আর কত ঝরিবে রক্ত

আর কত ঝরিবে রক্ত, ঝরিবে কত নতুন প্রাণ,
জুলুম, শোষণ, নির্যাতনের কবে হবে অবসান।
দুর্ভাগা এ জাতিটার অনল-পোড়া ভালে,
সুখের ভাগ্য হয়নি লেখা হয়নি কোনকালে।
জুলুম, শোষণ, নির্যাতনই মোদের চিরসাথী,
দীর্ঘ যুগের প্রতীক্ষাতেও কাটেনি আধার রাতি।
কত লড়াই, কত সংগ্রাম, কত নব অভ্যূত্থান,
ঝরেছে কত রুধির ধারা লয়েছে কত নবীন প্রাণ।
কত স্বপ্ন, কত আশা, চির মুক্তির কত বাসনা,
ঝঞ্জাবিক্ষুব্ধ সিন্ধু পেরুতে কত নিরন্তর সাধনা।
বৃথাই সব, সব নিষ্ফল, কেবলি শনির প্রভাব,
নতুন রূপে ঘটেছে কেবল নব্য শোষকের আবির্ভাব।
উষার দুয়ারে মুক্তি-অরুণ দেখিয়াছি যতবার,
নিরাশার কালোমেঘে তা ঢাকিয়াছে বারেবার।
দেখেছি কত মুক্তিকেতন ঐ আকাশে উড়িতে,
স্বল্পকালের ব্যবধানেই তা লুটিয়াছে ধুলিতে।

—————————
ময়মনসিংহ। তারিখ: ২৫/০৮/১৯৯০

ভয়ের রাজ্যে

ভয়ের রাজ্যে

 

এক ভয়ের রাজ্যে আমাদের অভিশপ্ত জনম

জন্ম থেকে মুত্যু অবধি

ভয়ের সংস্কৃতির দূর্ভেদ্য জালে ঘেরা

এই সমাজ ও রাষ্ট্রে

রেশমগুটির ভিতর সুপ্ত গুটিপোকার মত

বেচে থাকাই আমাদের জীবন।

 

ভয়ের সাথেই আমাদের নিত্য বসবাস

“চিত্ত যেথা ভয়শুন্য উচ্চ যেথা শির”

বিশ্বকবির এই অবিনাশী বাণী

শতবর্ষ পেরিয়ে গেলেও

এই পোড়াদেশে তা সত্য নয়।

 

অবোধ শিশুর দূরন্ত শৈশবের

সহজাত দূরন্তপনা নিয়ন্ত্রণে

আমরা অজান্তে ঢুকিয়ে দেই

অযথা অমূলক সব ভয়

জীন-ভুত-পুলিশ-ডাকাত-ছেলেধরা

কিংবা অবোধ-হিংস্র সর্প,

ব্যঘ্র, ভল্লুক, সিংহ কত কী!

স্রষ্টাকে ভয়, রাজাকে ভয়, শিক্ষাগুরুকে ভয়

এমনকি জনক, জননী, অগ্রজ

যাদের হৃদয়ে বহে প্রেম, প্রীতি,

ভালোবাসা, আদর, স্নেহের ফল্গুধারা

অযথা চাপানো ভয়

তাদেরকেও করে তুলে ভয়ংকর।

 

পাড়ার পাতি মাস্তান থেকে লুটেরা শাসক

চোর, ডাকাত, ছিনতাইকারী, খুনি, শীর্ষ সন্ত্রাসী

ইত্যকার সত্যিকারের ভয়ংকর যারা

ভয় দেখানোই যাদের মোক্ষম অস্ত্র

ভয় দেখিয়েই হাসিল করে কামিয়াবি

রাষ্ট্র ও সমাজের মাথার পরে

জগদ্দল পাথরের মত চেপে বসে

 

নির্মাণ করে চলে ভয়ের সংস্কৃতি

ভয়ের রাজ্যে তারাই সবচেয়ে ভয়ংকর।

————-

ময়মনসিংহ। ২৩/০৮/২০২৩

ব্যবস্থা বদলের স্বপ্ন

ব্যবস্থা বদলের স্বপ্ন

 

আজব এক ব্যবস্থা চলছে এই দেশে

যুগের পর যুগ জগদ্দল পাথরের বেশে।

ধান্দাবাজি আর লুটপাটে লিপ্ত থেকে সবাই

মুখে মুখে কথামালায় দেশটা বদলাতে চাই।

মিথ্যে বয়ানে ভুলে বঞ্চিত জনতা নামে পথে

রক্ত ঝরায় জীবন বিলায় ফিরে ব্যর্থ মনোরথে।

দেশের এ চিত্রটা সহজেই পাল্টে দেওয়া যায়

শুধু যদি সিস্টেমটাকে একটু বদলানো যায়।

কিন্তু এক আজব জাতি মোরা এই বাঙাল

পশ্চাতে সব খুইয়েও নগদ লাভের কাঙাল ।

সব সমস্যার মূলে আদতে আমরাই

তবু সারাক্ষণ দু’হাতে কপাল চাপরাই

চোখের সামনে অবিরত মারা খাই

তবুও যেন কারও সম্ভিতটুকুও নাই।

সমধানের পথে মোরা হাটতে নারাজ

যে যার বুঝ নিয়ে চলছে বকোয়াজ

যদি বলি চলো এক হয়ে বদলে দেই নিয়তি

শুধু ধান্ধা খুজে কেউ তাতে দেয়না সম্মতি।

চারিদিকে সবার মাঝেই চলছে নাভিশ্বাস

মিথ্যে আর ভণ্ডামিতে ভরা শুধুই অবিশ্বাস

বিশ্বাসে মিলায় বস্তু তর্কে বহুদূর

বিশ্বাসের পুঁজিই পারে এসব জঞ্জাল দূর।

দিনবদল কত দূরে

দিনবদল কত দূরে

 

ব্যবস্থা একখান বানাইছেন বেশ

আপনারা যারা চালান দেশ

আর আপনাদেরই দোসর, সহচর

যত দেশি-বিদেশি কোম্পানি

এবং মধ্যস্বত্বভোগী ব্যবসায়ি

সবাই মিলে ছলে বলে কৌশলে

খাসা, বলিহারি, আহা মরি!

 

ভালইতো মন্ত্র একখান শিখাইছেন

কৃষকেরে নিয়ে যন্তর-মন্তর ঘরে

“পেট ভরে নাও খাই, ফলন বাড়ানো চাই”

কৃষাণ-জেলে মরবে খেটে কাদাজল ঘেটে

রোদ-বৃষ্টি-ঝরে রক্ত পানি করে

ফলাইবে ফসল, ধরবে মৎস্য

নিরন্তর লড়াই করে

অনন্ত সমস্যা আর বৈরি প্রকৃতির সাথে

আর সেই ফসলে পকেট হবে ভারি

কর্পোরেশন আর মধ্যস্বত্বভোগির।

তাদেরই হবে টাকা কড়ি

বাড়ি গাড়ি আর সুরা নারী

মত্ত রবে দিবানিশি বিলাস জলসায়

যেথা পৌছে যায় অবলীলায়

কাটারিভোগ বা কালিজিরা

সেই চাল যা স্বাদে গন্ধে সেরা

রুই, কাতল, পাবদা, চিতল

নামেতেই জিভে আসে জল

আছে যত মুখরোচক খাদ্য খাবার

দেশের প্রান্ত হতে প্রান্তান্তর ছেকে

পৌছে যায় আপনাদেরই খাবার টেবিলে

যার কিছুটা যায় পেটে বাকিটা ডাস্টবিনে।

 

আর যারা এসব ধরেন বা ফলান

সেসব কৃষক আর জেলের সন্তান

পায়না খেতে দুবেলা, নিয়ে ক্ষুধার জ্বালা

কাটে বিনিদ্র রাত জুটেনা ডালভাত

ভোগে পুষ্টিহীনতায়, মরে অবেলায়।

চলবে আর কতকাল ধরে।

 

আজব এই ব্যবস্থাখানি

শুধুই ফাঁকা বুলি আর মিথ্যে প্রতিশ্রুতি শুনি

শুনি মুক্তির অসার বাণী

বায়ান্ন, উনসত্তর, একাত্তর, নব্বই

দশকের পর দশক চলে যায়

তৃষিত মন শুধুই প্রশ্ন করে যায়

দিনবদল আর কত দূরে ???

মানবজীবন

 

নরকতুল্য এই দুনিয়ায় বাঁচতে চাইনা বলে

অবলীলায় নিজেকে হনন করে চলি প্রতিদিন

অযত্নে, অবহেলায়, আলসেমিতে

ক্রমাগত ধেয়ে চলি মহাজীবনের পানে

কারণ, কি হবে বেঁচে থেকে পশুদের মত।

 

কতটা জরুরী ছিল আমার এই মানব জনম

কিংবা এই জগতের লক্ষ কোটি জীব

কেন যে জনম লয় আবার মরণ হয়

মাঝখানে কত না লড়াই-সংগ্রাম জীবনভর!

 

এই লড়াইয়ে নিরন্তর যন্ত্রণা আছে

আঘাত আছে প্রত্যাঘাত আছে,

আঘাতে আঘাতে জর্জরিত হয়ে

ব্যাথা বেদনায় কুকড়ে যাওয়া আছে

আর আছে অনুক্ষণ মৃত্যুর হাতছানি।

 

এতকিছুর মাঝে বেচে থাকার আনন্দও আছে

হঠাৎ আলোর ঝলকানির মত

ক্ষণস্থায়ী লড়াই জেতার আনন্দ-সুখ আছে

সেই সুখের মায়ায়, স্বজনের ভালোবাসায়

বেচে থাকার প্রাণপণ চেষ্টাও আছে

এইতো মায়াময় মানবজীবন।