরঙ্কুশ করতে হলে এমন বীজ কৃষককে দিতে হবে যে বীজ থেকে কৃষক নিজে বীজ উৎপাদন করে পরের বছর চাষ করতে পারবে না। প্রতিবছর কোম্পানির কাছ থেকে বীজ কিনতে বাধ্য হবে। ঠিক এমন বীজই হল হাইব্রিড ও জিএম (টার্মিনেটর প্রযুক্তি ব্যবহার করে উৎপাদিত) বীজ। এই টার্মিনেটর প্রযুক্তি সম্পর্কে পূর্বেই ট্রিপস চুক্তি চ্যাপ্টারে আলোচিত হয়েছে।
একসময় এ দেশের মাঠে মাঠে চাষ হতো প্রায় ১২,৫০০ জাতের ধান, আজ সেগুলো বিলুপ্ত প্রায়। আজ যদি আমাদের কৃষকরা হাইব্রিড ও জিএম জাতের চাষ শুরু করে তবে বর্তমানে যে জাতগুলো আছে (যেগুলোর বীজ কৃষক নিজে উৎপাদন ও সংরক্ষণ করতে পারে) সেগুলো হারিয়ে যাবে। তখন কৃষক বীজের জন্য সম্পূর্ণরূপে কোম্পানির নিকট জিম্মি হয়ে পড়বে। আর তখন বীজ সংকট বর্তমানের চেয়ে আরও মারাতœক আকার ধারণ করবে। রাসায়নিক সার, বালাইনাশক, ডিজেল ইত্যাদি উপকরণগুলোর সংকট সৃষ্টি হলে ফলন কম হলেও বিকল্প উপায়ে ফসল ফলানো সম্ভব হতে পারে কিন্তু বীজ ছাড়া তা কোনভাবেই সম্ভব হবে না। অন্যদিকে, বর্তমানে কৃষিতে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি দিন দিন বাড়ছে। এসব ঝুঁকি মোকাবিলায় প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্ট জাতগুলোর গুরুত্ব আজ নতুনভাবে অনুভ‚ত হচ্ছে। কাজেই কোন নতুন জাত প্রবর্তনের ক্ষেত্রে আমাদের নিজস্ব ফসল বৈচিত্র্য তথা জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের বিষয়টি সর্বাধিক গুরুত্ব পাওয়া উচিত। পাশাপাশি বীজ যাতে সম্পূর্ণভাবে কৃষকের হাতছাড়া না হয়ে যায় সে বিষয়টি নিশ্চিত করাও অপরিহার্য।
কিন্তু অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয় এই যে, বাংলাদেশসহ তৃতীয় বিশ্বের দরিদ্র কৃষকেরা তাদের বীজের জন্য ক্রমেই কোম্পানির উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে এবং নিজেদের হাতের বীজ হারিয়ে জিম্মি হয়ে পড়ছে কোম্পানির হাতে। বাংলাদেশের কৃষকেরা এখনই মারাত্মক বীজ সংকটের সন্মুখীন। ২০০৫ সালের পাট বীজের মারাত্মক সংকট এর জলন্ত উদাহরণ। পাট বীজ উৎপাদন একটু সময়সাপেক্ষ ও ঝামেলাপূর্ণ হওয়ায় এবং মোটামুটি সুবিধাজনক দামে বাজারে উচ্চ ফলনশীল জাতের পাট বীজ পাওয়ায় কৃষকরা পাট বীজ উৎপাদন প্রায় ছেড়েই দিয়েছে। কাজেই কৃষকের হাতে এখন আর কোন পাট বীজ নেই এবং তারা বীজের জন্য পুরোপুরি বাজরের উপর নির্ভরশীল। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে ২০০৫ সালে ব্যবসায়ী মহল পাট বীজের কৃত্রিম সংকট কৃষ্টি করে। ফলে, আগের বছর যে বীজের দাম ছিল প্রতি কেজি মাত্র ৩০-৩৫ টাকা, ২০০৫ সালে তা প্রতি কেজি ৭০০-৮০০ টাকা পর্যন্ত দামে বিক্রি করে এবং কৃষককে বাধ্য হয়ে এ দাম দিয়েই বীজ কিনতে হয়। অনেক কৃষক বীজ কিনতে না পেরে ঐ বছর পাট চাষ বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়। গত ২০০৯ সালের বোরো মৌসুমে ব্যবসায়িরা কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে ৩০০ টাকার ধান বীজ ৬০০-৭০০ টাকায় বিক্রী করেছে। বীজের ক্ষেত্রে এ ধরণের ঘটনা সারাদেশে প্রতিনিয়তই ঘটছে। এ দেশের দরিদ্র কৃষকদের জন্য এটি একটি ভয়াবহ সংকট যা তাদের খাদ্য নিরাপত্তা ও জীবিকার নিরাপত্তার জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দেখা দিয়েছে।
কাজেই এ দেশের দরিদ্র কৃষকদেরকে কৃষিতে টিকে থাকতে হলে বীজের নিয়ন্ত্রণ থাকতে হবে কৃষকেরই হাতে। বীজ কৃষকের অধিকার যা কৃষকের হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে। এ অধিকার সংরক্ষণে এগিয়ে আসতে হবে কৃষকদেরকেই। এ ব্যাপারে সরকারের উপর সর্বাত্মক চাপ সৃষ্টি করতে হবে যাতে সরকারি নীতি কৃষকের এই অধিকারকে সংরক্ষণ করে। হাইব্রিড ও জিএম বীজ কৃষকের বীজ অধিকারের সম্পূর্ণ পরিপন্থী। নিন্মে হাইব্রিড ও জিএম বীজ সম্পর্কে আলোচিত হল।
হাইব্রিড বীজ
দুটি ভিন্ন জাতের উদ্ভিদের মধ্যে কৃত্রিম মিলন ঘটিয়ে নতুন জাত সৃষ্টি করার পদ্ধতিকে বলে শংকরায়ন বা হাইব্রিডাইজেশন। এরূপ শংকরায়নের মাধ্যমেই উচ্চফলনশীল (উফশী) ও হাইব্রিড জাত তৈরি করা হয়। দুটি ভিন্ন প্রজাতির উদ্ভিদের মধ্যে শংকরায়নের ফলে প্রথম যে বংশধর সৃষ্টি হয় তাকে হাইব্রিড বলা হয়। ধরা যাক, জাত-১ ও জাত-২-এর মধ্যে শংকরায়নের ফলে প্রথম বংশধর ফিলিয়াল-১ (এফ-১) পাওয়া গেল। এখন যদি এই এফ-১ এর বৈশিষ্ট্য বা ফলন জাত-১ ও জাত-২ থেকে উৎকৃষ্টতর হয় তবে তাকে হাইব্রিড জাত হিসেবে বাজারে ছাড়া হয়। এরূপ শংকরায়নের ফলে যে নতুন জাতের (হাইব্রিড) সৃষ্টি হয় তার বৈশিষ্ট্যগুলো হয় সম্পূর্ণ অস্থায়ী। কারণ, এই জাতের অর্ধেক বৈশিষ্ট্য আসে মাতৃজাত থেকে আর বাকি অর্ধেক আসে পিতৃজাত থেকে। এসব বৈশিষ্ট্যের মধ্যে যেগুলো প্রকট শুধু সেগুলোই প্রথম বংশধরের (হাইব্রিড) মধ্যে প্রকাশ পায়। বাকি বৈশিষ্ট্যগুলো প্রথম বংশধরের মধ্যে প্রচ্ছন্নভাবে থেকে যায় অর্থাৎ সেগুলো প্রকাশ পায় না। কিন্তু পরবর্তী বংশধরগুলোতে সেসব প্রচ্ছন্ন বৈশিষ্ট্যগুলো আবার প্রকাশ পায়। এই এফ-১কে নিজেদের মধ্যে শংকরায়ন (সেল্ফ ক্রসিং) করা হলে দ্বিতীয় বংশধর এফ-২ পাওয়া যাবে। একইভাবে সেল্ফ ক্রসিং-এর মাধ্যমে এফ-৩, এফ-৪ ইত্যাদি অসংখ্য বংশধর পাওয়া যাবে। এভাবে সেল্ফ ক্রসিং-এর মাধ্যমে প্রতিবার যে বংশধর পাওয়া যাবে তা থেকে যদি কাংখিত বৈশিষ্ট্যের গাছগুলোকে বাছাই করে তাদের মধ্যে সেল্ফ ক্রসিং করা হয় তবে সাধারণত ৭/৮ বংশধরের মধ্যে স্থায়ী কাংখিত বৈশিষ্ট্যের গাছ পাওয়া যায়। এভাবেই উচ্চফলনশীল বা উফশী জাত তৈরি করা হয় যেগুলোকে কম্পোজিট জাত বলা হয়। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটসহ দেশের বিভিন্ন কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ধানসহ বিভিন্ন ফসলের অনেকগুলো উচ্চফলনশীল বা উফশী জাত আবিষ্কার করেছে এবং কৃষকদের কাছে দিয়েছে। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট বিআর-১০, বিআর-১১, ব্রিধান-২৮, ব্রিধান-৩৩, ব্রিধান-৩৯ ইত্যাদি নামে এযাবৎ ৪৬টি উফশী ধানের জাত কৃষকদের মাঝে দিয়েছে। এই জাতগুলো নিয়ে তেমন-কোন বিতর্ক নেই। কারণ, এই জাতগুলো প্রথম পর্যায়ে গবেষণা প্রতিষ্ঠানের মাঠে ৮-১০ বছর ধরে চাষ করে তার ফলাফল দেখা হয় এবং পরবর্তী পর্যায়ে বাংলাদেশের বিভিন্ন কৃষি পরিবেশ অঞ্চলে চাষ করে এ দেশের মাটি, পরিবেশ ও ইকোসিস্টেমের উপর এর প্রভাব পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখা হয়। সর্বোপরি বৈশিষ্ট্যগুলো স্থায়ী হওয়ার ফলে এসব বীজ থেকে কৃষক নিজে উৎপাদন ও সংরক্ষণ করতে পারে এবং পরের বছর চাষ করতে পারে।
কিন্তু হাইব্রিড জাত নিয়ে নানা বিতর্ক প্রচলিত আছে। হাইব্রিড নিয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে বিতর্কটি রয়েছে তা হল উফশী জাতের মত বাংলাদেশের মাটি, পরিবেশ ও ইকোসিস্টেমের উপর এর প্রভাব পরীক্ষা-নিরীক্ষা না করেই সরাসরি বিদেশ থেকে আমদানি করে এনে চাষের জন্য কৃষকের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে। হাইব্রিড নিয়ে অপর যে গুরুত্বপূর্ণ বিতর্কটি রয়েছে তা হল হাইব্রিড বীজ কৃষক নিজে উৎপাদন ও সংরক্ষণ করতে পারেনা। কারণ, শংকরায়নের ফলে যে নতুন জাতের (হাইব্রিড) সৃষ্টি হয় তার বৈশিষ্ট্যগুলো সম্পূর্ণ অস্থায়ী হয়ে থাকে। ধরা যাক জাত-১ এর ফলন একরে ৭০ মন আর জাত-২ এর ফলন একরে ৮০ মন। এই দুটি জাতের মধ্যে শংকরায়ন করার ফলে প্রথম যে বংশধর হল (হাইব্রিড) তার ফলন হল একরে ১০০ মন। এখন এই ধান থেকে বীজ রেখে যদি পরের বছর চাষ করা হয় তবে তা হবে দ্বিতীয় বংশধর। এই দ্বিতীয় বংশধরে গিয়ে প্রথম বংশধরের মধ্যে থাকা প্রচ্ছন্ন বৈশিষ্ট্যগুলো প্রকাশ পায়। যার ফলে পরের বছর এই জাত কতটা ফলন দিবে তা নিশ্চিভাবে বলা সম্ভব নয়। তবে ফলন যে কমবে এটা মোটামুটি নিশ্চিতভাবেই বলা যায়। কারণ, দ্বিতীয় বংশধরের বীজ চাষ করলে তা থেকে নানান বৈশিষ্ট্যের গাছ হয়। তাই হাইব্রিড জাতের ধান থেকে বীজ রেখে পরের বছর চাষ করা যায়না। প্রতিবার মাতৃজাত ও পিতৃজাত -এর মধ্যে শংকরায়ন করে প্রথম বংশধর (হাইব্রিড) বীজ তৈরি করে বাজারজাত করা হয়। এরূপ শংকরায়ন কৃষকের পক্ষে করা সম্ভব হয় না বিধায় কৃষক এই বীজ তৈরি করতে পারে না।
উল্লেখ্য যে, সব এফ-১ হাইব্রিডকেই হাইব্রিড জাত হিসেবে বাজারে ছাড়া হয় না। সেই এফ-১ হাইব্রিডকেই হাইব্রিড জাত হিসেবে বাজারে ছাড়া হয় যার ফলন ও অন্যান্য বৈশিষ্ট্য মাতৃ বা পিতৃজাত থেকে উৎকৃষ্টতর। তা ছাড়া, যেকোন দুটি জাতের মধ্যে শংকরায়ন করলেই হাইব্রিড জাত পাওয়া যায় না। এরূপ হাইব্রিড জাত বহুবার বহু জাতের মধ্যে শংকরায়ন করতে করতে হঠাৎ হঠাৎ পাওয়া যায়। কাজেই যে দুটো জাতের মধ্যে শংকরায়ন ঘটিয়ে হাইব্রিড জাত পাওয়া যায় প্রতিবার সে দুটো জাত থেকেই হাইব্রিড বীজ উৎপাদন করতে হবে। ফলে, এই মাতৃজাত ও পিতৃজাত যার কাছে থাকবে (যা সব সময় গোপন রাখা হয়) কেবল সেই এই বীজ উৎপাদন করতে পারবে এবং প্রতিবার তার কাছ থেকেই বীজ নিতে হবে। আমাদের দেশে যেসব হাইব্রিড জাত আসছে তার প্রায় সবই আসে চীন ও ভারত থেকে। যেসব চীনা ও ভারতীয় কোম্পানি এই বীজ এ দেশে বিক্রী করে তারা কখনই মাতৃজাত ও পিতৃজাত আমাদেরকে দেয়না বা কোনদিন দিবেওনা। ফলে, আমাদের বীজের জন্য চিরদিন চীন বা ভারতের উপর নির্ভরশীল থাকতে হবে। স¤প্রতি পত্রপত্রিকায় একটি সংবাদ প্রকাশিত হয়েছিল যাতে বলা হয়েছিল যে, চীন সরকার বাংলাদেশে হাইব্রিড বীজ বিক্রী বন্ধ করে দেওয়ার চিন্তাভাবনা করছে। এটি নিঃসন্দেহে একটি রাজনৈতিক চাল।
কাজেই বিদেশী হাইব্রিড বীজ ব্যবহারের সাথে এক মারাতœক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকট নিহিত রয়েছে। ধরা যাক, বাংলাদেশে ব্যাপকভাবে হাইব্রিড ধান চাষ করা শুরু হল এবং বাংলাদেশ বীজের জন্য চীনের উপর পুরোপুরি নির্ভরশীল হয়ে পড়ল। পক্ষান্তরে, ব্যাপকভাবে হাইব্রিড চাষ করার ফলে কৃষকের হাতেও কোন বীজ রইলনা। এমতাবস্থায়, যদি রাজনৈতিক কারণে চীনের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্কের অবনতি ঘটে এবং চীন যদি হাইব্রিড বীজ সরবরাহ বন্ধ করে দেয় তবে দেশে ধান চাষ বন্ধ হওয়ার উপক্রম হবে। ফলে, বাংলাদেশের কৃষি উৎপাদন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং সর্বোপরি খাদ্য নিরাপত্তা মারাতœক সংকটের মধ্যে পড়বে। অন্যদিকে, বাংলাদেশের এরূপ নাজুক ও সংবেদনশীল অবস্থার সুযোগ নিয়ে চীন নানা রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সুবিধা আদায় করে নিতে সক্ষম হবে যেমনটি বর্তমানে করছে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ আমাদের ঋণ নির্ভরশীলতার সুযোগকে কাজে লাগিয়ে।
বাংলাদেশের কৃষি মন্ত্রণালয়ের জাতীয় বীজ অনুমোদন কমিটি ১৯৯৮ সালে প্রথম যে হাইব্রিড জাত আমদানির অনুমতি দেয় তার নাম আলোক-৬২০১। ১৯৯৮ সালের ২০ নভেম্বর দেশের বিশিষ্ট কৃষি বিজ্ঞানী, শস্য ও উদ্ভিদ রোগতত্ব বিশেষজ্ঞ, রাজনীতিবিদ ও শিক্ষাবিদরা এক সেমিনারে হাইব্রিড বীজ সম্বন্ধে তাদের মতামত ব্যক্ত করেন। তারা বাংলাদেশে হাইব্রিড ধানের বীজ আমদানির কুফল সম্পর্কে বলেন যে, বিনা পরীক্ষায় বিদেশ থেকে হাইব্রিড ধানের বীজ আমদানি বাংলাদেশের জন্য একটি মারাত্মক আত্মঘাতি পদক্ষেপ হবে। এর মাধ্যমে এ দেশের ঐতিহ্যবাহী কৃষি ও কৃষককে চিরস্থায়িভাবে পঙ্গু করে ফেলা হবে। তারা আরও বলেন যে, হাইব্রিড আমদানির ফলে দেশের কৃষিক্ষেত্রে নতুন নতুন পোকামাকড় ও রোগ-বালাইয়ের আর্বিভাব ঘটবে যা আমাদের কৃষিকে আরও বিপদগ্রস্ত করে তুলবে। পক্ষান্তরে, বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর বালাইনাশক ব্যবসার হবে পোয়াবারো। কৃষি বিশেষজ্ঞ এবং কৃষি বিজ্ঞানীদের এসব আপত্তি উপেক্ষা করেই তখন হাইব্রিড জাত আমদানির অনুমতি দেওয়া হয়। অবশ্য তখন কোম্পানিগুলোকে শর্ত দেওয়া হয়েছিল যে, পরবর্তী তিন বছরের মধ্যে দেশেই এই বীজ উৎপাদন করতে হবে যা অদ্যাবধিও কোন কোম্পানি পূরণ করে নি। অথচ তারা দিব্যি বিদেশ থেকে বীজ আমদানি ও ব্যবসা করে যাচ্ছে।
পক্ষান্তরে, হাইব্রিড ধান একটি অতিমাত্রায় প্রযুক্তিনির্ভর সংবেদনশীল ধান। হাইব্রিড জাতের ধান চাষ আমাদের মাটি, পরিবেশ, প্রাণবৈচিত্র্য, কৃষকের আর্থ-সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অবস্থা ইত্যাদি কোন দিক থেকেই মানানসই নয়। অধিক সংবেদনশীল হওয়ার কারণে এসব জাতে পোকামাকড় ও রোগবালাইয়ের আক্রমণ হয় ব্যাপকভাবে। কৃষকরা হাইব্রিড জাত চাষ করলেই ভাল ফলন পাবে তার কোন নিশ্চয়তা নেই। হাইব্রিড জাতে যতেœর সামান্য ত্র“টি হলেই ফলন মারাত্মকভাবে হ্রাস পায়। সঠিক সময় ও সঠিক পরিমাণে সার প্রয়োগ, দফায় দফায় বালাইনাশক প্রয়োগ, পর্যাপ্ত সেচ দেওয়া, নিয়মিত আগাছা পরিষ্কার করা ইত্যাদি সকল কাজগুলো যথাযথভাবে করতে না পারলে ফলন কমে যায়। ধরা যাক, একটা হাইব্রিড ধানের জমিতে আজকে সার প্রয়োগ করা দরকার কিন্তু কৃষকের আর্থিক সংকট বা বাজারে সারের সংকটের (যা আমাদের কৃষকদের জন্য নিত্যদিনের ঘটনা) কারণে সার দিতে যদি কিছুদিন দেরি হয় তা হলে আর আশানুরূপ ফলন পাওয়া সম্ভব হবে না।
বাংলাদেশে প্রথম প্রবর্তিত হাইব্রিড আলোক ৬২০১ জাতটি নিয়ে তখন ব্যাপক প্রচার-প্রোপাগান্ডা চালানো হয় যে অতি উচ্চ ফলনের এই ধান চাষ করলে দেশের খাদ্য স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন হবে সময়ের ব্যাপারমাত্র। আজ এটা প্রমাণিত যে, ব্র্যাক ও আইসিআই-এর মাধ্যমে বাজারজাতকৃত প্রথম হাইব্রিড জাত আলোক ৬২০১ ধানের উচ্চ ফলনের দাবি ছিল নিতান্তই মিথ্যা। বহু কৃষক আলোক ৬২০১ ব্যবহার করে প্রতারিত হয়েছেন, সর্বশান্ত হয়েছেন। সারা দেশে এরকম অনেক উদাহরণ আছে। অথচ ৩০-৩৫ টাকা কেজি দরে আমদানি করা এই বীজ তখন কৃষকের কাছে ২০০-২৫০ টাকা দরে বিক্রী করে প্রচুর মুনাফা হাতিয়ে নিয়েছে এই কোম্পানিগুলো। ব্র্যাকসহ কোম্পানিরা হাইব্রিড ধানের পক্ষে একটি যুক্তি বারবার তুলে ধরেন যে হাইব্রিড বীজ যদি খারাপই হবে তবে কেন কৃষকরা নেয়? আপাতদৃষ্টিতে যুক্তিটা প্রণিধানযোগ্য মনে হলেও বাস্তবতা এই যে, ব্র্যাক যখন তার সদস্যদের ঋণ দেয় তখন ঋণের টাকা দিয়ে হাইব্রিড বীজ নিতে বাধ্য করে। অন্যদিকে, কোম্পানিগুলো নানান প্রচার-প্রোপাগান্ডা ও কৌশলে কৃষকদেরকে হাইব্রিড বীজ গ্রহণ করতে প্ররোচিত করে থাকে। অনেকসময় কোম্পানির প্রতিনিধিরা মিথ্যা তথ্য দিয়ে কৃষকদেরকে বিভ্রান্ত করে হাইব্রিড বীজ বিক্রি করে থাকে। ২০০৮ সালের বন্যা পরবর্তী পুনর্বাসন কর্মসূচির নামে সরকারও কোম্পানির হাইব্রিড বীজ কৃষকের হাতে তুলে দিয়েছিল। তবে একথা অনস্বীকার্য যে, অনেক কৃষক বিশেষ করে ধনী কৃষকরা হাইব্রিড ধান চাষ করে অনেকসময় ভাল ফলন পায়। কারণ তারা হাইব্রিড ধানের জন্য যে অতিরিক্ত খরচ ও পরিচর্যা প্রয়োজন তা ঠিকমতো করতে পারে। কোম্পানিও তাদেরকে প্রদর্শনীর জন্য নানান প্রনোদনা ও কারিগরি সহায়তা দিয়ে থাকে। ফলে, কিছুসংখ্যক কৃষক হাইব্রিড ধান চাষ করে ভাল ফলন পায়। তাই দেখে বাকি কৃষকরাও হাইব্রিড চাষে সহজে উদ্বুদ্ধ হয়। কিন্তু বাস্তবতা এই যে, সব কৃষকের জন্য বিশেষ করে দরিদ্র বা হতদরিদ্র কৃষকদের জন্য হাইব্রিড জাত মোটেও উপযোগি নয়।
আলোক ধানের পর বর্তমানে যেসব হাইব্রিড বীজ বাজারে আসছে সেগুলোর ফলাফলও খুব ভাল নয়। প্রথমবার খুব ভাল ফলন দিলেও সোনার বাংলা, জাগরণ, হীরা এগুলো যারা পরপর কয়েকবার চাষ করেছেন তাঁদের অনেকেই ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছেন। পত্রপত্রিকায় প্রতিনিয়ত কৃষকের প্রতারিত ও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার এসব খবর প্রকাশিত হচ্ছে। অন্যদিকে বাস্তবতা এই যে, আমাদের দেশের কৃষকরা শুধু বাড়তি ফলনটাই বিবেচনায় নেয়। উৎপাদন ব্যয়ের বিবেচনায় লাভ-ক্ষতির সঠিক হিসেব তাঁরা করে না। মাটির উর্বরতা, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের উপর ক্ষতিকর প্রভাবগুলোকেতো আমলেই নেয় না। অন্যদিকে, কোম্পানিগুলো তাদের বীজ বিক্রির কৌশল হিসেবে ব্যাপক প্রচারণার পাশাপাশি কৃষকদের নানাবিধ সুযোগ-সুবিধা দিয়ে থাকে। কোম্পানিগুলো মাঠ পর্যায়ে যেসব প্রদর্শনী প্লট স্থাপন করে সেখানে সার্বক্ষণিক কারিগরি সহায়তার পাশাপাশি বিনামূল্যে সার, সেচ, বালাইনাশকসহ বিভিন্ন উপকরণ ও আর্থিক সহায়তা প্রদান করে থাকে। কাজেই এসব প্রদর্শনী প্লটে কৃষকের মাঠে চাষকৃত অন্যান্য জাতের তুলনায় বেশি ফলন পাওয়া যায়। ফলে, অধিক ফলনের আশায় কৃষক হাইব্রিড ধানের প্রতি সহজেই আকৃষ্ট হয়।
হাইব্রিড বীজের সমস্যাসমূহ
মাঠ পর্যায়ে কৃষকদের অভিজ্ঞতা থেকে হাইব্রিড বীজের বা জাতের যেসব সমস্যার কথা জানা যায় এবং যেসব কারণে হাইব্রিড বীজ/জাত বিতর্কিত সেগুলো নিন্মে তুলে ধরা হলঃ
১. হাইব্রিড বীজ উৎপাদন প্রক্রিয়া অত্যন্ত জটিল বিধায় কৃষকরা ব্যক্তিগতভাবে এই বীজ উৎপাদন করতে পারে না;
২. বীজ উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় মাতৃজাতগুলো প্রতিবছর কোম্পানির কাছ থেকে কিনতে হয়। ফলে, বীজের উপর কোম্পানির একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ বজায় থাকে;
৩. কৃষকরা এই বীজ থেকে বীজ রেখে পরের বছর চাষ করতে পারে না। তাই প্রতিবছর বীজ কিনতে হয় ফলে কৃষকরা বীজের জন্য কোম্পানির উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে;
৪. হাইব্রিড বীজের বৈশিষ্ট্যগুলো খুবই অস্থায়ী হয়ে থাকে। তাই ফলন সম্পর্কে নিশ্চিতভাবে কিছু বলা যায় না।
৫. পোকামাকড় ও রোগবালাইয়ের আক্রমণ হাইব্রিড জাতে অত্যধিক বেশি।
৬. বীজের মূল্য অত্যন্ত বেশি যা গরীব কৃষকের ক্রয় ক্ষমতার বাইরে।
৭. হাইব্রিড জাতে অধিক পরিমাণে রাসায়নিক সার ও বালাইনাশক লাগে। অনেক ক্ষেত্রে বালাইনাশক দিয়েও পোকা দমন করা যায় না।
৮. বীজের ভেজাল হওয়ার সম্ভবনা বেশি থাকে তাই কৃষকরা প্রায়শঃই ক্ষতিগ্রস্থ হয়।
৯. একই জমিতে প্রথমবার বেশি ফলন দিলেও দ্বিতীয়/তৃতীয় বছর থেকে ফলন কমতে থাকে।
১০. হাইব্রিড ধানের ফসল উফশী ধানের তুলনায় ২০-৩০ শতাংশ বেশি দাবি করা হলেও এ বীজের মূল্য উফশী বীজের চেয়ে ১৫-২০ গুণ বেশি।
১১. দেশীয় হাইব্রিড বীজের উদ্ভাবন না করে এ ধরনের বিদেশী বীজ আমদানি এবং বাণিজ্যিক চাষাবাদের উদ্যোগ কৃষিক্ষেত্রে বিপর্যয় ডেকে আনবে।
১২. ধানের প্রচলিত অনেক হাইব্রিড জাতের গাছ খুবই নরম হয়। তাই একটু জোরে বৃষ্টি বা বাতাস হলে হেলে পড়ে। ফলে ব্যাপক ক্ষতি হয়।
১৩. ধানের প্রচলিত অনেক হাইব্রিড জাতে চিটার পরিমাণ অনেক ক্ষেত্রে ৫০ ভাগেরও বেশি এবং পাকা ধান ঝরে পড়ার হারও বেশি।
১৪. অন্যান্য ধানের তুলনায় এসব ধানে রাসায়নিক সার, বালাইনাশক ও শ্রমিকসহ উৎপাদন খরচ অনেক বেশি।
১৫. এসব ধানের জমিতে সব সময় পানি থাকতে হয়। অর্থাৎ সেচ বেশি লাগে এবং সেচ খরচও বেশি হয়।
১৬. এসব ধান কাঁচা অবস্থায় কেটে নিতে হয় কারণ নিচের ধান পাকতে পাকতে উপরের ধান ঝরতে শুরু করে।
১৭. এসব ধানের ভাতের স্বাদ কম। অনেক জাতের ভাত খুব আঠালো হয় এবং ঠাণ্ডা হওয়ার পর তা প্লাস্টিকের মতো হয়ে যায়।
১৮. বাজারে এসব ধানের চাহিদা ও বাজার মূল্যও কম।
পরিশেষে উল্লেখ্য যে, এ দেশে হাইব্রিড ধান প্রবর্তিত হয়েছে ১৯৯৮ সালে তৎকালীন মাননীয় কৃষিমন্ত্রী বেগম মতিয়া চৌধুরীর হাত দিয়ে যিনি কৃষক-বান্ধব মন্ত্রী হিসেবে পরিচিত। উপরোক্ত আলোচনা থেকে এই প্রশ্ন উঠা স্বাভাবিক যে, হাইব্রিড জাতের যেহেতু এতসব ক্ষতিকর দিক রয়েছে তা হলে মতিয়া চৌধুরীর মতো এমন একজন ব্যক্তি কেন হাইব্রিড জাত প্রবর্তন করলেন? এর পশ্চাতে প্রধান যে যুক্তিটি খুঁজে পাওয়া যায় তা হল বাংলাদেশের জনসংখ্যা দ্রæতহারে বাড়ছে আর তেমনি দ্রæতহারে কমছে ফসলি জমি। এমতাবস্থায়, দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে একক পরিমান জমিতে ফলন বৃদ্ধির কোন বিকল্প পথ খোলা নেই। হাইব্রিড জাত যেহেতু প্রচলিত উফশী জাতগুলো থেকে অধিক ফলনশীল তাই হাইব্রিড জাত প্রবর্তন করা যুক্তিযুক্ত হয়েছে। যুক্তিটি অবশ্যই প্রণিধানযোগ্য কারণ বেশকিছু সমস্যা ও সীমাবদ্ধতা থাকা সত্তে¡ও প্রযুক্তি হিসেবে এটি প্রবর্তন করা যে একেবারেই অগ্রহণযোগ্য তা নয়। তবে, কোন বাছ-বিচার ছাড়াই ঢালাওভারে এবং যে প্রক্রিয়ায় বিদেশী হাইব্রিড জাত প্রবর্তন করা হচ্ছে তা কখনই দেশের গোটা কৃষি ব্যবস্থা, ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষক, মাটি, পরিবেশ এমনকি খাদ্য নিরাপত্তার জন্যও যে কল্যাণকর নয় তা ইতোপূর্বেই আলোচনা করা হয়েছে। আমাদের খাদ্যশস্যের (প্রধানত দানাদার) উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য যদি হাইব্রিড জাত প্রবর্তন করতেই হয় তবে আমাদের নিজস্ব হাইব্রিড জাত আবিষ্কার করা উচিত। যদি সঠিক পরিকল্পনা ও কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয় এবং পর্যাপ্ত বিনিয়োগ করা হয় তবে আমাদের গবেষণা প্রতিষ্ঠানসমূহের পক্ষে হাইব্রিড জাত আবিষ্কার করা মোটেও অসম্ভব নয়। তবে, ধানের হাইব্রিড জাত যেহেতু মাটি থেকে অধিক পুষ্টি উপাদান গ্রহণ করে, বেশি সেচ লাগে এবং অনেক বেশি সংবেদনশীল তাই সারাদেশে ঢালাওভাবে হাইব্রিড জাত ছড়িয়ে না দিয়ে তা কেবল নিচু ও একফসলী বোরো ধানের জমিতে সীমাবদ্ধ রাখা উচিত।
জিএম বীজ
জিএম বীজ কি তা বুঝতে হলে প্রথমে জিন এবং ডিএনএ সম্পর্কে ধারণা থাকা প্রয়োজন। নিম্নে এ দুটি বিষয় সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোচনা করা হল।
১. জিন (Gene)
জিন হল বংশগতির ধারক ও বাহক। এই পৃথিবীতে হাজারো রকমের জীব অথচ কোন জীবের সাথে অন্য কোন জীবের হুবহু মিল নেই। একেকটি জীবের বৈশিষ্ট্য একেক রকম। এমনকি শুধু মানুষের কথা ধরা হলেও দেখা যাবে যে, একই বাবা মার সন্তানদের বৈশিষ্ট্যের মধ্যেও হুবহু মিল খুঁজে পাওয়া যায় না। জীবের এরূপ বৈশিষ্ট্য নিয়ন্ত্রণ করে জিন। প্রত্যেক জীবের দেহে থাকে কোষ; কোষে থাকে নিউক্লিয়াস; নিউক্লিয়াসে থাকে ক্রমোসোম; আর ক্রমোসোমে থাকে এই জীন।
২. ডিএনএ (DNA)
ডিএনএ থাকে জিনের মধ্যে র্অথাৎ জিন গঠিত হয় ডিএনএ দ্বারা। জিনের মধ্যে যে ডিএনএ থাকে তার গঠনের উপরই জীবের বৈশিষ্ট্য নির্ভর করে। কাজেই ডিএনএ-এর গঠনের পরিবর্তন করা হলে জীবের গঠনেরও পরিবর্তন ঘটে।
আজকাল এক বিশেষ ধরণের প্রযুক্তি ব্যবহার করে ডিএনএ-এর গঠনের পরিবর্তন ঘটিয়ে উদ্ভিদ ও প্রাণীর নতুন নতুন জাত তৈরি করা হচ্ছে। এই প্রযুক্তির নাম জৈব প্রযুক্তি বা জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং। জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং-এর মাধ্যমে ডিএনএ তথা জিনের গঠন পরিবর্তন করে যেসব নতুন জীব তৈরি করা হয় তাদের বলা হয় জিএমও (GMO=Genetically Modified Organism) এবং এভাবে যে উদ্ভিদ তৈরি করা হয় তাকে বলা হয় জিএম উদ্ভিদ এবং এসব উদ্ভিদ থেকে যে বীজ হয় তাকে জিএম [Genetically Modified (GM)] বীজ বলা হয়। জিএম বীজ উৎপাদনের ক্ষেত্রে অন্য প্রজাতির উদ্ভিদ এমনকি প্রাণীর ডিএনএ-এর অংশ বিশেষ কেটে এনে এক জটিল প্রক্রিয়ায় কাংখিত উদ্ভিদের দেহে ঢুকিয়ে তার জিনের স্বাভাবিক গঠনকে রূপান্তরিত করে জিএম উদ্ভিদ বা ফসল তৈরি করা হয়।
বিশ্বব্যাপী জিএম বীজের বিতর্ক
নানা কারণে জিএম শস্য আজ বিশ্বব্যাপী বিতর্কিত। জিএম শস্যের স্বাস্থ্য ও পরিবেশগত ঝুঁকি এবং খাদ্য নিরাপত্তা ও দরিদ্র কৃষকের বীজ নিরাপত্তার প্রশ্নে সারাবিশ্বের পরিবেশবাদী বিজ্ঞানীসহ সর্বস্তরের সচেতন মানুষ এর বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছেন। পাশাপাশি কোন জীবের জীনের গঠন পরিবর্তন করার নৈতিক ভিত্তি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন কেউ কেউ। কারণ, জিনের গঠনই জীবের বৈশিষ্ট্য নিয়ন্ত্রণ করে থাকে অর্থাৎ জিনের গঠনের ভিন্নতার কারণেই একটি জীব বা কোন উদ্ভিদ বা প্রাণীর একটি জাত স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের অধিকারী হয়। কাজেই, জিনের গঠনগত পরিবর্তন সাধন করার ফলে জীবের আসল বৈশিষ্ট্যই আর অক্ষুন্ন থাকে না। তা ছাড়া, জীনের গঠনের এরূপ পরিবর্তনের ফলে নতুন যে জাত তৈরি হয় তা আর সেই প্রজাতি থাকবে কি-না তাই প্রশ্ন সাপেক্ষ।
অন্যদিকে, জিনের গঠনের এরূপ রূপান্তরের ফলে পরিবেশ দূষণের বড় ধরণের ঝুঁকি থেকে যায়। তা ছাড়া, টার্মিনেটর প্রযুক্তি ব্যবহার করে এসব বীজকে বন্ধ্যা করে দেওয়া হয় যাতে কৃষকরা এরূপ বীজ একবারের বেশি ব্যবহার করতে না পারে। কাজেই জিএম বীজ-এর ব্যবহার বিশ্বের বিশেষ করে আমাদের মতো দরিদ্র দেশের কৃষি ব্যবস্থায় চরম বিপর্যয় ডেকে আনবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এসব বীজ ব্যবহার করে কৃষকেরা আপাতদৃষ্টিতে কিছুটা লাভবান হলেও নানাভাবে তারা ক্ষতিগ্রস্থ হবে।
অন্যদিকে, ক্রমবর্ধমান জনগোষ্ঠীর খাদ্য যোগানোর জন্য জিএম শস্য প্রবর্তনের কথা বলা হলেও এ পর্যন্ত এমন কোন জিএম জাত আবিষ্কৃত হয় নি যা ফলন বাড়াতে পারে। ভবিষ্যতেও এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে কোন উচ্চ ফলনশীল জাত আবিষ্কার করা যাবে কি-না সন্দেহ কারণ কোন ফসলের ফলন একক কোন জিন নিয়ন্ত্রণ করেনা। জিএম প্রযুক্তি ব্যবহার করে শুধু জাতের কিছু গুণাগুণের পরিবর্তন করা হয়। যেমনঃ বর্তমানে বাংলাদেশে জিএম প্রযুক্তি ব্যবহার করে লবণাক্ততা প্রতিরোধী, রোগ ও পোকা প্রতিরোধী জাত আবিস্কারের চেষ্টা করা হচ্ছে। সাধারণ শংকরায়নের মাধ্যমেও এসব গুণাবলী পাওয়া সম্ভব।
জিএম শস্যের স্বাস্থ্য ঝুঁকি সম্পর্কে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ‘জাতীয় বিজ্ঞান একাডেমি’র এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে, জিএম খাদ্য থেকে অপ্রত্যাশিত এলার্জি ও বিষাক্ততা সৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। পাশাপাশি পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য ও মাটিস্থ অনুজীবের উপর জিএম ফসলের সুদুরপ্রসারী ক্ষতিকর প্রভাব পড়বে। ২০০৩ সালে বৃটেনে দেশব্যাপী এক বিতর্কে অর্ধেকেরও বেশি মানুষ সেদেশে জিএম ফসল প্রবর্তন একেবারে নিষিদ্ধ করার পক্ষে মত দেয়। বাকি অর্ধেকের অধিকাংশই যথাযথ পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর জিএম ফসল প্রবর্তনের পক্ষে মত দেন।
২০০৩ সালে ভারতে ‘বিটি কটন’ নামক জিএম তুলার জাত প্রবর্তন করা হয়েছিল যা চাষ করে হাজার হাজার কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ ক্ষতির কষ্ট সহ্য করতে না পেরে অনেক কৃষক আতœহত্যার পথ বেছে নেয়। এটা ইতোমধ্যেই প্রমানিত যে, জিএম শস্য ফসলের স্থানীয় জাতগুলোতে কৌলিক দূষণ ঘটায়। ইটিসি গ্র“পের এক গবেষণায় দেখা গেছে যে, মেক্সিকোর স্থানীয় ভূট্টার মধ্যে মোনমান্টো কোম্পানি প্রবর্তিত জিএম ভূট্টার জিন পাওয়া গেছে যা ঐসব জাতের আদি বৈশিষ্ট্যগুলোকে নষ্ট করে দিয়েছে। কাজেই বাংলাদেশের মতো জীববৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ দেশের জন্য বিদেশী কোম্পানির জিএম শস্য প্রবর্তন নিঃসন্দেহে অত্যন্ত অবিবেচনাপ্রসূত কাজ হবে।
সর্বোপরি, জিএম বীজ কৃষক নিজেরা উৎপাদন ও সংরক্ষণ করতে পারবে না। ফলে, এসব বীজের ফসল চাষ করা হলে এখনও কৃষকের হাতে যেসব বীজ আছে সেগুলোও একসময় অবধারিতভাবেই হারিয়ে যাবে। বীজের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ চলে যাবে কোম্পানির হাতে। তখন, কৃষক কী ফসল চাষ করবে না করবে তা নির্ধারণ করবে কোম্পানি। একদা যে নীল চাষ করানোর জন্য ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে ভয়ভীতি প্রদর্শন ও অমানুষিক নির্যাতনের আশ্রয় নিতে হয়েছে নব্য ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে তা করতে মোটেও বেগ পেতে হবেনা। উদাহরণস্বরূপ তামাক ও ভূট্টা চাষের কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। এ দেশে যখন নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যশস্য উৎপাদনের জন্য জমি কমছে তখন তামাক চাষের জমি বেড়ে চলেছে। ধুমপান এবং তামাক চাষের নানারকম ক্ষতিকর প্রভাবের কথা আমরা সবাই জানি এমনকি কৃষক নিজেরাও জানে। তামাক চাষীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে যে, তামাক চাষ অত্যন্ত শ্রমসাধ্য, ব্যয়বহুল ও ঝুঁকিপূর্ণ, স্বাস্থ্যের ও পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর – এসবই তাঁদের জানা। তবুও তাঁরা তামাক চাষ করে কারণ তামাক চাষের সবচেয়ে বড় সুবিধা হল বাজারজাতকরণের নিশ্চয়তা। অর্থাৎ কোম্পানি কৃষকের উৎপাদিত সব তামাক ভাল দামে কিনে নেয় যে সুবিধা অন্যান্য ফসলের ক্ষেত্রে কৃষক পায় না। তা ছাড়া, কোম্পানি বীজ (যে বীজ কোন কৃষকের কাছে নেই) সার, বালাইনাশকসহ অন্যান্য উপকরণ কৃষককে সরবরাহ করে থাকে। কাজেই কৃষক তামাক চাষ করতে অধিক আগ্রহী। কোম্পানি যদি চায় এ দেশের অর্ধেক জমিতে শুধু তামাক চাষ হবে তবে তাই কৃষকরা করবে। এখন ভূট্টার কথা ধরা যাক। শিল্পোন্নত দেশগুলো ইদানিং ভূট্টা থেকে গাড়ির জন্য জ্বালানি তৈরি করছে। এখন যদি কোম্পানি এ দেশের কৃষকদেরকে দেখায় যে, ভ‚ট্টা চাষ অন্য সকল ফসল থেকে বেশি লাভজনক। তা ছাড়া, কোম্পানি ভূট্টা চাষের জন্য অতি উচ্চফলনশীল বীজ দিবে যা ঐ কোম্পানি ছাড়া অন্য কারও কাছে নেই। এছাড়া, রাসায়নিক সার, বালাইনাশক ইত্যাদি উপকরণগুলোও কোম্পানি সরবরাহ করবে এবং প্রয়োজনে কৃষককে স্বল্পসুদে বা বিনাসুদে ঋণও দিবে। এবং সর্বোপরি ভাল দামে সেই ভ‚ট্টা কৃষকের কাছ থেকে কোম্পানি কিনে নিবে। এমতাবস্থায়, সব ফসল ফেলে কৃষক যে ভ‚ট্টা চাষের দিকে ঝুঁকবে তাতে সন্দেহের কোন অবকাশ নেই।
যাহোক, যেসব কারণে জিএম বীজ নিয়ে সারা বিশ্বে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে তা নিন্মে তুলে ধরা হল।
যেসব কারণে জিএম বীজ বিতর্কিত
১. জিএম বীজের রূপান্তরিত জিনের প্রভাবে মাটির অনুজীব, মানুষ এবং প্রাণীদেহে এন্টিবায়োটিক রেজিস্টান্স সৃষ্টি হয়।
২. জিএম শস্যের প্রভাবে জীবদেহে নানারকম অপ্রত্যাশিত ও অনাকাঙ্খিত বৈশিষ্ট্য জন্ম নিতে পারে।
৩. জিএম খাদ্য মানুষ ও প্রাণিদেহে বিষাক্ত দ্রব্য তৈরি করে এবং এলার্জির লক্ষণ দেখা যায়।
৪. জিএম ফসলের ফুলের রেণু আশেপাশের অন্য ফসলে গিয়ে পড়লে তার কৌলিক বৈশিষ্ট্য নষ্ট হয়ে যেতে পারে।
৫. এসব ফসল প্রাকৃতিক ইকো-সিস্টেম, পরিবেশ এবং জীববৈচিত্র্যের জন্য হুমকিস্বরূপ।
৬. এসব ফসল অতিমাত্রায় ব্যয়বহুল প্রযুক্তিনির্ভর।
৭. এ পর্যন্ত এমন কোন জিএম জাত আবিষ্কৃত হয় নি যা ফলন বাড়াতে পারে। জিএম প্রযুক্তি ব্যবহার করে শুধু জাতের কিছু গুণাগুণের পরিবর্তন করা হয়।
৮. এসব ফসলের ক্ষতিকর প্রভাব, অনিশ্চয়তা ও ঝুঁকিসমূহ পরীক্ষা না করেই বাজারজাত করা হচ্ছে।
৯. জিএম প্রযুক্তির একচ্ছত্র মলিক গুটিকয় বহুজাতিক কোম্পানি। ফলে, সারা বিশ্বের খাদ্য নিরাপত্তা গুটিকয়েক কোম্পানির হাতে জিম্মি হয়ে পড়বে।
১০. জিএম বীজ প্যাটেন্টকৃত হওয়ায় তা উচ্চমূল্যের হয়ে থাকে যা তৃতীয় বিশ্বের দরিদ্র কৃষকদের ক্রয় ক্ষমতার মধ্যে থাকবে তার কোন নিশ্চয়তা নেই।
১১. জিএমও-র দূষণ একবার পরিবেশে ছড়িয়ে পড়লে তা রোধ করা খুব কঠিন হয়ে পড়বে।
জিএম ও প্যাটেন্ট বিতর্ক
বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার ট্রিপস চুক্তি অনুযায়ী জিএম জাত প্যাটেন্টযোগ্য। পূর্বেই আলোচিত হয়েছে যে, বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার ট্রিপস চুক্তির প্যাটেন্ট আইনের আর্টিকেল ২৭.৩ (বি) ধারা এবং উপোভ চুক্তিতে নতুন উদ্ভাবিত জাতের উপর বাণিজ্যিক প্রজননবিদদের একচ্ছত্র মালিকানা লাভের অধিকার দেওয়া হয়েছে যা আমাদের সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্য ও কৌলিক সম্পদের (জেনেটিক রিসোর্স) উপর বহুজাতিক কোম্পানির একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পথকে সুগম করছে। এরূপ প্যাটেন্ট কৃষক এবং রাষ্ট্রীয় গবেষণা প্রতিষ্ঠানসমূহের প্রজননবিদদের জন্য বীজ ও কৌলিক সম্পদের সহজপ্রাপ্যতাকে বাধাগ্রস্ত করবে। কারণ এই প্যাটেন্ট আইন বীজ সম্পদের উপর কোম্পানির একক মালিকানা ও একচেটিয়া বাণিজ্যের গ্যারান্টি দেয়। ফলে বীজের মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে কোন প্রতিযোগিতার সুযোগ না থাকায় বীজের মূল্য সাধারণ কৃষকের ক্রয় ক্ষমতার মধ্যে থাকবে তার কোন নিশ্চয়তা নেই। অথচ কৃষক এসব বীজ থেকে নিজেরা বীজ উৎপাদন ও সংরক্ষণ করতে পারবে না বিধায় প্রতিবছর কোম্পানির কাছ থেকেই বীজ কিনতে বাধ্য হবে।
বিশ্বব্যাপী জিএম শস্য প্রতিরোধ সংগ্রাম
আজ সারা বিশ্বেই জিএম ফসল প্রবর্তন প্রতিরোধের জন্য সংগ্রাম চলছে। জিএম ফসল প্রবর্তক বহুজাতিক কোম্পানির বিরুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক, ভোক্তা ও সচেতন নাগরিক সমাজ কর্তৃক বিক্ষোভ প্রদর্শন, প্রতিরোধ আন্দোলন ক্রমেই তীব্রতর হচ্ছে। স¤প্রতি শুধুমাত্র বৃটেনেই জিএম ফসল ধ্বংস ও পুড়িয়ে ফেলার মতো ঘটনা ঘটেছে ৩০০ টিরও বেশি। কিন্তু বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর প্রভাব এতটাই যে, তাদের টিকিটি স্পর্শ করার ক্ষমতা বিশ্বের বেশিরভাগ সরকারেরও নেই। তাই এত বিতর্ক, এত প্রতিবাদ সত্বেও আইন করে জিএম শস্য প্রবর্তন রোধ করতে আগ্রহী নয় অনেকেই। কারণটাও খুবই সুস্পষ্ট। মার্কিন কোম্পানি মোনসান্টো একাই নিয়ন্ত্রণ করছে বিশ্বের প্রায় ৯১% জিএম বীজের বাজার। তবুও আশার কথা এই যে, জনতার শক্তি ও জনপ্রতিরোধের মুখে আজ হউক কাল হউক সকল শক্তিই পরাভূত হয়। যেমন, ১৯৯৪ সালে মোনসান্টো ‘ফ্ল্যাভার সেভার’ নামক একটি জিএম টম্যাটোর জাত বাজারজাত করে যা দীর্ঘদিন যাবৎ রেখে দিলেও পঁচন ধরেনা। কিন্তু এর ক্ষতিকর প্রভাবের কারণে ভোক্তাদের প্রতিবাদের মুখে ১৯৯৬ সালে এ জাতের উৎপাদন বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়। কাজেই, কৃষকের বীজের অধিকার প্রতিষ্ঠা, দেশের জীববৈচিত্র্য ও কৌলিক সম্পদ রক্ষা এবং এ দেশের কৃষি ব্যবস্থার আশু বিপর্যয় রোধে সময় থাকতে সোচ্চার হওয়া জরুরী। এ ব্যাপারে কৃষক এবং সচেতন মহলের সোচ্চার ও জোড়ালো ভূমিকা গ্রহণ এখন সময়ের দাবী।
বাংলাদেশে জিএম বীজ প্রবর্তন ও ‘গোল্ডেন রাইস’ বিতর্ক
বাংলাদেশে বৈধভাবে এখনও কোন জিএম শস্য প্রবর্তিত হয় নি। তবে, অবৈধভাবে কোন জিএম বীজ বাংলাদেশে ইতোমধ্যে প্রবেশ করেছে কি-না তা বলা মুশকিল। কারণ, বাংলাদেশ বিভিন্ন ফসলের বিশেষ করে শাক-সব্জির প্রচুর বীজ বাইরে থেকে ঢুকছে। এসব বীজের সাথে কোন জিএম বীজ ঢুকছে কি-না এবং তা যথাযথভাবে রোধ করা হচ্ছে কি-না তা নিয়ে সংশয়ের অবকাশ রয়েছে। তবে, কোন জিএম খাদ্য যে বাংলাদেশে প্রবেশ করছেনা তা নির্দ্বিধায় বলা সম্ভব নয়।
যাহোক, সম্প্রতি দেশে জিএম ধান “গোল্ডেন রাইস” প্রবর্তনের জন্য আন্তর্জাতিক ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ইরি) ও বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) যৌথভাবে একটি গবেষেণা কার্যক্রম পরিচালনা করছে। আমরা জানি যে, ধানে ভিটামিন-এ খুব একটা থাকেনা। ভিটামিন-এ এর ধারক হল বিটা কেরোটিন। সবুজ শাক-সব্জি ও হলুদ ফলমূলে প্রচুর পরিমানে এই বিটা কেরোটিন বা ভিটামিন-এ থাকে। ডেফোডিল নামক ফুলেও এই বিটা কেরোটিন থাকে। কোন উদ্ভিদে এই বিটা কেরোটিন থাকবে কি থাকবেনা তা নিয়ন্ত্রণ করে নির্দিষ্ট এক জিন। ডেফোডিল ফুলের বিটা কেরোটিন নিয়ন্ত্রণকারী এই জিনের ডিএনএ’র নির্দিষ্ট অংশ কেটে নিয়ে ধানের কোন জাতের জিনের মধ্যে সেই অংশটি ঢুকিয়ে দিয়ে এই নতুন একটি জাত সৃষ্টি করা হয় যার নাম দেওয়া হয়েছে গোল্ডেন রাইস। গবেষেণাকর্মটি পরিচালিত হচ্ছে বহজাতিক কোম্পানি সিনজেন্টার টাকায় ইরির মাধ্যমে। সামনে ইরি পেছনে সিনজেন্টা। এ দেশের মানুষের ভিটামিনের অভাব দূর করে অন্ধত্বের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য সিনজেন্টার যেন ঘুম হারাম। আমরা বেশি ভাত খাই বলে ধানের মধ্যে ভিটামিন-এ ঢুকিয়ে আমাদের ভিটামিনের অভাব দূর করার এক হাস্যকর যুক্তি দেখিয়ে এই গোল্ডেন রাইস তৈরি করা হচ্ছে। গোল্ডেন রাইসের ভাত খেয়ে যদি ভিটামিন-এ এর অভাব দূর করতে হয় তবে একজন পূর্ণবয়স্ক মহিলার প্রতিদিন ৭.৫ কেজি ভাত খেতে হবে তাও যদি শরীর সবটা হজম করতে পারে। প্রতি ১০০ গ্রাম গোল্ডেন রাইস থেকে মাত্র ৩০ মাইক্রোগ্রাম বিটাক্যারোটিন বা ভিটামিন-এ পাওয়া যাবে। অথচ, আমাদের দেশী জাতের লাল চালে এর চেয়ে আনেক বেশি বিটাক্যারোটিন আছে যেসব ধান আজ বিলুপ্তির পথে। বনে-বাদাড়ে অবহেলায় পড়ে থাকা ১০০ গ্রাম হেলেঞ্চা শাকে ১৩৭০০ মাইক্রোগ্রাম, থানকুনি শাকে ১৩১০০ মাইক্রোগ্রাম, কলমী শাকে ১০৭৪০ মাইক্রোগ্রাম, কালোকচু শাকে ১২০০০ মাইক্রোগ্রাম এবং সবুজকচু শাকে ১০২৭৮ মাইক্রোগ্রাম বিটাক্যারোটিন আছে। যেসব গ্রামীণ দরিদ্র জনগোষ্ঠীর কথা চিন্তা করে গোল্ডেন রাইস তৈরি করা হচ্ছে তাদের আশেপাশে ভিটামিন-এ সমৃদ্ধ এমন অসংখ্য খাদ্যবস্তু রয়েছে যা নিতান্ত অসচেতনতার জন্য তারা খায়না। এজন্য সবার আগে প্রয়োজন ছিল সচেতনতা সৃষ্টির উপর সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া। তা না করে বাংলাদেশের সবচেয়ে বেশি ফলনশীল জাত ব্রিধান-২৯(কৃষকের মাঠে যার ফলন অনেক ক্ষেত্রে হাইব্রিডের ফলনকেও ছাড়িয়ে গেছে)-কে জিএম ধানে রুপান্তরের চেষ্টা চলছে যা কোম্পানি পেটেন্ট করে নিতে পারবে। কারণ, এই ‘গোল্ডেন রাইস’ প্রযুক্তি কোম্পানির প্যাটেন্ট করা। যদিও বলা হচ্ছে যে, এই গোল্ডেন রাইস মানব কল্যাণে সিনজেন্টার দান তাই এটি প্যাটেন্ট করা হবেনা।
অন্যদিকে, দেশে চারটি জেনেটিক্যালি মডিফাইড (জিএম) শস্য প্রবর্তনের জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের করনেল ইউনিভার্সিটি এবং মার্কিন দাতা সংস্থা ইউএসএআইডি (USAID=United States Agency for International Development)-এর সাথে বাংলাদেশ সরকারের একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে এবং গবেষণা কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে। এই গবেষণার উদ্দেশ্য হল, ফল ও ডগা ছিদ্রকারী পোকা প্রতিরোধী বেগুন ও মটর, লেইট বøাইট রোগ প্রতিরোধী গোলআলু এবং লবণাক্ততা প্রতিরোধী ধানের জিএম জাত উদ্ভাবন করা। সন্দেহ নেই যে, উল্লেখিত বৈশিষ্ট্যের জাত আবিষ্কার করা আমাদের জন্য খুবই দরকারী। তবে তা জিএম প্রযুক্তি ব্যবহার করেই করতে হবে তা বোধহয় ঠিক নয়। কারণ, সাধারণ শংকরায়ন বা মিউটেশন প্রযুক্তি ব্যবহার করেও এমন জাত আবিষ্কার করা সম্ভব। তা ছাড়া, এসব নতুন আবিষ্কৃত জাতের মালিকানার ব্যাপারে চুক্তিতে কি ধরণের শর্ত রয়েছে তা সুস্পষ্ট নয়। এখানে প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ্য যে, একদা ‘বন্ধাকরণ’ প্রক্রিয়ায় পোকামাকড় দমনের জন্য একটি কার্যকর পদ্ধতি আবিষ্কৃত হয়েছিল যা উৎপাদন ও বাজারজাতকরণের জন্য কোন কোম্পানিই আগ্রহ দেখায়নি। কারণ একটাই, এখানে মুনাফা অর্জনের সুযোগ ছিল কম। সুতরাং কোম্পানি পৃথিবীর ক্ষুধার্ত মানুষের খাদ্য নিরাপত্তার জন্য গলদঘর্ম হবে – এমনটা ভাবা আর বোকার স্বর্গে বাস করা একই কথা। বরং ক্ষুধা নিয়ে বাণিজ্য করাই যে কোম্পানির প্রধান লক্ষ্য এতে সন্দেহের কোনই অবকাশ নেই। কাজেই কোম্পানির মোটা অংকের বেতনভোগী দেশী-বিদেশী গবেষক-বিজ্ঞানীদের চটকদার যুক্তিতে ভুলে জিএম শস্য প্রবর্তনের সিদ্ধান্ত হবে একেবারেই আতœঘাতী। কারণ, আমাদের এখনও যেসব নীতি আছে তাতে জিএম বীজ এ দেশে ঢুকতে পারেনা। কাজেই, বহুজাতিক কোম্পানি ও তাদের দেশী-বিদেশী এজেন্টরা আজ উঠে-পড়ে লেগেছে যাতে বাংলাদেশ জিএম শস্য প্রবর্তনের জন্য আশু উদ্যোগ গ্রহণ করে। এজন্য একদিকে রয়েছে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা কর্তৃক কার্যকর সুই জেনেরিস সিস্টেম হিসেবে উপভ চুক্তি গ্রহণের চাপ আর অন্যদিকে রয়েছে উপরোল্লেখিত গবেষণার মাধ্যমে দেশে জিএম শস্য প্রবর্তনের গবেষণা পর্যায়ের উদ্যোগ। এসব গবেষণার ফলাফল যাই হোক না কেন বহুজাতিক কোম্পানি বা তাদের এজেন্টদের উপরোল্লেখিত বিনিয়োগের আসল উদ্দেশ্য যে বাংলাদেশের বাজারে তাদের জিএম প্রযুক্তি প্রবেশের পথ পরিষ্কার করা তাতে বোধহয় সন্দেহের অবকাশ নেই।
কৃষির যেকোন নীতি এখন আর দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার সদস্য হওয়ার ফলে স্বাধীনভাবে নীতি প্রণয়ের সুযোগ এখন সীমিত। কিন্তু তবুও আমাদের স্বার্থবিরোধি কোন অন্যায় নীতি যাতে আমাদের উপর চেপে না বসে তা প্রতিরোধ ও তার জন্য দরকষাকষি করার সুয়োগ এখনও আমাদের রয়েছে। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় এই যে, আমাদের বীজ নীতিতে এ দেশের বাজারে বহুজাতিক কোম্পানির অবাধ অনুপ্রবেশকে উৎসাহিত করা হয়েছে।
ইতিপূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ১৯৯৮ সালে তৎকালীন সরকার কর্তৃক গঠিত একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি “প্ল্যান্ট ভ্যারাইটি অ্যাক্ট অব বাংলাদেশ” নামক একটি বিধিমালা প্রস্তাব করে যাতে এ দেশে জিএম শস্যের অনুপ্রবেশ রোধে সুস্পষ্ট বিধান রাখা হয়েছে। এই বিধিতে বলা হয়েছে যে, যদি কোন জাত জেনেটিক ও সাংস্কৃতিক দুষণ ঘটায় তবে তা সংরক্ষণ করা যাবেনা। কিস্তু প্রস্তাবিত এই আইনটি কার্যকর করার কোন উদ্যোগ লক্ষ করা যাচ্ছেনা। এর প্রধান কারণ, এ দেশে জিএম বীজ প্রবর্তনের জন্য অনুক‚ল নীতি গ্রহণের জন্য বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা, বিভিন্ন দাতা সংস্থা ও দেশ এবং তাদের বহুজাতিক কোম্পানিগুলো আমাদের নীতি নির্ধারক মহলের উপর নানাভাবে প্রভাব বিস্তার ও চাপ সৃষ্টি করে চলেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপিয়ান ইউনিয়নসহ বিভিন্ন দাতা দেশ ও সংস্থাগুলো ক্রমাগত চাপ দিয়ে যাচ্ছে যাতে বাংলাদেশ বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার ট্রিপস চুক্তিতে বর্ণিত “সুই জেনেরিস সিস্টেম” হিসেবে “উপভ” গ্রহণ করে।
আজ থেকে প্রায় চলিশ বছর আগে উচ্চফলনশীল জাত উদ্ভাবন এবং সেচ, রাসায়নিক সার ও বালাইনাশক খাতে ব্যাপক বিনিয়োগের ম্যাধমে পৃথিবীর দক্ষিণ ভূখণ্ডে তথাকথিত যে ‘সবুজ বিপ্লব’ সূচীত হয়েছিল জিএম-ফসল তাতে নতুন সংযোজন। আজ বিশ্বনেতৃবৃন্দ ও কৃষি ব্যবসায়ী মহল কৃষির সকল সমস্যা সমাধান, বিশ্ব থেকে ক্ষুধা ও দারিদ্র দূরীকরণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কৃষি বিপ্লবের দ্বিতীয় ধাপ হিসেবে জৈব প্রযুক্তি প্রয়োগের প্রয়াস পাচ্ছেন। কিছু মুনাফালোভী বহুজাতিক কোম্পানির নিয়ন্ত্রণাধীন নানাবিধ ক্ষতিকারক রাসায়নিক উপকরণের উপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল এমন অস্থায়িত্বশীল কৃষি প্রযুক্তির দ্বারা কৃষির বর্তমান অবস্থায় স্থায়িত্বশীল উন্নয়ন কতটা সম্ভব তা বর্তমানে পরিবেশ ও মানবতাবাদী কৃষি বিজ্ঞানী এবং সচেতন মহলের কাছে এক বিরাট প্রশ্ন হয়ে দেখা দিয়েছে।
এটা অনস্বীকার্য যে, বর্তমান বিশ্বের বিপুল সংখ্যক নিরন্ন মানুষের খাদ্যের যোগান দেওয়া কৃষিখাতের জন্য এক বিরাট চ্যালেঞ্জ হয়ে দাড়িয়েছে। এ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় প্রয়োজন কৃষকনির্ভর একটি স্থায়িত্বশীল কৃষি ব্যবস্থা। অথচ আর্তমানবতার এরূপ সংকটকে পুঁজি করে জনগোষ্ঠীর স্বার্থ, কৃষকের অধিকার, পরিবেশের ভারসাম্য, জীববৈচিত্র্য ও ইকোসিস্টেম সংরক্ষণ ইত্যাদি অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোকে উপেক্ষা করে একদল অর্থলোভী তথাকথিত বিজ্ঞানী অর্থের বিনিময়ে নিজেদেরকে বিভিন্ন বহুজাতিক কোম্পানির কাছে বিক্রি করে দিয়ে কোম্পানির ফরমায়েশে এমন ধরণের কৃষি প্রযুক্তি উদ্ভাবন করছেন যাতে কোম্পানির একচেটিয়া ব্যবসা নিশ্চিত হয়। এজন্য শুধু প্রযুক্তির চটকদার কারিশমায় না ভুলে প্রযুক্তির পশ্চাতের মানুষ এবং তাদের উদ্দেশ্য সম্পর্কে সতর্ক হওয়া জরুরী। কারণ, যেকোন প্রযুক্তিরই ভাল-মন্দ দুটো দিকই থাকে যা হাইব্রিড ও জিএম প্রযুক্তির ক্ষেত্রেও আছে নিঃসন্দেহে। কোন প্রযুক্তি মানুষের কল্যাণে ব্যবহৃত হবে, না ধ্বংসাতœক কাজে ব্যবহৃত হবে তা নির্ভর করে কে কোন উদ্দেশ্যে সে প্রযুক্তিটি ব্যবহার করছে। হাইব্রিডাইজেশন এবং জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং নিঃসন্দেহে বৈজ্ঞানিক অগ্রযাত্রায় যুগান্তকারী সংযোজন। কিন্তু এই প্রযুক্তিগুলো যেভাবে গুটিকতক দৈত্যসম বহুজাতিক কোম্পানির কুক্ষিগত হয়ে যাচ্ছে তা বাংলাদেশের মত দরিদ্র দেশের দরিদ্রতর কৃষকদের জন্য ভয়াবহ বিপদের কারণ হয়ে দাড়াতে পারে। কাজেই প্রযুক্তির এরূপ কুক্ষিগত হওয়ার বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া যেমন জরুরী তেমনি জরুরী ঢালাওভাবে এসব প্রযুক্তি আমদানি না করে নিজেদের সক্ষমতা বৃদ্ধির দিকে অধিকতর নজর দেওয়া।
প্রকৃতপক্ষে, তড়িঘড়ি করে ঢালাওভাবে বিদেশি বহুজাতিক কোম্পানির হাইব্রিড ও জিএম ফসলের প্রবর্তন আমাদের জন্য একেবারেই অপরিহার্য নয়। তদুপরি, আমাদের নিজস্ব হাইব্রিড ও জিএম ফসল উদ্ভাবনের সম্ভাবনাও রয়েছে। এজন্য আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি এবং বর্তমান কৃষি ব্যবস্থার আমূল সংস্কার প্রয়োজন। এজন্য আমাদের স্বীকার করতে হবে যে, দেশের ক্ষুধার্ত মানুষের জন্য নিরাপদ ও পুষ্টিসম্পন্ন খাদ্য উৎপাদনে গত কয়েক দশক যাবৎ আমাদের প্রচেষ্টা একটি চরম ভুল পথে পরিচালিত হয়েছে যার ফলে আমাদের নিজস্ব একটি সমন্বিত ও স্থায়িত্বশীল কৃষি ব্যবস্থা গড়ে উঠতে পারেনি। আজ আমরা জোর গলায় খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের কথা বলি অথচ, দেশের অর্ধেকেরও বেশি জনগোষ্ঠী তাদের প্রয়োজনীয় ক্যালরি থেকে বঞ্চিত। বিষাক্ত খাদ্য আমাদেরকে নীরব ঘাতকের মত ক্রমান্বয়ে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে। আমাদের সমস্যা ও চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আমরা কেবল বিদেশী সাহায্য ও প্রযুক্তির মুখাপেক্ষি হয়ে থেকেছি। এ দেশের মাটি, পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য, আর্থ-সামাজিক অবস্থা, কৃষ্টি ও সংস্কৃতির সাথে একাত্ম হয়ে উঠে এমন লাগসই প্রযুক্তি উদ্ভাবনে আমাদের মনোযোগ ছিল চরম হতাশাব্যঞ্জক। এখনও যদি আমাদের বোধোদয় হয় তবে এ মুহূর্তে করণীয় হবে-
১. ভোক্তা, কৃষক, ব্যবসায়ী, নীতি নির্ধারক, সুশীল সমাজসহ সকলকে কৃষিতে বহুজাতিক কোম্পানির হাইব্রিড ও জিএম বীজ ব্যবহারের ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন হওয়া।
২. রাষ্ট্রীয় গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোতে বিদেশী সাহায্য এবং বহুজাতিক কোম্পানির টাকায় পরিচালিত গবেষণা নয়, সম্পূর্ণ নিজস্ব অর্থায়নে জনকল্যাণমুখি, স্থায়িত্বশীল ও লাগসই প্রযুক্তি উদ্ভাবনের জন্য গবেষণা কর্মকাণ্ড জোরদার করা।
৩. কৃষকদেরকে তাদের নিজস্ব বীজ এবং স্থানীয় জাত সংরক্ষণে উদ্যোগী করে তোলা এবং বীজ উৎপাদন ও সংরক্ষণে তাদের নিজস্ব ব্যবস্থা গড়ে তুলতে প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান করা।
৪. পরিবেশগত ও স্বাস্থ্য ঝুঁকি সম্পর্কে পর্যাপ্ত পরীক্ষা-নীরিক্ষা ছাড়া এ দেশের কৃষিতে বিদেশী হাইব্রিড ও জিএম বীজের ঢালাও প্রবর্তন বন্ধ করা।
৫. বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার চুক্তি থেকে কৃষিকে বাদ দেওয়া এবং ট্রিপস চুক্তি থেকে জীবের উপর প্যাটেন্ট বাতিল করার জন্য উন্নয়নশীল ও স্বল্পোন্নত দেশসমূহের আন্দোলনের সাথে সম্পৃক্ত হওয়া।
বীজ ছাড়া ফসল উৎপাদন সম্ভব নয়। কাজেই বীজের নিয়ন্ত্রণ যদি কোম্পানির হাতে চলে যায় তবে আমাদের কৃষি এবং খাদ্য নিরাপত্তা দুটোই চলে যাবে কোম্পানির একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণে। কোম্পানি থেকে বীজ পেলে আমাদের চাষাবাদ হবে এবং পেটের ভাত জুটবে, অন্যথায় নয়। এরূপ অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ নিশ্চয় আমাদের কাম্য নয়। যদি তাই হয় তবে এখনই সময় এই বহুজাতিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া; প্রয়োজন রুখে দাঁড়ানোর। কোম্পানির প্রযুক্তি ব্যবহার না করলে যদি আমাদের আহার না জুটে তবে না খেয়ে মরাও ঢের ভাল।
বর্তমান বাণিজ্যিক বিশ্বায়নের ফলে মানুষের সকল মৌলিক অধিকারগুলোও কোম্পানির হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে। আজ আামাদের খাওয়া-পরা, সুস্থভাবে বেঁচে থাকা, শিক্ষা ও অন্যান্য সেবা সবই নিশ্চিত করবে কোম্পানি এবং তা করবে অবশ্যই অর্থের বিনিমিয়ে। কাজেই অবস্থা এমন দাড়াবে যে, অর্থ আছে তো বাঁচো, র্অথ নেই তো মরো। আমরা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসন-শোষণ দেখেছি। আমরা দেখেছি কৃত্রিমভাবে দুর্ভিক্ষ সৃষ্টি করে দুহাতে মুনাফা লুটতে। একথা বলার অপেক্ষা রাখেনা যে, মুনাফা যেখানে মুখ্য মানবতা সেখানে উপেক্ষিত। আজ নতুন করে ফিরে আসছে নব্য ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসন। সুতরাং সময় থাকতে আমাদেরকে সাবধান হতে হবে।
Mar 30, 2025 | প্রকৃতি কথা
নয়াউদারনীতির বাজার অর্থনীতির গ্যারাকলে পড়ে এ দেশের কৃষির উপর কৃষকের নিয়ন্ত্রণ ক্রমেই শিথিল হচ্ছে। ক্রমেই এ নিয়ন্ত্রণ চলে যাচ্ছে বাজার নিয়ন্তাদের হাতে যেখানে কৃষকের কোন স্থান নেই। অথচ একসময় কৃষি ছিল সম্পূর্ণভাবে কৃষকের নিয়ন্ত্রণাধীন। ১৯৫০ সালের দিকে জমিদারদের হাত থেকে কৃষক তার জমির মালিকানা পুণরায় ফিরে পাওয়ার পর থেকে কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থা আবারও কৃষকের নিয়ন্ত্রণাধীনে আসে। কিন্তু মাত্র এক দশকের মাথাতেই অর্থাৎ ষাটের দশকের গোড়ার দিকে শুরু হওয়া ‘সবুজ বিপ্লব’ কৃষি ব্যবস্থাকে আবারও কৃষকের কব্জা থেকে বাজারে তুলে এনেছে। কৃষি এখন বাণিজ্যের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সেক্টর। কৃষকের স্থায়িত্বশীল কৃষি ব্যবস্থাকে ‘মান্ধাতার আমলের’ আখ্যা দিয়ে গবেষণা ও উন্নয়নের নামে সবুজ বিপ্লবের স্রোতধারায় যে ভাঙ্গন শুরু হয়েছিল তা আজ কৃষকের জীবন ব্যবস্থাকেই বিপর্যস্ত করে দিয়েছে। আর এ বিপর্যয়ের সূচনা হয়েছিল বীজের মাধ্যমেই।
বীজের নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নটি তাই এ দেশের কৃষক ও হাজার বছরের ঐতিহ্যবাহী স্বনির্ভর কৃষির অস্তিত্বের জন্য এক মারাত্মক হুমকি হয়ে দেখা দিয়েছে। কৃষিপ্রধান এ দেশের বীজের বিশাল বাজার দখলের সুদুরপ্রসারী লক্ষ্য নিয়ে বহুজাতিক কোম্পানিগুলো প্রবর্তন করছে হাইব্রিড ও জেনিটিক্যালি মডিফায়েড (জিএম) বীজ। কোম্পানির প্যাটেন্ট করা এসব বীজ কৃষক নিজেরা উৎপাদন ও সংরক্ষণ করতে পারবে না। অন্যদিকে, এসব বীজের ফসল চাষ করলে এখনও কৃষকের হাতে যেসব বীজ আছে একসময় অবধারিতভাবে সেগুলোও হারিয়ে যাবে। এতে করে শুধু কৃষক নয় দেশের গোটা কৃষি ব্যবস্থাই জিম্মি হয়ে পড়বে বহুজাতিক কোম্পানির উপর যা প্রকারান্তরে এ দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকেও মারাত্মক হুমকির মধ্যে ফেলে দিবে।
বাংলাদেশ জীববৈচিত্র্যে অত্যন্ত সমৃদ্ধশালী একটি দেশ। হাজারো জাতের ফসল, পশুপাখি, গাছপালা অতুলনীয় সমৃদ্ধি দান করেছে এ দেশের জীববৈচিত্র্যকে। উফশী ধানের ক্রমবর্ধমান চাষ আমাদের ফসল বৈচিত্র্যকে ধ্বংস করছে। আগের দিনের সুগন্ধি আতপ চালের পোলাও, নানা ধরণের পিঠা-পায়েস, শালি ধানের চিড়ে, বিন্নি ধানের খৈ ইত্যাদি মিলে আমাদের ছিল বিচিত্র খাদ্যাভ্যাস। এসবই এখন অতীত। একসময় বাঙালীর ঘরে ঘরে ছিল ‘বারো মাসে তের পার্বন’। বিশেষ জাতের ধানের চিড়া, মুড়ি, খৈ, পিঠা-পায়েস ছিল এসব পার্বনের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। ধানের উৎপাদন বাড়াতে গিয়ে আজ এসবই আমরা হারিয়েছি। অন্যদিকে, ধানের ফলন ও উৎপাদন বাড়লেও ডাল জাতীয়, তেল জাতীয়, মসলা জাতীয় ফসল এবং শাক-সব্জির উৎপাদন কমেছে যা আমাদের পুষ্টি চাহিদা পূরণে অত্যাবশ্যকীয়। আমাদের দেশী জাতগুলো আমাদের পরিবেশের সাথে খাপ খেয়ে বেড়ে উঠতো। পরিবেশের বর্তমান বিপর্যয় বহিরাগত জাত চাষ করার দীর্ঘমেয়াদি ফল। আমাদের এ সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্য ও ফসলবৈচিত্র্য আজ বিলুপ্তির পথে। এই ফসলবৈচিত্র্যের ধারক ও বাহক যে বীজ সে বীজ সম্পদের কোন সঠিক হিসাব আজ পর্যন্ত করা হয় নি।
বীজ সম্পদের উপর বহুজাতিক কোম্পানির নিয়ন্ত্রণ
বহুজাতিক কোম্পানির বীজ বাণিজ্যের ইতিহাস বেশি পুরনো নয়। ১৯৩৫ সালে নরিন-১০বি জাতের উচ্চফলনশীল গম বীজ প্রবর্তনের মাধ্যমে কোম্পানির বীজ বাণিজ্যের সূচনা হয়। এসময় গবেষণা ও উন্নয়নের নামে সারা বিশ্বের কৃষি বাণিজ্যকে গ্রাস করার জন্য মরিয়া হয়ে উঠে বহুজাতিক কোম্পানিগুলো। অন্যদিকে, যেহেতু এশিয়া মহাদেশের অধিকাংশ দেশের অন্যতম প্রধান ফসল ধান তাই এশিয়ার কৃষির উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে মার্কিনী প্রতিষ্ঠান রকফেলার এন্ড ফোর্ড ফাউন্ডেশন ১৯৬০ সালে ফিলিপাইনে প্রতিষ্ঠা করে আন্তর্জাতিক ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ইরি)। এটা ছিল সবুজ বিপ্লবের সূচনা পর্ব যা বহুজাতিক কোম্পানির জন্য খুলে দেয় বীজ, কৃষি রাসায়নিক দ্রব্যাদি এবং কৃষি যন্ত্রপাতির বাণিজ্যের অপার সম্ভাবনার দ্বার।
১৯৭০-এর দশক জুড়ে বিশ্বের মূলত বালাইনাশক উৎপাদনকারী বহুজাতিক কোম্পানিগুলো তাদের শক্তি-সামর্থ্যকে সুসংহত করে এবং কৃষি বাণিজ্যের উপর একচ্ছত্র ও একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে একে অপরকে আত্ত¡ীকরণের মাধ্যমে দানবীয় আকার ধারণ করে। যেমনঃ নোভার্টিস ও এস্ট্রাজেনেকা একসাথে মিলে হয়েছে সিনজেন্টা, রোন-পোলেন্ক ও এগ্রো-ইভো মিলে হয়েছে এভেন্টিস ক্রপ সায়েন্স ইত্যাদি। এরূপ পাঁচটি শীর্ষস্থানীয় বহুজাতিক কোম্পানি যেমনঃ সিনজেন্টা, এভেন্টিস, মোনসান্টো, বিএএসএফ ও ডু-পন্ট বর্তমান বিশ্বের বীজ, বালাইনাশক, কৃষি যন্ত্রপাতির বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে। বিশ্বের বীজ বাণিজ্যের দুই-তৃতীয়াংশ এবং জিএম বীজের প্রায় ১০০% নিয়ন্ত্রণ করছে এই পাঁচটি কোম্পানি। মোনসান্টো একাই নিয়ন্ত্রণ করছে বিশ্বের প্রায় ৯১% জিএম বীজের বাজার। ধান, গম, ভূট্টাসহ প্রধান প্রধান ফসলের জাতের উপর এ পর্যন্ত প্রায় ৯০০০টি প্যাটেন্ট দেওয়া হয়েছে যার ৪৪%ই মাত্র চারটি বড় বহুজাতিক কোম্পানির দখলে। বীজের উপর কোম্পানির এরূপ একক মালিকানা প্রতিষ্ঠা যে সাধারণ জনগোষ্ঠীর খাদ্য নিরাপত্তাকে মারাত্মক হুমকির মধ্যে ফেলে দিবে তাতে কোন সন্দেহ নেই। কারণ, বীজের উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা গোটা খাদ্য চক্রের উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠারই নামান্তর।
‘ট্রিপস’ চুক্তি, ‘উপোভ’ এবং কৃষকের বীজের অধিকার
খাদ্য ও কৃষির জন্য কৌলিক সম্পদের (জেনেটিক রিসোর্স) উপর প্যাটেন্ট বীজের উপর বহুজাতিক কোম্পানির নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠাকেই ত্বরান্বিত করছে যা ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকের খাদ্য নিরাপত্তা এমনকি জীবিকার জন্যও মারাতœক হুমকির সৃষ্টি করছে। এরূপ প্যাটেন্ট কৃষক ও প্রজননবিদদের জন্য বীজ ও কৌলিক সম্পদের সহজপ্রাপ্যতাকে বাঁধাগ্রস্ত করবে। কারণ, এই প্যাটেন্ট আইন কোম্পানির একচেটিয়া বাণিজ্যের গ্যারান্টি দেয়। ফলে, বীজের বাজার মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে কোন প্রতিযোগিতার সুযোগ না থাকায় তা সাধারণ কৃষকের ক্রয় ক্ষমতার মধ্যে থাকবে তার কোনই নিশ্চয়তা নেই। অথচ কৃষক এসব বীজ থেকে নিজে বীজ উৎপাদন ও সংরক্ষণ করতে পারবে না বিধায় প্রতিবছর কোম্পানির কাছ থেকেই বীজ কিনতে বাধ্য হবে।
ফসলের নতুন জাত উদ্ভাবনের জন্য কৃষক বা প্রজননবিদের জন্য উদ্ভিদের কৌলিক সম্পদের (চষধহঃ এবহবঃরপ জবংড়ঁৎপবং-চএজং) সহজলভ্যতা অপরিহার্য। আবহমান কাল ধরে যেসব জাত কৃষকরা চাষ করে আসছিল সেগুলো কৃষকেরই আবিষ্কার। প্রাকৃতিক প্রজনন ও নির্বাচনের মাধ্যমে কৃষক ও আদিবাসী জনগোষ্ঠী হাজারো স্থানীয় ও বন্য জাতের ফসল উদ্ভাবন করেছেন যেগুলো বর্তমানে আবিষ্কৃত সকল উচ্চফলনশীল (উফশী), হাইব্রিড ও জিএম জাতের মূল ভিত্তি। এসব স্থানীয় ও বন্য জাতের ফসল সকল গবেষক ও বাণিজ্যিক উদ্ভিদ প্রজননবিদের জন্যই সহজলভ্য। কারণ, এসবের কোন প্যাটেন্ট নেই। কিন্তু বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার ‘ট্রিপস’ চুক্তির প্যাটেন্ট আইনের আর্টিকেল ২৭.৩ (বি) ধারা এবং ‘উপোভ’-এ নতুন উদ্ভাবিত সকল জাতের উপর বাণিজ্যিক প্রজননবিদের একচ্ছত্র মালিকানা লাভের অধিকার দেওয়া হয়েছে। প্যাটেন্টকৃত এসব জাতের উপর কৃষক জনগোষ্ঠীর কোন অধিকারতো থাকছেইনা বরং জনকল্যাণে পরিচালিত সরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠানসমূহের গবেষকদের জন্যও এসব জাত নিয়ে গবেষণার কোন শর্তহীন সুযোগ থাকছে না।
‘ট্রিপস’ এবং ‘উপোভ’ চুক্তি দুটি জাতিসংঘ গৃহীত কনভেনশন অন বায়োলজিক্যাল ডাইভারসিটি (সিবিডি, ১৯৯২) এবং ইন্টারন্যাশনাল ট্রিটি অন প্লান্ট জেনেটিক রিসোর্সেস ফর ফুড এন্ড এগ্রিকালচার (আইটিপিজিআর, ২০০১)-এর সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। কারণ সিবিডি ও আইটিপিজিআর চুক্তি দুটিতে উদ্ভিদের কৌলিক সম্পদের উপর কৃষক ও আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকারের নিশ্চয়তা দেওয়া হয় যা ‘ট্রিপস’ এবং ‘উপোভ’ চুক্তি দুটিতে অস্বীকার করা হয়েছে। পরিতাপের বিষয় এই যে, সিবিডি ও আইটিপিজিআর চুক্তি দুটি কার্যকর করার ব্যাপারে কোন উদ্যোগ নেওয়া হয় নি যেমনটি হয়েছে ‘ট্রিপস’ চুক্তির বেলায়।
বাংলাদেশের সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্য ও কৌলিক সম্পদ সংরক্ষণের জন্য কোন আইনগত ব্যবস্থা নেই। এ ব্যাপারে আইন প্রণয়নের জন্য ১৯৯৮ সালে উদ্ভিদ কৌলিক সম্পদ বিষয়ক জাতীয় কমিটি গঠন করা হয় যে কমিটি চষধহঃ ঠধৎরবঃরবং অপঃ ড়ভ ইধহমষধফবংয (বাংলাদেশের উদ্ভিদ জাত সংরক্ষণ আইন)-এর একটি খসড়া তৎকালীন সরকারের বিবেচনার জন্য পেশ করে যা কার্যকর করার কোন উদ্যোগ অদ্যাবধি গ্রহণ করা হয় নি। প্রস্তাবিত এই আইন অনুসারে কোন হাইব্রিড বা জিএম শস্য ঢালাওভাবে এ দেশে প্রবেশ করতে পারবে না। পক্ষান্তরে, দাতা দেশ ও সংস্থাগুলো ক্রমাগত চাপ দিয়ে যাচ্ছে যাতে বাংলাদেশ বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার ট্রিপস চুক্তিতে বর্ণিত সুই জেনেরিস সিস্টেম হিসেবে উপভ গ্রহণ করে। হয়ত এরূপ চাপের কারণেই এ আইনটি অদ্যাবধি কার্যকর করা হচ্ছে না। যাহোক, প্রস্তাবিত প্ল্যান্ট ভ্যারাইটি অ্যাক্ট-এর আর্টিকেল-৭ -এ বর্ণিত গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি বিশেষ ধারা সংক্ষেপিত আকারে নিম্নে উল্লেখ করা হল।
ধারা-২: এই আইনের জন্য উদ্ভিদের সকল জাত, যেগুলো বর্তমানে বিদ্যমান বা নতুন উদ্ভাবিত জাত হিসেবে দাবীকৃত, বাংলাদেশের জনগণের “পূর্ববর্তী জ্ঞান” হিসেবে বিবেচিত হবে। অতএব, এই জাতগুলোকে ব্যক্তিগত বুদ্ধিজাত সম্পত্তির অধিকার, সংরক্ষণ বা বাণিজ্যিক স্বার্থে ব্যবহার করা যাবে না। উদ্ভাবিত জাতটি যে নতুন এবং তার অস্তিত্ব পূর্বে কখনও ছিলনা এবং উদ্ভাবনের সামাজিক প্রক্রিয়ার উপর একটি স্বাধীন মানব সংস্থার প্রতি কমিউনিটির স্বীকৃতি রয়েছে এটা প্রমাণ করা উদ্ভাবনকারীর একক দায়িত্ব।
নোট: এই আইনে “সংরক্ষণ” বলতে সবসময় ‘জাতীয় জীববৈচিত্র্য কর্তৃপক্ষ’ কর্তৃক কোন উদ্ভাবনকারীর অনুক‚লে অনুমোদিত ও বরাদ্দকৃত, সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হউক বা না হউক, কোন সংজ্ঞায়িত এবং সুনির্দিষ্ট ব্যবসায়িক সুবিধাদি বুঝাবে এবং তা কোন সাধারণকৃত বুদ্ধিজাত সম্পত্তির অধিকার তৈরি করবে না, এবং আবিষ্কারের ধরণ অনুসারে বিভিন্ন আবেদনকারীর ক্ষেত্রে ভিন্নরকম হতে পারে।
ধারা-৩: কোন জাতের বাণিজ্যিক অধিকার লাভের জন্য কেবল প্রজনন বা কিছু উৎকর্ষসাধনমূলক প্রজননই যথেষ্ট হবেনা। এরূপ অধিকার লাভের যোগ্য বলে বিবেচিত হতে গেলে নতুন জাতটিকে বাংলাদেশের মানুষের সুনির্দিষ্ট ও প্রয়োজনীয় চাহিদা মিটাতে সক্ষম হতে হবে। কোন জাত বাংলাদেশের মানুষের জন্য তাৎক্ষণিকভাবে, সরাসরি এবং যথেষ্ট পরিমানে লাভজনক বিবেচিত না হলে জাতীয় জীববৈচিত্র্য কর্তৃপক্ষ তা প্রত্যাখ্যান করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। হাইব্রিড জাতকে শুধুমাত্র তখনই সংরক্ষণ করা যাবে যদি তার মাতৃজাতগুলো কমিউনিটির জাত হিসেবে জনগণের কাছে সহজলভ্য হয়।
ধারা-৫: যদি কোন নতুন জাত পরিবেশ, জীবজগৎ, স্বাস্থ্য এবং জনমানুষের কল্যাণের ক্ষেত্রে ক্ষতিকর বলে বিবেচিত হয় তবে তা এই আইন দ্বারা সংরক্ষণ করা যাবেনা।
ধারা-৬: যদি কোন নতুন জাতের জীববৈচিত্র্য এবং/অথবা বিদ্যমান জৈবিক ও কৌলিক সম্পদ এবং কৌলিক ও সাংস্কৃতিক অবক্ষয়সহ সংশ্লিষ্ট বুদ্ধিজাত ও সাংস্কৃতিক জ্ঞান ও চর্চার উপর ঋণাতœক প্রভাব থাকে তবে তা এই আইনে সংরক্ষণ করা যাবেনা।
ধারা-৭: কোন ট্রান্সজেনিক (জিএম) জাত সংরক্ষণ করার যোগ্য হবে না যদি না সে জাতের –
ক. জাতীয় জীববৈচিত্র্য কর্তৃপক্ষ কর্তৃক নির্ধারিত সংশ্লিষ্ট কোন সংস্থা/বিভাগ কর্তৃক পরিবেশের উপর প্রভাব মূল্যায়ন করা হয়;
খ. বাংলাদেশকে জৈব দুষণ থেকে মুক্ত রাখার জন্য ‘জৈব নিরাপত্তা কমিশন’ কর্তৃক জৈব-নিরাপত্তা মূল্যায়ন করা হয়;
গ. সেই ট্রান্সজেনিক (জিএম) জাত ব্যবহার বা নাড়াচাড়ার ফলে যদি কোন বিপদ বা ক্ষতি সাধিত হয় তবে সে জাতের মালিক তার জন্য ক্ষতিপূরণ দিতে রাজি থাকে এবং জাত সংরক্ষণের দরখাস্তের সাথে এই মর্মে লিখিত অঙ্গীকার করে;
ঘ. জাত সংরক্ষণের জন্য আবেদনকারী এই মর্মে অঙ্গীকার করে যে, জাতের ট্রান্সজেনিক বৈশিষ্ট্য জনসমক্ষে ঘোষণা করা হবে এবং লেবেল, লোগো এবং সংশ্লিষ্ট সকল তথ্য উপকরণে তা সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা থাকবে;
ঙ. জাতীয় জীববৈচিত্র্য কর্তৃপক্ষ কর্তৃক নির্ধারিত হয় যে দুর্যোগের দায় বহন করার মত আবেদনকারীর যথেষ্ট আর্থিক সামর্থ রয়েছে।
ধারা-১০: কোন জাতীয় সরকারী গবেষণা প্রতিষ্ঠান যেমনঃ সরকারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, জাতীয় কৃষি গবেষণা কেন্দ্র, স্বায়ত্বশাসিত বা আধা-স্বায়ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠান কর্তৃক আবিষ্কৃত জাতগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাংলাদেশের জনগণের সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হবে। রাষ্ট্রীয় আর্থিক সহায়তায় বা জনগণের অর্থায়নকৃত সম্পদ বা উন্নয়ন সহযোগিতা হিসেবে প্রাপ্ত টাকায় আবি®কৃত জাতও সাধারণ সম্পত্তি হিসেবে গণ্য করা হবে।
ধারা-১১: কোন ব্যক্তি, এনজিও বা অন্য কোন সংস্থা যারা স্থানীয় বা বৈদেশিক উন্নয়ন তহবিল ব্যবহারে করে বা করেছে যে তহবিল নীতিগতভাবে জনকল্যাণে দান করা হয়েছে তাদের উদ্ভাবিত নতুন জাতও সাধারণ সম্পত্তি হিসেবে গণ্য করা হবে এবং এসব জাত সংরক্ষণযোগ্য হবে না বা কোন বাণিজ্যিক সুবিধা দাবী করা যাবে না।
ধারা-১২: উপরোক্ত জাতগুলো যেগুলো আইনগতভাবে জনগণের সাধারণ সম্পত্তি কেউ যাতে সেগুলোর বুদ্ধিজাত সম্পত্তির অধিকার দাবী করতে না পারে জাতীয় জীববৈচিত্র্য কর্তৃপক্ষ সে ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।
প্রস্তাবিত এই আইনটি কার্যকর করা হলে তা দেশের কৌলিক সম্পদ এবং কৃষক জনগোষ্ঠীর স্বার্থ সংরক্ষণে যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হতে পারত। কাজেই, দেশের সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্য ও কৌলিক সম্পদ সংরক্ষণে এই আইনটি কার্যকর করা অত্যন্ত জরুরী।
বাংলাদেশের বীজ-সম্পদ এবং বীজবাণিজ্য
বাংলাদেশ জীববৈচিত্র্যে অত্যন্ত সমৃদ্ধশালী একটি দেশ। হাজারো জাতের ফসল, পশুপাখি, গাছপালা অতুলনীয় সমৃদ্ধি দান করেছে এ দেশের জীববৈচিত্র্যকে। কিন্তু পরিতাপের বিষয় এই যে, আমাদের এই সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্য আজ বিলুপ্তির পথে। আমাদের বীজ সম্পদের কোন সঠিক হিসাব আজ পর্যন্ত করা হয় নি। ১৯১৫ সালে ঢাকাস্থ তৎকালীন কৃষি গবেষণা কেন্দ্রের এক হিসেব মতে বাংলাদেশে একসময় ১৫,০০০ জাতের ধানের চাষ হতো। এর প্রায় ৭০ বছর পর বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট প্রায় ৬০০০ জাতের ধান সংগ্রহ করে। সংগৃহীত এসব জাতের মধ্যে মাত্র ২০০০ টি জাত প্রজননবিদদের জন্য সহজলভ্য হয়। আশির দশকে পরিচালিত এক জরিপে ১২,৪৭৯ জাতের ধানের তালিকা করা হয় যার অধিকাংশই আজ বিলুপ্ত। বর্তমানে দেশজুড়ে চাষ হচ্ছে গুটিকয় স্থানীয়, উচ্চফলনশীল ও হাইব্রিড জাতের ধান।
ষাটের দশকের শেষের দিকে ফোর্ড ফাউন্ডেশনের সৌজন্যে এ দেশে প্রথম উচ্চফলনশীল জাতের ধান বীজ আমদানি করা হয়। এরপর সত্তরের দশকে ফিলিপাইনস্থ ইরি ও ইন্ডিয়া থেকে প্রচুর উচ্চফলনশীল জাতের ধান বীজ আমদানি করা হয়। অতঃপর ১৯৭০ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট যা একটি হাইব্রিডসহ এ পর্যন্ত ধানের ৪৬ টি নতুন জাত আবিষ্কার করেছে। অন্যদিকে, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট ২১ টি গমের জাত, ৪ টি ভূট্টার জাত, ৩২ টি গোল আলুর জাত, ২৪ টি ডাল জাতীয় ফসলের জাত, ২১ টি তৈলবীজ ফসলের জাত, ৪১ টি শাক-সব্জির জাত এবং ২৬ টি ফলের জাত আবিষ্কার করেছে। সরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান কর্তৃক আবিষ্কৃত হওয়ায় এসব জাতের কোন প্যাটেন্ট নেওয়া হয় নি। ফলে, এগুলো কৃষকের কাছে সহজলভ্য এবং কৃষক নিজেরাই এসব জাত থেকে বীজ তৈরি করতে পারে (হাইব্রিড ছাড়া)।
কাজেই নতুন জাতের আবিষ্কার এবং তার বীজের নিয়ন্ত্রণ অন্ততঃ সরকারের হাতে থাকলেও কৃষকেরা কিছুটা হলেও স্বস্তিতে থাকতে পারে। কারণ, সে যে সরকারই হউক জনগণের কাছে তার কমবেশি দায়বদ্ধতা থাকে যা কোম্পানির মোটেও থাকে না। মুনাফা অর্জনই কোম্পানির একমাত্র লক্ষ্য সে যে করেই হউক। মুনাফার জন্য যদি কৃষককে জিম্মি করে ফেলতে হয়, কৃত্রিম সংকটের ফাঁদে ফেলতে হয়, কৃষকের স্বনির্ভর ব্যবস্থাকে ধ্বংস করতে হয় কোম্পানি তা করতে কখনও পিছপা হবে না। কিন্তু সরকারের লক্ষ্য কখনই এমনটি হতে পারে না। তাই বীজ সম্পদের মালিকানা বা নিয়ন্ত্রণ কৃষকের হাতে থাকা উচিত। কেবলমাত্র যেসব বীজ কৃষক নিজেরা উৎপাদন করতে পারবে না যেমন: হাইব্রিড ও ব্রিডার মানের বীজ সেগুলো বড়জোড় সরকারি মালিকানায় রাখা যেতে পারে। পাশাপাশি যদি বিদেশি কোম্পানির কোন বীজ প্রবর্তন করতেই হয় তবে তা কঠোর নিয়ন্ত্রিত অবস্থায় করা উচিত, ঢালাওভাবে কখনই নয়।
বাংলাদেশের বীজ সম্পদের নিয়ন্ত্রণ এবং বিএডিসি
এ দেশে সরকারি নিয়ন্ত্রণে একমাত্র বীজ উৎপাদন ও বাজারজাতকারী সংস্থা হল বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএডিসি) যেটি প্রতিষ্ঠিত হয় সবুজ বিপ্লবের সূচনালগ্নে ষাটের দশকে। এখানে প্রসঙ্গক্রমে বিএডিসির প্রতিষ্ঠা থেকে শুরু করে বর্তমান অবস্থার দিকে একটু আলোকপাত করা প্রয়োজন যাতে এ দেশে বহুজাতিক কোম্পানির বাণিজ্যের প্রসারে এই সংস্থার ভূমিকা এবং তার পিছনের রাজনীতি সম্পর্কে ধারণা লাভ করা যায়। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, শুরুতে এই সংস্থা শুধু বীজ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ছিলনা। শুরুতে এই সংস্থার প্রধান কাজ ছিল সেই সময়ে আসা উচ্চফলনশীল জাতের চাষাবাদের জন্য প্রয়োজনীয় বীজ, রাসায়নিক সার, বালাইনাশক, সেচ যন্ত্রসহ অন্যান্য কৃষি উপকরণ ও যন্ত্রপাতি কৃষকের হাতে তুলে দেওয়া। সেসময় বিএডিসি এসব কৃষি উপকরণ ও যন্ত্রপাতি কৃষকদেরকে দিত উচ্চহারে ভর্তুকি মূল্যে, এমনকি কখনও কখনও বিনামূল্যে। আর এই ভর্তুকির ভার বহন করা হত বিশ্বব্যাংকসহ বিভিন্ন বিদেশী দাতা সংস্থার ঋণের টাকায়। তবুও সে সময় এসব নতুন জাতের বীজ ও প্রযুক্তি কৃষকরা সহজে গ্রহণ করতে চায়নি কারণ তারা সম্ভবত তাদের হাজার বছরের স্বনির্ভর কৃষি ব্যবস্থার পরিবর্তন চায়নি। এ কারণেই বিএডিসির মাধ্যমে এসব প্রযুক্তির বিস্তার হচ্ছিল অত্যন্ত ধীর গতিতে। ধীর গতিতে হলেও ইতোমধ্যে সুসংহত হওয়া বহুজাতিক কোম্পানির জন্য এ দেশের বাজারে প্রবেশের পথ সুগম করার ক্ষেত্রে তা যথেষ্ট সহায়ক হয়। আর এ সুযোগেই বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের মতো দাতা সংস্থাগুলো একদিকে যেমন ভর্তুকি প্রত্যাহার করতে থাকে অন্যদিকে তেমনি ঋণের শর্ত হিসেবে কাঠামোগত সংস্কার কর্মসূচি চাপিয়ে দিয়ে এ দেশের সরকারগুলোকে বাধ্য করে বিএডিসি কর্তৃক সরবরাহকৃত কৃষি উপকরণ ও প্রযুক্তির বাণিজ্যকে বেসরকারি খাতে ছেড়ে দিতে যাতে বহুজাতিক কোম্পানির বাণিজ্যের প্রসার সহজতর হয়। এরই ধারাবাহিকতায় তৎকালীন সামরিক সরকার আশির দশকে এ দেশের কৃষি বাণিজ্যের ক্ষেত্রে ঢালাও বেসরকারিকরণ ও উদারিকরণ নীতির বাস্তবায়ন ঘটায় যা বাংলাদেশের কৃষির ইতিহাসে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ রূপান্তরের দশক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। এখানে স্মরণ রাখা দরকার যে, শুধু বাংলাদেশে নয় তৃতীয় বিশ্বের বহু দেশেই অগণতান্ত্রিক, স্বৈরাচারী ও সামরিক সরকারকে ক্ষমতায় বসানো এবং টিকিয়ে রাখার ক্ষেত্রে বিশ্ব ব্যাংকসহ এসব দাতা সংস্থার নগ্ন পৃষ্ঠপোষকতার কথা সর্বজনবিদিত। যাহোক, ঐ সময় থেকেই বীজ, রাসায়নিক সার, বালাইনাশক এবং কৃষি যন্ত্রপাতির সরবরাহ বা বাজারজাতকরণ ব্যবস্থা বিএডিসির কাছ থেকে ধীরে ধীরে চলে যেতে থাকে বহুজাতিক কোম্পানির হাতে। আর এই নিয়ন্ত্রণকে একচ্ছত্র করতে বর্তমানে এসব দাতা সংস্থা বিএডিসিকেই বন্ধ করে দেওয়ার জন্য সরকারকে ক্রমাগত চাপ দিয়ে যাচ্ছে। বর্তমানে এ দেশের বীজ, রাসায়নিক সার, বালাইনাশক এবং কৃষি যন্ত্রপাতি বাণিজ্যের প্রায় সবটুকুই নিয়ন্ত্রণ করছে বহুজাতিক কোম্পানি ও তাদের দেশীয় এজেন্টরা।
বীজ ফসল উৎপাদনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপকরণগুলোর একটি। ‘ভাল বীজে ভাল ফসল’ – এটি একটি বৈজ্ঞানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত সত্য। কৃষি গবেষকদের মতে বাংলাদেশের গবেষণা প্রতিষ্ঠানসমূহ যেসব উচ্চ ফলনশীল জাত কৃষকের হাতে তুলে দিয়েছে সেগুলোর কৃষকের মাঠের ফলন গবেষণা খামারের ফলনের তুলনায় অনেক কম। এর অন্যতম প্রধান কারণ কৃষকরা যে বীজ ব্যবহার করে তা মোটেও উৎকৃষ্ট মানের নয়। বিজ্ঞানীদের মতে শুধু উৎকৃষ্ট মানের বীজ ব্যবহার করা গেলে ধানের ফলন শতকরা ২০ ভাগ পর্যন্ত বাড়ানো সম্ভব। আজ দেশের খাদ্য নিরাপত্তা মারাতœক সংকটাপন্ন। দেশের জনসংখ্যা বাড়ছে, কমছে ফসলি জমি। এমতাবস্থায়, একক পরিমান জমিতে শস্যের ফলন বাড়ানো অপরিহার্য। অথচ আজ পর্যন্ত সরকারি-বেসরকারি খাত মিলে দেশের প্রধান ফসল ধানের বীজের চাহিদার শতকরা মাত্র ১০/১২ ভাগ সরবরাহ করা সম্ভব হয়েছে। অথচ দুঃখজনক হলেও সত্য এই যে, মানসম্মত বীজ কৃষকের হাতে পৌছে দেওয়ার জন্য যেখানে বিএডিসিকে আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন ছিল সেখানে বিএডিসিকে বন্ধ করে দেওয়ার চিন্তাভাবনার কথা শোনা যাচ্ছে।
জাতীয় বীজ নীতি ও কৃষকের বীজের অধিকার
অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে, এ দেশের সমৃদ্ধ বীজ সম্পদ ও কৃষকের বীজের অধিকার সংরক্ষণে বাংলাদেশ সরকারের ভূমিকা অত্যন্ত হতাশাজনক যা পূর্বেই আলোকপাত করা হয়েছে। আরও দুঃখজনক ব্যাপার এই যে, আমাদের সরকারি নীতি ও পরিকল্পনা বীজ সম্পদের উপর বহুজাতিক কোম্পানির নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় সহায়ক।
সরকার ২০০৬ সালে একটি জাতীয় বীজ নীতি প্রণয়ন করেছে যার প্রধান লক্ষ্য হল বেসরকারি খাতে বীজ শিল্প স্থাপনকে উৎসাহিত করা। এবং এই লক্ষ্যকে সামনে রেখে ১৯৭৭ সালের সীড এ্যাক্ট সংশোধন করে সীড এ্যাক্ট ১৯৯৭ প্রবর্তন করা হয়েছে। জাতীয় বীজ নীতির প্রায় সকল ধারায় কোম্পানির বীজ বাণিজ্যকেই উৎসাহিত করা হয়েছে। এই বীজ নীতিতে বীজ উৎপাদন ও বাজারজাতকরণে একমাত্র সরকারি প্রতিষ্ঠান বিএডিসি বর্তমানে এ দেশের বীজের চাহিদার মাত্র ৫-৬% সরবরাহ করছে। অথচ বিএডিসির ক্ষমতাবৃদ্ধির কোন সুস্পষ্ট দিক নির্দেশনা এই বীজ নীতিতে নেই।
পক্ষান্তরে, এই বীজ নীতি বেসরকরি খাতে হাইব্রিড বীজ আমদানির শর্তসাপেক্ষ অনুমোদনকে আরও সুসংহত করবে। কারণ, এই বীজ নীতি অনুসারে বাংলাদেশের কোন গবেষণা প্রতিষ্ঠান যদি কোন জাত আবিষ্কার করে এবং তা কৃষক পর্যায়ে চাষের জন্য ছাড় করতে চায় তবে দেশের বিভিন্ন কৃষি পরিবেশ অঞ্চলে পরীক্ষাসহ দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হয়। কিন্তু বেসরকারি খাতে বীজ আমদানি ও বাজারজাতকরণের জন্য এরূপ কোন পরীক্ষার দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হয় না। অথচ, দেশের ইকোসিস্টেম সুরক্ষার জন্য এই ধরণের পরীক্ষা জরুরী। অন্যথায় বাইরে থেকে আসা কোন জাত দেশের ফসল বৈচিত্র্যের জন্য বিপদজ্জনক হতে পারে। অন্যদিকে অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য যে, দেশীয় বীজ সম্পদ সংরক্ষণের কোন কথাই এ বীজ নীতিতে বলা হয় নি যদিও সরকার তা করার জন্য জাতিসংঘের জীববৈচিত্র্য সনদ ও পরিবেশ উন্নয়ন সম্মেলনের এজেন্ডা-২১ অনুযায়ী অঙ্গীকারাবদ্ধ।
আমাদের এখনও যেসব নীতি আছে তাতে হাইব্রিড বা জিএম বীজ সহজে এ দেশে ঢুকতে পারেনা। কিন্ত বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থাসহ বিভিন্ন দাতা দেশ ও সংস্থার চাপে আমাদের নীতিগুলো পরিবর্তন করা হচ্ছে। যারা আমাদের বাজার দখল করতে চায় তারাতো বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করবেই। হুমকি-ধামকি ও চাপ প্রয়োগ করবেই। কিন্তু একটি দেশপ্রেমিক, মেরুদন্ডসম্পন্ন সরকারের উচিত এসব হুমকি-ধামকি ও চাপ উপেক্ষা করে দেশের স্বার্থে, কৃষকের স্বার্থে নীতি প্রণয়ন করা।
Mar 30, 2025 | প্রকৃতি কথা
Trade Related Aspects of Intellectual Property Rights (TRIPS) অর্থাৎ বাণিজ্য সংশ্লিষ্ট মেধাস্বত্ব (ট্রিপস) চুক্তিটিও কৃষিচুক্তির মতোই ১৯৯৪ সালে গ্যাটের উরুগুয়ে রাউণ্ডে গৃহীত হয় এবং ১৯৯৫ সাল থেকে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার মাধ্যমে কার্যকর হয়। এ চুক্তির উদ্দেশ্য হল কোন নতুন আবিষ্কারের উপর আবিষ্কারক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের স্বত্ব বা মালিকানা নিশ্চিত করা। এই মালিকানা নিশ্চিত করার জন্য ট্রিপস চুক্তিতে যে ব্যবস্থা রাখা হয়েছে তা হল প্যাটেন্ট। প্যাটেন্ট বিষয়টা একটু ভালোভাবে বুঝে নেওয়া প্রয়োজন এবং এর সাথে জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়টাকে মিলিয়ে না দেখলে প্যাটেন্টকে মামুলি বিষয় বলে মনে হতে পারে।
সহজ কথায় প্যাটেন্ট হল একপ্রকার মালিকানার দলিল। অর্থাৎ কোনকিছু প্যাটেন্ট করা মানে তার স্বত্বাধিকারী হওয়া। এরূপ প্যাটেন্ট আইন কপিরাইট আইন নামে বহু আগে থেকেই প্রচলিত ছিল। ধরা যাক, কোন লেখক একটি বই লিখলেন এবং কপিরাইট আইনে তার স্বত্বাধিকারী হলেন। এমতাবস্থায়, লেখকের অনুমতি ছাড়া কেউ সেই বই ছাপতে বা কপি করতে পারবেনা এবং করলে তা হবে শাস্তিযোগ্য অপরাধ। ট্রিপস চুক্তি অনুযায়ী বর্তমানে তা একটু ভিন্নরূপে উদ্ভিদ ও প্রাণীর ওপরও প্রয়োগ করা হচ্ছে। আমাদের চারপাশের গাছপালা, ফসল, গরু-ছাগল, হাঁস-মুরগি এসবের মালিক কে? আপনি, সে বা আমি অর্থাৎ যারা এসবের লালন-পালনকারী। কিন্তু ট্রিপস চুক্তি স্বাক্ষরের পর এগুলোর মালিকানা আর আমাদের থাকবে, তার কোন নিশ্চয়তা নেই। কারণ, সামান্য জিনগত পরিবর্তন ঘটিয়েই কোম্পানী যেকোন সময় এগুলোর মালিকানা নিয়ে নিতে পারে। ধরা যাক, আমাদের বাদশাভোগ ধানের সামান্য জিনগত পরিবর্তন ঘটিয়ে কোন কোম্পানী একটি নতুন জাত তৈরি করলো এবং তা বাদশাভোগ নামে প্যাটেন্ট করলো। এরূপ প্যাটেন্ট করার ফলে বাংলাদেশ যদি বাদশাভোগ নামের কোন ধান উৎপাদন, ব্যবহার, বিক্রি ও আমদানি-রপ্তানি করতে চায় তবে সে কোম্পানীকে টাকা দিয়ে অনুমতি নিতে হবে। উদ্ভিদ ও প্রাণীর নতুন জাতের মালিকানা কুক্ষিগত করে মুনাফা করার অদ্ভূত এক রক্ষাকবচ হলো এই প্যাটেন্ট আইন!
এ চুক্তিটি বিভিন্ন প্যাটেন্টধারী বা প্যাটেন্ট করতে চায় এমন সব বহুজাতিক কোম্পানির চাপে উরুগুয়ে রাউণ্ডে উত্থাপিত হয়েছিল। এসব প্রতিষ্ঠানের যুক্তি ছিল এরকম যে, যদি কোন নতুন আবিস্কারের একচ্ছত্র মালিকানা নিশ্চিত করা না হয় তবে নতুন আবিষ্কারে কেউ উৎসাহিত হবে না। কথাটি আপাতদৃষ্টিতে যুক্তিযুক্ত মনে হলেও মানব ইতিহাস তা সত্য বলে মেনে নিবেনা। কারণ, আজ পর্যন্ত এ পৃথিবীতে যত নতুন আবিষ্কার হয়েছে তার জন্যে তো মালিকানা সুরক্ষার কোন ব্যবস্থা ছিল না। তখন কি আবিষ্কার হয় নি? গ্রেগর জোহানেজ ম্যাণ্ডেল যখন তার বংশগতির সূত্রগুলো আবিষ্কার করেন তখনতো প্যাটেন্ট আইন ছিল না। তাই বলে কি অসামান্য পরিশ্রম করে মেণ্ডেল তার সূত্রগুলো আবিষ্কার করেন নি! অথচ সেসব সূত্র ব্যবহার করে আজ নতুন নতুন উফশী ও হাইব্রিড জাত আবিষ্কার করা হচ্ছে এবং প্যাটেন্ট করে নেয়া হচ্ছে। তখন যদি মেণ্ডেলের সূত্র প্যাটেন্ট করা হতো তা হলে উদ্ভিদ প্রজনন বিদ্যার এতটা বিকাশ কখনো ঘটতো না। কারণ, প্যাটেন্টকৃত কোন আবিষ্কার নিয়ে গবেষণা করতে হলে প্যাটেন্টধারীর (ব্যক্তি বা কোম্পানি) কাছ থেকে অনুমতি ও স্বত্ব কিনে নিতে হবে। বাস্তব সত্য এই যে, অতীতে বিজ্ঞানীরা নিজস্ব জ্ঞান-পিপাসা থেকে এবং মানবকল্যাণে ব্রতী হয়েই নতুন কোন আবিষ্কারে আত্মনিয়োগ করতেন। অথচ আজ বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করেন অর্থ উপার্জনের ব্রত নিয়ে কোম্পানির ভাড়াটিয়া হিসেবে এবং কোম্পানির ব্যবসায়িক স্বার্থ চরিতার্থ করতে। মানবকল্যাণ এখানে নিতান্তই গৌণ বিষয়। আগেকার দিনের আবিষ্কার ও বর্তমানকালের আবিষ্কারের মধ্যে মূল পার্থক্যটা এখানেই। আজ এরূপ আবিষ্কারকেই বলা হচ্ছে বুদ্ধিজাত সম্পত্তি। এসব আবিষ্কার প্রকৃতপক্ষেই বুদ্ধিজাত না কুবুদ্ধিজাত তা ভেবে দেখার অবকাশ রয়েছে।
ট্রিপস চুক্তিতে মৌলিক আবিষ্কারের কোন স্বীকৃতি নেই। যে কৃষক হাজারো জাতের ধানের মৌলিক আবিষ্কারক এবং হাজার বছর ধরে সেগুলো লালন করেছে তার কোন স্বীকৃতি এই ট্রিপস চুক্তিতে নেই। অথচ ভূইফোঁড় কোন কোম্পানি কৃষকের আবিষ্কৃত এসব জাতগুলোর সামান্য জিনগত পরিবর্তন ঘটিয়েই তার মালিক বনে যাচ্ছে। প্রকৃতপক্ষে আবিষ্কারকে উৎসাহিতকরণ ফাঁকা বুলি। মুদ্দাকথা হল মুনাফা। একচেটিয়া মুনাফা লুটার অভিলাষ থেকেই তৈরি করা হয়েছে কুটকৌশলী এই প্যাটেন্ট আইন।
ট্রিপস চুক্তিটি বহু বিষয়ের উপর প্রয়োগ করা হচ্ছে তবে বর্তমান বিতর্ক হচ্ছে উদ্ভিদ ও প্রাণীর উপর এর প্রয়োগ নিয়ে। এই চুক্তির ২৭.৩ (বি) ধারায় কোম্পানিগুলোকে নতুন জাতের উদ্ভিদ ও প্রাণী এবং তার উৎপাদন প্রক্রিয়া প্যাটেন্ট করার অধিকার দেওয়া হয়েছে। ট্রিপস চুক্তির এ ধারাটির সুযোগ নিয়ে বহুজাতিক কোম্পানিগুলো বিভিন্ন উদ্ভিদ ও প্রাণীর সামান্য জিনগত পরিবর্তন ঘটিয়েই তাকে নতুন আবিষ্কার হিসেবে দাবি করছে এবং সেগুলোর মালিক বনে যাচ্ছে। এর চেয়ে হাস্যকর অথচ দুঃখজনক ব্যাপার আর কি হতে পারে!
ট্রিপস চুক্তি স্বাক্ষরের পূর্বে বুদ্ধিজাত সম্পত্তির সংরক্ষণ আইন ছিল একটি দেশের অভ্যন্তরীণ ব্যাপার। কিন্তু ট্রিপস চুক্তিতে যেকোন আবিষ্কারের স্বত্বাধিকার বা মালিকানা প্রদানের জন্য প্রত্যেক দেশকে প্যাটেন্ট আইন প্রণয়ন করা অথবা আপনা আপনি বুদ্ধিজাত সম্পত্তির মালিকানা প্রতিষ্ঠিত ও স্বীকৃত হয়ে যায় এমন কোন কার্যকর ব্যবস্থা (effective sui generis system) বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। চুক্তির ধারায় প্রথমে কার্যকর (effective) শব্দটি ছিল না; এটি অন্তর্ভুক্ত করেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সম্ভবত এজন্য যে, কোন দেশ তার ইচ্ছামতো ব্যবস্থা নিলেই হবে না, তা বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা, শিল্পোন্নত দেশ ও বহুজাতিক কোম্পানির কাছে কার্যকর বা গ্রহণযোগ্য বলে বিবেচিত হতে হবে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য ধনী দেশ তৃতীয় বিশ্বের গরীব দেশগুলোর উপর চাপ সৃষ্টি করে চলেছে যেন তারা কার্যকর ব্যবস্থা হিসেবে উপভ (UPOV) কনভেনশন গ্রহণ করে। UPOV-এর পূর্ণরূপ হল International Convention for Protection of New Varieties of Plant । ১৯৬১ সালে ধনী দেশগুলো প্যাটেন্ট আইনের বিকল্প হিসেবে UPOV চুক্তি স্বাক্ষর করে। যে বিজ্ঞানীরা নতুন জাত তৈরি করেন তাদেরকে উদ্ভিদ প্রজননবিদ (Plant Breeder) বলা হয়। উদ্ভাবিত জাতের উপর উদ্ভিদ প্রজননবিদদের মালিকানা স্বত্ত্ব (Plant Breeders’ Rights) প্রতিষ্ঠার জন্য এই চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। কিন্তু বর্তমানে নতুন জাত উদ্ভাবনের জন্য প্রায় সকল গবেষণাই কোম্পানির টাকায় কোম্পানির নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হচ্ছে। এসব কোম্পানির নিজেদের বেতনভূক্ত বা চুক্তিবদ্ধ প্রজননবিদ রয়েছে। এমনকি কোন গবেষণা প্রতিষ্ঠান বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নতুন কোন জাত উদ্ভাবন করলে তাও তারা টাকা দিয়ে কিনে নেয় এবং এরূপ গবেষণার জন্য তারা অর্থ বিনিয়োগ করে থাকে। এভাবে নতুন আবিষ্কৃত প্রায় সকল জাতের মালিক বনে যাচ্ছে বহুজাতিক কোম্পানিগুলো। ফলে, আমাদের ধান, আমাদের নিম এবং এ দেশের হাজারো উদ্ভিদ ও প্রাণীর মালিকানা আর আমাদের থাকবে না, মালিক হবে বহুজাতিক কোম্পানি। কাজেই এই প্যাটেন্ট আইন মেনে নেওয়া বা উপভ কনভেনশন গ্রহণ করা আমাদের দেশের জন্য কোন মতেই সমীচীন হবে না।
বাংলাদেশের কৃষিতে ট্রিপস চুক্তির প্রভাব
বিশ্বের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৭৫% গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর জীবিকার প্রধান উৎস হল কৃষি। উন্নয়নশীল দেশগুলোর ক্ষুদ্র কৃষকেরা সনাতন পদ্ধতিতে চাষাবাদের মাধ্যমেই বিশ্বের ৬৬% মানুষের খাদ্যের যোগান দেয়। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার ট্রিপস চুক্তির অধীনে উদ্ভিদ ও বীজের উপর বুদ্ধিজাত সম্পত্তির সংরক্ষণ নীতি (প্যাটেন্ট আইন) প্রয়োগ করা হচ্ছে। ফলে, বিশ্বের কোটি কোটি ক্ষুদ্র কৃষকের জীবন-জীবিকা, খাদ্য স্বাধিকার ও খাদ্য নিরাপত্তা আজ হুমকির সন্মুখীন। তৃতীয় বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশও আজ এরূপ মারাত্মক হুমকির মুখোমুখি।
বাংলাদেশের প্রায় ৮৮% কৃষকই ক্ষুদ্র, প্রান্তিক ও ভূমিহীন শ্রেণীভূক্ত। কৃষি উপকরণের ক্রমবর্ধমান উচ্চমূল্য এবং উৎপাদিত পণ্যের সঠিক মূল্য না পাওয়ার কারণে সম্পূর্ণ কৃষিনির্ভর এই বিশাল জনগোষ্ঠীর পক্ষে কৃষিতে টিকে থাকাই দুষ্কর হয়ে পড়েছে। তদুপরি, মনুফালোভী বহুজাতিক কোম্পানিগুলো এমনসব প্রযুক্তি নিয়ে এ দেশের বাজারে ঢুকছে যার প্রবর্তন করা হলে এসব কৃষকের পক্ষে কৃষিতে টিকে থাকা নিশ্চিতভাবেই অসম্ভব হয়ে পড়বে। নিম্নে এরূপ কিছু প্রযুক্তি সম্পর্কে আলোচনা করা হল।
প্যাকেজ টেকনোলজি (Package Technology)
বর্তমানে কোম্পানিগুলো ধান বা অন্যান্য ফসলের এমনসব জাত তৈরি করছে যার সাথে সে কোম্পানির তৈরি বিশেষ ধরণের রাসায়নিক সার, বালাইনাশক, হরমোন, ভিটামিন ইত্যাদি ব্যবহার না করলে ভাল ফলন পাওয়া যাবে না। আবার জাতের সাথে সাথে এসব প্রযুক্তিও কোম্পানির প্যাটেন্টকৃত। এভাবে কোম্পানিগুলো চুটিয়ে একচেটিয়া ব্যবসা করার নানা ফন্দি-ফিকির বের করছে। আর এরূপ ফন্দির সফল বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন হল কৃষকের হাতে যেসব জাত আছে সেগুলোকে সরিয়ে দেওয়া। এজন্য তারা এমনসব জাত তৈরি করছে যাতে কৃষকের নিজস্ব বীজ হাতছাড়া হয়ে যায় এবং কৃষক প্রতিবছর কোম্পানির বীজ কিনতে বাধ্য হয়। এরূপ টেকনোলজি যেগুলো একসাথে ব্যবহার না করলে আশানুরূপ ফলন পাওয়া যায়না, সেগুলোকে প্যাকেজ টেকনোলজি বলা হয়।
উদাহরণস্বরূপ, এগ্রো-ইভো নামক একটি বহুজাতিক কোম্পানি এমন একটি ধানের জাত তৈরি করেছে যাতে সে কোম্পানির লিভার্টি নামক আগাছানাশক ব্যবহার করতে হবে। অন্য কোম্পানির আগাছানাশকে ভাল কাজ করবে না। মোনাসান্টো রাউণ্ড-আপ-রেডি নামের একটি ধানের জাত তৈরি করছে যাতে সে কোম্পানির তৈরি প্লাইসোফেট নামক আগাছানাশক ব্যবহার করতে হবে।
টার্মিনেটর টেকনোলজি (Terminator Technology)
মার্কিন বহুজাতিক কোম্পানি ডেল্টা এন্ড পাইন ল্যাণ্ড ১৯৯০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগের সহায়তায় এমন একটি নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছে যা দিয়ে বীজকে বন্ধ্যা করে দেওয়া যায়। এই প্রযুক্তির নাম দেওয়া হয়েছে টার্মিনেটর প্রযুক্তি। এই প্রযুক্তি ব্যবহার করা হলে বীজ শুধু একবারই গজাবে, পরের বছর আর গজাবেনা। অর্থাৎ এই প্রযুক্তি ব্যবহার করা কোন জাতের বীজ যদি কোন কৃষক চাষ করে এবং সেই ফসল থেকে বীজ রেখে পরের বছর চাষ করতে চায় তবে সে বীজ গজাবেনা। প্রতিবছর কোম্পানির কাছ থেকে বীজ কিনেই চাষ করতে হবে। একাজে এক প্রকার জিন ব্যবহার করা হয় যা ধানসহ যেকোন ফসলে ব্যবহারের জন্য প্যাটেন্ট করা হয়েছে।
দুই ধরণের টার্মিনেটর প্রযুক্তি রয়েছে।
১. ভি-গার্ট: এই ধরণের টার্মিনেটর বীজ থেকে বীজ রাখলে সে বীজ গজাবেনা। এবং
২. টি-গার্ট: এই ধরণের টার্মিনেটর বীজ থেকে বীজ রাখলে বীজ গজাবে কিন্তু সেই কোম্পানির বিশেষ ধরনের রাসায়নিক দ্রব্য ব্যবহার না করলে সেই বীজ থেকে ভাল ফলন পাওয়া যাবেনা।
টার্মিনেটর প্রযুক্তি ব্যবহার করা এরূপ বীজকে আত্মঘাতি বীজও বলা হয়ে থাকে। প্রধানত নিম্নরূপ কয়েকটি কারণে এই প্রযুক্তির বিরুদ্ধে সারা বিশ্বে প্রতিবাদের ঝড় উঠে।
প্রথমত: বর্তমান বিশ্বের বিশেষ করে তৃতীয় বিশ্বের দরিদ্র দেশসমূহের অধিকাংশ কৃষকই নিজের উৎপাদিত বীজ দিয়ে চাষাবাদ করে থাকে। তাদের পক্ষে প্রতিবছর বীজ কিনে চাষ করা সম্ভব হয়না। কাজেই এই ধরণের বীজ এসব দরিদ্র কৃষকের জন্য মারাত্মক সংকট সৃষ্টি করবে।
দ্বিতীয়ত: বীজের জন্য কৃষক কোম্পানির উপর পুরোপুরি নির্ভরশীল হয়ে পড়বে। ফলে, একটি দেশের খাদ্য নিরাপত্তাও কোম্পানির নিয়ন্ত্রণে চলে যাবে। যে কারণে সারা বিশ্বের সচেতন মহল আশংকা প্রকাশ করেছেন যে, এই ধরণের বীজ বাজারজাত করা হলে সারা বিশ্বে দুর্ভিক্ষের আশংকা অনেকগুণ বেড়ে যাবে।
তৃতীয়ত: এই প্রযুক্তি ব্যবহার করা কোন ফসল যদি কোন মাঠে চাষ করা হয় তবে সেই মাঠের অন্যান্য ফসলেও কৌলিক দুষণ ঘটবে। ফলে, সেই মাঠের অন্যান্য ফসলের বা জাতের বীজও বন্ধ্যা হয়ে যাবে। ফলে, কৃষকের হাতে আর কোন বীজই থাকবে না।
চতুর্থত: এই প্রযুক্তি ফসলবৈচিত্র্য তথা জীববৈচিত্র্যকে ধ্বংস করে দিবে।
মজার ব্যাপার হচ্ছে, ডেল্টা এন্ড পাইন ল্যান্ড কোম্পানিটি যখন ১৯৯৯ সালে এই বীজ বাজারজাত করার উদ্যোগ নেয় তখন বিশ্বের শীর্ষ মার্কিন বীজ কোম্পানি মোনসান্টোও ১৯৯৯ সালে এই বীজের বাণিজ্যিক ব্যবহার নিষিদ্ধ করার ব্যাপারে সোচ্চার হয়েছিল। কিন্তু ২০০৬ সালে এই মোনসান্টো কোম্পানিই ডেল্টা এন্ড পাইন ল্যাণ্ড কোম্পানিটি কিনে নেয় এবং এই প্রযুক্তি বাজারজাত করতে উঠেপড়ে লাগে। যাহোক, আশার কথা হচ্ছে উপরোক্ত বিষয়গুলো বিবেচনা করে জাতিসংঘের কনভেনশন অন বায়োলজিক্যাল ডাইভারসিটি (সিবিডি) ২০০০ সালে এই প্রযুক্তির মাঠ পরীক্ষা ও বাণিজ্যিক বিক্রয় নিষিদ্ধ করার সুপারিশ করেছে এবং ২০০৬ সালে মোনসান্টোর বাজারজাতকরণ তৎপরতার প্রেক্ষিতে তা পূনর্ব্যক্ত করেছে। ব্রাজিল ও ইন্ডিয়া ইতোমধ্যে জাতীয়ভাবে এই প্রযুক্তি নিষিদ্ধ করে আইন প্রণয়ন করেছে। বাংলাদেশ সিবিডিতে স্বাক্ষর করলেও এই প্রযুক্তি নিষিদ্ধ করার ব্যাপারে আজ পর্যন্ত কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করে নি।
বহুজাতিক কোম্পানি কর্তৃক গরিব দেশের জীববৈচিত্র্য চুরি
এশিয়া ও আফ্রিকার দেশগুলো জীববৈচিত্র্যে অত্যন্ত সমৃদ্ধ। এসব দেশে রয়েছে হাজার হাজার প্রজাতির উদ্ভিদ, প্রাণী ও অনুজীব যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা ইউরোপের ধনী দেশগুলোতে নেই। নতুন জাতের উদ্ভিদ ও প্রাণী তৈরি করতে গেলে বৈচিত্র্যপূর্ণ জীবের সংগ্রহ অত্যন্ত জরুরী। তাই ধনীদেশ বা বহুজাতিক কোম্পানিগুলো এশিয়া ও আফ্রিকা থেকে উদ্ভিদ ও প্রাণী চুরি করে নিয়ে গিয়ে তাদের জীনব্যাংকের সংগ্রহকে সমৃদ্ধ করছে এবং তা থেকে নতুন নতুন জাত তৈরি করে তার মালিকানা নিয়ে নিচ্ছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে এক সময় দেখা যাবে যে, এ অঞ্চলে বাণিজ্যিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ যত উদ্ভিদ ও প্রাণী আছে তার মালিক বনে গেছে বহুজাতিক কোম্পানিগুলো।
বাংলাদেশের মাঠে মাঠে একসময় শুধু চাষই হত প্রায় ১২,৫০০ জাতের ধান। চাষ হতোনা এমন অগণিত জাতের বন্য ধান ছিল। ধানের এসব জাত কোন বিজ্ঞানীর আবিষ্কার নয় বা কোন গবেষণাগার থেকেও আসেনি। হাজার বছর ধরে কৃষকরাই সেসব জাত আবিষ্কার ও লালন করেছে। আজ হাইব্রিড বা জিএম-এর মতো যেসব নতুন জাত তৈরি করা হচ্ছে সেগুলো তৈরি করা হয় কৃষকের আবিষ্কৃত জাত থেকেই। তাই আমরা হেলায় হারিয়ে ফেললেও গবেষকদের কাছে বা কোম্পানির কাছে এসব দেশী জাতের ধানের গুরুত্ব অপরিসীম। তাই এমন অনেক জাতের ধান বর্তমানে কৃষকের মাঠ থেকে বিলুপ্ত হয়ে গেলেও বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের জিন ব্যাংকে সেগুলোর অনেকই সংরক্ষণ করা আছে। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের জিনব্যাংক সংরক্ষিত আছে মাত্র প্রায় ৩০০০ প্রজাতির ধান। পক্ষান্তরে, শুধু আন্তর্জাতিক ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (সংক্ষেপে ইরি) এর জিন ব্যাংকেও সংরক্ষিত আছে হাজার হাজার জাতের ধান।
ট্রিপস চুক্তিতে কৃষকের এসব আবিষ্কারের কোন স্বীকৃতি নেই, নেই প্যাটেন্ট করার অধিকার। অন্যদিকে, সবুজ বিপ্লব কেড়ে নিচ্ছে কৃষকের নিজস্ব এসব আবিষ্কার। এসব আদি জাত থেকেই শংকরায়ন করে বা জিনগত পরিবর্তনের মাধ্যমে তৈরি করা হচ্ছে নতুন নতুন উচ্চ ফলনশীল (উফশী), হাইব্রিড বা জিএম জাতের ধান। আর এগুলো প্যাটেন্ট করে নিয়ে বহুজাতিক কোম্পানিগুলো একচেটিয়া ব্যবসা করে একদিকে যেমন মুনাফা লুটছে এবং অন্যদিকে জিম্মি করে ফেলছে আমাদের মতো তৃতীয় বিশ্বের কৃষক ও গোটা কৃষি ব্যবস্থাকে।
বহুজাতিক কোম্পানিগুলো জীববৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ এশিয়া ও আফ্রিকার দেশগুলো থেকে হাজার বছর ধরে লালিত প্রাণসম্পদ (উদ্ভিদ ও প্রাণী) চুরি বা একার্থে ডাকাতি করে নিয়ে গিয়ে প্যাটেন্ট করে নিচ্ছে। নিন্মে এরকম দুটি উদাহরণ তুলে ধরা হল।
উদাহরণ-১: বাসমতি ধানের প্যাটেন্ট
বাসমতি অত্যন্ত উচ্চ মানের একটি সুগন্ধি জাতের ধান। ভারত ও পাকিস্তানের কৃষকরা বহু শতাব্দী ধরে এই ধান চাষ করে আসছে। ১৯৯৭ সালে ভারত এককভাবে বিশ্বের চার ভাগের তিনভাগ বাসমতি চাল রপ্তানি করেছে এবং ১৯৯৮ সালে ভারত শুধু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ৬ লাখ টন বাসমতি চাল রপ্তানি করেছে। বাসমতি চালের এরূপ বাজার চাহিদা দেখে এই ধানের একচ্ছত্র মালিকানা গ্রাস করার মতলব আটে রাইসটেক নামের একটি মার্কিন কোম্পানি। এই কোম্পানি বাসমতি ধানের সাথে একটি মার্কিন জাতের শংকরায়নের মাধ্যমে নতুন ধরনের একটি জাত আবিষ্কার করে। মজার ব্যাপার হচ্ছে, কোম্পানিটি তাদের আবিষ্কৃত জাতটির নতুন কোন নাম না দিয়ে তা বাসমতি নামেই ১৯৯৭ সালে ইউএস প্যাটেন্ট এন্ড ট্রেডমার্ক অফিস থেকে অজ্ঞাতসারে এর প্যাটেন্ট লাভ করে। এই প্যাটেন্ট লাভের ফলে তাদের আবিষ্কৃত জাতসহ বাসমতি নামের সকল জাতের মালিক বনে যায় ঐ কোম্পানি। কারণ, ট্রিপস চুক্তির প্যাটেন্ট আইন অনুসারে রাইসটেককে রয়্যালটি না দিয়ে কেউ বাসমতি নামের কোন ধান বা চাল উৎপাদন, ব্যবহার, বাজারজাতকরণ ও রপ্তানি করতে পারবে না। যাহোক, ভারত সরকার বাসমতির প্যাটেন্টকে চ্যালেঞ্জ করে ইউএস প্যাটেন্ট এন্ড ট্রেডমার্ক অফিসে মামলা দায়ের করে। সর্বশেষ খবর হল রাইসটেক বাসমতি নামে তার আবিষ্কৃত জাতের প্যাটেন্ট পায় নি, পেয়েছে ভিন্ন নামে।
উদাহরণ-২: নিমের প্যাটেন্ট
নিম ভারতীয় উপমহাদেশের একটি অতি মূল্যবান ভেষজ উদ্ভিদ। নিমকে জাতিসংঘ একুশ শতকের উদ্ভিদ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। নিমের জৈব ও ভেষজ গুণ সর্বজনবিদিত। হাজার বছর ধরে এ উপমহাদেশের মানুষ বিভিন্ন রোগের ঔষধ, পোকামাকড় দমন ইত্যাদি বিভিন্ন কাজে নিম ব্যবহার করে আসছে। নিমের এরূপ গুরুত্বের কথা বিবেচনা করে এটাকে কুক্ষিগত করার মতলব আটে ‘ডবিøও আর গ্রেস’ নামের একটি মার্কিন বহুজাতিক কোম্পানি। রবার্ট লারসন নামক এক মার্কিন বিজ্ঞানী নিমের বীজ থেকে ছত্রাকনাশক তৈরি করে বললেন যে, এটা তার নতুন আবিষ্কার। এরপর লারসন তার এই আবিষ্কার দেড় লাখ মার্কিন ডলারের বিনিময়ে বেচে দিলেন ‘ডব্লিও আর গ্রেস’ নামের একটি মার্কিন বহুজাতিক কোম্পানির কাছে। ‘ডব্লিও আর গ্রেস’ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগ ১৯৯৫ সালে জার্মানির মিউনিখে অবস্থিত ইউরোপিয়ান প্যাটেন্ট অফিস থেকে অজ্ঞাতসারে নিমের প্যাটেন্ট লাভ করে। এই প্যাটেন্ট লাভের ফলে উক্ত কোম্পানি নিম নিয়ে সারা বিশ্বে একচেটিয়া বাণিজ্য করার অধিকার পায়। ফলে, যে নিম আমাদের নিজস্ব সম্পদ এবং যে নিম হাজার বছর ধরে ভারতীয় উপমহাদেশের কৃষকরা ছত্রাকনাশক ও বালাইনাশক হিসেবে ব্যবহার করে আসছে সে নিমের মালিক বনে যায় উক্ত কোম্পানি। অর্থাৎ কোম্পানিকে রয়্যালটি না দিয়ে কোন কৃষক বালাইনাশক হিসেবে আর এই নিম ব্যবহার করতে পারবেনা। প্যাটেন্ট আইন অনুসারে যদি কোন কৃষক কোম্পানিকে রয়্যালটি না দিয়ে তার বাড়ির গাছের নিমের বীজ নিজের জমিতে বালাইনাশক হিসেবে ব্যবহার করে তবে তা হবে প্যাটেন্ট আইনের লঙ্ঘন। এজন্য উক্ত কোম্পানি সেই কৃষকের বিরূদ্ধে মামলা করতে পারবে যে মামলায় সে কৃষকের জেল জরিমানা হবে। এর চেয়ে দুঃখজনক আর কী হতে পারে! এই প্যাটেন্টের বিরুদ্ধে তখন ইউরোপিয়ান পার্লামেন্টের গ্রীন পার্টি, ভারতের পরিবেশবাদী বিজ্ঞানী বন্দনা শিবা ও ইন্টারন্যাশনাল ফোরাম ফর অর্গানিক এগ্রিকালচার মুভমেন্ট (আইফোম) মিলে ইউরোপিয়ান প্যাটেন্ট অফিসে মামলা দায়ের করে এবং তারা তথ্য ও দলিলপত্র উপস্থাপন করে প্রমাণ করতে সক্ষম হয় যে বালাইনাশক হিসেবে নিমের ব্যবহার নতুন কোন আবিষ্কার নয়। যার প্রেক্ষিতে ২০০০ সালে এই প্যাটেন্ট বাতিল করা হয়। এরপর উক্ত কোম্পানি এই রায়ের বিরূদ্ধে আপিল করে যা ইউরোপিয়ান প্যাটেন্ট অফিস ২০০৫ সালে খারিজ করে দেয়।
যাহোক, উপরের দুটি উদাহরণ থেকে এটা সুস্পষ্ট যে, এভাবে বিভিন্ন বহুজাতিক কোম্পানি সারা বিশ্ব, বিশেষ করে এশিয়া ও আফ্রিকা থেকে কৌলিক সম্পদ (জেনেটিক রিসোর্স) চুরি করে প্যাটেন্ট করে নিচ্ছে। বিশ্বে ধানের উপর এ পর্যন্ত দুই শতাধিক প্যাটেন্ট দেওয়া হয়েছে যার অধিকাংশই নিয়েছে মার্কিন ও জাপানি কোম্পানি।
উন্নয়নশীল দেশের খাদ্য নিরাপত্তায় ট্রিপস চুক্তির প্রভাব
শংকরায়নের মাধ্যমে ধানের নতুন নতুন জাতের আবিষ্কার শুরু হয় মাত্র ষাটের দশক থেকে। তা হলে প্রশ্ন জাগতে পারে যে, এর আগে হাজার হাজার বছর ধরে যেসব ধান চাষ হয়ে আসছে তার আবিষ্কারক কে? উত্তরও সবার জানা। বংশ পরম্পরায় নিজস্ব জ্ঞান থেকে কৃষকেরাই আবিষ্কার করেছে এসব জাত। কিন্তু প্যাটেন্ট আইনের আওতায় এসব জাতের প্যাটেন্ট হতে পারে না। কারণ, এগুলোকে আবিষ্কার হিসেবেই গণ্য করা হয় না। ট্রিপস চুক্তি বিজ্ঞান ও উন্নয়নের এমন এক ধারণার উপর প্রতিষ্ঠিত যা প্রাকৃতিক পদ্ধতিতে বংশ বিস্তারকে বিজ্ঞানভিত্তিক বা মৌলিক আবিষ্কার হিসেবে স্বীকৃতি দেয় না, বরং স্বীকৃতি দেয় বাণিজ্যিক সম্ভবনাময় আবিষ্কারকে।
যে জাত জৈবিক পদ্ধতি (বায়োলজিক্যাল প্রসেস) ব্যবহার করে তৈরি করা হয় কেবল তাকেই ট্রিপস চুক্তিতে আবিষ্কার হিসেবে ধরা হয়। যদিও এগুলো শত শত বছর ধরে প্রাকৃতিক শংকরায়নের ফলে সৃষ্ট এবং কৃষকের দ্বারা আবিষ্কৃত জাত ব্যবহার করেই তৈরি করা হয়ে থাকে। অর্থাৎ ট্রিপস চুক্তি নিজস্ব ফসলের উপর কৃষকগোষ্ঠীর সার্বভৌম অধিকারের স্বীকৃতি দেয় না। অথচ ব্যক্তি বিশেষ বা কোম্পানি তাদের উদ্ভাবিত নতুন জাতের ফসলের উপর প্যাটেন্ট পেয়ে যায়।
তৃতীয় বিশ্বের গরীব দেশগুলোর স্থানীয় জাত ব্যবহার করে উদ্ভাবিত নতুন জাতের উপর কোম্পানিগুলোর প্যাটেন্ট পাওয়ার অর্থ হল জৈবস্বত্ব অপহরণ। তৃতীয় বিশ্বের (উন্নয়নশীল ও স্বল্পোন্নত দেশের) স্থানীয় প্রজাতির নমুনা বিনা অনুমতিতে নিয়ে গিয়ে তা থেকে নতুন জাত তৈরি করা হয়। অথচ তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর কৃষকরা যদি এই নতুন ফসল ফলাতে চায় তা হলে আবিষ্কারক কোম্পানির কাছ থেকে তা কিনে নিতে হবে।
আজকাল ক্ষুধা ও দারিদ্র বিমোচনের নামে উন্নয়নশীল ও স্বল্পোন্নত দেশের কৃষকের উপর উচ্চ ফলনশীল, হাইব্রিড ও জিএম শস্য কৌশলে চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এর মূল লক্ষ্য হল ধনী দেশগুলোর প্যাটেন্টকৃত বীজ ও রাসায়নিক সামগ্রির উপর তৃতীয় বিশ্বের কৃষকদেরকে আরও বেশি নির্ভরশীল করে তোলা। প্যাটেন্টকৃত হওয়ার কারণে এসব প্রযুক্তির মূল্যের ক্ষেত্রে কোন প্রতিযোগিতার সুযোগ থাকেনা বলে এগুলো এমনিতেই উচ্চ মূল্যের হয়ে থাকে। তদুপরি, অতি মুনাফালোভী ব্যবসায়ি কর্তৃক কৃত্রিম মূল্য বৃদ্ধির আশঙ্কা সর্বদাই থেকে যায়। অর্থাৎ প্যাটেন্টধারী কোম্পানিগুলোর একচেটিয়া ব্যবসার লাইসেন্স হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে ট্রিপস চুক্তিটি।
Mar 30, 2025 | প্রকৃতি কথা
অধ্যায়-৪
কৃষিচুক্তি ও বাংলাদেশের কৃষি
কৃষিচুক্তির পটভূমি:
১৯৯৫ সালে গ্যাট-এর উরুগুয়ে রাউণ্ডের সিদ্ধান্ত মোতাবেক কৃষিকে বাণিজ্যের আওতায় আনার লক্ষ্যে কৃষিচুক্তি প্রণীত হয়। এ চুক্তির লক্ষ্য হল সারাবিশ্বে কৃষিপণ্যের অবাধ বাণিজ্য নিশ্চিত করা। ধনী দেশসমূহ তাদের অভ্যন্তরীণ কৃষি নীতিকে আড়াল করার জন্যই এতদিন গ্যাট-এর আলোচনায় কৃষি বিষয়টাকে আনেনি। তারা শিল্প ও সেবা খাতের আয়কৃত অর্থে কৃষিকে আধুনিকীকরণ করেছে। প্রচুর পরমাণে ভর্তুকী দিয়ে বড় বড় কৃষি খামার প্রতিষ্ঠা করেছে। রপ্তানি ভর্তুকী দিয়ে একদিকে অন্তর্জাতিক বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে অন্যদিকে, নিজেদের বাজারে অন্যের প্রবেশকে ঠেকিয়ে রেখেছে। কিন্তু এভাবে আর কতদিন রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় ঘটবে। এখন সময় এসেছে অর্থ উপার্জনের। তাই কৃষি বাণিজ্যের প্রসার ঘটাতে হবে। অনুন্নত বিশ্বের কৃষিকে ধ্বংস করে আন্তর্জাতিক বাজারে একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্য নিয়েই আন্তর্জাতিক বাণিজ্য আলোচনায় কৃষিকে সম্পৃক্ত করা হয়। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার বিভিন্ন চুক্তি যেমন: কৃষিচুক্তি, বাণিজ্য সংক্রান্ত মেধাস্বত্ব চুক্তি (ট্রিপস) এবং সেনিটারি ও ফাইটোসেনিটারি চুক্তির মূলমন্ত্র হচ্ছে অনুন্নত দেশের কৃষিকে ধ্বংস করে ধনী বিশ্বের একচেটিয়া ব্যবসা ও মুনাফা অর্জনের পথ সুগম করা।
কৃষিচুক্তির সার-সংক্ষেপ:
কৃষিচুক্তির মূল স্তম্ভ হল তিনটি, যথা:
১) বাজার প্রবেশাধিকার
২) রপ্তানি ভর্তুকী এবং
৩) অভ্যন্তরীণ সহায়তা।
স্বল্পোন্নত দেশ ছাড়া বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার বাকি সকল সদস্য কৃষি বাণিজ্য উদারীকরণের লক্ষ্যে উক্ত তিনটি বিষয়ে যেসব অঙ্গীকারে আবদ্ধ হয়েছ সেগুলো নিম্নে তুলে ধরা হলো।
১। বাজার প্রবেশাধিকার
কোন দেশের পণ্য অন্য দেশের বাজারে প্রবেশ করতে গেলে সাধারণত দুই ধরনের বাধার সন্মুখীন হতে হয়। যথাঃ
১. শুল্ক বাধা ও
২. অশুল্ক বাধা।
অবাধ বাণিজ্যের জন্য এসব বাধা দূর করা আবশ্যক। এসব বাধা দূর করার জন্য চুক্তিতে নিম্নরূপ বিধান রাখা হয়েছে।
- কোন দেশ যাতে তার পণ্যসামগ্রী নিয়ে অন্য দেশের বাজারে অবাধে প্রবেশ করতে পারে সেজন্য সকল অশুল্কজাত বাধাসমূহকে দূর করে তাকে সরল শুল্কে রূপান্তরিত (টেরিফিকেশন) করতে হবে।
- শুল্ক আরোপের একটি নির্দিষ্ট সীমা থাকবে যার বেশি শুল্ক বাড়ানো যাবে না।
- ধনী দেশগুলো ৬ বছরের মধ্যে সকল পণ্যের জন্য গড়ে ৩৬% এবং আলাদাভাবে কোন একটি পণ্যের জন্য কমপক্ষে ১৫% শুল্ক কমাবে।
- উন্নয়নশীল দেশগুলো ১০ বছরের মধ্যে সকল পণ্যের জন্য গড়ে ২৪% এবং আলাদাভাবে কোন একটি পণ্যের জন্য কমপক্ষে ১০% শুল্ক কমাবে।
এখানে উল্লেখ্য যে, বাংলাদেশের মত স্বল্পোন্নত দেশগুলোর জন্য উপরোক্ত বাধ্যবাধকতা প্রযোজ্য নয়। কিন্তু দুঃখজনক হলেও আমাদের সবারই জানা যে, বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ-এর মতো সংস্থাগুলো কিভাবে এসব দেশকেই শুল্ক ও অশুল্ক বাধাসমূহ দূর করে বাজার উন্মুক্ত করে দিতে বাধ্য করে থাকে।
২। রপ্তানি ভর্তুকী
কৃষি পণ্য রপ্তানিতে অনেক দেশই ভর্তুকী দিয়ে থাকে যা আমদানিকারক দেশের কৃষিকে ক্ষতিগ্রস্থ করে এবং ঐ আমদানিকারক দেশের রপ্তানিকে বাধাগ্রস্ত করে। উদাহরণস্বরূপ বাংলাদেশ ও ইন্ডিয়া উভয় দেশই পাটজাত দ্রব্য রপ্তানি করে থাকে। ধরা যাক, ইণ্ডিয়া রপ্তানি ভর্তুকী দেয় কিন্তু বাংলাদেশ দেয় না। এমতাবস্থায়, ইন্ডিয়া বাংলাদেশের চেয়ে কম দামে আন্তর্জাতিক বাজারে পাট বিক্রী করতে পারবে। ফলে, বাংলাদেশ তার রপ্তানি-বাজার হারাবে। এভাবে রপ্তানি ভর্তুকি আন্তর্জাতিক অবাধ বাণিজ্যকে বাধাগ্রস্ত করে থাকে। এরূপ বাধা দূর করার জন্য চুক্তিতে নিম্নরূপ বিধান রাখা হয়েছে।
ধনী দেশগুলো ১৯৮৬ থেকে ১৯৯০ সালের মধ্যে যে হারে রপ্তানি ভর্তুকী দিয়েছে ৬ বছরের মধ্যে সে ভর্তুকীর পরিমাণ কমাবে ৩৬% এবং যেসব পণ্যের ক্ষেত্রে ভর্তুকী দেওয়া হয় সেসব পণ্যের রপ্তানি কমাবে ২৪%। পক্ষান্তরে, উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য তা হবে যথাক্রমে ২৪% ও ১০% এবং সময়সীমা হবে ১০ বছর। এছাড়া সকল পণ্যের জন্য গড়ে ৩৬% এবং আলাদাভাবে কোন একটি পণ্যের জন্য কমপক্ষে ১৫% ভর্তুকী কমাবে।
বাজার প্রবেশাধিকারের ন্যায় রপ্তানি ভর্তুকির ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের মত স্বল্পোন্নত দেশগুলোর জন্য উপরোক্ত বাধ্যবাধকতা প্রযোজ্য নয়। কিন্তু দুঃখজনক হলেও আমাদের সবারই জানা যে, বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ-এর মতো সংস্থাগুলো কিভাবে এসব দেশকেই ভর্তুকি না দিতে বাধ্য করে থাকে।
৩। অভ্যন্তরীণ সহায়তা
বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার কৃষিচুক্তিতে অভ্যন্তরীণ সহায়তা বা ভর্তুকীকে তিনটি শ্রেণীতে ভাগ করা হয়েছে এবং এগুলোকে চুক্তিতে কয়েকটি বক্স আকারে উপস্থাপন করা হয়েছে। যথাঃ ক) অ্যাম্বার বক্স খ) বøু বক্স ও গ) গ্রীন বক্স (এ বক্সগুলোর ব্যাখ্যা পরবর্তীতে টীকা আকারে দেওয়া হল) এগুলোর মধ্যে শুধু অ্যাম্বার বক্স ভর্তুকী কমানোর ব্যাপারে নিম্নরূপ বিধান রাখা হয়েছে, কিন্তু ব্লু-বক্স বা গ্রীন-বক্স ভর্তুকী কমানোর কোন অঙ্গীকার করা হয় নি।
ধনী দেশগুলো ১৯৮৬ সাল থেকে ১৯৮৮ সালের মধ্যে যে হারে অ্যাম্বার বক্স ভর্তুকী দিয়েছে ১৯৯৫ সালের পরবর্তী ৬ বছরের মধ্যে গড়ে তার ২০% কমাবে। পক্ষান্তরে, উন্নয়নশীল দেশগুলো কমাবে ১৩% এবং তার সময়সীমা হবে ১০ বছর।
এক্ষেত্রেও বাংলাদেশের মত স্বল্পোন্নত দেশগুলোর জন্য উপরোক্ত বাধ্যবাধকতা প্রযোজ্য নয়। কিন্তু দুঃখজনক হলেও আমাদের সবারই জানা যে, বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ-এর মতো সংস্থাগুলো কিভাবে এসব দেশকেই ভর্তুকি না দিতে বাধ্য করে থাকে।
টীকা-(১) : অ্যাম্বার বক্স
যেসব অভ্যন্তরীণ ভর্তুকী কৃষি উৎপাদন ও বাণিজ্যের জন্য ক্ষতিকারক হিসেবে বিবেচনা করা হয়, সেসব ভর্তুকী অ্যাম্বার বক্স-এর আওতাভুক্ত। ধনী দেশে কোন ফসলের বাজার মূল্য যদি উৎপাদন ব্যয় থেকে কম হয় বা লাভজনক না হয় তবে সরকার কৃষকদের ক্ষতি পুষিয়ে দেবার জন্য সরাসরি মূল্য ভর্তুকি দিয়ে থাকে। তা ছাড়া, ফসলের উৎপাদন ব্যয় কমানোর জন্য সরকার স্বল্পমূল্যে বা বিনা মূল্যে বিভিন্ন উৎপাদন উপকরণ কৃষকদেরকে সরবরাহ করে থাকে। যেমন, সারের বাজারমূল্য কম ও স্থিতিশীল রাখার জন্য বাংলাদেশ সরকার যে ভর্তুকী দেয় তা অ্যাম্বার বক্স-এর আওতাভুক্ত হবে। ধনী দেশের কৃষকরা প্রচুর পরিমানে এ ধরণের ভর্তুকি পেয়ে থাকে। কৃষিচুক্তি অনুযায়ী কেবলমাত্র এ ধরণের ভর্তুকী কমানোর অঙ্গীকার করা হয়েছে যা পূর্বেই আলোচিত হয়েছে।
টীকা-(২) : ব্লু বক্স
অনেক দেশে বিশেষ করে ধনী দেশগুলোতে জমি বা গবাদি পশুর জন্য কৃষকদেরকে ভর্তুকি দেওয়া হয়। যেমনঃ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি হেক্টর জমির জন্য বছরে ৫৩০ ডলার এবং প্রতিটি গাভীর জন্য প্রতিদিন ২ ডলার ভর্তুকী দেওয়া হয়। জার্মানীতে যে কৃষকের ৮০-১০০টি গরুর একটি ছোট খামার আছে সেই কৃষক প্রতি বছর সরকার থেকে ৩০০০০ ইউরো বা প্রায় ৩০ লক্ষ টাকা ভর্তুকি পায়। যদি খামারটি হয় অর্গানিক খামার তবে এই ভর্তুকির পরিমান বছরে ৫০০০০ ইউরো বা প্রায় ৫০ লক্ষ টাকা। আবার ধরা যাক মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এ বছর রপ্তানী ও অভ্যন্তরীণ চাহিদা মিলে গমের মোট চাহিদা এক কোটি টন। কিন্তু দেখা গেল কৃষকদের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা দেড় কোটি টন। এমতাবস্থায়, গমের বাজার যাতে স্থিতিশীল থাকে সেজন্য সরকার কৃষকদের জন্য উৎপাদন কোটা নির্ধারণ করে দেয় যাতে এক কোটি টনের বেশি উৎপাদন না হয় এবং তার জন্য কৃষকদেরকে ভর্তুকি প্রদান করে থাকে। আশ্চর্যের ব্যাপার হল এরূপ ভর্তুকীকে বাণিজ্যের জন্য তেমন ক্ষতিকর হিসেবে বিবেচনা করা হয় নি। অথচ একথা একজন সাধারণ মানুষের জন্যও বুঝতে কষ্ট হওয়ার কথা নয় যে, এরূপ ভর্তুকিপ্রাপ্ত কৃষকের পণ্য যখন বাংলাদেশের মতো গরীব দেশের বাজারে আসে তখন গরীব দেশের কৃষকরা এক অসম প্রতিযোগিতার মুখোমুখি হয়। কারণ, বাংলাদেশের মতো গরীব দেশের কৃষকরা মোটেও ভর্তুকি পায়না বা পেলেও তা নামমাত্র। উদাহরণস্বরূপ ধরা যাক, এক মন গম উৎপাদন করতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একজন কৃষকের খরচ হল ৫০০ টাকা এবং সে রাষ্ট্র থেকে ভর্তুকি পেল ২০০ টাকা। এখন সে কৃষক যদি বাজারে ৫০০ টাকা দরেও গম বিক্রী করে তবে তার লাভ থাকে মনপ্রতি ২০০ টাকা। কিন্তু বাংলাদেশের কৃষকের গমের উৎপাদন খরচ যদি ৫০০ টাকা হয় এবং সে যদি রাষ্ট্র থেকে কোন ভর্তুকি না পায় তবে সে গম ৫০০ টাকা দরে বিক্রী করলে কোন লাভই থাকবেনা। ফলে, তাকে বাজারের প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে গম চাষ করা ছেড়ে দিতে হবে। যাহোক, কৃষিচুক্তি অনুযায়ী এরূপ ভর্তুকী কমানোর কোন বাধ্যবাধকতা রাখা হয় নি।
টীকা-(৩) : গ্রীন বক্স
কোন কোন ভর্তুকীকে উৎপাদন ও বাণিজ্যের জন্য তেমন ক্ষতিকর নয় বলে বিবেচনা করা হয় কারণ কোন কিছু উৎপাদন না করেও কৃষকরা এরূপ ভর্তুকী পেতে পারে। এরূপ ভর্তুকী গ্রীন বক্সের আওতাভুক্ত। পরিবেশ উন্নয়ন কর্মসূচি , সরকারি সেবা কর্মসূচি (কৃষি গবেষণা, স¤প্রসারণ, বালাই দমন, অবকাঠামো উন্নয়ন ইত্যাদি), সরকারি খাদ্য নিরাপত্তা কর্মসূচি , প্রাকৃতিক দুর্যোগকালীন সহায়তা, সরকারি বীমা ও আয় নিরাপত্তা কর্মসূচি , কৃষকদের অবসরকালীন সহায়তা কর্মসূচি , অনুন্নত/পশ্চাদপদ এলাকার কৃষকদের জন্য বিশেষ সহায়তা ইত্যাদি নানা ধরনের কর্মসূচি র মাধ্যমে সরকার কৃষকদেরকে প্রচুর পরিমানে সহায়তা বা ভর্তুকী দিয়ে থাকে। কৃষিচুক্তি অনুযায়ী এরূপ ভর্তুকী কমানোর কোন বিধান রাখা হয় নি।
উপরে বর্ণিত টীকাগুলো থেকে দেখা যাচ্ছে যে, শুধু অ্যাম্বার বক্স-এর আওতাভুক্ত ভর্তুকী কমানোর জন্য কৃষিচুক্তিতে অঙ্গীকার করা হয়েছে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি এই যে, ভর্তুকী কমানোর অঙ্গীকার বাস্তবায়নের নির্ধারিত সময়সীমা অনেক আগেই পার হয়ে গেলেও ধনী দেশগুলো ভর্তুকীতো কমায়নিই বরং তা বাড়িয়েছে। মজার ব্যাপার এই যে, এসব দেশ অ্যাম্বার বক্স-এর আওতাভূক্ত ভর্তুকীকে নাম ও রূপ বদল করে বøু বক্স ও গ্রীন বক্সের আওতাভুক্ত করে তার পরিমাণ আরও বাড়িয়েই চলেছে। প্রকৃত প্রস্তাবে, ভর্তুকিকে এ ধরণের বিভিন্ন বক্সে ফেলে ধনী দেশগুলো এক ধরনের ধোকাবাজির খেলা খেলছে যা অসহায়ের মতো দেখছে স্বল্পোন্নত দেশগুলো। ধনী বিশ্বের ছলচাতুরি ও ধোকাবাজির এখানেই শেষ নয়। ধনী বিশ্বের কৃষি, কৃষক ও কৃষি বাজারকে সুরক্ষিত রাখার জন্য কৃষিচুক্তিতে আরও যেসব কৌশল অবলম্বন করা হয়েছে সেগুলো নিন্মে সংক্ষেপে আলোচিত হল।
(ক) ডি মিনিমাস
পূর্বেই আলোচিত হয়েছে যে, বাজার মূল্য ভর্তুকী, উপকরণ সহায়তা ইত্যাদি অ্যাম্বার বক্স-এর আওতাভুক্ত যা হ্রাস করার জন্য কৃষিচুক্তিতে সুষ্পস্টভাবে অঙ্গীকার করা হয়েছে। কিন্তু কৃষিচুক্তির ৬.৪ ধারায় কৌশলে অনেক পণ্যকে ভর্তুকি কমানোর অঙ্গীকারের বাইরে রাখার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। চুক্তির এই ধারায় বলা হয়েছে-
- ধনী দেশগুলোর ক্ষেত্রে কোন পণ্যের জন্য মূল্য ভর্তুকী ও উপকরণ সহায়তা যদি এক বছরে ঐ পণ্যের মোট উৎপাদন খরচের ৫%-এর বেশি না হয় তবে তা ভর্তুকী কমানোর অঙ্গীকারের আওতাভূক্ত হবে না।
- উন্নয়নশীল দেশের ক্ষেত্রে এই ডি মিনিমিস লেভেল হবে ১০%।
উল্লেখ্য যে, এই কৌশল ব্যবহার করে ধনী দেশের বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অনেক কৃষি পণ্যকে ভর্তুকি হ্রাসের অঙ্গীকারের বাইরে রাখা সম্ভব হয়েছে।
(খ) বিশেষ নিরাপত্তা (Special Safeguard)
একটি দেশে কোন পণ্যের আমদানী হঠাৎ খুব বেড়ে গেল বা দাম কমে গেলে একই ধরণের দেশীয় পণ্যকে রক্ষার জন্য সে দেশ ঐ আমদানীকৃত পণ্যের উপর বাড়তি শুল্ক আরোপ করতে পারবে। উরুগুয়ে রাউন্ডে কৃষিচুক্তি প্রণয়নকালীন সময়ে যেসব দেশে অশুল্ক বাধা ছিল কেবলমাত্র সেসব দেশ এই সুবিধার আওতাভূক্ত হয়েছে। এই দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে ১৬ টি শিল্পোন্নত এবং ২২ টি উন্নয়নশীল দেশ। উল্লেখ্য যে, এই সুবিধার আওতায় মোট ৬০৭২ টি পণ্য চিহ্নিত করা হয়েছে যার মধ্যে ৪১৪২ টি পণ্য (৬৮.২%) শিল্পোন্নত দেশে এবং মাত্র ১৯৩০ টি পণ্য (৩১.৮%) উন্নয়নশীল দেশে পাওয়া যায়। স্বল্পোন্নত দেশগুলো এই সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়েছে।
(গ) শান্তি ধারা (Peace Clause)
যদি অন্যান্য দেশ ভর্তুকী কমানোর অঙ্গীকার পূরণে ব্যর্থ হয় তবে শিল্পোন্নত দেশগুলোর ভর্তুকী ব্যবস্থার উপর যাতে কোন বিরূপ প্রভাব না পড়ে তার জন্য এ ধারাটির প্রবর্তন করা হয়। ২০০৩ সালে এ ধারার মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে।
(ঘ) উচ্চ শুল্ক (High Tarrif or Tariff Peak)
কৃষিচুক্তির শর্তে বলা হয়েছে যে, ধনী দেশগুলো ৬ বছরের মধ্যে সকল পণ্যের জন্য গড়ে ৩৬% এবং আলাদাভাবে কোন একটি পণ্যের জন্য কমপক্ষে ১৫% আমদানী শুল্ক কমাবে। এখানে ধনী বিশ্বের একটি গভীর চালবাজি লক্ষ্য করা যায়। উরুগুয়ে রাউন্ডের আলোচনা যখন চলছিল তখনই ধনী দেশগুলো তাদের বিভিন্ন পণ্যের উপর এমনভাবে আমদানী শুল্ক আরোপ করে যাতে শুল্ক কমানো হলেও তাদের নিজেদের বাজার সংরক্ষণের ক্ষেত্রে কোন সমস্যায় পড়তে না হয়। এক হিসেবে দেখা যায় যে, ১৯৮৯-৯৩ সময়কালে ইউরোপ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যে গড় শুল্ক হার ছিল ২০০০ সালের মধ্যে তা ৭০-৭৫% পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়েছিল। যেহেতু কৃষিচুক্তি অনুসারে ১৯৯৫-২০০১ সময়কালের মধ্যে গড় শুল্ক ৩৬% কমানোর অঙ্গীকার করা হয়েছিল তাই আমদানী শুল্ক গড়ে ৩৬% কমালেও এখনও তাদের অধিকাংশ পণ্যের ক্ষেত্রে উচ্চ আমদানী শুল্ক (ঐরভয ঞধৎৎরভভ ড়ৎ চবধশং) বজায় রয়েছে।
এখানে উল্লেখ্য যে, সকল পণ্যের উপর থেকে গড়ে ৩৬% শুল্ক কমানোর কথা বলা হয়েছে সব পণ্য থেকেই কমপক্ষে ৩৬% শুল্ক কমানোর কথা বলা হয় নি। যেহেতু গড়ে ৩৬% শুল্ক কমানোর কথা তাই তারা এমনসব পণ্য থেকে বেশি হারে শুল্ক কমায় যেগুলো নিজেরা উৎপন্ন করেনা বা করলেও সেগুলো তাদের বাজারের জন্য বা কৃষকদের জন্য তেমন গুরুত্বপূর্ণ নয়। পক্ষান্তরে, গুরুত্বপূর্ণ পণ্যেগুলোর ক্ষেত্রে উচ্চহারে শুল্ক আরোপ করে গড় হিসাব ঠিক রাখা হয়। ধরা যাক, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কাঁচা পাটের উপর আমদানী শুল্ক আছে ৮০% এবং তুলার উপর আমদানী শুল্ক আছে ৯০% অর্থাৎ গড় শুল্ক ৮৫%। এখন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পাট উৎপন্ন করে না এবং বাইরে থেকে তার দেশে কাঁচা পাট ঢুকার কোন সম্ভাবনাও নেই বা ঢুকলেও কোন সমস্যা নেই। অন্যদিকে, তুলা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পণ্য। বাইরে থেকে কোন তুলা যাতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে না ঢুকতে পারে সেজন্য তুলায় উচ্চ হারে শুল্ক আরোপ করতে হবে। কিন্তু তাকে মোটের উপর ৩৬% শুল্ক কমাতে হবে অর্থাৎ গড় শুল্ক হবে (৮৫-৩৬)=৪৯%। কাজেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যদি কাঁচা পাটের শুল্ক কমিয়ে ০% করে দেয় এবং তুলার শুল্ক বাড়িয়ে ৯৮% করে তবুও গড় শুল্ক হবে ৪৯%। অর্থাৎ শুল্ক কমানো হল ৩৬% কিন্তু তুলার শুল্ক বাড়ানো হল ৮%। এভাবে তারা শুল্ক হ্রাসের গড় হার ঠিক রেখে নিজেদের কৃষি বাজারকে সুরক্ষিত রাখে।
(ঙ) মই শুল্ক (Tariff Escalation)
ধনী দেশগুলো চায় না যে, তৃতীয় বিশ্বে শিল্পের বিকাশ ঘটুক। বরং তারা চায় তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলো তাদের শিল্পের কাঁচামাল যোগান দিক। এজন্য তারা যে কৌশল অবলম্বন করে তা হল কাঁচামালের উপর খুব কম হারে শুল্ক আরোপ করা কিন্তু সে কাঁচামাল থেকে শিল্পজাত কোন পণ্য তৈরি করে বিক্রি করতে গেলে তার উপর অধিক হারে শুল্ক আরোপ করা। এরূপ শুল্ককে মই শুল্ক বলা হয়। ধরা যাক, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তুলা, সূতা, কাপড় ও তৈরি পোশাকের ক্ষেত্রে যথাক্রমে ৫%, ৩০% ৪০% ও ৫০% হারে শুল্ক আরোপ করল। এমতাবস্থায়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে সুতা, কাপড় বা তৈরি পোশাকের চেয়ে তুলা রপ্তানি করাই বেশি লাভজনক হবে। এই তুলা দিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সুতা, কাপড় ও পোশাক তৈরির কারখানা গড়ে উঠবে যা তুলা উৎপাদনকারী দেশে গড়ে উঠবেনা।
(চ) ডাম্পিং (Dumping)
এক কথায় ডাম্পিং হল উৎপাদন খরচের চেয়ে কম দামে কোন দেশে পণ্য বিক্রি করা। ধরা যাক, এ বছর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ১ লক্ষ টন গম উৎপাদিত হল; নিজের দেশে খাদ্য হিসেবে লাগলো ৫০ লক্ষ টন আর রপ্তানি করলো ৩০ লক্ষ টন; বাকি ২০ লক্ষ টন উদ্বৃত্ব রয়ে গেলো যা কোথাও রপ্তানি করতে পারলো না। এমতাবস্থায়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সরকার যদি এ উদ্বৃত্ব গম বেশি দামে কৃষকদের কাছ থেকে কিনে নিয়ে উৎপাদন খরচের চেয়ে কম দামে অন্য কোন দেশে বিক্রি করে দেয় তাকে ডাম্পিং বলা হয়। এটাও ধনী দেশের বাজার দখলের একটি অত্যন্ত কার্যকর কৌশল। ধরা যাক, বাংলাদেশ ইন্ডিয়া থেকে গম আমদানি করে। কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার দেশের অতিরিক্ত গম বাংলাদেশের কাছে বিক্রী করতে চায়। এখন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যদি বাংলাদেশকে ইন্ডিয়ার চেয়ে অনেক কম দামে গম দিতে চায় তা হলে স্বাভাবিকভাবেই বাংলাদেশ ইন্ডিয়া থেকে গম আমদানি বন্ধ করে কম দামে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে গম আমদানি শুরু করবে। ফলে, অষ্ট্রেলিয়া বাংলাদেশের বাজার হারাবে আর তা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দখলে চলে যাবে। কিন্তু বাংলাদেশের গমের চাহিদা যেহেতু সব সময়ই থাকবে তাই পরবর্তীতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র গমের দাম বাড়াতে থাকবে। এমনকি সুযোগ পেলে পূর্বের লোকসানসহ পুষিয়ে নিবে।
এরূপ ডাম্পিং গরীব দেশের কৃষি ও কৃষকের জন্য মারাত্মক বিপদ ডেকে আনতে পারে। যেমনঃ ধরা যাক, কম দামে পেয়ে বাংলাদেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রচুর পরিমাণে গম আমদানি করলো। এতে বাংলাদেশের বাজারে গমের দাম কমে যাবে। ফলে, বাংলাদেশের যেসব কৃষক গম উৎপাদন করবে তারা ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং পরের বার আর গম উৎপাদন করবে না। বাংলােেদশে গমের চাষ কমবে বা বন্ধ হবে এবং গমের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের উপর নির্ভরশীল হবে। তখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের বাজারের একচেটিয়া দখল পেয়ে যাবে। এমতাবস্থায়, তারা ইচ্ছামতো গমের দাম বাড়িয়ে পূর্বের ক্ষতি সুদে-আসলে উঠিয়ে নেবে। এমন ঘটনা আমাদের চোখের সামনেই ঘটছে। যেমন-ইণ্ডিয়া থেকে কম দামে চিনি আসাতে আমাদের দেশের চিনিকল ও আখচাষ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। বিদেশী সোয়াবিন তেল ও ইণ্ডিয়ান পেয়াজ, মসুর ডাল ইত্যাদি আসাতে আমাদের সরিষা, পেয়াজ ও মসুরের চাষ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এরূপ বহু উদাহরণ আমাদের চোখের সামনেই রয়েছে।
স্বাস্থ্য ও উদ্ভিদ স্বাস্থ্য বিষয়ক পদক্ষেপ
স্বাস্থ্য ও উদ্ভিদ স্বাস্থ্য বিষয়ক পদক্ষেপ (Sanitary and Phytosanitary Measures) হল এমন একটি ব্যবস্থা যার মাধ্যমে শিল্পোন্নত দেশগুলো তাদের বাজারে অন্য দেশের পণ্য প্রবেশে বাধার সৃষ্টি করতে পারে। উপরে যেসব সংরক্ষণমূলক ব্যবস্থার কথা আলোচিত হয়েছে সেগুলো দিয়েও যদি কোন পণ্যের অনুপ্রবেশ ঠেকানো না যায় তবে এই ব্যবস্থা দিয়ে সহজেই তা করা যায়। কৃষিচুক্তিতে বলা হয়েছে, বৈজ্ঞানিক ভিত্তির উপর নির্ভর করে প্রত্যেক দেশের নিজস্ব স্বাস্থ্যগত নিারাপত্তা বিধান তৈরি করার অধিকার রয়েছে। অর্থাৎ কোন দেশ এমন আইন প্রবর্তন করতে পারবে যে আইনের বলে সে দেশ মানব ও পশু স্বাস্থ্যের কথা বলে যেকোন দেশের যেকোন পণ্যের আমদানির উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে পারবে। নিচের দুটি উদাহরণ দ্রষ্ঠব্য।
উদাহরণ-১: বাংলাদেশ যে অল্প কয়টি পণ্য বিদেশে রপ্তানি করে চিংড়ি তার একটি। ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের দেশগুলো বাংলাদেশের চিংড়ির প্রধান রপ্তানি বাজার। স¤প্রতি ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন অভিযোগ তুলেছে যে, বাংলাদেশের চিংড়িতে মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ নাইট্রোফোরাম ও কোরামফিনিক্যাল-এর অস্তিত্ব ধরা পড়েছে। অথচ বাংলাদেশের চিংড়ি রপ্তানিকারকরা দাবি করেছে যে, চিংড়ি প্রক্রিয়াজাত করার কাজে তারা কোন রাসায়নিক পদার্থই ব্যবহার করে না। তারপরও রাসায়নিক পদার্থের অস্তিত্ব ধরা পড়ার ঘটনায় তারা উদ্বিগ্ন। এমতাবস্থায়, ইউরোপে চিংড়ি রপ্তানি করতে হলে তাদের দেশের বা তাদের কাছে গ্রহণযোগ্য নির্দিষ্ট কোন ল্যাবরেটরির অত্যন্ত ব্যয়বহুল ছাড়পত্র লাগবে। এই ব্যবস্থা যদি ভাল উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয় তো ভাল, কিন্তু যদি কোন পণ্যের অনুপ্রবেশ ঠেকানোর জন্য করা হয় তবে হাজারো অজুহাতের বাধার পাহাড়ে সে পণ্য আটকে থাকবে, কোনদিন ঢুকতে পারবেনা।
উদাহরণ-২: পাকিস্তান অষ্ট্রেলিয়া থেকে গম আমদানি করে। স¤প্রতি পাকিস্তান অষ্ট্রেলিয়ার গমের মান খারাপ-এ অভিযোগ তুলে অষ্ট্রেলিয়া থেকে গম আমদানি বন্ধ করে দিয়েছে। অথচ অষ্ট্রেলিয়া বলছে পাকিস্তানের অভিযোগ মোটেও সত্য নয়। অষ্ট্রেলিয়া নিরপেক্ষ ল্যাবরেটরীতে গম পরীক্ষা করে দেখার চ্যালেঞ্জ জানিয়েছে। কিন্তু পাকিস্তান এতে কর্ণপাত করে নি।
উপরোক্ত উদাহরণ দুটি থেকে এটা সুস্পষ্ট যে, সত্য-মিথ্যা যাই হোক না কেন স্যানিটারি ও ফাইটোস্যানিটারি পদক্ষেপ দ্বারা মানের প্রশ্ন তুলে কোন দেশ থেকে পণ্য আমদানির উপর নিষেধাজ্ঞা (এরূপ নিষেধাজ্ঞা এক ধরণের অশুল্ক বাধা, যা অবাধ বাজার প্রবেশাধিকারের অন্তরায়) আরোপ করার সুযোগ রয়েছে।
সেনসেটিভ (স্পর্শকাতর) পণ্য
পরিবেশ সংরক্ষণ এবং পলী উন্নয়নের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত কিছু কৃষ পণ্যকে ভর্তুকী হ্রাসের আওতা থেকে বাইরে রাখার জন্য জুলাই ২০০৪ সাল থেকে আলোচনা শুরু করেছে ধনী দেশগুলো। প্রকৃতপক্ষে নিজ দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পণ্যগুলোকে রক্ষা করার এটা একটা নতুন কৌশল ছাড়া আর কিছুই নয়।
সুতরাং উপরোক্ত আলোচনা থেকে স্পষ্টতঃই দেখা যায় যে, ধনী দেশগুলো বিভিন্ন কৌশল এবং আর্থিক ক্ষমতাবলে একদিকে নিজেদের বাজারে বাইরের পণ্যের অনুপ্রবেশে বাধার সৃষ্টি করছে অন্যদিকে, অন্য দেশের বিশেষ করে তৃতীয় বিশ্বের গরীব দেশগুলোর বাজারে অবাধে প্রবেশের সকল ব্যবস্থা পাকাপোক্ত করেছে এবং করছে। ধনী দেশগুলোর এরূপ দ্বিমুখী নীতির নির্মম শিকার বাংলােেদশের মতো গরীব ও দুর্বল দেশগুলো।
বাংলাদেশের কৃষিতে কৃষিচুক্তির প্রভাব
পূর্বেই আলোচনা করা হয়েছে যে, কৃষিচুক্তি বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় অন্তর্ভূক্ত করা হয় মূলত শিল্পোন্নত দেশগুলোর আগ্রহের কারণে। কারণ, সবুজ বিপ্লব প্রযুক্তির (ঊফশী ও হাইব্রিড জাতের বীজ, রাসায়নিক সার ও বালাইনাশক, সেচ যন্ত্রপাতি ও অন্যান্য কৃষি যন্ত্রপাতি) মাধ্যমে এসব দেশ ইতোমধ্যেই কৃষিকে শিল্প বা বাণিজ্যিক কৃষিতে রূপান্তরিত করেছে। এখন তাদের জন্য সবুজ বিপ্লব প্রযুক্তি ও কৃষিপণ্যের বাজার স¤প্রসারণ অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। পক্ষান্তরে, বাংলাদেশের কৃষি মোটেও বাণিজ্যিক কৃষি নয়। কাজেই, কৃষিচুক্তির প্রভাবে বাংলাদেশের কৃষিপণ্য বর্তমান মুক্ত বাজারে এক অসম প্রতিযোগিতার মুখোমুখি হয়েছে। এই অসম প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের কৃষকদের টিকে থাকার কোন সুযোগই নেই। ফলে, কৃষিচুক্তির প্রভাবে বাংলাদেশ একদিকে সবুজ বিপ্লব প্রযুক্তি এবং অন্যদিকে শিল্পোন্নত দেশের কৃষিপণ্যের অবাধ বাজারে পরিণত হয়েছে।
শিল্পোন্নত দেশগুলো তাদের কৃষিতে গড়ে প্রায় ১১০% ভর্তুকী প্রদান করে থাকে। কাজেই কৃষিচুক্তির শর্ত মোতাবেক যদি তারা ২০% ভর্তুকী কমায় তবুও তাদের ৯০% ভর্তুকী বহাল থাকে। যদিও বাস্তব সত্য এই যে, তাদের নিজেদের করা এই অঙ্গীকার পূরণে তারা গড়িমসি ও নানা অপকৌশল অবলম্বন করে যাচ্ছে যা ইতিপূর্বে আলোচনা করা হয়েছে। পক্ষান্তরে, কৃষিচুক্তি মোতাবেক স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে বাংলাদেশের ভর্তুকি কমানোর কোন বাধ্যবাধকতা এখন পর্যন্ত নেই। কৃষিপণ্যে অভ্যন্তরীণ ভর্তুকির সুযোগ থাকলেও দুর্বল অর্থনীতির কারণে বাংলাদেশের মতো দরিদ্র দেশগুলো তা দিতে পারবে না। তা ছাড়া চুক্তি অনুযায়ী ১০% অভ্যন্তরীণ ভর্তুকীর সুযোগ থাকলেও আইএমএফ ও বিশ্ব ব্যাংকের চাপে এ দেশের সরকার তাও দিতে পারছে না। কাজেই, আমদের দেশের কৃষিপণ্য আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্য প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারবে না। ফলে, ভূমিহীন (যাদের কৃষিজমির পরিমাণ ৫০ শতকের কম), ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক চাষী যারা বাংলােেদশের কৃষিনির্ভর জনসংখ্যার প্রায় ৮৮% তারা কৃষিতে টিকে থাকতে পারবে না। এই শ্রেণীর কৃষকরা কৃষিতে চরমভাবে মার খাবে। শেষ সম্বল জমিটুকু বিক্রি করে দিয়ে নিঃস্ব হবে। আর তখন এসব জমি কিনে নিবে বিভিন্ন কোম্পানি ও পুঁজিপতিরা। শুরু হবে কৃষিতে কোম্পানির ব্যাপক বিনিয়োগ এবং কৃষির শিল্পায়ন। বন্ধ হবে আদমজীর মতো কৃষিভিত্তিক দেশীয় শিল্পকারখানা। একক প্রজাতির শস্যের আবাদ, অধিক ফলনের আশায় বিপুল পরিমাণ সার ও বালাইনাশক প্রয়োগ এবং হাইব্রিড ও জিএম শস্যের আবাদে বিনষ্ট হবে বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী ফসল প্রজাতিসমূহ ও পারিবারিক কৃষি ব্যবস্থা। আমাদের কৃষকের জমি কিনে নিয়ে তাদেরই সস্তা শ্রম ব্যবহার করে মুনাফা লুটবে কোম্পানিগুলো।
অন্যদিকে, যদিও বলা হচ্ছে কৃষিতে ভর্তূকী দেওয়া যাবে না বা কমাতে হবে তবুও ধনী দেশগুলো তাদের কৃষিতে ভর্তূকী দিয়েই চলেছে এবং নানা কৌশলে ভর্তুকী প্রদানের পথ তৈরি করে রেখেছে। এসব কৌশলের অন্যতম হল গ্রীন বক্স এবং ব্লু বক্স পলিসি। গ্রীন বক্স পলিসিতে বলা হয়, যে সমস্ত খাত কৃষি পণ্যের দামে সরাসরি প্রভাব ফেলবে না যেমন – কৃষি গবেষণা, স¤প্রসারণ কর্মকাণ্ড, বালাই প্রতিরোধ ও অন্যান্য প্রাতিষ্ঠানিক খরচ ইত্যাদিতে রাষ্ট্রীয়ভাবে অর্থায়ন করা যাবে। বর্তমানে শিল্পোন্নত ধনী দেশ ও তাদের বহুজাতিক কোম্পানিগুলো কৃষি গবেষণায় ব্যাপক বিনিয়োগের মাধ্যমে নতুন নতুন কৃষি প্রযুক্তি যেমন: হাইব্রিড ও জিএম বীজ, রাসায়নিক সার, বালাইনাশক, কৃষি যন্ত্রপাতি ইত্যাদি উৎপাদন করে স্বল্পমূল্যে বা বিনামূল্যে তাদের কৃষকদের হাতে তুলে দিচ্ছে যা আমাদের কৃষকদেরকে উচ্চমূল্যে কিনতে হচ্ছে।
ধনী দেশসমূহ এতদিন কৃষিতে শিল্পায়ন ঘটিয়ে ব্যাপক রাষ্ট্রীয় ভর্তুকী দিয়ে টনে টনে রাসাযনিক সার ও বালাইনাশক জমিতে ফেলেছে। গাছপালা, জীববৈচিত্র্য, পোকামাকড় ও অনুজীব ধবংস করেছে। পরিবেশকে করেছে মারাত্মক সমস্যাগ্রস্ত। খাদ্যের মাধ্যমে এসব বিষ দেহে ঢুকছে। তাই, এখন তারা পরিবেশ সংরক্ষণ ও নিজে বাঁচার তাগিদ অনুভব করছে। ফলে, উদ্ভাবিত সব প্রযুক্তি ঠেলে পাঠাচ্ছে আমাদের দিকে। যাতে আমাদের যা আছে তা হারিয়ে পুরোপুরি নির্ভরশীল হতে হয় তাদের উপর। এবং তারা তখন ইচ্ছামতো দুহাত ভরে মুনাফা লুটবে। যেহেতু বাংলাদেশের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশসমূহ প্রযুক্তিগতভাবে দুর্বল এবং এখনও কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণের ব্যাপক প্রযুক্তি ও সফলতা নেই কাজেই কৃষি কাঁচামালই আমাদেরকে বিক্রি করতে হবে। কৃষিভিত্তিক এ দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে যাবে। যদিও এই শিল্পায়িত কৃষির নিয়ন্ত্রণকারী কর্পোরেশন ও ব্যবসায়ি মহলের আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হবে।
বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার কৃষি বিষয়ক সমঝোতা আলোচনা এবং বাংলাদেশ
বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার সর্বোচ্চ পর্যায়ের সমঝোতা আলোচনা অনুষ্ঠিত হয় সদস্য দেশসমূহের মন্ত্রী পর্যায়ের সম্মেলনে। ১৯৯৫ সাল থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত ৭টি মন্ত্রী পর্যায়ের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে। ১৯৯৬ সালে সিঙ্গাপুরে এবং ১৯৯৮ সালে সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় অনুষ্ঠিত সম্মেলন দুটি মোটামুটি নির্বিঘেœ স¤পন্ন হলেও ১৯৯৯ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সিয়াটলে অনুষ্ঠিত সম্মেলন থেকে সমঝোতা আলোচনা জটিল আকার ধারণ করতে থাকে। মূলত কৃষি ভর্তুকি হ্রাসসহ কৃষিচুক্তিতে ধনী দেশগুলোর দেওয়া অঙ্গীকার বাস্তবায়ন না করার কারণে সমঝোতা আলোচনায় অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়। আফ্রিকান, ক্যারিবিয়ান ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় দেশগুলোর গ্র“প জি-৯০, উন্নয়নশীল দেশের জোট জি-২০ ও স্বল্পোন্নত দেশ মিলে জি-১১০-এর ব্যানারে কৃষি বিষয়ে ঐক্যবদ্ধ অবস্থান গ্রহণ করে। এমতাবস্থায়, সিয়াটল (১৯৯৯), দোহা (২০০১) ও কানকুন (২০০৩) সম্মেলন ব্যর্থতায় পর্যবসিত হওয়ার পর হংকং (২০০৫) সম্মেলন সফল করার জন্য সর্বশক্তি নিয়োগ করে ধনী দেশগুলো। তারা জি-১১০ এর নেতৃত্বদানকারী ভারত ও ব্রাজিলকে বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা ও ছাড় দিয়ে হাত করে নেয় এবং নানা কুটকৌশলে স্বল্পোন্নত দেশগুলোর ঐক্যেও ফাটল সৃষ্টি করার ক্ষেত্রে সফল হয়। উলেখ্য যে, এই সম্মেলনেও ভারত ও ব্রাজিলের নেতৃত্বে উন্নয়নশীল ও স্বল্পোন্নত দেশগুলোর গ্র“প জি-১১০ এর সামনে বিভিন্ন প্রতিশ্র“তির মুলো ঝুঁলিয়ে তাদের স্বার্থ হাসিল করে নেয় ধনী দেশগুলো।
উলেখ্য যে, ২০০৩ সালের কানকুন সম্মেলন ব্যর্থ হওয়ার পর হংকং সম্মেলন সফল করার লক্ষ্যে ২০০৪ সালের ২৭-৩১ জুলাই জেনেভায় অনুষ্ঠিত সংস্থার সাধারণ পরিষদের সভায় এক সমঝোতা আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন কর্তৃক পর্যায়ক্রমে কৃষি ভর্তুকী হ্রাসের পুনঃঅঙ্গীকারের মধ্য দিয়ে ‘জুলাই ফ্রেমওয়ার্ক’ গৃহীত হয় যা বাণিজ্য আলোচনার অচলাবস্থা নিরসনে এবং হংকং সম্মেলনের সফল সমাপ্তিতে কার্যকর ভূমিকা রাখে। গৃহীত জুলাই ফ্রেমওয়ার্ক মূলত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয়ান ইউনিয়ন ও অস্ট্রেলিয়ার মতো ধনী কিছু দেশ এবং ব্রাজিল ও ভারতের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে সমঝোতার একটি কাঠামো যা থেকে বাংলাদেশের মতো স্বল্পোন্নত দেশগুলোর প্রাপ্তির কোন সুযোগ ছিলনা। অথচ এ জুলাই ফ্রেমওয়ার্কের ভিত্তিতেই হংকং-এ সমঝোতা আলোচনা পরিচালিত হয় যা থেকে স্বভাবিকভাবেই বাংলাদেশের জন্য কোন সুফল লাভ সম্ভব হয় নি। যদিও হংকং সম্মেলন চলাকালে আফ্রিকান, ক্যারিবিয়ান ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় দেশগুলোর গ্র“প জি-৯০, উন্নয়নশীল দেশের জোট জি-২০ ও স্বল্পোন্নত দেশ মিলে জি-১১০-এর ব্যানারে কৃষি বিষয়ে ঐক্যবদ্ধ ঘোষণা ও অবস্থান গ্রহণ করে। কিন্তু ব্রাজিল ও ভারতের বিশ্বাসঘাতকতার কারণে শেষ পর্যন্ত তা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। জি-১১০ গ্র“পের এই ঘোষণায় স্বল্পোন্নত, খাদ্য আমদানিকারক ও ক্ষুদ্র অর্থনীতির দেশগুলোর কৃষির স্বার্থের প্রতি নজর দেওয়ার অঙ্গীকার থাকলেও ভারত ও ব্রাজিলের বাস্তবিক লক্ষ্য ছিল এই ঐক্যকে ব্যবহার করে তাদের নিজেদের বাণিজ্যিক ও রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিল করা এবং সেক্ষেত্রে তারা অনেকটাই সফল হয়েছে। আর ফলস্বরূপ স্বল্পোন্নত দেশগুলোর স্বার্থ উপেক্ষিতই থেকে গেছে। পরবর্তী কালে ২০০৯ সালে জেনেভায় অনুষ্ঠিত সপ্তম সম্মেলনেও কৃষি বিষয়ক সমঝোতা আলোচনায় আশানুরূপ কোন অগ্রগতি লক্ষ করা যায়নি।
প্রকৃতপক্ষে, কৃষি বিষয়ে হংকং বা জেনেভা সম্মেলনে বাংলাদেশের জোড়ালো কোন ইস্যু ছিলনা। হংকং সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রধান চাওয়া ছিল ধনী দেশের বাজারে বাংলাদেশী রপ্তানিপণ্যের বিশেষ করে তৈরি পোষাকের শুল্ক ও কোটামুক্ত প্রবেশাধিকার এবং সেবা বাণিজ্য চুক্তির মোড-৪ বাস্তবায়ন অর্থাৎ শ্রমিক রপ্তানির সুযোগ সৃষ্টি করা যার কোনটিতেই বাংলাদেশের সুনির্দিষ্ট কোন অর্জন নেই। অথচ হংকং সম্মেলনে আমাদের তৎকালীন বাণিজ্য মন্ত্রী আলতাফ হোসেন চৌধুরীর ভূমিকা ছিল অত্যন্ত চমকপ্রদ। বাণিজ্য মন্ত্রী আলতাফ হোসেন চৌধুরী বীরদর্পে ঘোষণা দিয়েছিলেন দাবী মানা না হলে বাংলাদেশ ভেটো দিবে। কিন্তু তৈরি পোশাকের ক্ষেত্রে শুল্ক ও কোটামুক্ত প্রবেশাধিকার দিতে পাকিস্তান ও শ্রীলংকার বাধার মুখে যখন কৌশলে সিদ্ধান্ত হল, “যে সব দেশ সকল পণ্যের শুল্ক ও কোটামুক্ত প্রবেশাধিকার দিতে সক্ষম নয় তারা অন্তত ৯৭ শতাংশ পণ্যের ক্ষেত্রে এ সুবিধা প্রদান করবে” তখন বাণিজ্য মন্ত্রীর হম্বিতম্বি থেমে গেল। তিনি সহসাই বুঝে গেলেন, “বাংলাদেশ ব্যাঙের ঠ্যাং থেকে এরোপ্লেন পর্যন্ত সবই বিনাশুল্কে রপ্তানি করতে পারবে”- দেশে ফিরে সাংবাদিক সম্মেলনে তিনি আমাদের এ আশ্বাস বাণীই শুনালেন। অথচ তিনি একবারও ভাবলেন না যে, বাকি ৩ শতাংশ পণ্যের মধ্যে তৈরি পোষাক থেকে শুরু করে চিংড়ি, পাট, চা, শাক-সব্জিসহ বাংলাদেশের হাতেগুণা যে কয়টি রপ্তানি পণ্য রয়েছে তার সবই অন্তর্ভূক্ত হতে পারে। কারণ, শুল্ক ও কোটামুক্ত প্রবেশাধিকারের আওতায় পণ্য আছে প্রায় ১১,০০০ টি যার ৩% মানে হল ৩৩০ টি পণ্য। অথচ বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি পণ্যের সংখ্যা ২০-৩০ টির বেশি নয়। কাজেই কোন দেশ চাইলেই বাংলাদেশের সকল রপ্তানি পণ্যকেই শুল্ক ও কোটামুক্ত প্রবেশাধিকারের আওতা থেকে বাদ দিতে পারে। বাস্তবে হচ্ছেও তাই। উক্ত ৯৭ শতাংশ পণ্যের মধ্যে কোনগুলো অন্তর্ভূক্ত হবে তা ২০০৬ সালের এপ্রিল মাসে জেনেভায় অনুষ্ঠিত সমঝোতা আলোচনায় নির্ধারিত হওয়ার কথা ছিল। অথচ ২০০৯ সালের জেনেভা সম্মেলন বা পরবর্তী কালেও এ ব্যাপারে কোনরূপ সিদ্ধান্ত হয় নি। কারণ, হংকং সম্মেলনে কৌশলে গৃহীত সিদ্ধান্ত মোতাবেক উক্ত ৯৭ শতাংশ পণ্যের তালিকায় বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যগুলোর অন্তর্ভূক্তি সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করছে ধনী দেশগুলোর মর্জির উপর। এবং এক্ষেত্রে দ্বিপাক্ষিক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক এবং দরকষাকষির ক্ষমতার উপরই তা সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করবে যেক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থা অত্যন্ত নাজুক। কাজেই হংকং বা জেনেভা সম্মেলন থেকে বাংলাদেশের অর্জন একেবারেই শূন্য। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদেরও অভিমত এরূপ যে, হংকং সম্মেলন থেকে সব দেশই কমবেশি সুবিধা আদায় করতে পারলেও বাংলাদেশ ও কম্বোডিয়া একেবারেই বঞ্চিত হয়েছে।
যাহোক, পূর্বেই বলা হয়েছে যে, বাংলাদেশ কৃষি পণ্যের উলেখযোগ্য কোন রপ্তানিকারক দেশ নয়। কাজেই কৃষিপণ্যের ক্ষেত্রে শুল্ক ও কোটামুক্ত বাজার প্রবেশাধিকারের দাবী বাংলাদেশের জন্য খুব বেশি গুরুত্ব বহন করেনা। বাংলাদেশের কৃষির বর্তমান প্রধান সংকট হল এ দেশের বাজারে বিদেশী কৃষিপণ্যের অবাধ প্রবেশের সুযোগ। এমনিতেই অন্যান্য স্বল্পোন্নত দেশের মতো এ দেশের বাজার অনেক বেশি উদার ও উন্মুক্ত। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)-এর বাণিজ্য প্রতিবন্ধকতা সূচক অনুযায়ী ২০০২ সালে যে ৪৬ টি স্বল্পোন্নত দেশের তথ্য পাওয়া গিয়েছে তাতে দেখা যায় যে, এসব দেশের মধ্যে ৪২ টি দেশের গড় শুল্ক হার ২৫%-এর কম এবং এসব দেশের অশুল্ক বাধাও কম। তদুপরি যদি শুল্ক হ্রাস করা হয় তবে অতি উচ্চহারে ভর্তুকিপ্রাপ্ত বিদেশী পণ্যের সাথে দারিদ্রপীড়িত ও যথেষ্ট সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা থেকে বঞ্চিত আমাদের কৃষকদের উৎপাদিত পণ্যগুলোকে এক অসম প্রতিযোগিতার মুখোমুখি হতে হবে যা আগেই বলা হয়েছে। ফলে, আমাদের কৃষকের পক্ষে নিজেদের বাজারেই মুক্ত প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা প্রায় অসম্ভব ব্যাপার হয়ে দাড়াবে, অন্য দেশের বাজারে প্রবেশতো অনেক দূরের কথা।
কাজেই, বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার আগামী দিনের সমঝোতা আলোচনায় যেসব দাবীর প্রতি বাংলাদেশের সর্বাধিক গুরুত্ব আরোপ করা উচিত সেগুলো হলঃ ১) ভর্তুকী হ্রাসের ব্যাপারে ধনী দেশের দেওয়া প্রতিশ্র“তির আশু বাস্তবায়ন, ২) অভ্যন্তরীন বাজার সুরক্ষার জন্য প্রয়োজনমাফিক শুল্ক আরোপের স্বাধিনতা প্রদান। অর্থাৎ অন্তত ততদিন পর্যন্ত আমাদের জন্য শুল্ক হ্রাসের অঙ্গীকার থেকে শুধু মুক্তিই নয় বরং প্রয়োজনে শুল্ক বৃদ্ধির সুযোগ দিতে হবে যতদিন পর্যন্ত ধনী দেশগুলো কৃষিতে তাদের দেওয়া ভর্তুকি হ্রাস করে মুক্ত প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রে ক্ষমতার ন্যূনতম সমতা বিধান না করে। এবং ৩) বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার দোহা উন্নয়নসূচিতে আলোচিত ‘বাণিজ্যের জন্য সাহায্য’ সংক্রান্ত কাগুজে সিদ্ধান্তের কার্যকর বাস্তবায়ন। দুঃখজনক হলেও সত্য যে, এসব দাবী আদায়ের ক্ষেত্রে আমাদের দেশের সংশ্লিষ্ট নীতি নির্ধারকদের মনোযোগ মোটেও লক্ষ্যনীয় নয়। এ থেকে এটাই প্রমাণিত হয় যে, এ দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ কৃষক জনগোষ্ঠীর স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে আমাদের নীতিনির্ধারকদের সদিচ্ছা, আন্তরিকতা, জ্ঞান ও দরকষাকষির ক্ষেত্রে দক্ষতারও যথেষ্ট অভাব রয়েছে।
Mar 30, 2025 | প্রকৃতি কথা
বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা ও কৃষির বাণিজ্য
বর্তমানকালে বহুল আলোচিত দুটি বিষয় হল বিশ্বায়ন ও মুক্তবাজার অর্থনীতি। বিশ্বায়ন বলি আর মুক্ত বাজারের কথাই বলি – এসবই শিল্পোন্নত দেশগুলোর বাজার সম্প্রসারণের হাতিয়ার যার নিয়ন্ত্রণ বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার হাতে। কৃষি আজ বিশ্ব বাণিজ্যের অতি গুরুত্বপূর্ণ সেক্টর। কাজেই, আমাদের কৃষির বর্তমান সমস্যা ও সংকটসমূহ অনুধাবন এবং সঠিক উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়নের জন্য বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা এবং কৃষি বাণিজ্য সম্পর্কে সম্যক ধারণা থাকা আবশ্যক। কিন্তু বিষয়গুলো এত জটিল ও বহুমাত্রিক যে, স্বল্প পরিসরের আলোচনায় সেগুলোর অন্তর্নিহিত তাৎপর্য উপলব্ধি করা দুষ্কর। তথাপিও এই অধ্যায়সহ পরবর্তী কয়েকটি অধ্যায়ে বর্তমান কৃষি বাণিজ্যের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট এবং কৃষি বাণিজ্য উদারিকরণে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থাসহ বহুজাতিক কোম্পানির ভূমিকা এবং সর্বোপরি বাংলাদেশের কৃষি ও দরিদ্র কৃষকের উপর এসবের প্রভাব সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোকপাত করা হল।
বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা গঠনের পটভূমি
ঔপনিবেশিক যুগে সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলো নানান কুটকৌশলে এবং পেশি শক্তির জোরে বিভিন্ন দেশ দখল করে তাদের বাণিজ্যের প্রসার ঘটাতো এবং লুটেপুটে নিত দখলকৃত দেশের ধনসম্পদ। যেমন, সপ্তদশ শতাব্দিতে বৃটিশরা ব্যবসা করতে এসে এ দেশটাই দখল করে নেয় এবং প্রায় দুইশত বছর ধরে তাদের শাসন, শোষণ ও লুন্ঠন চালায়। এভাবে বাজার দখল, দেশ দখল এবং উপনিবেশ বিস্তার করতে গিয়ে সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলোর মধ্যে সৃষ্টি হতো দ্বন্দ-সংঘাত যার চূড়ান্ত পরিণতিতে তারা একে অপরের সাথে ধ্বংসাত্মক যুদ্ধে লিপ্ত হতো। প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধসহ সারা বিশ্বে এরূপ অসংখ্য যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে। বিশ্বব্যাপী ঔপনিবেশিক শাসন যুগের অবসানের পর বিশ্ব বাণিজ্য এক নতুন রূপে আর্বিভূত হয়েছে। মূলত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এই প্রেক্ষাপট আরও বদলে যায়। এসময় অধিকাংশ সাম্রজ্যবাদী দেশ তাদের উপনিবেশাধীন দেশগুলোকে স্বাধীনতা দিয়ে চলে যেতে বাধ্য হয়।
যেহেতু বাণিজ্যই এসব ভয়াবহ যুদ্ধের মূল কারণ তাই বিনাযুদ্ধে তাদের বাণিজ্যিক সাম্রাজ্য বিস্তারের উপায় অণ্বেষণে এবং যুদ্ধকে আলোচনার টেবিলে নিয়ে আসার লক্ষ্যে দিত্বীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে ১৯৪১ সালের আগস্ট মাসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট বেঞ্জামিন ফ্রাংকলিন রুজভেল্ট ও বৃটেনের প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিল আটলান্টিক সনদে স্বাক্ষর করে যার ভিত্তিতে ১৯৪৮ সালের ২৪ অক্টোবর গঠিত হয় জাতিসংঘ। এই সনদে বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণকারী একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার চিন্তা ভাবনা শুরু হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৪৪ সালের ব্রিটন উডস সম্মেলনে জাতিসংঘের অধীনে আন্তর্জাাতিক বাণিজ্য সংস্থা নামে একটি সংস্থা গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। কিন্তু এতে বাধ সাধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। কারণ, সম্ভবত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্যকে জাতিসংঘের অধীনে রাখতে রাজি হয় নি। তাই আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সংস্থা গঠনের প্রস্তাব নাকচ করে দিয়ে বিকল্প হিসেবে ১৯৪৭ সালে গড়ে তোলা হয় গ্যাট (GATT) নামক একটি বাণিজ্য আলোচনা ফোরাম যা ১৯৯৫ সাল থেকে রূপ পাল্টে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (WTO) নামে আত্মপ্রকাশ করেছে।
ব্রিটন উডস সম্মেলন
১৯৪৪ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউহ্যাম্পশায়ার রাজ্যের ব্রিটন উডস নামক শহরে ৪৪টি দেশের এক শীর্ষ সম্মেলনে তিনটি সংস্থা গঠনের প্রস্তাব গৃহীত হয়, যথা: ১) আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সংস্থা (International Trade Organisation – ITO), ২) আন্তর্জাতিক পুণর্গঠন ও উন্নয়ন ব্যাংক (International Bank for Reconstruction and Development – IBRD) যা বিশ্বব্যাংক নামে পরিচিত এবং (৩) আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (International Monetary Fund – IMF)। এ সংস্থাগুলো সম্মিলিতভাবে ব্রিটন উডস সংস্থা নামে পরিচিত। নিন্মে সংস্থাগুলো সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোচনা করা হল।
১. আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সংস্থা
১৯৪৪ সালে ব্রিটন উডস সম্মেলনে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সংস্থা (আইটিও) গঠনের প্রাথমিক সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। ১৯৪৮ সালের ২৪ মার্চ কিউবার রাজধানী হাভানায় অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের বাণিজ্য ও কর্মসংস্থান বিষয়ক সম্মেলনে আইটিও-র জন্য খসড়া ‘হাভানা সনদ’ গৃহীত হয়। এই সনদে অন্তর্ভূক্ত ছিল বাণিজ্য, বিনিয়োগ, সেবাখাত এবং ব্যবসা ও কর্মসংস্থান বিষয়ক বিস্তারিত নীতি। উল্লেখ্য যে, কৃষি বাণিজ্য তখনও আলোচনায় আসেনি। যাহোক, জাতিসংঘের তৎকালীন ৫৩ টি সদস্য দেশ এই সনদে স্বাক্ষর করলেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র হাভানা সনদ প্রত্যাখান করে। ফলে, এ সংস্থা আর আলোর মুখ দেখে নি। এর কারণ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র হয়তো চায়নি যে, বাণিজ্যের বিষয়টি জাতিসংঘের অধীনে থাকুক। তাই আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সংস্থা গঠনের প্রস্তাব নাকচ করে দিয়ে বিকল্প হিসেবে গড়ে তোলা হয় গ্যাট (General Agreement on Tariff and Trade – GATT) নামক একটি শিথিল বাণিজ্য আলোচনা ফোরাম যা বর্তমানে রূপ পাল্টে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা নামে আত্মপ্রকাশ করেছে।
২. আন্তর্জাতিক পুনর্গঠন ও উন্নয়ন ব্যাংক বা বিশ্বব্যাংক
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত ধনী দেশগুলোর অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের লক্ষ্যে ১৯৪৪ সালে ব্রিটন উডস সম্মেলনের মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক পুনর্গঠন ও উন্নয়ন ব্যাংক গঠিত হয় যা বর্তমানে বিশ্বব্যাংক নামে পরিচিত। প্রকৃত প্রস্তাবে এটা কোন সাহায্য সংস্থা নয় বরং এটি একটি ঋণদানকারী প্রতিষ্ঠান। বর্তমানে এ ব্যাংক শিল্পোন্নত, উন্নয়নশীল ও স্বল্পোন্নত সব ধরনের দেশকেই বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মসূচিতে দীর্ঘমেয়াদী ঋণ দিয়ে থাকে। বিশ্বব্যাংকের বর্তমান সদস্য দেশের সংখ্যা ১৬৮ এবং এর সদর দপ্তর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ডিসিতে অবস্থিত। বিশ্ব ব্যাংকের বর্তমান প্রেসিডেন্ট রবার্ট বি. জোলিক যিনি তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিও বুশ কর্তৃক মনোনীত একজন মার্কিন নাগরিক।
এখানে প্রণিধানযোগ্য এই যে, বিশ্ব ব্যাংকে সমস্যদের ভোটের হার নির্ধারিত হয় চাঁদার পরিমাণের ভিত্তিতে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিশ্ব ব্যাংকে সবচেয়ে বেশি চাঁদা প্রদানকারী দেশ যার ভোটের হার প্রায় ১৬%। তাই সর্বদা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক মনোনীত ব্যক্তিই বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট হিসেবে নিয়োগ পেয়ে থাকে। কাজেই বিশ্বব্যাংকের উপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একচ্ছত্র আধিপত্য বিরাজমান।
৩. আন্তর্জাাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)
বিশ্বের মুদ্রা বাজারের অস্থিতিশীলতা এবং সমস্যা দূর করার লক্ষ্যে ১৯৪৪ সালে ব্রিটন উডস সম্মেলনের মধ্য দিয়ে এ সংস্থাটি গঠিত হয়। বিশ্ব ব্যাংকের মতো এ সংস্থাটিও একটি ঋণদানকারী প্রতিষ্ঠান। তবে, এটি মূলত মুদ্রা বাজারের অস্থিতিশীলতা এবং সমস্যা দূর করার জন্য স্বল্পমেয়াদী ঋণ দিয়ে থাকে। কার্যত বিশ্বব্যাংকের মতো এ সংস্থাটিও বাণিজ্যের প্রসার ও বিশ্ববাজার নিয়ন্ত্রণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ধনী বিশ্বের এক গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। কারণ, এ সংস্থার ক্ষেত্রেও ভোটের হার নির্ধারিত হয় প্রদত্ত চাঁদার আনুপাতিক হারে। আইএমএফ-এ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভোটের হার শতকরা প্রায় ১৭% এবং ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের সম্মিলিত ভোটের পরিমাণ ৩২%। কাজেই এখানে ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিরঙ্কুশ আধিপত্য বিরাজমান। আইএমএফ-এর প্রধানের পদবী হল ব্যবস্থাপনা পরিচালক যিনি ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন কর্তৃক মনোনীত হন। আইএমএফ-এর বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক (MD) হলেন বুলগেরিয়ান অর্থনীতিবিদ ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা, যিনি ১ অক্টোবর ২০১৯ সাল থেকে এই পদে অধিষ্ঠিত রয়েছেন এবং ১ অক্টোবর ২০২৪ থেকে দ্বিতীয়বারের মত দ্বায়িত্ব পেয়েছেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ডিসিতে এর সদর দপ্তর অবস্থিত।
বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ-এর রাজনৈতিক ভূমিকা
আজ একথা সুস্পষ্ট যে, বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ তৃতীয় বিশ্বের দরিদ্র দেশগুলোর উপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপের কর্তৃত্ব ও আধিপত্য বিস্তার এবং এসব দেশের বহুজাতিক কোম্পানির জন্য তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর বাজার উন্মুক্তকরণের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। বিশ্বব্যাংক তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোকে ঋণ দানের সাথে সাথে অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের নামে এমনসব শর্ত জুড়ে দেয় যা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার বাণিজ্য উদারীকরণের কাজকে সহজতর করে যার সুফল ভোগ করে ধনী দেশের বহুজাতিক কোম্পানিগুলো। বাংলাদেশসহ তৃতীয় বিশ্বের দেশসমূহের সামষ্টিক অর্থনৈতিক নীতি নির্ধারণ এবং রাজনৈতিক ক্ষেত্রে অন্যান্য দাতা দেশ ও সংস্থার পাশাপাশি বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ ব্যাপকভাবে হস্তক্ষেপ করে থাকে। এমনকি এসব দেশের রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ ও সরকার পরিবর্তনের ক্ষেত্রেও বিশ্ব ব্যাংকের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা লক্ষ করা যায়। সারা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সামরিক ও বেসামরিক স্বৈরাচারী সরকারকে ক্ষমতায় বসানো এবং ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখার ক্ষেত্রে বিশ্ব ব্যাংকের ভূমিকা আজ কারও অজানা নয়। একথা আজ প্রমাণিত সত্য যে, বিশ্বব্যাংক গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারকে ঋণ দিতে যতটা না আগ্রহী তার চেয়ে অনেক বেশি আগ্রহী অবৈধভাবে ক্ষমতা দখলকারী অগণতান্ত্রিক সরকারকে। বাংলাদেশে এরশাদের সামরিক সরকারকে দীর্ঘ প্রায় ১০ বছর ধরে ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখা এবং ঐতিহাসিক এক-এগারোর পর গঠিত সামরিক মদদপুষ্ট তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে ক্ষমতায় বসানো ও দুই বছর টিকিয়ে রাখার ক্ষেত্রে বিশ্ব ব্যাংকের ভূমিকা সর্বজনবিদিত। এরূপ পুতুল সরকারকে ক্ষমতায় বসিয়ে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ কাঠামোগত সংস্কার কর্মসূচি চাপিয়ে দিয়ে ধনী দেশের বহুজাতিক কোম্পানির জন্য গরীব দেশের বাজার দখলকে সহজতর করে থাকে।
গ্যাট-এর উৎপত্তি
১৯৪৭ সালে সুইজারল্যাণ্ডের রাজধানী জেনেভায় ২৩ টি সদস্য রাষ্ট্রের মধ্যে একটি চুক্তি সম্পাদিত হয় যা ১৯৪৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে গ্যাট হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। গ্যাট-এর সেক্রেটারিয়েট প্রতিষ্ঠিত হয় সুইজারল্যাণ্ডের জেনেভায়। আগেই বলা হয়েছে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সংস্থা গঠনের জন্য গৃহীত ‘হাভানা সনদ’ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পর বিকল্প হিসেবে গ্যাট জন্মলাভ করে। শুরুতে বলা হয়েছিল গ্যাটকে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় রূপ দিয়ে তা জাতিসংঘে অন্তর্ভূক্ত করা হবে। গ্যাটকে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় রূপ দেওয়া হয়েছে ঠিকই, কিন্তু জাতিসংঘে অন্তর্ভূক্ত করা হয় নি। প্রকৃতপক্ষে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ ধনী বিশ্বের অনেক দেশই তাদের নিজস্ব স্বার্থকে বড় করে দেখায় তা হতে দেয়নি। কারণ, এতে হয়তো এ সংস্থাকে অনেক ক্ষেত্রে তাদের ইচ্ছেমতো ব্যবহার করার ক্ষেত্রে সমস্যা হত। কারণ, জাতিসংঘে ধনী বিশ্বের ভোটের হার মাত্র শতকরা ১৭ ভাগ যেখানে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ-এ শতকরা ৬১ ভাগ।
প্রকৃতপক্ষে, গ্যাট কোন সংস্থা ছিল না বরং এটি ছিল বিভিন্ন ঐচ্ছিক চুক্তির সমাহার। নির্দিষ্ট মেয়াদান্তর সদস্য দেশের বাণিজ্য মন্ত্রীরা বৈঠকে মিলিত হয়ে সমঝোতা আলোচনার মাধ্যমে বাণিজ্যের অবাধ বিস্তারে মূলত শুল্ক ও অশুল্কজাত বাধাসমূহ দূর করার লক্ষ্যে বিভিন্ন চুক্তি স্বাক্ষর করত। একেকটি সমঝোতা আলোচনা কয়েক বছর ধরে চলত যাকে ‘রাউণ্ড’ নামে পরিচিত। প্রথম রাউণ্ড আলোচনা শুরু হয় ১৯৪৭ সালে জেনেভায়। সর্বশেষ উরুগুয়ে রাউণ্ড (১৯৮৬-১৯৯৪ সাল) পর্যন্ত সর্বমোট আট (৮) রাউণ্ড আলোচনা সম্পন্ন হয়, যাতে প্রায় ১৩০টি দেশ অংশগ্রহণ করে। ১৯৪৭ সাল থেকে ১৯৯৩ সাল পর্যন্ত সকল রাউণ্ডের আলোচনার ভিত্তিতে গৃহীত সকল চুক্তির সমন্বয়ে একটি প্যাকেজ (যা গ্যাট ১৯৯৪ চুক্তিমালা হিসেবে পরিচিত) তৈরি করা হয়। সপ্তম রাউণ্ড (টোকিও রাউণ্ড ১৯৮৬) পর্যন্ত ধনী দেশগুলো তাদের আমদানি শুল্ক হ্রাস করে এবং তৃতীয় বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশগুলো তা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে। কিন্তু উরুগুয়ে রাউণ্ডে এসে তৃতীয় বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশগুলোকে শুল্ক হ্রাসের প্রস্তাব দেওয়া হলে বিরোধ দেখা দেয়। এ বিরোধের কারণ, তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর দাবী ছিল ধনী বিশ্বের দেশগুলোর দেওয়া রপ্তানি ভর্তুকি প্রত্যাহার করা। কিন্তু ধনী বিশ্ব তাতে কর্ণপাত করে নি। ফলে, আলোচনায় অচলাবস্থা সৃষ্টি হয় এবং কোনরূপ সমঝোতা ছাড়াই উরুগুয়ে রাউণ্ডের আলোচনা শেষ হয়। অতঃপর গ্যাটের তৎকালীন সেক্রেটারী জেনারেল মিঃ ডাংকেল-এর রিপোর্ট ও সুপারিশক্রমে ১৯৯৪ সালে গ্যাট বিলুপ্ত হয়। গ্যাট বিলুপ্ত হওয়ার সম্ভাব্য মূল কারণ ছিল এই যে, গ্যাটের সমঝোতা চুক্তিগুলো ছিল ঐচ্ছিক। অর্থাৎ চুক্তিতে স্বাক্ষর করা এবং তা মানা বা না মানা কোন সদস্য দেশের ইচ্ছার উপর নির্ভরশীল ছিল যা বাণিজ্যিক সম্রাজ্য বিস্তারে ধনী বিশ্বের আকাংখা পূরণের পথে প্রধান বাধা হয়ে দাড়ায়। এই আকাংখা পূরণের উদ্দেশ্যেই পরবর্তীতে বিশ্ববাণিজ্য সংস্থা গঠন করা হয়েছে যাতে গ্যাটের সকল চুক্তি অন্তর্ভূক্ত করা হয়েছে।
গ্যাটের মূলনীতি ছিল তিনটি, যথাঃ
১. বাণিজ্য হবে বৈষম্যহীন
২. বাণিজ্য হবে বহুপাক্ষিক এবং
৩. সর্বাধিক সুবিধাপ্রাপ্ত জাতি নীতি (MFN: Most Favored Nation) অর্থাৎ গ্যাট-এর সদস্য দেশসমূহ পারস্পরিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে সর্বাধিক সুবিধা পাবে।
নীতিতে যত চমৎকার কথাই থাকুক না কেন বাস্তবে এই সংস্থাটি শিল্পোন্নত ও স্বল্পোন্নত দেশগুলোর মধ্যে বাণিজ্য-বৈষম্য হ্রাসের পরিবর্তে এই বৈষম্য বৃদ্ধিতেই বেশি ভ‚মিকা পালন করেছে। অন্যদিকে, শিল্পোন্নত দেশগুলো বহুপাক্ষিক আলোচনা থেকে যেমন অধিক সুবিধা আদায় করে নিয়েছে তেমনি প্রয়োজনে বহুপাক্ষিক বাণিজ্য আলোচনাকে পাশ কাটিয়ে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের দিকে অধিক মনোযোগি হয়েছে। পাশাপাশি, সর্বাধিক সুবিধাপ্রাপ্ত জাতি নীতির সর্বাধিক সুফলও লাভ করেছে শিল্পোন্নত দেশগুলোই।
বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা গঠন
আগেই বলা হয়েছে যে, গ্যাটের শিথিল সমঝোতা প্রক্রিয়া ধনী বিশ্ব ও তাদের বহুজাতিক কোম্পানির বাণিজ্যিক সাম্রাজ্য বিস্তারের আকাংখা পুরোপুরি পূরণ করতে ব্যর্থ হওয়ার প্রেক্ষাপটে এবং বিশ্ব বাণিজ্যিকে আরও কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করার লক্ষ্যে গ্যাটকে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় রূপান্তরিত করা হয়েছে। ১৯৯৫ সালের জানুয়ারি মাস থেকে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যক্রম শুরু করে। বর্তমানে এর সদস্য সংখ্যা ১৪৯। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার সদস্যদের অধিকাংশই বিভিন্ন দেশের সরকার তবে বিভিন্ন শুল্ক এলাকা যেমনঃ সাফটা, নাফটা উত্যাদিও এর সদস্য হতে পারে।
মূলত ১৯৮৬ সালের ২০ সেপ্টেম্বর উরুগুয়ের পুনটা ডেল এস্তে-তে শুরু হওযা গ্যাটের বিখ্যাত উরুগুয়ে রাউন্ডের (অষ্টম রাউণ্ড) আলোচনায় বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা গঠনের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করা হয়। ১৯৮৮ সালে কানাডার মন্ট্রিলে এবং ১৯৯০ সালে বেলজিয়ামের ব্রাসেলসে দুটি মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকের ধারাবাহিকতায় এ রাউণ্ডের আলোচনার সমাপ্তি ঘটে ১৯৯৩ সালের ১৫ ডিসেম্বর। এরপর ১৯৯৪ সালের ১২-১৫ এপ্রিল মরক্কোর মারাকাশ শহরে আয়োজিত মন্ত্রী পর্যায়ের সম্মেলনে উরুগুয়ে রাউণ্ডের ফাইনাল এ্যাক্ট এবং বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা প্রতিষ্ঠার মারাকেশ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। মারাকেশ চুক্তিতে গ্যাটের সকল সমঝোতা চুক্তি, যা গ্যাট ১৯৯৪ চুক্তিমালা হিসেবে পরিচিত, অন্তর্ভূক্ত করা হয়। এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, উরুগুয়ে রাউন্ডের বাণিজ্য আলোচনায় প্রথমবারের মতো কৃষি বাণিজ্যের উদারীকরণের জন্য ‘কৃষিচুক্তি’ এবং ‘বাণিজ্য সংশ্লিষ্ট বুদ্ধিজাত সম্পত্তির অধিকার’ চুক্তি সংক্ষেপে ট্রিপস চুক্তি অন্তর্ভূক্ত করা হয় যা বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা গঠন সংক্রান্ত মারাকেশ চুক্তি স্বাক্ষরের সাথে সাথে কার্যকর হয়ে যায়।
বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার কাজ
বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা বাণিজ্য সংক্রান্ত বিধিমালা প্রণয়ন, বিধিমালার প্রয়োগ পর্যবেক্ষণ ও বিরোধ মীমাংসা করে থাকে। সংস্থার কাজগুলো মোটামুটি নিম্নরূপ:
১. অবাধ বাণিজ্যের প্রসার ঘটানো (মৌলিক কাজ);
২. আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা;
৩. বাণিজ্য উদারীকরণের লক্ষ্যে সমঝোতা আলোচনা পরিচালনা করা;
৪. বাণিজ্য সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তি করা;
৫. সদস্য দেশসমূহের বাণিজ্য নীতি বাস্তবায়ন পদ্ধতি মনিটরিং করা;
৬. বিশ্ব অর্থনীতির নীতি সমূহের মধ্যে সামঞ্জস্য বিধানের লক্ষ্যে বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ইত্যাদি প্রতিষ্ঠানকে সাহায্য করা;
৭. কৌশলগত সহায়তা ও প্রশিক্ষণ কর্মসূচির মাধ্যমে উন্নয়নশীল ও স্বল্পোন্নত দেশসমূহকে বাণিজ্য নীতি বিষয়ে সহায়তা প্রদান করা।
পূর্বেই যেমনটি বলা হয়েছে যে, গ্যাট ছিল মূলত সাধারণ সমঝোতার একটি ফোরামমাত্র। গ্যাটের সমঝোতা আলোচনার মাধ্যমে যেসব বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষরিত হত সেগুলো ছিল ঐচ্ছিক চুক্তি। যে কোন সদস্য দেশ ইচ্ছে করলে সেসব চুক্তিতে সই করতেও পারত আবার নাও করতে পারত। এমনকি চুক্তিতে সই করার পরও তা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কোন বাধ্যবাধকতা ছিল না এবং চুক্তি না মানলে শাস্তিরও কোন বিধান ছিল না। কিন্তু বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় সেই সুযোগ নেই। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার সকল চুক্তি মেনে চলা সদস্য দেশসমূহের জন্য বাধ্যতামূলক। চুক্তি ঠিকমতো মানা হচ্ছে কি-না তা দেখাশোনা করা এবং প্রয়োজনে শাস্তির ব্যবস্থা করার ক্ষেত্রে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার রয়েছে অসীম ক্ষমতা। কোন সদস্য দেশের নিজস্ব বাণিজ্য নীতি বা আইনে যাই থাকুক না কেন এক্ষেত্রে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার নীতি বা আইনই কার্যকর হবে। একটি রাষ্ট্রে আইন প্রণয়ন, আইন বাস্তবায়ন বা প্রশাসন এবং বিচার বা শাস্তি প্রদান এই তিনটি দায়িত্ব পালন করে থাকে তিনটি আলাদা সংস্থা যেমনঃ আইন বিভাগ বা সংসদ আইন প্রণয়ন করে, শাসন বিভাগ আইন প্রয়োগ করে এবং বিচার বিভাগ আইন ভঙ্গকারীর বিচার করে ও শাস্তি প্রদান করে থাকে। অথচ বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা একাই তিনটি ক্ষমতার অধিকারী। অর্থাৎ মাটির পৃথিবীতে এক দানবীয় ক্ষমতার অধিকারী এই বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা।
বিশ্বায়ন ও বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা
বিশ্বায়ন বর্তমান বিশ্বে বহুল আলোচিত একটি শব্দ। প্রকৃতপক্ষে বিশ্বায়ন একটি বিমূর্ত ধারণামাত্র। বিশ্বায়নকে একটি সংজ্ঞার মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গরূপে প্রকাশ করা খুবই কঠিন। উইকিপিডিয়ার সংঙ্গানুসারে বিশ্বায়ন হল এমন একটি প্রক্রিয়া যার দ্বারা আঞ্চলিক অর্থনীতি, সমাজ ও সংস্কৃতি একটি বৈশ্বিক যোগাযোগ, পরিবহণ ও বাণিজ্য নেটওয়ার্কের মাধ্যমে একটি সমন্বিত রূপ লাভ করে। অন্য কথায় বিশ্বায়ন হল সারা বিশ্বের অর্থনীতি, রাজনীতি, সংস্কৃতি, সরকারি নীতি ইত্যাদি সকল বিষয়কে সমন্বিত করা অর্থাৎ একটি ব্যবস্থার আওতায় আনার প্রক্রিয়া।
প্রকৃত প্রস্তাবে, বিশ্বায়ন কোন নতুন ধারণা নয়। সভ্যতার সূচনালগ্ন থেকেই মানুষের ধ্যান-ধারণা, আচার-আচরণ, উদ্ভাবিত প্রযুক্তি ও পণ্য ক্রমশ পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ার মাধ্যমে বিশ্ব মানব জাতির মধ্যে একটি অদৃশ্য যোগসূত্র স্থাপিত হয়েছে। বর্তমানে যোগাযোগ ব্যবস্থা ও যোগাযোগ মাধ্যমের উৎকর্ষের ফলে এই যোগসূত্র এত দ্রæত ও সহজ হয়ে এসেছে যে, মানব জাতির এই যোগসূত্র আরও সুদৃঢ় হওয়ার মাধ্যমে সমস্ত ভেদাভেদ, হিংসা-বিদ্বেষ ও বৈষম্য বিলুপ্ত হয়ে গোটা মানব জাতি একটিমাত্র জাতিতে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে বিশ্বায়নের লক্ষ্য হওয়া উচিত এই সম্ভাবনাকে বাস্তব রূপ দেওয়া। আরো পরিষ্কার করে বললে বিষয়টা এমন দাঁড়ায় যে, বিশ্বায়নের ফলে বর্তমান রাষ্ট্র ব্যবস্থার আর প্রয়োজন থাকবে না; রাষ্ট্র হবে মানচিত্রে অংকিত রেখাচিত্র মাত্র। সারা পৃথিবী একটিমাত্র ব্যবস্থার অধীনে থাকবে। আসলে এমন একটি বিশ্বায়ন সকলেরই কাম্য যেখানে সারা বিশ্বের সকল মানুষ বিশ্বের সব কিছুর সুফল ভোগ করবে; কেউ বঞ্চিত থাকবে না; কেউ দারিদ্রের কষাঘাতে জর্জরিত হয়ে অনাহারে, অর্ধাহারে ধূকে ধূকে মরবে না। ধর্ম-বর্ণ-গোত্র বা জাতিগোষ্ঠীগত ভেদাভেদ উঠে গিয়ে এ বিশ্বে সকল মানুষ এক জাতি হয়ে উঠবে যে জাতির নাম মানুষ জাতি। কিন্তু বর্তমানে যে বিশ্বায়ন আমরা দেখছি তা মোটেও সে কাংঙ্খিত বিশ্বায়ন নয়।
বাস্তবে বিশ্বায়ন বলতে প্রধাণতঃ অর্থনৈতিক বিশ্বায়নকে বুঝানো হচ্ছে যা জাতীয় অর্থনীতিকে বাণিজ্য, সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ, মূূলধন প্রবাহ, জনশক্তি স্থানান্তর এবং প্রযুক্তির বিস্তারের মাধ্যমে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে সমন্বিত করাকে বুঝানো হচ্ছে। বিশ্বায়নের অন্তর্নিহিত চরিত্রের কারণে একে বাণিজ্যিক বিশ্বায়ন, পুঁজিবাদী বিশ্বায়ন, সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বায়ন ইত্যাদি নানা নামে অবহিত করা হয়ে থাকে। আমরা বিশ্বায়নের যে রূপ দেখছি তা প্রকৃতপক্ষে আগ্রাসী চরিত্রের বাণিজ্যিক বিশ্বায়ন। এর মূল লক্ষ্য হল উন্নয়নশীল ও স্বল্পোন্নত দেশগুলোর অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড ভেঙ্গে দিয়ে এবং সেসব দেশের প্রায় ৫০০ কোটি জনসংখ্যার বিশাল বাজার দখল করে ধনী বিশ্বের বাণিজ্যের অবাধ বিস্তার। এরূপ বিশ্বায়ন চাইছে সেইসব ধনী দেশ যারা শুধু ধনীই নয়, বিশ্বের সামরিক শক্তি ও প্রযুক্তির উপর তাদের রয়েছে একচ্ছত্র আধিপত্য। অথচ তারা চাইছে বাংলাদেশের মত তৃতীয় বিশ্বের দরিদ্র দেশের দরিদ্র কৃষকরা সীমাহীন রাষ্ট্রীয় সুবিধাপ্রাপ্ত ধনী বিশ্বের ধনী খামার মালিকদের সাথে মুক্ত প্রতিযোগিতায় নামুক। এ যেন ঠেলাগাড়ি নিয়ে এরোপ্লেনের সাথে প্রতিযোগিতায় নামার হাস্যকর প্রস্তাব!
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে সাম্রাজ্যবাদী দেশসমূহের ‘দেশ দখল নয়, বাজার দখল নীতি’র বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেই বিশ্বায়নের ধারণাকে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দেওয়ার প্রচেষ্টা নেওয়া হয়েছে। বিশ্বায়নের নামে বাণিজ্যের ক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টিকারী সকল বিধিনিষেধ তুলে দিয়ে মূলত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের শিল্পোন্নত দেশসমূহের বহুজাতিক কোম্পানি কর্তৃক উৎপাদিত পণ্য, সেবা ও প্রযুক্তি যেকোন দেশে অবাধ প্রবেশের সুযোগ সৃষ্টির উদ্দেশ্যেই বিশ্বায়নকে ব্যবহার করা হচ্ছে। পাশাপাশি বাণিজ্যের এই প্রসারকে সহজতর করার অনুষঙ্গ এবং প্রযুক্তি বাণিজ্যের নতুন ক্ষেত্র হিসেবে প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়া, স্যাটেলাইট, সিডি, ইন্টারনেট ইত্যাদি নানা মাধ্যমে ভোগবাদি পাশ্চাত্য সংস্কৃতির বিস্তার ঘটানো হচ্ছে যা এই বাণিজ্যিক বিশ্বায়নের ক্ষেত্রে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে।
এটা আজ স্পষ্টত দৃশ্যমান যে, চলমান বিশ্বায়ন প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্রের ভূমিকা ক্রমশ গৌণ থেকে গৌণতর হচ্ছে। কারণ, এই বাণিজ্যিক বিশ্বায়ন একটি দেশের নাগরিকদের খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ইত্যাদি মৌলিক অধিকারসহ সকল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড, ব্যবসা-বাণিজ্য, সবই কোম্পানির হাতে তুলে দিচ্ছে। আর বিশ্বায়নের এ প্রক্রিয়ার সফল বাস্তাবায়নের দায়িত্বে রয়েছে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা আর সহযোগিতায় রয়েছে বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ, এডিবির মতো অর্থ লগ্নিকারী প্রতিষ্ঠানসমূহ। এক্ষেত্রে রাষ্ট্রের কাজ হল কোম্পানির অবাধ বাণিজ্যের নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা এবং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বাহিনী দিয়ে কর্পোরেট পুঁজির নিরাপত্তা বিধান করা। বর্তমান বাণিজ্যিক বিশ্বায়নের গ্যাড়াকলে পড়ে আমাদের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বই আজ বিপন্নপ্রায়। এ দেশের উন্নয়ন কিভাবে হবে, কোন পথে হবে তা নির্ধারণ করার অধিকারও আমরা আজ হারাতে বসেছি। দাতা দেশ ও সংস্থাসমূহ লোকাল কন্সাল্টেটিভ গ্রুপ নামে সারা বছর ধরে দেশের সকল সেক্টরের উন্নয়ন তদারকি করে বেড়ায়। এদেরই সুপারিশক্রমে প্রতিবছর বাজেটের আগে বাংলাদেশ উন্নয়ন ফোরাম নামে দাতা দেশ ও সংস্থাসমূহ ঠিক করে দেয় এ দেশের ভবিষ্যৎ। এদেরই সুপারিশে সরকারি সেবা প্রতিষ্ঠানসমূহের ঢালাও বেসরকারিকরণ হচ্ছে, বন্ধ হচ্ছে আদমজী জুট মিলসহ রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বহু কলকারখানা ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এবং এ দেশের ব্যবসার সকল সেক্টর চলে যাচ্ছে বিদেশী বহুজাতিক কোম্পানির দখলে। হায়রে স্বাধীন দেশ, হায় আমাদের স্বাধীনতা! এই বাণিজ্যিক বিশ্বায়ন প্রক্রিয়া বাস্তবায়িত হলে আমাদের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব হবে অর্থহীন। আমরা হব বহজাতিক কোম্পানির শাসনাধীন তাবেদার। আজ নতুন রূপে ফিরে আসছে কোম্পানির শাসন। সুতরাং এরূপ বিশ্বায়ন কখনই আমাদের কাম্য হতে পারে না।
বহুজাতিক কোম্পানি (Multinational Company)
শিল্পোন্নত দেশগুলোর অনেক কোম্পানিই আজ দেশের সীমানা ছাড়িয়ে বহুদেশে এমনকি পৃথিবীব্যাপী বিস্তার লাভ করেছে। এসব কোম্পানি প্রকৃতপক্ষে কোন দেশের কোম্পানি তা খুঁজে বের করা দুষ্কর। কারণ, এসব কোম্পানির মালিকানা বহুদেশে বিস্তৃত। তাই এ ধরনের কোম্পানিকে বহজাতিক কোম্পানি বলা হয়ে থাকে। যেমনঃ বৃটিশ কোম্পানি ইউনিলিভার (সাবেক লিভার ব্রাদার্স) ‘ইউনিলিভার বাংলাদেশ’ নামে এ দেশে ব্যবসা করছে। নরওয়ের কোম্পানি টেলিনর বাংলাদেশে গ্রামীণ ব্যাংকের সাথে ‘গ্রামীণ ফোন’ নামে ব্যবসা করছে। কৃষি সেক্টরে অনেক বহুজাতিক কোম্পানিই এ দেশে ব্যবসা করছে। যেমনঃ সিনজেন্টা, এভেন্টিস, কারগিল, মোনসান্টো, বেয়ার ইত্যাদি। এসব কোম্পানির আকার, বিস্তার ও শক্তি অত্যন্ত ব্যাপক। এরূপ একটি বহুজাতিক কোম্পানির আয় একটি দেশের মোট জাতীয় আয় থেকেও বেশি হতে পারে। যেমনঃ কারগিল কৃষি বাণিজ্যের একটি বড় মার্কিন কোম্পানি যার আয় নয়টি সাব-সাহারান আফ্রিকান দেশের মোট আয় থেকেও বেশি।
বহুজাতিক কোম্পানি বা ট্রান্সন্যাশনাল কর্পোরেশন (Transnational Corporation) বর্তমান বিশ্বের বাণিজ্য শুধু নয় অর্থনীতি ও রাজনীতিকেও নিয়ন্ত্রণ করছে। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় সদস্য দেশগুলো আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের নীতিমালা তৈরি করে আর তা বাস্তবায়ন তথা বাণিজ্য পরিচালনা করে বহুজাতিক কোম্পানি। সরাসরি বিদেশী বিনিয়োগের নামে তৃতীয় বিশ্বের গরীব দেশগুলো এসব কোম্পানির জন্য নিজেদের বাজার খুলে দিতে বাধ্য হয়। কারণ-
১. এসব কোম্পানির হাতে আছে উন্নয়ন বাণিজ্যে সহযোগিতা করার মতো পর্যাপ্ত প্রযুক্তি, অর্থশক্তি ও দক্ষতা;
২. বহুজাতিক কোম্পানিগুলো বাণিজ্যের মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা আয় করে নিজের দেশের অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করে থাকে। তাই, সেসব দেশ কোম্পানিগুলোর বাজার বিস্তারে প্রয়োজনীয় আর্থিক, নীতিগত, কুটনৈতিক এমনকি সামরিক সহায়তাও প্রদান করে থাকে; যেমনঃ আজ এটা প্রমাণিত সত্য যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরাক ও আফগানিস্তানে যে দুটো ভয়াবহ যুদ্ধ পরিচালনা করেছে তা মূলত মার্কিন তেল কোম্পানির স্বার্থ রক্ষার্থে;
৩. দরিদ্র দেশের বাজার বহুজাতিক কোম্পানির জন্য খুলে দিতে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা নানা নীতি ও আইন তৈরি করে এবং সেগুলো মানতে বাধ্য করে;
৪. বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ ও অন্যান্য দাতা সংস্থা দরিদ্র দেশগুলোকে যে ঋণ দেয় সে ঋণের সাথে নানা শর্ত জুড়ে দিয়ে দরিদ্র দেশের বাজার বহুজাতিক কোম্পানির জন্য খুলে দিতে বাধ্য করে;
৫. এসব কোম্পানি যেদেশে বিনিয়োগ করে সেদেশে স্থানীয় জনশক্তির জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়। যদিও স্বস্তা শ্রম সহজলভ্য হওয়ার কোম্পানিগুলো এরূপ বিনিয়োগে আগ্রহী হয় তবুও কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য এসব দেশের সরকারগুলো এ ধরণের বিনিয়োগকে স্বাগত জানায় এবং প্রচুর সুযোগ-সুবিধা দিয়ে থাকে। যেমন: বাংলাদেশ সরকার বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার জন্য বিদেশী বিনিয়োগকারীকে অনেক ক্ষেত্রে দেশী বিনিয়োগকারীর চেয়েও বেশি সুযোগ-সুবিধা প্রদান করে থাকে;
৬. জনগণ দেশীয় পণ্য ও সেবা ব্যবহার করতে পারে যা দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে কমবেশি ভূমিকা রাখে।

বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার উপর বহুজাতিক কোম্পানির কর্তৃত্ব
বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার সদস্য মূলত বিভিন্ন রাষ্ট্র। কাজেই বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার বাণিজ্য আলোচনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় বহুজাতিক কোম্পানির সরাসরি অংশগ্রহণের কোন সুযোগ নেই। কিন্তু পরোক্ষভাবে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার বাণিজ্য আলোচনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় বহুজাতিক কোম্পানিগুলো ব্যাপকভাবে প্রভাব বিস্তার করে এবং নিজেদের স্বার্থ হাসিল করে নেয়। এজন্য বহুজাতিক কোম্পানি বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করে থাকে। যেমন-
১. বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর প্রতিনিধিরা জাতীয় প্রতিনিধি দলের অংশ হিসেবে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার বিশেষজ্ঞসভা ও মন্ত্রী পর্যায়ের সম্মেলনে অংশগ্রহণকারী প্রতিনিধিদের কাছে বাণিজ্যিক আলোচনার আগে ও পরে পরিকল্পনা ও নীতিমালা বিষয়ে তাদের স্বার্থ সংরক্ষণের জন্য সার্বক্ষণিক তদ্বির করে থাকে;
২. বহুজাতিক কোম্পানিগুলো তাদের স্বার্থ রক্ষার্থে তদ্বির করার জন্য প্রতিনিধি (দালাল) নিযুক্ত করে যারা বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার বিশেষজ্ঞ সভা ও মন্ত্রী পর্যায়ের সম্মেলনে অংশগ্রহণকারী প্রতিনিধিদের কাছে বাণিজ্যিক আলোচনার আগে ও পরে পরিকল্পনা ও নীতিমালা বিষয়ে তাদের স্বার্থ সংরক্ষণের জন্য সার্বক্ষণিক তদ্বির করে থাকে;
৩. বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর প্রতিনিধিরা সরাসরি বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার সচিবালয়ের কর্মকর্তাদের (যারা ধনী বিশ্বের স্বার্থ সংরক্ষণে সদা সচেষ্ট) সঙ্গে বৈঠক করে তাদের স্বার্থ সংরক্ষণের জন্য তদ্বির করে থাকে।
এছাড়াও বহুজাতিক কোম্পানিগুলো বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার সদস্য দেশগুলোর উপরও বিভিন্নভাবে প্রভাব খাটায়।
যেমন-
১. বিভিন্ন ধরনের উপদেষ্টা কমিটির মাধ্যমে বহুজাতিক কোম্পানিগুলো ধনী দেশগুলোর নীতি নির্ধারকদেরকে প্রভাবিত করে থাকে। জাপান ও যুক্তরাষ্ট্রে এরূপ বিভিন্ন চ্যানেল স্পষ্টতঃই লক্ষ্য করা যায়।
২. বহুজাতিক কোম্পানির পরিচালনা পরিষদ বা উপদেষ্টা কমিটিতে ধনী বিশ্বের রাজনীতিবিদদের অনেকেই বিভিন্ন পদে অধিষ্ঠিত যারা বহুজাতিক কোম্পানির স্বার্থ রক্ষায় ভূমিকা রাখে।
৩. বহুজাতিক কোম্পানিগুলো রাজনৈতিক দল ও দলের নির্বাচনী প্রচারণায় টাকা ঢালে।
৪. গরীব দেশগুলোর অর্থনীতিতে বহজাতিক কোম্পানিগুলো শক্তিশালী ভূমিকা রাখে ও হস্তক্ষেপ করে থাকে।
বর্তমান বিশ্ব বাণিজ্যের উপর রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ ক্রমেই শিথিল হয়ে যাচ্ছে। এসব বহুজাতিক কোম্পানি যাতে অবাধে সারা বিশ্বে তাদের বাণিজ্যের প্রসার ঘটাতে পারে তার জন্য সকল ব্যবস্থাই পাকাপোক্ত করছে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা। আর রাষ্ট্র এক্ষেত্রে শুধু সহায়কের ভূমিকা পালন করছে। যেমনঃ মার্কিন তেল কোম্পানির স্বার্থ রক্ষায় বুশ সরকার নানান ছলছুতোয় আফগানিস্তান ও ইরাকে যুদ্ধ চাপিয়ে দিয়ে তাদের পছন্দমতো সরকার বসিয়েছে। অন্যদিকে, বাংলাদেশে গ্যাস উত্তোলনে নিয়োজিত মার্কিন কোম্পানির স্বার্থে গ্যাস রপ্তানির জন্য এ দেশের সরকারের উপর ক্রমাগত চাপ সৃষ্টি করে চলেছে।
বহুজাতিক কোম্পানির শক্তির কিছু নমুনা
১. পৃথিবীর সর্ববৃহৎ ১০০টি বড় অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৫১টিই হল বহুজাতিক কোম্পানির মালিকানাধীন আর ৪৯টি হল রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন।
২. জেনারেল মটরস ডেনমার্কের চেয়ে বেশি আয় করে, ওয়াল মার্ট নরওয়ের চেয়ে বেশি আয় করে এবং জেনারেল ইলেট্রিক পর্তুগালের চেয়েও বেশি আয় করে।
৩. পৃথিবীর বড় কর্পোরেশগুলোর ৫০০টির মোট বিক্রয় পৃথিবীর সকল দেশের মোট জাতীয় আয়ের ৪৭% অথচ এগুলোতে কর্মসংস্থান মাত্র ১.৫৯%।
বায়োটেকনোলজিক্যাল বহুজাতিক কোম্পানি
১. পৃথিবীতে বায়োটেকনোলজিক্যাল কোম্পানি আছে মোট ৩৬১ টি, যার মধ্যে ৭৬% যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক।
২. বিশ্বের ৯৮% জিএম ফসল উৎপন্ন হয় যুক্তরাষ্ট্র, আর্জেন্টিনা ও কানাডায়।
৩. বর্তমানে সারা বিশ্বে যত জিএম ফসল চাষ হয় তার ৯৪% মনসান্টো (বর্তমান নাম ফার্মাসিয়া) কোম্পানির।
৪. ২০০১ সালে সারা বিশ্বে চাষকৃত মোট জিএম ফসলের ৯১% ছিল মনসান্টো কোম্পানির বীজ।
৫. মনসান্টো, সিনজেন্টা ও এভেন্টিস ক্রপ সাযেন্স – মূলত এই তিনটি কোম্পানিই দখল করে আছে সারা বিশ্বের পুরো জিএম (GM – Genetically Modified) খাদ্যের বাজার।
উল্লেখ্য যে, ইউরোপ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে জিএম খাদ্যের বিরুদ্ধে ভোক্তাশ্রেণী প্রতিবাদমুখর হওয়ায় সেখানে কোম্পানিগুলো বর্তমানে সুবিধা করতে পারছে না। তাই তারা অনগ্রসরতা, দারিদ্রতা, পরনির্ভরশীলতা ও প্রযুক্তিগত দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে এসব জিএম খাদ্য ও জিএম ফসল ঠেলে পাঠাচ্ছে বাংলাদেশের মতো তৃতীয় বিশ্বের গরীব দেশগুলোতে।
বিশ্বের কৃষি বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণকারী কয়েকটি বহুজাতিক কোম্পানি
১. মোনসান্টো (বর্তমান নাম ফার্মাসিয়া): মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র
২. ডু-পন্ট/পাইওনিয়ার হাইব্রিড ইন্টারন্যাশনাল: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র
৩. সিনজেন্টা/নোভাট্রিস: সুইজারল্যাণ্ড
৪. এভেন্টিস ক্রপ সায়েন্স: ফ্রান্স
৫. এ্যডভান্সড টেকনোলজিস: বৃটেন
৬. এগ্রো-ইভো: জার্মানি
৭. ব্যায়ার ক্রপ সায়েন্স: জার্মানি
৮. মিট্সুই-টুটসু ক্যামিক্যালস: জাপান
প্রকৃত প্রস্তাবে এসব বহুজাতিক কোম্পানি নব্য ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানি ছাড়া আর কিছুই নয়। বৃটিশ ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির শাসন-শোষণের করুণ ইতিহাস আমাদের সবারই জানা। এক সময় ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানি এ দেশে ব্যবসা করতে এসে গোটা দেশটাই দখল করে নিয়েছিল, স্থাপন করেছিল উপনিবেশ। প্রায় দু’শ বছর তারা এ দেশ শাসন করেছে এবং এ দেশের সম্পদ শোষণ ও লুন্ঠন করে নিয়ে নিজের দেশে গড়েছে সম্পদের পাহাড়। শুধু তাই নয়, আমরা দেখেছি কোম্পানির মুনাফার ক্ষুধা এতটাই সর্বগ্রাসী যে, সে ক্ষুধা মেটাতে গিয়ে কৃত্রিম দুর্ভিক্ষ সৃষ্টি করে কোটি মানুষকে করুণ মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিতেও তারা কুণ্ঠিত হয় নি। কোম্পানির কাছে মুনাফাই একমাত্র সত্য যেখানে মানবতার কোন মূল্য নেই। কিন্তু তথাকথিত গণতন্ত্রের বর্তমান যুগে এরূপ উপনিবেশ স্থাপন করা আর সম্ভব নয়। এরূপ ইচ্ছাও আর সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলোর নেই এবং এর প্রয়োজনও আর তাদের নেই। কারণ, তারা ইতোমধ্যে এর বিকল্প পন্থা বের করে ফেলেছে। আর সেটি হল ‘দেশ দখল নয়, বাজার দখল’।
এটা ভুলে গেলে চলবে না যে, এসব বহুজাতিক কোম্পানি গরিব দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন বা মুক্তির জন্য গড়ে উঠেনি। তাদের মূল লক্ষ্য হল মুনাফা অর্জন, তা যে করেই হোক। এজন্য যদি মাটি, পানি, পরিবেশ ও জীবজগৎ ধ্বংস হয়, মানুষের স্বাস্থ্যহানি ঘটে, তাতে তাদের কিছুই এসে যায় না। এমনকি এজন্য যদি পৃথিবীর বুকে যুদ্ধও চাপিয়ে দিতে হয়, তাতেও তারা মোটেও পিছপা হবে না। সা¤প্রতিক কালেই আমরা দেখেছি মধ্যপ্রাচ্যের তেলের উপর একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে আফগানিস্থান ও ইরাকের উপর দুটি বিধ্বংসী যুদ্ধ চাপিয়ে দিতে। সুতরাং এই আগ্রাসন থেকে মুক্তির পথ খুঁজে বের করা এখন গরীব দেশগুলোর জন্য একান্ত জরুরি হয়ে পড়েছে।