পূর্ববর্তী অধ্যায়সমূহের আলোচনা থেকে এটা সুস্পষ্ট যে, সবুজ বিপ্লবের হাত ধরে যে বাণিজ্যিক কৃষি এদেশে প্রবর্তিত হয়েছে তা দানাদার খাদ্যশস্যের উৎপাদন বাড়ালেও দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ ক্ষুদ্র, প্রন্তিক ও ভূমিহীন কৃষকদের খাদ্য নিরাপত্তাসহ জীবিকার নিরাপত্তা ও স্থায়িত্বশীল উন্নয়নের পথে বড় অন্তরায় হিসেবে প্রতিভাত হয়েছে। কিন্তু বাণিজ্যিক বিশ্বায়নের বর্তমান বাস্তবতায় বাণিজ্যকে অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে কৃষির বর্তমান ধারার বাণিজ্যিকীকরণ দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ ক্ষুদ্র, প্রন্তিক ও ভূমিহীন কৃষকদের জন্য মারাত্মক বিপর্যয় ঢেকে আনবে যা সম্পর্কে ইতোপূর্বে বিস্তারিতভাবে আলোচিত হয়েছে। কারণ বাস্তব সত্য এই যে, বর্তমান ধারার বাণিজ্যিক কৃষিতে ক্ষুদ্র উৎপাদকদের কোন স্থান নেই। এই বাণিজ্যিক কৃষির মূলমন্ত্র হল খামারের আয়তন যত বড় হবে, যান্ত্রিকীকরণ যত বেশি হবে এবং যত বেশি পুঁজিঘন প্রযুক্তি ব্যবহার করা যাবে উৎপাদনশীলতা তত বেশি হবে। কাজেই, বাণিজ্যিক কৃষিতে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকরা গতিশীল উৎপাদক নয়। কারণ তাঁদের পুঁজি নেই, আধুনিক প্রযুক্তিগত জ্ঞান ও দক্ষতা নেই, সর্বোপরি জমিই নেই। এসব কৃষক নিজের একখন্ড জমি বা অন্যের কাছ থেকে একখন্ড জমি বর্গা নিয়ে তাতে নিজের ও পরিবারের সদস্যদের শ্রম ও সর্বস্ব মূলধন বিনিয়োগ করে যা কিছু উৎপাদন করে তা দিয়ে কোনরকমে নিজেদের জীবিকা নির্বাহ করতে পারে মাত্র। কিংবা কোন কোন ক্ষেত্রে গ্রামীণ ক্ষমতা কাঠামোর মধ্যে তাও পারে না। ধসে পড়ার দিকেই এদের ঝোঁক থাকে। অনেকে হয়তো ধসে না পড়ে একটু এগিয়ে যায়। তাই এটা সত্য যে, কোনরকম বেঁচে থাকা এই ব্যাপক সংখ্যক কৃষককে দিয়ে কৃষিতে গতিশীলতা আসতে পারে না। তাই হয়ত ‘বাণিজ্যিক কৃষির প্রচলন করা’ খসড়া কৃষিনীতি (২০১০)-এর অন্যতম উদ্দেশ্য ঠিক করা হয়েছে। যদিও সবুজ বিপ্লবের হাত ধরে বাণিজ্যিক কৃষি এদেশে অনেক আগেই প্রবর্তিত হয়েছে।

এটা ভুলে গেলে চলবে না যে, সবুজ বিপ্লবের হাত ধরে যে বাণিজ্যিক কৃষি এদেশে প্রবর্তিত হয়েছে তা বৈষম্য সৃষ্টিতে সহায়ক। কারণ, পুঁজিঘন বর্তমান কৃষি ব্যবস্থায় পুঁজিরই সঞ্চয়ন হচ্ছে এবং হবে। কাজেই এ কৃষি ব্যবস্থা পুঁজিপতি অকৃষক এবং পুঁজিহীন কৃষকের মধ্যে বৈষম্য উত্তরোত্তর বাড়িয়ে দিবে তাতে সন্দেহের অবকাশ নেই। যে বৈষম্য থেকে মুক্তির স্বপ্ন নিয়ে দেশের কৃষক-শ্রমিকসহ আপামর জনতা এক রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়েছিল সে স্বপ্ন আজও সুদুর পরাহত। এর প্রধান কারণ, স্বাধীনতা লাভের পর গত চার দশক ধরে দাতাদের পরামর্শে ও মদদে আমরা এক ভ্রান্ত পথে হেটেছি যার ফলশ্রæতিতে কর্পোরেট পুঁজি আজ এদেশের কৃষিকে গ্রাস করতে যাচ্ছে যার সাথে এ দেশের শতকরা প্রায় ৮০ ভাগ কৃষিনির্ভর গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর ভাগ্য জড়িত। কাজেই স্বাধীনতার চেতনা শুধু কথামালায় নয়, যদি বাস্তবে থেকে থাকে তবে এখনও সময় আছে সঠিক সিদ্ধান্ত নেবার; এখনও সময় আছে ঘুরে দাড়াবার। তবে তার জন্য প্রয়োজন বর্তমান কৃষি ব্যবস্থার আমূল সংস্কারের সুদৃঢ় রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত।

কিন্তু কৃষি একটি ব্যাপক বিষয়। কৃষি শুধু ফসল উৎপাদন নয় বরং মৎস্য, বনজ ও প্রণিসম্পদসহ সকল প্রাকৃতিক উৎপাদন ব্যবস্থাই এর অন্তর্ভূক্ত। পাশাপাশি জমি, জলা, জঙ্গলসহ প্রাকৃতিক সম্পদের বন্টন ও ব্যবস্থাপনাও এর সাথে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। সর্বোপরি এটি একটি দেশের আর্থসামাজিক ব্যবস্থা ও সংস্কৃতিরও প্রধান নিয়ামক। স¤প্রতি এসবের সাথে যুক্ত হয়েছে খাদ্য নিরাপত্তা ও জলবায়ু পরিবর্তনজণিত দুর্যোগ মোকাবিলার চ্যালেঞ্জ। কাজেই কৃষিসংস্কারও একটি ব্যাপক ও সামগ্রিক বিষয়। উপরোক্ত সকল বিষয়কে সমন্বিতভাবে বিবেচনায় না নিলে সঠিকভাবে একটি কার্যকর কৃষি সংস্কার কর্মসূচি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। এজন্য প্রযোজন ব্যাপক নীতিনির্ধারণী গবেষণা, সংশ্লিষ্ট সকল মহলের মতামত গ্রহণ এবং সর্বোপরি কৃষিনির্ভর গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর কার্যকর অংশগ্রহণ। কাজেই এই স্বল্প পরিসরের আলোচনায় কৃষি সংস্কারের কোন পূর্ণাঙ্গ রূপরেখো তুলে ধরা সম্ভব নয়। বাংলাদেশের কৃষির বর্তমান প্রেক্ষাপটে কৃষিসংস্কারের সবচেয়ে বড় দুটি ক্ষেত্র হবে দেশের ভূমি ব্যবস্থা ও বাজার ব্যবস্থার সংস্কার। নিম্নে এ দুটি ক্ষেত্রে সংস্কার সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোকপাত করা হল। পাশাপাশি কৃষির সমাগ্রিক সংস্কারের সম্ভাব্য একটি দিকনির্দেশনামূলক রূপরেখাও তুলে ধরার চেষ্টা করা হল।

ভূমিসংস্কার

কৃষির সূচনালগ্ন থেকে কৃষকরাই প্রকৃতিপ্রদত্ত জমিকে চাষাবাদের উপযোগি করেছে, সন্তানসম লালন-পালন করেছে। কিন্তু অত্যন্ত দুর্ভাগ্য ও পরিতাপের বিষয় এই যে, এই সন্তানের মালিকানা কৃষক কখনও পায়নি। কাল থেকে কালান্তরে কার্যত একটি দস্যু শ্রেণী শাসকরূপে কৃষকের মাথার উপর চেপে বসে দেশ শাসনের নামে নিতান্তই গায়ের জোরে জমির মালিকানা কুক্ষিগত করে রেখেছে। সামন্তযুগ থেকে শুরু করে আজকের তথাকথিত গণতান্ত্রিক যুগেও এর ব্যত্যয় চোখে পড়ে না। এই উপমহাদেশে রাজা, বাদশা, নবাব এবং সর্বশেষ ইংরেজ লর্ড এবং তাদের পদলেহী জমিদার শ্রেণীর হাত থেকে ১৮৮৫ সালের ‘বঙ্গীয় প্রজাস্বত্ব আইন’ এবং পরবর্তীতে ১৯৫০ সালের ‘রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন’ অনুসারে কৃষকরা জমির কিছুটা স্থায়ী ভোগদখলের সুযোগ পেলেও অধিকাংশ জমি রাষ্ট্রীয় সুবিধাভোগী, ভূমিগ্রাসী অকৃষকদের হাতেই কুক্ষিগত থেকে গেছে। এই অবস্থার পরিবর্তনের জন্য যে ধরণের ভূমি সংস্কার অপরিহার্য ছিল তেমনটি করার সৎসাহস বা সদিচ্ছা কোন কালেই শাসক শ্রেণী দেখায় নি।

রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন অনুসারে এখনও দেশের সমস্ত জমির মালিক রাষ্ট্র হলেও কোন শাসনামলেই রাষ্ট্র তার কৃষক জনগোষ্ঠীর মাঝে কৃষিজমির ন্যায্য বন্টনের কোন উদ্যোগ কার্যত গ্রহণ করে নি। উপরন্তু মালিকানার ক্ষেত্রে চরম বৈষম্য সৃষ্টিকারী একটি ব্যবস্থাকে সবসময় পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে গেছে যে ব্যবস্থায় বৈধ বা অবৈধভাবে একটি ভূমিগ্রাসী শ্রেণী কৃষিজমিকে নির্বিচারে কুক্ষিগত করে চলেছে। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় এই যে, রাষ্ট্র নিজেও আজ একই ধরণের ভূমিকায় অবতীর্ণ রয়েছে। অথচ যে মুক্তির স্বপ্ন নিয়ে বাংলাদেশ নামক একটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল সে স্বপ্ন পূরণের পথে প্রথম সোপান হওয়ার কথা ছিল ভূমি সংস্কার।  কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য যে, স্বাধীনতা লাভের অব্যবহিত পরে বাংলাদেশের প্রথম পরিকল্পনা কমিশন ভুমি সংস্কারের কিছু খসড়া সুপারিশমালা প্রণয়ন করে এবং তা বিবেচনার জন্য তৎকালীন মন্ত্রী পরিষদে পেশ করে যা বাস্তবায়নের কোন উদ্যোগ গ্রহণ করা হয় নি। এগুলো নিম্নে তুলে ধরা হলো।

১.   জমির উৎপাদনক্ষমতার অঞ্চলভিত্তিক পার্থক্য বিবেচনা করে জমির সর্বোচ্চ সিলিং পরিবারপ্রতি ১০ একরে নামিয়ে আনা (এই সিলিং খামারের আয়তন নয় বরং জমির মালিকানার ভিত্তিতে নির্ধারিত হবে)।

২.   সিলিংউদ্বৃত্ব জমি, যেখানে সম্ভব কৃষক সমবায়ের মধ্যে বন্টন করা।

৩.   সিলিংউদ্বৃত্ব জমি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সেই জমির বর্গাদার, ভূমিহীন শ্রমিক এবং কর্মহীনদের মধ্যে বন্টন করা।

৪.   ক্ষুদ্র ও মাঝারি শ্রেণীর কৃষকদের সমবায়ে যুক্ত হওয়ার সুযোগ দেওয়া।

৫.   প্রস্তাবিত সিলিং-এ প্রভাবিত হয়নি এমন মালিকের জমি যেসব বর্গাদার চাষ করত তার চাষাবাদ চালিয়ে যাওয়ার জন্য উক্ত বর্গাদারদের আইনগত ও অর্থনৈতিক ভিত্তি সুসংহত করা।

৬.   সমাজতান্ত্রিক নীতিমালা অনুসারে যৌথ খামারের মডেল প্রদর্শণী করা।

৭.   একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি সিলিং নির্ধারণ এবং বাস্তবায়নের বিস্তারিত কর্মপন্থা ঠিক করার জন্য “পরিবার”-এর সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা নির্ধারণ করবে।

৮.   একটি সমবায় খামারে প্রত্যেক সদস্যের এক একরের বেশি জমি থাকতে পারবে না। যদি সম্ভাব্য অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা চাহিদার তুলনায় বেশি হয় (জনপ্রতি জমির অনুপাত ০.৫ একর ভিত্তিতে) তবে লটারির মাধ্যমে সমবায়ের সদস্য নির্বাচন করা হবে।

৯.   সুবিধাজনক ব্লকে উদ্বৃত্ব জমি সহজলভ্য হলে অথবা যৌথ খামার গড়ে তোলার সুযোগ আছে একে অপরের এমন কাছাকাছি হলে সমবায়ভিত্তিক যৌথ খামার গড়ে তুলতে হবে।

১০.  একজন মালিক-কৃষক যদি সমবায়ে অংশগ্রহণ করতে চায় তবে তার জন্য দুইটি সুযোগ থাকবে যথাঃ ১) সম্পূর্ণভাবে তার জমি সমবায়কে সমর্পন করে পূর্ণ সদস্যপদ লাভ অথবা ২) সমবায়ের স্বত্বাধিকারে জমি সমর্পন করা। দ্বিতীয় ক্ষেত্রে সমবায়, উক্ত জমির ঐতিহাসিক ফলনের একতৃতীয়াংশের সমান নির্দিষ্ট ভাড়া প্রদান করবে।

১১.  সমবায় খামারের উৎপাদন ব্যবস্থাপনা এবং বন্টনভার সংশ্লিষ্ট সমবায়ের সদস্যদের দ্বারা নির্বাচিত ব্যবস্থাপনা কমিটির উপর ন্যাস্ত থাকবে। এক্ষেত্রে দিকনির্দেশনামূলক নীতিমালা হবে নিম্নরূপঃ

ক.   সদস্যদের দ্বারা গণতান্ত্রিকভাবে অনুমোদিত একটি পরিকল্পনার ভিত্তিতে প্রত্যেক সমবায়ের উৎপাদন কার্যক্রম পরিচালিত হবে;

খ.   উৎপাদিত ফসলের অংশভাগ শ্রম-দিবসে তার অবদানের ভিত্তিতে নির্ধারিত হবে। উৎপাদিত দ্রব্যের প্রায় ২০-২৫% সঞ্চয় তহবিলে জমা করা হবে যা জমির উন্নয়ন, যন্ত্রপাতি ক্রয় এবং কমিউনিটি উন্নয়ন ও আয় স্থিতিশীলতার জন্য ব্যয় করা হবে।

১২.  সরকার ব্যাংকিং ও স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে সমবায়গুলোকে শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক, আর্থিক ও উপকরণগত সহায়তা প্রদান করবে।

১৩. সমবায় পরিচালনার জন্য কাঠামোগঠন কর্মসূচি হাতে নেওয়া হবে।

১৪.  সিলিং অন্তর্ভূক্ত বর্গাচাষীদের জন্য বর্গাকৃত জমি অব্যাহতভাবে চাষ করা এবং সে জমি কখনও বিক্রী হলে তা কিনে নেওয়ার অধিকার থাকবে। বর্গাচাষকৃত জমির ভাড়া হবে জমির ঐতিহাসিক উৎপাদনশীলতার এক-তৃতীয়াংশের সমমূল্যের সাধারণ ভাড়া।

উক্ত সুপারিশমালা বাস্তবায়িত হলে ক্ষুদ্র, প্রান্তিক ও ভূমিহীন কৃষকদের ভাগ্যের কিছুটা হলেও গুণগত পরিবর্তন আসতে পারত। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে, রাষ্ট্রীয় সুবিধাভোগী শ্রেণী কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত রাজনৈতিক ব্যবস্থায় উপরোক্ত উদ্যোগগুলো গ্রহণ করার মত সৎসাহস বা সদিচ্ছা কোনটাই আমাদের রাজনৈতিক নেতৃত্বের মাঝে লক্ষ করা যায় নি। উপরন্তু স্বাধীনতা পরবর্তী সরকারগুলো উল্টোপথেই হেটেছে। ভূমি সংস্কারের ইস্যুটি আজ একটি অশ্রাব্য ও মৃত ইস্যুতে পরিণত হয়েছে যাকে আবার জীবিত করা এখন সময়ের দাবী।

বাংলাদেশে জমির মালিকানার ভিত্তিতে কৃষককে পাঁচটি শ্রেণীতে ভাগ করা হয়। যেমনঃ  বড়, মাঝারি, ক্ষুদ্র, প্রান্তিক ও ভূমিহীন কৃষক (সারণি-১)। সারণিতে দেখা যাচ্ছে যে, বাংলাদেশে খামারের আয়তন খুবই ছোট। এখানে মাত্র ৩ হেক্টরের বেশি জমি থাকলেই সে বড় কৃষক। বাংলাদেশের কৃষকদের মাথাপিছু জমির পরিমান মাত্র ০.১২ হেক্টর যেখানে খামারের গড় আয়তন ডেনমার্কে ১৫ হেক্টর, যুক্তরাজ্যে ৪৫ হেক্টর এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ১০০ হেক্টর। অথচ বর্তমান মুক্ত বাজার ব্যবস্থায় আমাদের এই ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র দরিদ্র কৃষকদেরকেই ধনী বিশ্বের বৃহৎ খামার মালিকদের সাথে প্রতিযোগিতায় নামতে হবে।

সারণি-১: কৃষকের শ্রেণী, জমির পরিমান ও শতকরা হার

কৃষকের শ্রেণী জমির পরিমান কৃষক পরিবার (%) জমির মালিকানা (%)
হেক্টর একর
ভূমিহীন ০.০-০.১৯ ০.০-০.৪৯ ৫২.৬৫ ৪.৫
প্রান্তিক ০.২-০.৫৯ ০.৫০-১.৪৯ ২৩.৫৩ ১৮.৫
ক্ষুদ্র ০.৬-১.০ ১.৫-২.৪৯ ১০.৫ ১৮.২
মাঝারি ১.০-৩.০ ২.৫-৭.৫ ১১.৬৫ ৪২.৪
বড় >৩.০ >৭.৫ ১.৬৭ ১৬.৪

উৎসঃ বাংলাদেশ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, স্ট্র্যাটেজিক প্ল্যান ২০০২-২০০৬

 

উপরের সারণি থেকে আরও দেখা যাচ্ছে যে, এ দেশের কৃষক জনগোষ্ঠীর মধ্যে ভূমিহীন কৃষক প্রায় শতকরা প্রায় ৫৩ ভাগ (যারা মূলত কৃষি শ্রমিক ও বর্গা কৃষক), প্রান্তিক কৃষক শতকরা প্রায় ২৪ ভাগ এবং ক্ষুদ্র কৃষক শতকরা প্রায় ১১ ভাগ। এই তিন শ্রেণীর কৃষকই মোট কৃষক জনগোষ্ঠীর শতকরা প্রায় ৮৮ ভাগ। বর্তমান ব্যয়বহুল চাষাবাদের কারণে এরা কৃষিতে টিকে থাকতেই হিমসিম খাচ্ছে। অনেকে ইতোমধ্যেই কৃষি থেকে ছিটকে পড়েছে। প্রধানত ব্যয়বহুল চাষাবাদ এবং উত্তরাধিকার প্রথায় জমির খন্ডায়নের কারণে প্রচুরসংখ্যক কৃষক প্রতিনিয়ত ভূমিহীনে পরিণত হচ্ছে। ফলে, ভূমিহীনের সংখ্যা দিন দিন বেড়ে চলেছে। একথা সত্য যে, বাংলাদেশে যে পরিমাণ চাষযোগ্য জমি রয়েছে তাতে বর্তমান এবং ক্রমবর্ধমান কৃষক জনগোষ্ঠীর সবাই কৃষিনির্ভর জীবিকা নির্বাহ করতে পারবে না। তাই বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করাও অপরিহার্য।

জমির মালিকার বিষয়টি বিবেচনায় নিলে সারণী-১ থেকে আরও দেখা যায় যে, এ দেশের অর্ধেকেরও বেশি (৫২.৬৫%) কৃষক ভূমিহীন যাদের মালিকানায় দেশের মোট আবাদি জমির মাত্র ৪.৫%। অন্যদিকে, মাঝারি ও বড় কৃষক সংখ্যায় মাত্র শতকরা ১২ ভাগ হলেও মোট জমির শতকরা প্রায় ৫৯ ভাগই তাদের দখলে। অথচ ৮৮ ভাগ ক্ষুদ্র, প্রান্তিক ও ভূমিহীন কৃষকদের দখলে আছে মোট জমির মাত্র শতকরা ৪১ ভাগ। দেশের সোয়া কোটি গ্রামবাসীর এক ইঞ্চিও জমি নেই এবং বর্গাচাষীর সংখ্যা প্রায় সাড়ে তিন কোটি। একটি তথ্যে দেখা যায় যে, অকৃষকদের হাতে মোট চাষের জমির অর্ধেকেরও বেশি কুক্ষিগত আছে। এই অকৃষকদের জীবিকার প্রধান উৎস ভূমি নয়। কৃষি উৎপাদনে তারা তাদের মেধা বা পুঁজি বিনিয়োগ করে না। এর ফলে একদিকে যেমন জমি ক্ষতিগ্রস্থ হয় তেমনি জাতীয় ঊৎপাদনেরও ক্ষতি হয়। কাজেই ভূমি সংস্কারের ক্ষেত্রে এ বিষয়গুলোকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনায় নিতে হবে।

কার্যকর ভূমি সংস্কার করতে হলে অকৃষকদের হাত থেকে কৃষি জমি উদ্ধারের কোন বিকল্প নেই। এজন্য জমির সর্বোচ্চ সিলিং নির্ধারণ করে সিলিং-উদ্বৃত্ত জমি উদ্ধার করতে হবে এবং উদ্ধারকৃত জমিসহ সরকারি খাস জমি ভূমিহীন, প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষকদের মাঝে আনুপাতিক হারে বন্টন করে জমির মালিকানায় যথাসম্ভব সমতা বিধান করতে হবে। কৃষিজমি ও অকৃষিজমি সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করতে হবে এবং অকৃষিকাজে কৃষিজমির ব্যবহার রোধকল্পে কঠোর আইন প্রণয়ন ও তার বাস্তবায়ন করতে হবে। অতপর জমির মালিকানা অক্ষুন্ন রেখে মাঠ ভিত্তিক বা পাড়া ভিত্তিক বা গ্রাম ভিত্তিক সকল কৃষকের জমিকে একত্রিত করে সমবায়ভিত্তিক যৌথ খামার ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।

কৃষি-বাজার-ব্যবস্থার সংস্কার

বাণিজ্যিক বিশ্বায়নের এ যুগে একটি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে বাজারের প্রয়োজনীয়তা অপরিহার্য। কিন্তু বাজারের উপর চোখ না রাখলে, প্রয়োজনমতো নিয়ন্ত্রণ না করলে এবং যাদের আত্মনির্ভর উন্নয়নে রাষ্ট্রের অগ্রণী ভূমিকা থাকবে বাজারের খেলায় তাদেরকে শক্তিশালী করতে না পারলে, বাজার জাতির উন্নয়ন স্বপ্ন বানচাল করে দিতে পারে। কৃষিপ্রধান এ দেশের উৎপাদন প্রক্রিয়ায় দরিদ্র কৃষক শ্রেণীর টিকে থাকার ক্ষমতা না থাকায় তারা যা উদ্বৃত্ত উৎপাদন করে বাজার তা অন্যের হাতে (মধ্যস্বত্বভোগী ও লুটেরা বণিক শ্রেণী) তুলে দেয়। কৃষক এক্ষেত্রে তার উদ্বৃত্ত উৎপাদনের ন্যায্য মূল্য থেকেও বঞ্চিত হয়। উদাহরণস্বরূপ, গ্রামাঞ্চলে কৃষক যখন এক টাকা কেজি দরে টমেটো বিক্রী করে সেই টমেটোই শহরে এসে দাম হয় আট টাকা কেজি। এভাবেই তার উদ্বৃত্ব মূল্যটা বেহাত হয়ে যায়। কিন্তু সে যখন ক্রেতা হিসেবে বাজারে অন্য দ্রব্য কিনতে যায় তখন তাকে অত্যন্ত চড়া দামেই তা কিনতে হয়। এরূপ বাজার ব্যবস্থার কারণে কৃষক দিন দিন দরিদ্র থেকে দবিদ্রতর হচ্ছে।

আমাদের কৃষির অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হল বাৎসরিক ও মৌসুম ভিত্তিতে কৃষিপণ্যের মূল্যের অত্যধিক উঠা-নামা। এক বছর কোন ফসলের দাম ভাল পেলে কৃষক সে ফসল উৎপাদনে বেশি উৎসাহিত হয়। ফলে, পরের বছর চাহিদার তুলনায় উৎপাদন অনেক বেশি হয় এবং মূল্যের ধস নামে। আবার দাম না পেয়ে পরের বছর কৃষক উৎপাদনে নিরুৎসাহিত হয়, ফলে উৎপাদন হয় চাহিদার তুলনায় কম এবং দাম উর্ধ্বমুখী হয়। অন্যদিকে, উৎপাদিত ফসলের প্রক্রিয়াজাতকরণ ও সংরক্ষণের সুবিধার অভাব এবং ঋণ পরিশোধ ও পরিবারের মৌলিক প্রয়োজন মেটানোর তাগিদ ইত্যাদি কারণে কৃষক ফসল উঠার অল্প দিনের মধ্যেই উদ্বৃত্ত পণ্যের অধিকাংশই বাজারজাত করতে বাধ্য হন। অথচ পণ্যের চাহিদা সারা বছরব্যাপী। ফলে ফসল উঠার সময় যোগান বেশি হওয়ায় কৃষি পণ্যের দাম কমে, আবার কয়েক মাস পরেই যোগানের স্বল্পতার জন্য মূল্যের ঊর্ধ্বগতি ঘটে। ধরা যাক, এ বছর দেশে এক লক্ষ টন আলু উৎপাদিত হলো যা জানুয়ারি ও ফেব্রæয়ারি বা বড়জোর মার্চ মাসের মধ্যেই কৃষক মাড়াই করবে এবং বাজারে তুলতে বাধ্য হবে। কিন্তু জানুয়ারি থেকে মার্চ এই মাসে বাজারে আলুর চাহিদা হয়ত মাত্র ত্রিশ হাজার টন অথচ বাজারে সরবরাহ এক লক্ষ টন। কাজেই বাজারের স্বাভাবিক নিয়মেই তখন দাম কম হবে। কিন্তু কম দামে এই আলু কিনে মধ্যস্বত্বভোগীরা মজুদ করবে এবং বছরের বাকী সময় ধরে নিয়ন্ত্রিত যোগানের মাধ্যমে  ইচ্ছেমত মুনাফা হাতিয়ে নিবে। নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের অত্যধিক উঠানামা স্বল্প আয়ের উৎপাদক ও ভোক্তা উভয়ের জন্যই কাম্য নয়। এর থেকে লাভবান হয় মূলত ব্যবসায়ী শ্রেণী। তা ছাড়া খামারের ছোট আয়তন এবং উৎপাদিত পণ্যের বেশিরভাগ পরিবারের প্রয়োজন মেটাতে ব্যবহৃত হওয়ার কারণে বাজারজাতকৃত পণ্যের পরিমাণের হ্রাস-বৃদ্ধি হয় অনেক বেশি (পরিবারের প্রয়োজন যেহেতু স্থিতিশীল)। কাজেই, বাজারের অস্থিতিশীলতার প্রবণতা বাংলাদেশের মতো সাবসিস্ট্যান্স কৃষি অর্থনীতিতে অনেক বেশি। ধান ও পাটের মতো স্পর্শকাতর (মূল খাদ্য ও অর্থকরী ফসল বিধায়) পণ্যের বাজারের অস্থিতিশীলতার প্রভাব রাজনীতির উপরও পড়ে। সেজন্য কৃষকদের আয় ও খাদ্য নিরাপত্তা বজায় রাখার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ কৃষি পণ্যের দামের স্থিতিশীলতা অর্জন পৃথিবীর অনেক দেশেই অনুসৃত কৃষি নীতির অন্যতম লক্ষ্য। অথচ দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে, বাংলাদেশের কৃষি নীতির স্বল্প, মধ্য বা দীর্ঘ মেয়াদি লক্ষ্যসমূহের কোনটিতেই বাজার নিয়ন্ত্রণ ও গুরুত্বপূর্ণ কৃষিপণ্যের দামের স্থিতিশীলতা অর্জনের কথা বিবেচিত হয় নি।

পক্ষান্তরে, খাদ্যশস্যের বাজারে সরকারি হস্তক্ষেপ সংকুচিত করার জন্য দাতা সংস্থাগুলো অনেকদিন থেকেই সরকারের উপর চাপ দিয়ে আসছে। নব্বই দশকের প্রথমার্ধে এই চাপ অত্যন্ত বৃদ্ধি পায়। এরূপ চাপের ফলে সরকার বাজার নিয়ন্ত্রণের জন্য মূলত বাণিজ্যিক ভিত্তিতে খাদ্য আমদানি এবং খাদ্যখাতে বিদেশী সাহয্যের উপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়ে যা প্রকারান্তরে কৃষকের উৎপাদিত ফসলের ন্যায্য মূল্য প্রাপ্তিতে অন্তরায় সৃষ্টি করে এবং লাভবান হয় কেবল আমদানিকারক ব্যবসায়ি গোষ্ঠী।

অন্যদিকে, সরকারের অত্যন্ত সীমিত আকারের অভ্যন্তরীণ খাদ্য সংগ্রহ ও বিতরণ ব্যবস্থা থেকেও লাভবান হয় মূলত শহুরে ভোক্তা ও অবস্থাপন্ন শ্রেণী, খাদ্য ব্যবসায়ী, মিল মালিক এবং কার্যক্রম পরিচালনায় নিয়োজিত সরকারি কর্মচারীরা। আর ক্ষতিগ্রস্ত হয় কৃষক। সরকারের অভ্যন্তরীণ খাদ্য সংগ্রহ নীতি উদ্বৃত্তের বছরে মূল্যের নিম্নগতি রোধে ব্যর্থ। ক্ষুদ্র ও মাঝারি কৃষক সরকারি ক্রয় কেন্দ্রে খাদ্য বিক্রয়ে উৎসাহী নন। কারণ নানা অজুহাতে তাদের কাছ থেকে অনেক সময় পণ্য ক্রয় করা হয় না এবং পণ্যের বিনিময়ে নগদ টাকা বুঝে পেতে অনেক হয়রানিরও শিকার হতে হয়।

বন্যা ও খরার বছরগুলোতে সরকারের খাদ্য আমদানি কার্যক্রম বাজারকে স্থিতিশীল করার পরিবর্তে আরো অস্থিতিশীল করে তোলে। প্রাকৃতিক দুর্যোগজনিত ঘাটতির পরিমাণ প্রকৃত ঘাটতির তুলনায় বেশি করে দেখিয়ে প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত খাদ্য আমদানি করা হয়। কৃষকগণও বন্যাজনিত ক্ষয়ক্ষতি পোষানো এবং পণ্যের বেশি মূল্য পাওয়ার আশায় প্রাকৃতিক দুর্যোগের পরের মৌসুমে অতিরিক্ত খাদ্য উৎপাদন করে। এই বাড়তি উৎপাদন ও আমদানিকৃত খাদ্য একই সময়ে বাজারে আসে। ফলে মূল্যের ধস নামে। অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যের ধস বা রপ্তানিকারক দেশের ডাম্পিং নীতি আমাদের কৃষকদের আয়ের উপর মারাত্মকভাবে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

একসময় এদেশের কৃষি ছিল দেশের গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর জীবন ব্যবস্থা যা আজ আর নেই। কৃষি আজ বাণিজ্যই শুধু নয় তা বিশ্ব বাণিজ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ। আজ কৃষক তার খাদ্য বা নিজস্ব প্রয়োজনের কথা চিন্তা করে নয়, উৎপাদন করে বাজারের জন্য। কিন্তু পরিতাপের বিষয় এই যে, বাজার ব্যবস্থার উপর কৃষকের কোন নিয়ন্ত্রণ না থাকার কারণে উৎপাদন থেকে তেমন কোন লাভ কৃষকের ঘরে উঠছে না। যারা বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে তারা একদিকে যেমন বীজ, সার, কীটনাশকসহ অন্যান্য কৃষি উৎপাদন উপকরণ বিক্রী করে ইচ্ছেমত মুনাফা হাতিয়ে নিচ্ছে অন্যদিকে, সকল ব্যয়ভার ও ঝুঁকি কাঁধে নিয়ে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে কৃষক যা উৎপাদন করছে তার লভ্যাংশটাও তারা হাতিয়ে নিচ্ছে। কৃষক যে পণ্য লোকসানে বিক্রী করে সে পণ্য থেকেই কয়েকগুণ লাভ তুলে নেয় মধ্যস্বত্বভোগীরা। এরূপ বাজার ব্যবস্থার কারণে কৃষক দিন দিন দরিদ্র থেকে দবিদ্রতর হচ্ছে। কার্যত কৃষক আজ মুক্ত বাজার ব্যবস্থার দাসে পরিণত হয়েছে।

অথচ দুঃখজনক ব্যাপার হল, এই বাজার ব্যবস্থার ফাঁকিটাও কৃষক বুঝে উঠতে পাচ্ছে না। কারণ, কৃষি যে একটা ব্যবসা বা বাণিজ্য এই সত্যটাই স্বাভাবিক কারণেই কৃষকের মাথায় ঢুকেনা। ফসল ফলাতে গিয়ে কৃষক নিজে এবং তার পরিবারের সদস্যরা যে শ্রম দেন এবং তাঁর জমি ও অন্যান্য স্থায়ী বিনিয়োগের মূল্য ইত্যাদি কৃষক কখনও হিসেবের মধ্যে ধরে না। এসব ব্যয় ধরা হলে বাস্তবে ফসলের চাষ বিশেষ করে ধানের চাষ মোটেও লাভজনক নয়। প্রকৃত প্রস্তাবে, কৃষক নিজে ভর্তুকি দিয়েই এ জাতির আহার জোগাচ্ছে।

কৃষকের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য মূল্য প্রাপ্তির ক্ষেত্রে যেসব সমস্যা চিহ্নিত করা যায় তার মধ্যে প্রধান হল অর্থ সংকট। অর্থাৎ অর্থ সংকটের কারণে প্রায় সব কৃষকই ফসল সংগ্রহের সাথে সাথেই তাদের উৎপাদিত ফসল বিক্রী করে দিতে বাধ্য হয়। এমনকি নিজেদের খাদ্য হিসেবে যেটুকু প্রয়োজন সেটুকুও তাঁরা ধরে রাখতে পারেনা। কারণ, অধিকাংশ কৃষকই তাঁদের চাষের খরচ যোগাতে উচ্চ সুদে ধার-দেনা বা বাকী-বর্গা করে থাকেন। কাজেই, ফসল ঘরে উঠামাত্রই মাথার উপর নেমে আসে পাওনাদারের খরগ। আর সব কৃষক যখন একসাথে তাদের ফসল বাজারে নিয়ে আসে তখন বাজারে সরবরাহ অত্যধিক বেড়ে যাওয়ার কারণে বাজার অর্থনীতির স্বাভাবিক নিয়মেই দাম কমে যায়। তা ছাড়াও রয়েছে বাজার সিন্ডিকেট যারা কৃষকের এরূপ অসহায়ত্বের পুরো সদ্ব্যবহার করে নিজেরা ইচ্ছেমত ফসলের মূল্য নির্ধারণ করে যে দামে কৃষক তার পণ্য বিক্রী করতে বাধ্য হয়।

তা ছাড়াও, অনেক সময় দেখা যায় যখন কৃষকের পণ্য বাজারে আসছে মুক্ত বাজার অর্থনীতির দোহাই দিয়ে তখনও আমদানি নিয়ন্ত্রণ করা হয় না। আর এ সুযোগে ব্যবসায়িরা পরিকল্পিতভাবে উৎপাদন মৌসুমে অধিক আমদানি করে এবং পূর্বেই আমদানি ও মজুদকৃত শস্য কৃষকের ফসল উঠার প্রাক্কালে বাজারে ছেড়ে দেয়। ফলে, বাজারে সরবরাহ অত্যধিক বেড়ে যায় এবং কৃষকের পণ্যের দাম কমে যায়।

অন্যদিকে, মজার ব্যাপার হচ্ছে, উৎপাদক কৃষক ও ভোক্তা উভয়েই বাজারের খেলোয়াড়দের খেলার পুতুলের মত ব্যবহৃত হচ্ছে; উভয় পক্ষই ঠকছে। কারণ, ফসল উঠার পরপরই কৃষকের সব পণ্য মধ্যস্বত্বভোগী মহাজনদের গুদামে চলে যায়। আর তারা সারা বছরজুড়ে নিয়ন্ত্রিত সরবরাহের মাধ্যমে এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে অতি উচ্চমূল্যে সেসব বিক্রী করে থাকে। এর ফলে, একদিকে যেমন কৃষক ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছে অন্যদিকে ভোক্তাসাধারণকেও অধিক মূল্যে এসব পণ্য কিনতে হচ্ছে। এমনকি খোদ কৃষকও যখন বাজার থেকে এসব পণ্য কিনতে যায় তাকেও উচ্চ মূল্যে তা কিনতে হয়।

অথচ আশ্চর্যের ব্যাপার হল এই যে, কৃষক যেসব পণ্য উৎপাদন করে সেসব মানুষের বেঁচে থাকার জন্য অপরিহার্য পণ্য যার চাহিদা সাধারণত দামের সাথে সম্পর্কিত নয়। অর্থাৎ দাম বাড়লেও এসব পণ্যের চাহিদার খুব বেশি হেরফের হবে না। কাজেই এসব পণ্য উৎপাদন করে লোকসান গুনার সঙ্গত কোন কারণ নেই। বাস্তবে লোকসান হয়ওনা। বাজারে চাল, ডাল, তেল, মসলা, তরিতরকারীর দাম দেখলেই এর সত্যতা মেলে। অথচ, অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য যে, কৃষককে প্রতিনিয়ত লোকসান গুনে যেতে হচ্ছে। বর্তমান বাজার ব্যবস্থাই এ অবস্থার জন্য দায়ী। আর আমাদের রাষ্ট্র ব্যবস্থা এই বাজার ব্যবস্থাকেই পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে যাচ্ছে। এর কারণ খুবই সুস্পষ্ট যা পাশের চিত্রে তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে। অর্থাৎ এটাই কাম্য যে, রাষ্ট্র ব্যবস্থা জনগণের স্বার্থে বাজারকে নিয়ন্ত্রণ করবে। কিন্তু বর্তমান রাষ্ট্র ব্যবস্থায় বাস্তবে তা ঘটে না। কারণ, দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ কৃষক জনগণ রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে নীতিনির্ধারণের জন্য তাদের যেসব প্রতিনিধি নির্বাচন করেন তারা প্রকৃতপক্ষে ব্যবসায়িদের প্রতিনিধি বা অধিকাংশক্ষেত্রে নিজেরাই ব্যবসায়ি। কাজেই, এসব নীতিনির্ধারকগণ যেসব নীতিমালা তৈরি ও বাস্তবায়ন করেন তা স্বাভাবিকভাবেই ব্যবসায়িদের অনুক‚লে যায়।

সুতরাং এসব সমস্যার স্থায়ী সমাধান করতে হলে বর্তমান বাজার ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনতেই হবে। এক্ষেত্রে মুক্ত বাজারের ধোয়া তুলে হাত গুটিয়ে বসে থাকার কোন সুযোগ নেই। আমাদের দেশের নীতিনির্ধারক মহল যারা মুক্ত বাজারের কথা বলে বাজারের উপর হস্তক্ষেপ থেকে বিরত থাকতে চান তারা প্রকৃতপক্ষে আমজনতাকে বোকা বানিয়ে নিজেদের স্বার্থ হাসিল করতে চান। এরা কোন না কোনভাবে মুক্ত বাজারের সুবিধাভোগী। অন্যদিকে, বিদেশি শক্তি যারা মুক্ত বাজারের আফিম গিলিয়ে আমাদেরকে নির্বোধের মত ব্যবহার করছে তাদের নিজেদের বাজার মোটেও মুক্ত নয়। প্রকৃত প্রস্তাবে, তারা মুক্ত বাজারের নামে আমাদের বাজার দখলের পথকে সুগম করতে চায়। আমাদের কৃষকদেরকে ভর্তুকি দিতে গেলেই বিশ্ব ব্যাংক, আইএমএফ হুমকি-ধামকি শুরু করে অথচ এসব প্রতিষ্ঠানের প্রভুরা কোটি কোটি ডলার ভর্তুকি দিয়ে উৎপাদিত  পণ্য আমাদের মত গরীব দেশে ডাম্পিং করে আমাদের বাজার দখল করে নিচ্ছে তা নিয়ে টু শব্দটি তারা করে না। কাজেই নামেমাত্র স্বাধীন দেশে ঠুটো জগন্নাথ হয়ে থাকার মধ্যে কোন বাহাদুরী নেই। আজ সময় এসেছে মাথা তুলে দাড়াবার।

আশার কথা হচ্ছে এই যে, বর্তমান অর্থমন্ত্রী বলছেন, ‘প্রয়োজনে বাজারে হস্তক্ষেপ করতে হবে’। বর্তমান কৃষিমন্ত্রী প্রতিনিয়ত কৃষকের স্বার্থ রক্ষার কথা বলছেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীও সমাজ থেকে বৈষম্য কমিয়ে সুষম উন্নয়নের জন্য কৃষি ও গ্রামীণ উন্নয়নের দিকে গুরুত্বারোপ করছেন, বর্তমান সরকার কর্তৃক গৃহীত অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে যার কিছু প্রতিফলনও দেখা যাচ্ছে। তবে, ক্যান্সারের ঘায়ে মলম লাগানোর মত করে কিছু কথাবার্তা বা ব্যবস্থা নিলেই এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। রোগের সঠিক কারণ বর্তমান উৎপাদন ও বাজার ব্যবস্থার মধ্যে নিহিত। সুতরাং রোগ সারাতে হলে গোটা ব্যবস্থারই চিকিৎসা প্রয়োজন। অর্থাৎ বর্তমান উৎপাদন ও বাজার ব্যবস্থার একটি সামগ্রিক সংস্কার ছাড়া আমাদের সামনে দ্বিতীয় আর কোন পথ খোলা নেই।

কৃষি পণ্যের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিতকরণে কয়েকটি সুপারিশ

১.     সমবায় বা সমবায় ও কর্পোরেট ব্যবস্থার সংমিশ্রণে কোন এক পদ্ধতিতে কৃষকদের সংগঠিত করে একটি সমষ্টিগত উৎপাদন ও বাজারজাতকরণ ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা;

২.     কৃষকের উৎপাদিত ফসলের উপর “শস্য ঋণ” দেওয়ার ব্যবস্থা করা;

(এখানে উল্লেখ্য যে, কৃষি ব্যাংকের বর্তমান নীতিমালায় উৎপাদিত ফসলের উপর ঋণ দেওয়ার কোন বিধান নেই। ঋণ দেওয়া হয় কেবল উৎপাদন ব্যয় যোগানোর জন্য। আর দুঃখজনক বাস্তবতা এই যে, যাদের এই ঋণের প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি তারা নানাবিধ জটিলতার কারণে এই ঋণের ধারেকাছেও ঘেষতে পারেনা। বর্তমান সরবারের নির্বাচন মেনিফেস্টোতে তাই ঋণের পরিমাণ বাড়ানো, ঋণদান প্রক্রিয়া সহজতর করা এবং বর্গাচাষীদের ঋণপ্রাপ্তি নিশ্চিত করার সুস্পষ্ট অঙ্গীকার রয়েছে যার কিছু বাস্তবায়নও পরিলক্ষিত হচ্ছে। এক্ষেত্রে ঋণের পরিমাণ বৃদ্ধি ও কৃষকদের ঋণ প্রাপ্তির ক্ষেত্রে সকল জটিলতা দূর করে শস্য ঋণ ব্যবস্থা চালু করা প্রয়োজন।)

৩.    ‘শস্য গুদাম ঋণ প্রকল্প’-এর অনুরূপ কার্যক্রম দেশের প্রত্যেক গ্রামে চালু করা।

৪.     এনজিওগুলো গ্রামাঞ্চলে যে ঋণ দিচ্ছে তার সুদের হার কমানো, সাপ্তাহিক কিস্তির পরিবর্তে মৌসুমী কিস্তি চালু করা এবং উৎপাদিত ফসলের উপর মৌসুমী ঋণ দেওয়ার ব্যবস্থা করা।

৫.     বেসরকারী ব্যাংকগুলোর জন্য গ্রামাঞ্চলে শাখা খোলা এবং কৃষি ঋণ প্রদান বাধ্যতামূলক করা।

৬.     সরকারি ধান, পাট ইত্যাদি শস্য ক্রয় কার্যক্রমে সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ক্রয় করতে প্রয়োনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা।

৭.     উৎপাদন ব্যয় সঠিকভাবে হিসেব করে কৃষিপণ্যের মূল্য নির্ধারণ করা।

৮.     উৎপাদন ব্যয়ের প্রায় একতৃতীয়াংশই হলো সেচ খরচ। কাজেই সেচ খরচ কমানোর জন্য সেচকাজে বিদ্যুৎ সরবরাহ বাড়ানো বা সৌর বিদ্যুতের মত নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা।

৯.     জৈব সার, জীবাণু সার ও জৈব বালাইনাশক উৎপাদন এবং আমদানীকৃত রাসায়নিক সারে ভর্তুকি প্রদানের পরিবর্তে অভ্যন্তরীন উৎপাদন বৃদ্ধির মাধ্যমে ফসলের উৎপাদন ব্যয় হ্রাসের দীর্ঘমেয়দি পরিকল্পনা গ্রহণ করা।

১০.   বাজার ব্যবস্থার উপর সরকারি নজরদারি জোড়দার করা এবং যেকোন ধরণের অনিয়ম, দুর্ণীতি, স্বজনপ্রীতি ও দলীয়করণ কঠোরহস্থে দমন করা।

১১.   কৃষিপণ্যের মজুদদারি রোধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা।

১২.   কৃষক যাতে তার উৎপাদিত পণ্য সরাসরি ভোক্তার কাছে নিয়ে যেতে পারে তার জন্য সরকার ও বেসরকারী খাত মিলে যৌথভাবে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করা।

১৩.   পচনশীল কৃষিপণ্য সংরক্ষণের জন্য কৃষকদের মালিকানায় সংরক্ষণাগার স্থাপনের উদ্যোগ গ্রহণ করা।

১৪.   কৃষি পণ্যের বাজার অবকাঠামোর উন্নয়ন কার্যক্রম জোড়দার করা।

১৫.   কৃষিপণ্য পরিবহন সহজতর ও ব্যয় হ্রাসের জন্য রেলপথ ও নদীপথের যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন করা।

যাহোক, বাজারের উপর কৃষক বা উৎপাদক শ্রেণীর প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যকে সামনে রেখে বাংলাদেশের বর্তমান কৃষি বাজার ব্যবস্থার আমূল সংস্কার অত্যাবশ্যক। এ লক্ষ্যে কৃষকদের হাতে তাদের উদ্বৃত্ত উৎপাদন ধরে রাখার জন্য তাদের আর্থিক সক্ষমতা বাড়ানোর ব্যবস্থা করা এবং তৃণমূল কৃষক সংগঠনের মাধ্যমে যৌথ উৎপাদন, সংরক্ষণ ও বিপণন ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন যাতে উৎপাদন ও বাজারজাতকরণের সকল পর্যায়ে কোন মধ্যস্বত্বভোগীর অনুপ্রবেশের পথ রুদ্ধ হয়। এমনভাবে বাজার কাঠামোর সংস্কার প্রয়োজন যাতে উৎপাদক শ্রেণীর হাতেই পুনর্বিনিয়োগের জন্য উদ্বৃত্ত উৎপাদন পুঁজি হিসেবে থেকে যেতে পারে।

একাজে সরকারকেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে। সরকারের কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের গবেষণা ও পরিকল্পনা শাখাকে আরো শক্তিশালী করতে হবে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সঙ্গে এই সংস্থার প্রাতিষ্ঠানিক সংযোগ বৃদ্ধি করতে হবে, যাতে মূল্যের উঠানামার তথ্যের ভিত্তিতে সম্প্রসারণ বিভাগ বিভিন্ন শস্যের উৎপাদনে কৃষকদের উৎসাহিত বা নিরুৎসাহিত করতে পারে। আন্তর্জাতিক বাজারে কৃষিপণ্যের মূল্যের উঠানামা যাতে অভ্যন্তরীণ বাজারের মূল্যকে প্রভাবিত করতে না পারে তার জন্য আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য কঠোর হাতে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। ভোগবিলাসী ধনীক শ্রেণী তার টাকার জোরে বিদেশী বিলাসী পণ্য আমদানি করবে। তাতে বাণিজ্য ঘাটতি বেড়ে গিয়ে জাতির পরনির্ভরতা বাড়বে এবং দেশজ পণ্য নিরুৎসাহের কারণে দেশের অর্থনীতিতে স্থবিরতা আনবে। যেমনঃ গুড়োদুধ ও দুগ্ধজাতদ্রব্য, ফাস্ট ফুড, বিদেশী ফল ইত্যাদির অবাধ আমদানি দেশজ উৎপাদনকে ব্যাহত করছে। এসব বিলাসদ্রব্য আমদানি কঠোরহস্থে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। আমাদেরকে মনে রাখতে হবে যে, পাশ্চাত্যের শিল্পোন্নত দেশগুলোর চাপিয়ে দেওয়া বাজার অর্থনীতির স্রোতে গা ভাসিয়ে দিলে আমরা বাজারে টিকতে পারব না। এজন্য আমাদের সংরক্ষণবাদী নীতি অবলম্বন করতে হবে। আমাদের উপলব্ধি করতে হবে যে, একসময় যারা সামরিক শক্তির জোরে তৃতীয় বিশ্বের দরিদ্র দেশসমূহে উপনিবেশ স্থাপন করে শোষণ-লুন্ঠনের মাধ্যমে তাদের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জন করেছে তারাই আজকের পরিবর্তিত বিশ্ব ব্যবস্থায় অর্থনৈতিক, প্রযুক্তিগত ও সামরিক শক্তির জোরে বাজার দখল করে এসব দেশকে বাণিজ্যিক উপনিবেশে পরিণত করার মাধ্যমে তাদের অর্থনৈতিক উন্নতি অব্যাহত রাখতে চাইছে। আজকে যদি তারা আমাদেরকে বাজারের কাছে আত্মসমর্পণ করতে বলে এটা যে তাদের স্বার্থেই বলছে, আমাদের স্বার্থে নয়, এই চেতনাবোধটুকু অবশ্যই আমাদের থাকা প্রয়োজন।

কৃষির সামগ্রিক সংস্কারে করণীয়

বাংলাদেশের জাতীয় উৎপাদন, কর্মসংস্থান, দারিদ্র বিমোচন, খাদ্য নিরাপত্তা, জনমানুষের জীবন-জীবিকা এবং আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে কৃষির অবদান এখনও ব্যাপক। দেশের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ মানুষ কৃষির উপর নির্ভরশীল এবং মোট শ্রমশক্তির শতকরা প্রায় ৫২ ভাগ কৃষিতে নিয়োজিত। সুতরাং কৃষি খাতকে পাশ কাটিয়ে এদেশের উন্নয়নের চিন্তা করাও অবান্তর। বিশ্বে যেসব দেশ আজ শিল্পোন্নত তাদের ইতিহাস পর্যালোচনা করলেও দেখা যায় যে তারা কৃষির উন্নয়নের সোপানে দাড়িয়েই শিল্পোন্নয়নের দিকে মনোযোগি হয়েছে। অথচ স্বাধীনতার পর ৩৯ বছর পেরিয়ে গেলেও কৃষিপ্রধান এদেশের কৃষি ও কৃষকের উন্নয়ন যথেষ্ট গুরুত্ব পায়নি।

পক্ষান্তরে, ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার নামে যে কোন উপায়ে প্রধানত ধানের উৎপাদন বৃদ্ধির এক ভ্রান্ত লক্ষ্যকে সামনে রেখে এবং বিশ্বব্যাংকের চাপিয়ে দেওয়া কাঠামোগত সংস্কার কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে গিয়ে এমন একটি কৃষি ব্যবস্থা কৃষকের উপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে যা কৃষককে কার্যত বাজারের দাসে পরিণত করেছে। দেশীয় উপকরণনির্ভর স্থায়িত্বশীল কৃষি প্রযুক্তির উদ্ভাবন এবং ব্যবহারের দিকে যথেষ্ট গুরুত্ব না দিয়ে ক্রমবর্ধমান হারে রাসায়নিক সার, কীটনাশক এবং অন্যান্য বাজারনির্ভর এবং আমদানিনির্ভর কৃষি উপকরণের ব্যবহারকে উৎসাহিত করা হয়েছে যা দেশের কৃষিকে কৃষকের হাত থেকে কেড়ে নিয়ে বাজারের হাতে জিম্মি করে ফেলেছে। ফলে, বাজারের খেলোয়াড়দের কারসাজিতে একদিকে যেমন ফসলের উৎপাদন ব্যয় এ দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ ক্ষুদ্র, প্রান্তিক ও ভূমিহীন কৃষকের সাধ্যের বাইরে চলে যাচ্ছে অন্যদিকে, মাটির উর্বরতা ও উৎপাদন ক্ষমতা  হ্রাসের ফলে ফলন হ্রাস, ফসল চাষের ঝুঁকি বৃদ্ধি, সেচ সংকট, সার সংকট, বীজ সংকট, ভেজাল বীজ সার ও কীটনাশক এবং জলবায়ুগত পরিবর্তনের ফলে প্রাকৃতিক দুর্যোগ বৃদ্ধিসহ নানাবিধ সংকট ও সমস্যায় কৃষক দিশেহারা হয়ে পড়ছে। তাছাড়া, মানব স্বাস্থ্য, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যও আজ মারাত্মক হুমকির সন্মুখীন। সর্বোপরি ধ্বংস হয়েছে এ দেশের হাজার বছরের স্বনির্ভর ও স্থায়িত্বশীল কৃষি ব্যবস্থা।

অন্যদিকে, বর্তমান বাজার ব্যবস্থার উপর কৃষকের কোন নিয়ন্ত্রণ না থাকার কারণে উৎপাদন থেকে তেমন কোন লাভ কৃষকের ঘরে উঠছেনা। যারা বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে তারা একদিকে যেমন বীজ, সার, কীটনাশকসহ অন্যান্য কৃষি উৎপাদন উপকরণ বিক্রী করে ইচ্ছেমত মুনাফা হাতিয়ে নিচ্ছে অন্যদিকে, সকল ব্যয়ভার ও ঝুঁকি কাঁধে নিয়ে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে কৃষক যা উৎপাদন করছে তার লভ্যাংশটাও তারা হাতিয়ে নিচ্ছে। কৃষক যে পণ্য লোকসানে বিক্রী করছে সে পণ্য থেকেই কয়েকগুণ লাভ তুলে নিচ্ছে মধ্যস্বত্বভোগীরা। কার্যত কৃষক আজ বাজরের দাসে পরিণত হয়েছে। এরূপ মধ্যস্বত্বভোগী ফড়িয়া, মহাজন, আড়তদার, মজুদদার ব্যবসায়ী, বীজ-সার-কীটনাশক কোম্পানি, বীজ-সার-কীটনাশক ব্যবসায়ী, সুদখোর মহাজন, ভূমি ও জলাধার গ্রাসী, হাট-বাজারের ইজারাদার, কৃষি ব্যাংকের দালাল চক্র, ঘুষখোর সরকারী কর্মকর্তা, ঋণ ব্যবসায়ি এনজিও মিলে চারদিক থেকে কৃষককে এক শোষণ-শৃংখলে বন্দী করে কৃষি উৎপাদনের সুফলটুকো লুটেপুটে নিচ্ছে। তাই এই শৃংখল থেকে কৃষকের মুক্তির জন্য প্রয়োজন বর্তমান কৃষি ব্যবস্থার সামগ্রিক সংস্কার। বাংলাদেশের কৃষির সামগ্রিক সংস্কার কর্মসূচী প্রণয়নের ক্ষেত্রে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা কর্তৃক প্রণীত চাষি সনদ এবং গ্রামীণ জীবনযাত্রার স্থায়িত্বশীল উন্নয়নের জন্য প্রচারাভিযান কর্তৃক প্রণীত সামগ্রিক কৃষ সংস্কার কর্মসূচী সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে। নিম্নে এগুলো সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোকপাত করা হল।

চাষী সনদ

১৯৮১ সালে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) কর্তৃক আয়োজিত কৃষি সংস্কার ও গ্রামীণ উন্নয়ন বিষয়ক বিশ্ব সম্মেলনে একটি ‘চাষী সনদ’ (Peasants’ Charter, ১৯৮১) গৃহীত হয়। এই সনদে এমন একটি কৃষি সংস্কারের সুপারিশমালা তুলে ধরা হয় যার মূল লক্ষ্য হবে অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, পরিবেশগত ও মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর জীবন ও কার্যক্রমের রূপান্তর। প্রস্তাবনাগুলো বাংলাদেশের কৃষির চলমান সংকট ও সমস্যাগুলো মোকাবিলা করে গোটা কৃষক সম্প্রদায় বিশেষ করে ক্ষুদ্র, প্রান্তিক ও ভূমিহীন কৃষকদের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন এবং সার্বিকভাবে দেশের কৃষি ও গ্রামীণ উন্নয়নের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সুপারিশগুলো সংক্ষেপিত আকারে নিন্মে তুলে ধরা হল।

ভূমি মালিকানার পুনর্বিন্যাস

১.     ব্যক্তি মালিকানাধীন জমির সর্বোচ্চ সিলিং নির্ধারণ করা।

২.     মৎস্য চাষের উপযোগী জলাশয় অধিগ্রহণ ও পুনরুদ্ধার করে সেগুলো সহজ শর্তে কৃষক ও মৎস্যজীবিদের মধ্যে চাষের জন্য বিতরণ করা।

৩.    অধিগ্রহণ ও পুনরুদ্ধারকৃত জমি বা জলাশয় বন্টনের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত বর্গাচাষী, ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক, ভূমিহীন ও কৃষি শ্রমিক বিশেষকরে বঞ্চিতদের প্রধান্য দিতে হবে এবং বন্টনের পর সেগুলো যাতে যথাযথভাবে ব্যবহার হয় তার জন্য সমবায় বা অন্য কোন ধরণের কৃষক সংগঠন গঠনসহ রাষ্ট্রের সার্বিক সহায়তায় উন্নয়ন কর্মসূচি গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করা।

৪.     বণ্টনকৃত জমি বা জলাশয় অব্যবহার, অপব্যবহার ও হস্তান্তর রোধ করার জন্য গতিশীল ও দৃঢ়প্রতিজ্ঞ পুনর্বন্টন কার্যক্রম বাস্তবায়ন ও প্রতিরোধমূলক আইন প্রবর্তন করা।

৫.     সংস্কার পরবর্তীকালে সম্পদের যেকোন ধরণের পুঞ্জিভবন ও শোষণ রোধ করার জন্য কৃষক সংগঠন, সমবায়, সমষ্টিগত ও রাষ্ট্রীয় খামার গড়ে তোলা এবং উপকারভোগীদের অংশগ্রহণে উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়নে প্রতিষ্ঠানিক সহায়তা প্রদান করা।

বর্গাপ্রথা ও গ্রামীণ মুজুরি কাঠামোর সংস্কার

৬.     বর্গাদার ও লিজ বন্দোবস্ত গ্রহণকারী কৃষকদের দলিলের ব্যবস্থা করা।

৭.     বর্গা ও লিজ বন্দোবস্ত গ্রহণকারী কৃষকদের অনুক‚লে সর্বোচ্চ মূল্য নির্ধারণ নিশ্চিত করার জন্য আইন প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা।

৮.     সামাজিক ন্যায়পরায়ণতা, ঋণ ও সেবা গ্রহণের অধিকার সমুন্নত করা এবং বিনিয়োগ উৎসাহিত করার জন্য বর্গা ও লিজ বন্দোবস্ত গ্রহণকারী কৃষকদের জন্য বর্গা বা লিজের মেয়াদকালের নিরাপত্তা বিধান করা।

৯.     দলীয় সংহতি, আইন বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া তদারকি করা এবং আইনগত ভুল সংশোধনে তাদের ক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য বর্গাদারদের সংগঠন গড়ে তুলতে উৎসাহ প্রদান করা।

১০.   গ্রামীণ শ্রমিকদের শোষণ থেকে রক্ষা করার লক্ষ্যে কাজের শর্তাবলী, ন্যূনতম মুজুরী ইত্যাদি বিষয়ক বিধি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা।

প্রথাগত ভোগদখল নিয়ন্ত্রণ

১১.   অসম বেসরকারিকরণ ও অনুপস্থিত মালিকানা রোধ এবং ক্ষুদ্র চাষীদের স্বার্থ সংরক্ষণ করা।

১২.   ভূমি ও পানির অধিকারের উপর বৃহত্তর পরিসরে কমিউনিটির নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবস্থাপনার সিস্টেম প্রবর্তন করা।

১৩.   গোচারণভূমির অধিকতর দক্ষ ব্যবহারের জন্য কর্মসূচি গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করা।

জমি একত্রিতকরণ এবং যৌথ চাষাবাদ, সমবায়, সমষ্টিগত এবং রাষ্ট্রীয় খামার স্থাপনে উৎসাহদান

১৪.   খন্ডিত ও বিক্ষিপ্ত জমিগুলোকে একত্রিতকরণের জন্য জোড়ালো কার্যক্রম গ্রহণ করা।

১৫.   কমিউনিটিভিত্তিক এবং এলাকাভিত্তিক উন্নয়ন কর্মসূচির সহিত একত্রিত জমির সমন্বয় সাধন এবং একত্রিতকরণের ফলে উদ্বৃত্ব শ্রমিকদের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করার জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ করা।

১৬.   দলগত চাষ, রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন খামার, জনগণের মালিকানাধীন খামার, সমবায় এবং অন্য কোন ধরণের যৌথ মালিকানা ব্যবস্থাকে উৎসাহিত করা।

কৃষি সংস্কারে জনগণের অংশগ্রহণ  

১৭.   ভূমি সংস্কারের উপকারভোগীদের সংগঠন গঠনে উৎসাহিত করা এবং তাদেরকে ভূমি ও জলাশয়ের পুনর্বন্টন, সংশ্লিষ্ট সকল আইনের বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ার সহিত সম্পৃক্ত করা।

১৮.   ক্ষুদ্র চাষী, ভূমি সংস্কারের উপকারভোগী এবং অন্যান্য চাষী গ্র“পের সাথে সরকারি ঋণ ও অন্যান্য উপকরণ সরবরাহ ব্যবস্থার সংযোগ স্থাপন করা।

১৯.   অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগের জন্য উপকারভোগীদের শ্রম ও অন্যান্য সম্পদের কার্যকর ব্যবহারের সুযোগ নিশ্চিত করা।

নারীদের সমন্বিতকরণ

২০.   যেসব আইন নারীদের উত্তরাধিকার, মালিকানা এবং সম্পদের নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে বৈষম্যের সৃষ্টি করে সেসব আইন রহিত করা।

২১.   যৌথ মালিকানা এবং স্বামীর অনুপস্থিতিতে নারী উৎপাদকদের সহমালিকানা প্রদান এবং তাদের ব্যবহারকৃত ভূমির ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গ্রহণের আইনগত অধিকার প্রদান করাসহ নারীদের মালিকানার অধিকার নিশ্চিত করা।

২২.   জমি, গবাদিপশু এবং অন্যান্য উৎপাদনশীল সম্পদের উপর নারীদের সমঅধিকার নিশ্চিতকরণের জন্য পদক্ষেপ গ্রহণ করা।

২৩.   বিভিন্ন জনসংগঠন যেমন: বর্গাচাষী সংগঠন, শ্রমিক ইউনিয়ন, সমবায়, ক্রেডিট ইউনিয়ন ও সংগঠন ইত্যাদিতে নারীদের পূর্ণ সদস্যপদ ও সমান ভোটাধিকার নিশ্চিত করা।

২৪.   বিদ্যমান সরবরাহ ব্যবস্থায় বৈষম্যহীন প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার মাধ্যমে নারীদের কৃষি উপকরণ ও অর্থনৈতিক সেবা প্রাপ্তি নিশ্চিত করা।

২৫.   কৃষিপণ্য উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, সংরক্ষণ ও বিপণন কার্যক্রমে নারীদের ভূমিকায় সহায়তার জন্য কৃষি প্রশিক্ষণ ও সম্প্রসারণ কর্মসূচির আওতা বৃদ্ধি করা।

ইনপুট ও সেবা

২৬.   ক্রয়কৃত কৃষি ইনপুট-এর বিশেষত ক্ষুদ্র কৃষক ও তাদের গ্রুপ কর্তৃক বর্ধিত ও অধিক দক্ষ ব্যবহার নিশ্চিত করার জন্য মূল্য নীতি, সুদের হার এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য নীতিমালা গ্রহণ ও পুনর্বিন্যাস করা।

২৭.   সংগঠিত ক্ষুদ্র কৃষক দল এবং গ্রামীণ দরিদ্রদের অন্যান্য দলের সরাসরি ও বর্ধিত অংশগ্রহণসহ সমতাভিত্তিক প্রবেশাধিকার এবং ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করার জন্য ইনপুট এবং আর্থ-সামাজিক সেবাদানকারী স্থানীয় ও আঞ্চলিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা এবং শক্তিশালীকরণ।

২৮.   ঋণ, বস্তুগত উপকরণ, সম্প্রসারণ, কৃষি-কারিগরি প্রশিক্ষণ, বিক্রয়কেন্দ্রসহ সার্বিক সেবা এবং স্থানীয় পর্যায়ে বিতরণ ব্যবস্থার কার্যকরী সমন্বয় সাধনের জন্য সময়মত সরবরাহ নিশ্চিত করা।

২৯.   বাজার প্রতিষ্ঠানসমূহের পরিবর্তন সাধন এবং বাজারবহির্ভূত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সাবসিস্ট্যান্স ও অন্যান্য ক্ষুদ্র কৃষক এবং সমবায়ের কাছে ইনপুটের বর্ধিত প্রবাহ নিশ্চিত করার জন্য প্রাধিকারভিত্তিক মূল্যে এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে কর্মসূচি প্রণয়ন ও প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা।

ঋণ এবং বাজার ব্যবস্থার সংস্কার

৩০.   ইনপুট এবং সেবার ক্ষেত্রে বিস্তৃত প্রবেশাধিকারের সুযোগ সৃষ্টি করা এবং মূল্যের উর্ধ্বগতি নিয়ন্ত্রণ ও সরবরাহ ব্যবস্থার ব্যয় সর্বনিন্ম পর্যায়ে রাখার লক্ষ্যে বাজার-শহর, সাধারণ সুবিধাদি এবং গ্রামীণ সেবা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা এবং শক্তিশালী করা।

৩১.   ইনফরমাল মার্কেট, কৃষক সমবায় এবং স্বায়ত্বশাসিত সংস্থাসমূহের কার্যকর ব্যবহারের মাধ্যমে ক্ষুদ্র কৃষকদের উৎপাদিত পণ্যের বাজারজাতকরণ, সংরক্ষণ ও পরিবহন ব্যবস্থা উন্নতকরণ।

৩২.   সরকারী এবং বেসরকারি ঋণদানকারী প্রতিষ্ঠানের ঋণদান ব্যবস্থার পূনর্বিন্যাসের মাধ্যমে ক্ষুদ্র কৃষকদের গৃহ নির্মাণ, ভোগ ও উৎপাদনের কাজে প্রয়োজন অনুযায়ি ঋণের ব্যবস্থা করা যাতে মহাজনি ঋণের হাত থেকে কৃষক মুক্তি পেতে পারে।

৩৩.  ক্ষুদ্র কৃষকদের উপকরণ ও অন্যান্য সেবা সরবরাহের অধিক ব্যয় ও ঋণের ঝুঁকি পুষিয়ে নেওয়ার জন্য একটি ভর্তুকি তহবিল গঠন করা

৩৪.   ক্ষুদ্র কৃষক ও নিম্ন আয়ের উৎপাদকদের খেলাপি ঋণের জন্য ঋণদানকারী প্রতিষ্ঠানের ক্ষতিপূরণের লক্ষ্যে ঝুঁকি তহবিল গঠন করা।

৩৫.   কৃষিপণ্য ও উপকরণের দামের ঋতুভিত্তিক ও বছরভিত্তিক অত্যাধিক উঠানামা রোধ করা এবং উৎপাদকের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করার জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ করা।

৩৬.  ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া এবং উৎপাদিত ফসলের মূল্যের উঠনামার কারণে ক্ষুদ্র কৃষকদের ঝুঁকি নিরসনের জন্য বীমা, ক্ষতিপূরণমূলক অর্থায়ন এবং মূল্য সহায়তা প্রদান করা।

৩৭.   সরকারি অর্থ বরাদ্দ বৃদ্ধি ও স্থানীয় সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহারের মাধ্যমে উপকরণ সরবরাহ ও উৎপাদিত পণ্যের বাজারজাতকরণে (পরিবহণ এবং অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা, বাজার, গ্রামীণ সেবা কেন্দ্র ইত্যাদি) গ্রামীণ অবকাঠামোর উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ করা।

একটি বিকল্প প্রস্তাবনা

পরিশেষে বলা যায়, বাণিজ্যিক বিশ্বায়নের এ যুগে আমাদের অথনৈতিক উন্নয়ন করতে হলে কৃষির উন্নয়ন ও কৃষিভিত্তিক শিল্পায়নের মাধ্যমেই তা করতে হবে। আমাদের কৃষিকে দীর্ঘমেয়াদে গতিশীল রাখতে হলে কৃষিক্ষেত্রে উদ্বৃত্ত মূলধনের বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। শুধু উৎপাদনশীলতা ও বার্ষিক আয় বাড়ালেই অথনৈতিক উন্নয়ন সম্ভব হবে না। উদ্বৃত্ত মূলধন গঠন করে তা বিনিয়োগের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদী উৎপাদনশীলতা যাতে বাড়ানো যায় সেদিকে নজর দিতে হবে। তা ছাড়া কৃষি বাণিজ্যের পুরোপুরি উদারীকরণ সম্পন্ন হলে অদূর ভবিষ্যতে এ দেশের কৃষককে বৈদেশিক কৃষি পণ্যের সাথে এক অসম প্রতিযোগিতার মুখোমুখি হতে হবে। এই প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে প্রয়োজন কৃষির খামারায়ন ও শিল্পায়ন। আর এজন্য প্রয়োজন কৃষিতে ব্যাপক বিনিয়োগ নিশ্চিত করা।

কিন্তু কে করবে এই বিনিয়োগ? বর্তমান প্রেক্ষাপটে কৃষকের পক্ষে কৃষি খামার ও কৃষি শিল্পে বিনিয়োগ এক কথায় অসম্ভব। সুতরাং স্বাভাবিকভাবেই এ বিনিয়োগ করবে পুঁজিপতিরা যাদের পুঁজির প্রধান যোগানদার হবে ব্যাংক ও অন্যান্য অর্থলগ্নিকারী প্রতিষ্ঠান যেখানে কৃষকের কোন অভিগম্যতা নেই। কাজেই, ব্যাংকের পুঁজি খাটিয়ে, কৃষকের জমি ও স্বস্তা শ্রম ব্যবহার করে মুনাফা হাতিয়ে নিবে পুঁজিপতিরা। পক্ষান্তরে, দেশের কৃষিনির্ভর ব্যাপক জনগোষ্ঠী হবে কর্মহীন। কারণ পুঁজিপতিদের খামারায়ন ও শিল্পায়ন হবে যন্ত্রনির্ভর যেখানে কর্মসংস্থান হবে সীমিত। আর যেহেতু এদেশে বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগও কম তাই আমাদের কৃষিতে এ ধারার খামারায়ন ও শিল্পায়ন ক্ষুদ্র, প্রান্তিক ও ভূমিহীন কৃষক জনগোষ্ঠী ও কৃষি শ্রমিকের জীবন-জীবিকার উপর মারাত্মক বিপর্যয় ডেকে আনবে। কাজেই কৃষিতে যদি খামারায়ন ও শিল্পায়ন করতে হয় তবে তাতে কৃষকের অংশীদারিত্ব নিশ্চিত করতে হবে। কৃষিভিত্তিক বিনিয়োগের জন্য কৃষকদের রয়েছে প্রয়োজনীয় জমি ও শ্রমশক্তি। তাদের ঘাটতি হলো পুঁজি, ব্যবস্থাপনাগত জ্ঞান আর স্থায়িত্বশীল প্রযুক্তির। এসব ক্ষেত্রগুলোতে সহায়তা পেলে কৃষকরাই হয়ে উঠতে পারে সবচেয়ে বেশী প্রতিযোগিতার ক্ষমতাসম্পন্ন বিনিয়োগকারী। এতে করে শুধু যে কৃষকের আর্থসামাজিক উন্নয়ন ঘটবে তাই নয়, মজবুত হবে এ দেশের অর্থনৈতিক ভিত্তি।

অন্যদিকে, বাজার ব্যবস্থার উপর কৃষকের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করাও অত্যন্ত জরুরী। শুধু কাঁচামাল উৎপাদন করে বাজারে তুলে দিলেই হবে না, কাঁচামালের সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ করে সর্বশেষ ভোগ্যপণ্য পর্যন্ত যেতে হবে। উদাহরণস্বরূপ, কৃষকরা মরিচ, হলুদ, ধনিয়া ইত্যাদি খুব স্বল্প মূল্যে কাঁচা অবস্থায় বাজারে বিক্রী করে দেয়। তারপর তা কয়েক হাত ঘুরে যায় গুড়া মসলা প্রস্তুতকারী কারখানায়। সেখানে গুড়া মসলা হিসেবে প্যাকেটজাত হয়ে উচ্চমূল্যে বাজারে বিক্রী হয়। অথচ শুধু পুঁজির ব্যবস্থা করতে পারলে কৃষক নিজেই এই ব্যবসা করতে পারে। প্রথমিকভাবে এরূপ ছোট আকারের সহজ ব্যবসা দিয়ে শুরু করে একসময় বৃহৎ শিল্প প্রতিষ্ঠার দিকে যাওয়া যেতে পারে।

বর্তমান ধারার কৃষি ব্যবস্থায় এবং বৈশ্বিক কৃষি বাণিজ্যের বর্তমান গতিধারা বিবেচনায় কৃষকের অধিকার প্রতিষ্ঠা, আর্থ-সামাজিক অবস্থার উন্নয়ন ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত দুরূহ ও সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। অন্যদিকে, বহুজাতিক কোম্পানি নামক বিষবৃক্ষ দিনে দিনে ডালপালা বিস্তার করে সর্বগ্রাসী মহীরূহ রূপ ধারণ করছে। বহুজাতিক কোম্পানির বাণিজ্যের আগ্রাসন মোকাবিলার জন্য প্রয়োজন সমগ্র উৎপাদন ও বাজার ব্যবস্থার উপর কৃষকের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা যা বিচ্ছিন্ন অবস্থায় থেকে কখনই কৃষকের পক্ষে সম্ভব হবে না। এ জন্য কৃষকের ঐক্যবদ্ধ ও সংগঠিত প্রচেষ্টা আশু প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে যতই কালক্ষেপন করা হবে ততই এ আগ্রাসন মোকাবেলার সম্ভাবনা ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হবে।

কিন্তু এরূপ যৌথ উৎপাদন ব্যবস্থা গড়ে তোলার কৌশল কি হবে তা বিতর্কের বিষয়। সমবায়ভিত্তিক খামার ব্যবস্থা একটি ভাল বিকল্প হতে পারত। এদেশে ষাটের দশক থেকে সরকারী পৃষ্ঠপোষকতায় যে সমবায় ব্যবস্থা গড়ে তোলার চেষ্টা হয়েছে, যা ছিল বহুজাতিক কোম্পানির প্রযুক্তি বিস্তারের কৌশলমাত্র, তা বহুজাতিক কোম্পানির বাণিজ্যের প্রসারে ব্যাপক ভূমিকা রাখলেও কৃষকের স্বার্থ রক্ষায় স্বাভাবিক কারণেই ব্যর্থ হয়েছে। অন্যদিকে, ব্যক্তি স্বাতন্ত্রবাদের বিস্তার ও কৃষকের মাঝে রাজনৈতিক বিভাজন এমন এক ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে যে, এমতাবস্থায় সমবায়ভিত্তিক খামার ব্যবস্থা গড়ে তোলার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ। কাজেই, সমবায় এবং বর্তমান কর্পোরেট ব্যবস্থার সংমিশ্রণে নতুন কোন ব্যবস্থার কথা ভাবতে হবে। এ জন্য প্রয়োজন কৃষকের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণে এবং সংশ্লিষ্ট সকলের সম্মিলিত প্রয়াসের মাধ্যমে সরকারী উদ্যোগে একটি বিকল্প কৃষি ও গ্রামীণ উন্নয়ন মডেল গড়ে তোলা।

 

 

তথ্যসূত্রঃ

১।   আলম, ড. এম. এন. (২০০৪): বাংলাদেশের উন্নয়নে কৃষির অবদান ও সম্ভাবনা, একবিংশ শতাব্দির কৃষির চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা, কৃষি কর্মী মহাসম্মেলন ও প্রযুক্তি মেলা-২০০৪ উপলক্ষ্যে প্রকাশনা, কৃষি মন্ত্রণালয়, ঢাকা, বাংলাদেশ।

২।   আলী, এ.কে.এম. মাসুদ ও অন্যান্য (২০০২): বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার কৃষিচুক্তি, ইনসিডিন বাংলাদেশ, ঢাকা।

৩।   উবিনীগ (২০০৫): কৃষি খাদ্যে জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং: কৃষক ও জনগণের জন্য হুমকি, উবিনীগ, ঢাকা।

৪।   ওমর, ব. (১৯৯৮): চিরস্থায়ি বন্দোবস্তে বাংলাদেশের কৃষক, মাওলা ব্রাদার্স, ঢাকা।

৫।   জেজেএস (২০০৩): বিশ্বায়নের আগ্রাসন ও বাংলাদেশের কৃষক, জেজেএস, খুলনা।

৬।   পাক্ষিক চিন্তা (১৯৯৪): বছর-৩, সংখ্যা ১৬-১৭, ৩০ এপ্রিল ১৯৯৪।

৭।   পার্থ, পা. (২০০৪): বীজ সংকট: কৃষকের বীজের অধিকার, বারসিক, লালমাটিয়া, ঢাকা।

৮।   মজহার, এফ (২০০৪): বাণিজ্য ও বাংলাদেশের জনগণ, চিন্তা প্রকাশনা, ঢাকা, বাংলাদেশ।

৯।   মুক্তা, জেড. এইচ (২০০৩): আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও খাদ্য নিরাপত্তা, পলিসি সাপোর্ট ইউনিট, এ্যাকশন এইড বাংলাদেশ, ঢাকা।

১০। মুক্তা, জেড. এইচ (২০০৪): বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার বৈধতার সংকট, এ্যাকশন এইড বাংলাদেশ, ঢাকা।

১১। রহমান, এ. (২০০২): বাংলাদেশের আতœনির্ভর উন্নয়নের জন্য কাঠামোগত রূপান্তও, কনসেপ্ট পেপার, বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি সাময়িকী, ঢাকা।

১২। রিকাবদার, এম.এফ. এইচ (২০০৪): খাদ্য ও পুষ্টির সন্ধানে, কৃষি তথ্য সার্ভিস, বাইকালার অফসেট প্রেস, ঢাকা।

১৩। হোসেন, এম. (২০০০): কৃষি পণ্যের বাজারে সরকারি হস্তক্ষেপের কার্যকারিতা: বাংলাদেশের অভিজ্ঞতার পর্যালোচনা ও কয়েকটি সুপারিশ, বাংলাদেশ উন্নয়ন সমীক্ষা, খন্ড-১৭, বার্ষিক সংখ্যা, ঢাকা।

  1. Mazhar, F (2004): Popular Strategies of Food Sovereignty in the Context of ‘Globalization’, Nayakrishi Andolon, Okkhar Mudrayan, Dhaka.
  2. Barakat, A & Maksud, A.K.M (2002): Fate of Bangladesh Agriculture Against Globalization: Some Critical Issues, Bangladesh Journal of Political Economy, Vol XVI, No.-1, Bangladesh Economic Association, Dhaka, p. 257-276.
  3. Mahfuzullah (2002): Intellectual Property Rights and Bangladesh, BELA & CFSD, Dhaka, Bangladesh.
  4. Action Aid (2004): Trade Related Intellectual Property Rights and Threat to Food Security and Farmers Rights, Action Aid, UK.
  5. Kanniah, R (2003): TRIPS, Farmers’ Rights and Food Security-The Issue at Stake. Briefing Paper, Consumer International, London, UK.
  6. VOICE (2004): No to GMO and Corporisation of Food and Agriculture, Food Sovereignty, Vol-1, No-1.
  7. http://en.wikipedia.org/wiki/Green_Revolution
  8. http://geography.about.com/od/globalproblemsandissues/a/greenrevolution.htm

http://www.foodfirst.org/media/opeds/2000/4-greenrev.html