বর্গীমুক্তির বাসনা

বর্গীমুক্তির বাসনা

 

এক নির্জলা সত্য এই যে,

যুগে যুগে শাসকরূপে চেপে বসা

শ্রেফ লুটেরা এক দস্যু শ্রেণি

শ্রমে-ঘামে গায়ের রক্ত পানি করে

দিনরাত প্রাণান্তকর পরিশ্রমে

যাকিছু উৎপাদন করেছে কৃষক ও শ্রমিক

তাতে ভাগ বসিয়েছে কুকুরের মত

অমানবিক নিষ্ঠুরতায় লুটে নিয়ে গেছে

অবুঝ শিশুর মুখের গ্রাসটুকুও।

 

আর সেই হতভাগা কৃষাণী মাতা

অসহায় চিত্তে গেয়ে চলেছে

অভুক্ত শিশুর জন্য ঘুমপাড়ানি গান

“খোকা ঘুমালো, পাড়া জোড়ালো

বর্গী এলো দেশে,

বুলবুলিতে ধান খেয়েছে

খাজনা দিব কিসে!”

 

স্বাধীনতার তিপ্পান্ন বছর পরেও

অলিগার্ক আর মাফিয়ারূপী নব্য বর্গীদের খপ্পরে দেশ

আজও কি বর্গীমুক্ত হলো এই জনপদ?

মুক্তির বাসনায় কত লড়াই, সংগ্রাম

যুগের পর যুগ, শতাব্দীর পর শতাব্দী

বৃথাই গেলো কত প্রাণ, অকাতর রক্তদান

আজও কি তাই হবে চব্বিশে এসে?

—————————–

ময়মনসিংহ। ১১/১২/২০২৪

এক অবিমৃষ্যকারী জাতির ভবিষ্যৎ

এক অবিমৃষ্যকারী জাতির ভবিষ্যৎ

 

এই না হলে আমরা বাঙালি!

এক অসভ্য, ইতর, উশৃংখল জাতি আমরা!

দিবস-রজনী আশায় আশায় থাকি

কোন এক দৈত্য দানব এসে

দেশটাকে স্বর্গ বানিয়ে দিয়ে যাবে

আর আমরা বসে বসে মেওয়া ভোজন করব।

 

এদেশে দিবানিশি ব্যক্তিস্বার্থের ধান্ধা-ফিকির চলে

দেশের স্বার্থ, দশের স্বার্থ দেখার ফুরসত নাহি মিলে।

 

বিধাতা বানিয়েছিলেন মানুষ জংলি পশুরূপে

দিয়েছিলেন সভ্য হওয়ার জ্ঞান

সেই জ্ঞানের চর্চায় কত জাতি উন্নত হলো

সভ্য হয়ত হয়নি পুরোটা মানবিকতায়

কিন্তু নিয়ম-নীতি, শৃঙ্খলা, আইনের শাসন

এসব চর্চায় নিজের দেশটাকে গড়েছে বাসযোগ্য করে।

 

আর আমরা আজও রয়ে গেলাম পশুর স্তরে

দেশটাকে বানিয়ে রেখেছি হাবিয়া দোজখ

যেখানে দখল-দুষণ আর নিয়ম ভাঙার মহোৎসব চলে

তুচ্ছ কারণে মারামারি, হানাহানি আমাদের মজ্জাগত

কুকুরের মত হাউমাউ, ঘেউঘেউ, কামড়াকামড়িতে

সারাক্ষণ মেতে থাকি ভুত হয়ে।

ভালোমন্দ বিচারবুদ্ধিটুকুও লোপ পেয়েছে যেন

এমন এক অবিমৃষ্যকারী জাতির ভবিষ্যৎ

সীমাহীন গহীন আধারে ঘেরা।

————————–

ময়মনসিংহ। ২৫/১২/২৪

ঘুষ

ঘুষ

 

সবাই মোরে ঘৃণাভরে নাম রাখিল ঘুষ,

চুপি চুপি পেতে আমায় রয় না কারো হুশ।

নাম শুনে কি তোমরা সবে করছো মোরে ঘৃণা,

তোমরা হাবা, আমার কদর তাইতো জান না।

কথায় কথায় যারা আমায় ঘৃণায় থুথু ছুড়ে,

সংগোপনে তারাই আবার আমার পিছু ঘুরে।

বড়সড় কর্তারা সব আমায় কদর করে,

পেলে আমায় মনে তাদের আনন্দ না ধরে।

ছোট খাট কর্মচারি তারাও বোকা নয়,

সুযোগ বুঝেই আমায় তারা আপন করে লয়।

কৃষক-শ্রমিক-মুটে-মজুর ওহঃ আর বলো না,

আমি ওদের দু’চোখেতে দেখতে পারি না।

গায়ের লোক? ওদের দেখে আমার লাগে ভয়,

গায়ে আমার অনাদরে স্বাস্থ্য খারাপ হয়।

আমার বাস শহর-নগর অট্টালিকা ’পরে,

শিক্ষিত সব শহরবাসী আমায় যতন করে।

মূর্খের কাছে তাইতো আমি যাইনাকো ভাই কভু

তোমরা তাদের সৎ বলিলেও আমি বলি হবু।

তোমরা তবু আমার নামে দিচ্ছ অপবাদ,

সেই জানে যে পেয়েছে বারেক আমারি আস্বাদ

যতবড় কর্তা বল আদর্শ নীতিবান,

আমায় পেলে আদর্শ সব পালায় পরীস্থান।

ভয়ের রাজ্যে

ভয়ের রাজ্যে

 

এক ভয়ের রাজ্যে আমাদের অভিশপ্ত জনম

জন্ম থেকে মুত্যু অবধি

ভয়ের সংস্কৃতির দূর্ভেদ্য জালে ঘেরা

এই সমাজ ও রাষ্ট্রে

রেশমগুটির ভিতর সুপ্ত গুটিপোকার মত

বেচে থাকাই আমাদের জীবন।

 

ভয়ের সাথেই আমাদের নিত্য বসবাস

“চিত্ত যেথা ভয়শুন্য উচ্চ যেথা শির”

বিশ্বকবির এই অবিনাশী বাণী

শতবর্ষ পেরিয়ে গেলেও

এই পোড়াদেশে তা সত্য নয়।

 

অবোধ শিশুর দূরন্ত শৈশবের

সহজাত দূরন্তপনা নিয়ন্ত্রণে

আমরা অজান্তে ঢুকিয়ে দেই

অযথা অমূলক সব ভয়

জীন-ভুত-পুলিশ-ডাকাত-ছেলেধরা

কিংবা অবোধ-হিংস্র সর্প,

ব্যঘ্র, ভল্লুক, সিংহ কত কী!

স্রষ্টাকে ভয়, রাজাকে ভয়, শিক্ষাগুরুকে ভয়

এমনকি জনক, জননী, অগ্রজ

যাদের হৃদয়ে বহে প্রেম, প্রীতি,

ভালোবাসা, আদর, স্নেহের ফল্গুধারা

অযথা চাপানো ভয়

তাদেরকেও করে তুলে ভয়ংকর।

 

পাড়ার পাতি মাস্তান থেকে লুটেরা শাসক

চোর, ডাকাত, ছিনতাইকারী, খুনি, শীর্ষ সন্ত্রাসী

ইত্যকার সত্যিকারের ভয়ংকর যারা

ভয় দেখানোই যাদের মোক্ষম অস্ত্র

ভয় দেখিয়েই হাসিল করে কামিয়াবি

রাষ্ট্র ও সমাজের মাথার পরে

জগদ্দল পাথরের মত চেপে বসে

 

নির্মাণ করে চলে ভয়ের সংস্কৃতি

ভয়ের রাজ্যে তারাই সবচেয়ে ভয়ংকর।

————-

ময়মনসিংহ। ২৩/০৮/২০২৩

ব্যবস্থা বদলের স্বপ্ন

ব্যবস্থা বদলের স্বপ্ন

 

আজব এক ব্যবস্থা চলছে এই দেশে

যুগের পর যুগ জগদ্দল পাথরের বেশে।

ধান্দাবাজি আর লুটপাটে লিপ্ত থেকে সবাই

মুখে মুখে কথামালায় দেশটা বদলাতে চাই।

মিথ্যে বয়ানে ভুলে বঞ্চিত জনতা নামে পথে

রক্ত ঝরায় জীবন বিলায় ফিরে ব্যর্থ মনোরথে।

দেশের এ চিত্রটা সহজেই পাল্টে দেওয়া যায়

শুধু যদি সিস্টেমটাকে একটু বদলানো যায়।

কিন্তু এক আজব জাতি মোরা এই বাঙাল

পশ্চাতে সব খুইয়েও নগদ লাভের কাঙাল ।

সব সমস্যার মূলে আদতে আমরাই

তবু সারাক্ষণ দু’হাতে কপাল চাপরাই

চোখের সামনে অবিরত মারা খাই

তবুও যেন কারও সম্ভিতটুকুও নাই।

সমধানের পথে মোরা হাটতে নারাজ

যে যার বুঝ নিয়ে চলছে বকোয়াজ

যদি বলি চলো এক হয়ে বদলে দেই নিয়তি

শুধু ধান্ধা খুজে কেউ তাতে দেয়না সম্মতি।

চারিদিকে সবার মাঝেই চলছে নাভিশ্বাস

মিথ্যে আর ভণ্ডামিতে ভরা শুধুই অবিশ্বাস

বিশ্বাসে মিলায় বস্তু তর্কে বহুদূর

বিশ্বাসের পুঁজিই পারে এসব জঞ্জাল দূর।

দিনবদল কত দূরে

দিনবদল কত দূরে

 

ব্যবস্থা একখান বানাইছেন বেশ

আপনারা যারা চালান দেশ

আর আপনাদেরই দোসর, সহচর

যত দেশি-বিদেশি কোম্পানি

এবং মধ্যস্বত্বভোগী ব্যবসায়ি

সবাই মিলে ছলে বলে কৌশলে

খাসা, বলিহারি, আহা মরি!

 

ভালইতো মন্ত্র একখান শিখাইছেন

কৃষকেরে নিয়ে যন্তর-মন্তর ঘরে

“পেট ভরে নাও খাই, ফলন বাড়ানো চাই”

কৃষাণ-জেলে মরবে খেটে কাদাজল ঘেটে

রোদ-বৃষ্টি-ঝরে রক্ত পানি করে

ফলাইবে ফসল, ধরবে মৎস্য

নিরন্তর লড়াই করে

অনন্ত সমস্যা আর বৈরি প্রকৃতির সাথে

আর সেই ফসলে পকেট হবে ভারি

কর্পোরেশন আর মধ্যস্বত্বভোগির।

তাদেরই হবে টাকা কড়ি

বাড়ি গাড়ি আর সুরা নারী

মত্ত রবে দিবানিশি বিলাস জলসায়

যেথা পৌছে যায় অবলীলায়

কাটারিভোগ বা কালিজিরা

সেই চাল যা স্বাদে গন্ধে সেরা

রুই, কাতল, পাবদা, চিতল

নামেতেই জিভে আসে জল

আছে যত মুখরোচক খাদ্য খাবার

দেশের প্রান্ত হতে প্রান্তান্তর ছেকে

পৌছে যায় আপনাদেরই খাবার টেবিলে

যার কিছুটা যায় পেটে বাকিটা ডাস্টবিনে।

 

আর যারা এসব ধরেন বা ফলান

সেসব কৃষক আর জেলের সন্তান

পায়না খেতে দুবেলা, নিয়ে ক্ষুধার জ্বালা

কাটে বিনিদ্র রাত জুটেনা ডালভাত

ভোগে পুষ্টিহীনতায়, মরে অবেলায়।

চলবে আর কতকাল ধরে।

 

আজব এই ব্যবস্থাখানি

শুধুই ফাঁকা বুলি আর মিথ্যে প্রতিশ্রুতি শুনি

শুনি মুক্তির অসার বাণী

বায়ান্ন, উনসত্তর, একাত্তর, নব্বই

দশকের পর দশক চলে যায়

তৃষিত মন শুধুই প্রশ্ন করে যায়

দিনবদল আর কত দূরে ???