নারীর হাত ধরে কৃষির সূচনা হলেও বর্তমান রাসায়নিক কৃষি ব্যবস্থায় পুরুষের নিয়ন্ত্রণ ও আদিপত্য ক্রমশ বাড়ছে। কারণ, কৃষি এখন অনেকটাই বাজারনির্ভর। যেহেতু বাজারে নারীদের অভিগম্যতা নেই বললেই চলে তাই কৃষিতেও নারীদের অভিগম্যতা দিন দিন কমছে। উদাহরণস্বরূপ বীজের কথাই ধরা যাক। কৃষক পরিবারে বীজ সংরক্ষণের কাজটি ছিল মূলত নারীদের। এই বীজ সংরক্ষণের মাধ্যমেই নারীরা ফসল চাষের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় জড়িয়ে পড়তেন। তা ছাড়া, একসময় বাংলাদেশের কৃষি ছিল একটি সমন্বিত ব্যবস্থা যার অধিকাংশ কাজই ছিল গৃহস্থালীকেন্দ্রিক। যেমন: চাষের গরুটিকে দেখাশুনা করা, গরুর গোবরটা জমিতে দেওয়ার জন্য সংরক্ষণ করা এসব কাজ করতে গিয়ে নারী সংসারে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতেন। যদিও পুরুষতান্ত্রিক ব্যবস্থায় তার কাজের যথাযথ মূল্যায়ন বা স্বীকৃতি তখনও ছিল না তবুও গুরুত্ব ছিল এখনকার চেয়ে অনেক বেশি। বর্তমানে নারীর কাজ প্রধানত শস্য মাড়াই, ঝাড়াই আর শুকিয়ে বাজারের জন্য প্রস্তুত করে দেওয়া যেখানে নারী নিছক একজন শ্রমিকের ভূমিকা পালন করে থাকে। ফলে, বর্তমান চাষ ব্যবস্থায় নারী-পুরুষের বৈষম্য বা জেন্ডার বৈষম্য বাড়ছে বলেই মনে হয়।
জেন্ডার (Gender) কি?
যে কোন দেশে যে কোন সমাজে অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক ও ঐতিহ্যগতভাবে নারী ও পুরুষের কাজের ভিন্নতা রয়েছে। সমাজে নারী ও পুরুষের এই ভিন্নমূখী ভূমিকা ও দায়িত্ব পালন তাদের দৈহিক কাঠামোগত পার্থক্য দ্বারা নির্ণীত হয় নি, বরং সমাজ আরোপিত আচার-আচরণ, মুল্যবোধ ও নিয়মনীতি দ্বারা নির্ধারিত হয়েছে। সমাজ ও সংস্কৃতি দ্বারা নির্ধারিত নারী পুরুষের এরূপ ভিন্নতাকেই জেন্ডার বলা হয়। জন্মগত ও দৈহিকভাবে নারী পুরুষের পার্থক্যকে নির্ণয় করা হয় পুলিঙ্গ ও স্ত্রীলিঙ্গ হিসাবে। পক্ষান্তরে, জেন্ডার হচ্ছে নির্দিষ্ট সমাজের সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়ার ধারাবাহিকতা। যেমন: সামাজিক ও সাংস্কৃতিকভাবে নারী মায়ের দায়িত্ব পালন, ঘর গৃহস্থালীর কাজ ও সেবা শুশ্রুষা দায়িত্ব পালন করে থাকে। অন্যদিকে, পুরুষের জন্য থাকে পরিবারের বাইরের কাজ, সমাজ ও রাষ্ট্রের নেতৃত্বদানের কাজ, পরিবার পরিচালনা ও কর্তাব্যক্তি হিসেবে দায়িত্ব পালন ইত্যাদি। কাজ বা দায়দায়িত্বের এরূপ বিভাজন শুরু হয় জন্মলগ্ন থেকেই; একটি মেয়ে শিশু ও একটি ছেলে শিশুর প্রতি পৃথক আচরণ করার মাধ্যমে। যেমনঃ শৈশবে খেলাধুলার সরঞ্জাম হিসেবে একটি ছেলে শিশুকে যখন দেওয়া হয় বন্দুক, সাইকেল, টেনিস বল বা ক্রিকেট ব্যাট তখন একটি মেয়ে শিশুকে দেওয়া হয় পুতুল, রান্নার হাড়ি-পাতিল ইত্যাদি। এভাবেই পরিবার বা সমাজ নির্ধারিত গুণাবলী ও বৈশিষ্ট্য নিয়ে ছেলে শিশুটি বলবান পুরুষে ও মেয়ে শিশুটি দুর্বল, কোমলমতি ও সেবাধর্মী নারীতে পরিণত হয়। তাই ঐতিহ্যগতভাবেই সমাজ নির্ধারণ করে দেয় নারী ঘর গৃহস্থালির কাজ করবে এবং পুরুষ বাইরের কাজ এবং পরিবার ও সমাজ পরিচালনার কাজ করবে। সামাজিকভাবে আরোপিত নারী ও পুরুষের এরূপ শ্রম বিভাজন সমাজ পরিবর্তনের সাথে সাথে ক্রমান্বয়ে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করেছে।
নারী-পুরুষের দৈহিক ভিন্নতাকে কেন্দ্র করে সামাজিক শ্রম বিভাজন প্রাতিষ্ঠানিক রূপলাভ করেছে যা নিম্নরূপঃ-
১. উৎপাদনমুখী ও আয়বর্ধক কাজ
বাণিজ্যিকভাবে বা এককভাবে গৃহের চাহিদার জন্য যে সকল উৎপাদনমূলক কাজ করা হয় যেমনঃ জমিতে ফসল উৎপাদন, মাছ ধরা, হাস-মুরগী ও গরুছাগল পালন ইত্যাদি। এসব কাজে নারী ও পুরুষ উভয়েরই অংশগ্রহণ থাকে।
২. পুনঃউৎপাদনমুখী কাজ
ঘর-গৃহস্থালী এবং পরিবারের সদস্যদের দেখা শোনা, সন্তান ধারণ ও লালন পালন, রান্নাবান্না, পানি ও জ্বালানী সংগ্রহ, পরিবারের সদস্যদের সেবা-শুশ্রুষা ইত্যাদি কাজগুলোর অধিকাংশই নারী করে থাকে এবং এর মধ্যে সন্তান ধারণ এককভাবেই নারীর কাজ।
৩. সামাজিক কাজ
সামাজিক কাজের মধ্যে পড়ে বিভিন্ন সামাজিক উৎসব উৎযাপন, সমাজ উন্নয়নমূলক কাজ, স্থানীয় রাজনীতি প্রভৃতি। এসব কাজে পুরুষের অংশগ্রহণ তুলনামুলকভাবে অনেক বেশি থাকে।
উপরে বর্ণিত কাজগুলোর দিকে লক্ষ্য করলে দেখা যায় যে, এই কাজগুলিতে নারী-পুরুষ, বালক-বালিকা সকলের আংশগ্রহণ ঘটলেও নারী পুনঃউৎপাদনশীল কাজের প্রায় পুরোটাই এবং কোন কোন ক্ষেত্রে উৎপাদনমূলক কাজের অর্ধেকেরও বেশি সম্পন্ন করে থাকে। উৎপাদন ও পুনঃউৎপাদন এই দুটি ক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ অধিক থাকায় নারীকে পুরুষের চেয়ে অধিক শ্রম দিতে হয় এবং অনেক বেশি কাজ করতে হয়। শস্য উত্তোলন পরবর্তী কাজগুলো (যেমন: শস্য ও বীজ প্রক্রিয়াজাতকরণ, সংরক্ষণ ইত্যাদি) সাধারণত নারীই করে থাকে। দীর্ঘদিন থেকে এ কাজে সম্পৃক্ত থাকার ফলে এই বিষয়ে তার দক্ষতা ও অভিজ্ঞতাও বেশি থাকে।
সামাজিক অবস্থান, নিয়মনীতি, চিন্তা-চেতনা ও মুল্যবোধ নারী ও পুরুষকে ভিন্নতা দান করেছে। স্থানীয় সম্পদ ব্যবহারের সুযোগের ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের সমান অধিকার থাকে না। ভূমি, পানি, মজুরী, অর্থ, নেতৃত্ব, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, তথ্য প্রভৃতির উপরও নারী-পুরুষের সমান নিয়ন্ত্রণ থাকে না। নারী ও পুরুষের শ্রম বিভাজন এবং সম্পদের উপর অসম নিয়ন্ত্রণের ফলে তাদের আকাঙ্খা, চাহিদা, জ্ঞান, দক্ষতা ও অভিজ্ঞতাসমূহও ভিন্ন হয়।
স্থায়িত্বশীল কৃষিতে নারীর ভূমিকা
স্থায়িত্বশীল কৃষিতে ব্যবহৃত উৎপাদন উপকরণগুলো মূলত স্থানীয় সম্পদনির্ভর যা কৃষক পরিবারের ভিতরেই থাকে। এখানে বাইরের উপকরণ যেমন: বীজ, রাসায়নিক সার ও কীটনাশক প্রভৃতি ব্যবহার করা হয় না। কৃষক পরিবারের নিজস্ব গোবর বা জৈব সার, বীজ প্রভৃতি নারীরা রক্ষণাবেক্ষণ করে থকে। ব্যাপকভাবে স্থায়িত্বশীল কৃষির সম্প্রসারণ ঘটলে নারীদের কাজের মাত্রা আরও বেড়ে যাবে। সেক্ষেত্রে পুরুষদেরকেও নারীদের কাজের প্রতি সহানুভূতিশীল ও সহমর্মী হতে হবে এবং পরস্পর কাজ ভাগ করতে হবে। খামারের কার্যাবলী বিশ্লেষণ থেকে দেখা যায় যে, খামার পরিচালনায় নারী পুরুষ (বালক/বালিকা) সকলের অংশগ্রহণ থাকলেও খামারটি পরিচালনায় নারীর ভূমিকা অত্যন্ত নগণ্য হয়। স্থায়িত্বশীল কৃষিতে নারী-পুরুষের অংশগ্রহণ সমান বা ক্ষেত্রবিশেষে বেশি। কাজেই, নারীর কাজের যথাযথ মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি দান অত্যন্ত জরুরী।
প্রশিক্ষণের প্রয়োজনীয়তা
স্থায়িত্বশীল কৃষিতে নারীদের অংশগ্রহণ শ্রম-ঘন্টা হিসেবে অনেক বেশি ইতিমধ্যে তা জানা গেছে। কৃষিতে নারীর এরূপ অংশগ্রহণকে আরও দক্ষভাবে ব্যবহার করতে হলে প্রয়োজন সঠিকভাবে এর কলাকৌশল সর্ম্পকে জানা। এ লক্ষ্য অর্জনে প্রয়োজন প্রশিক্ষণ। কৃষক নারী তার দীর্ঘদিনের প্রচলিত জ্ঞান অনুযায়ী বীজ সংরক্ষণ করেছে তার মূল্যায়ন দরকার তবে সেই সাথে প্রয়োজন আধুনিক কলাকৌশল সম্পর্কে তাকে অবহিত করা। এজন্য পুরুষের পাশাপাশি নারী প্রশিক্ষণের বিষয়টিকেও অধিক গুরুত্ব দিতে হবে।
সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারীর অংশগ্রহণের প্রয়োজনীয়তা
স্থায়িত্বশীল কৃষিতে নারীর অংশগ্রহণকে আরও কার্যকর করতে হলে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার কোন বিকল্প নেই। কিন্তু বাস্তবক্ষেত্রে দেখা যায়, পরিবার পরিচালনা, ফসল নির্বাচন, গৃহস্থালীর জন্য প্রয়োজনীয় ক্রয়-বিক্রয়, সন্তান ধারণ ইত্যাদি সিদ্ধান্তগুলো গ্রহণ করার ক্ষেত্রে পুরুষের একক আধিপত্য বজায় থাকে। ফলে, সিদ্ধান্তগ্রহণ প্রক্রিয়ায় নারীর অংশীদারিত্ব না থাকায় একজন নারী যতখানি ভালো ফলাফল দিতে পারতো তা দিতে পারে না।
সম্পদের উপর নারীর নিয়ন্ত্রণ
সম্পদের উপর নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে ভিন্নতার কারণে মানুষের সেই সম্পদ ব্যবহার করার ইচ্ছা, শক্তি ও মানসিকতাতেও ভিন্নতা আসে। যেমনঃ একজন বর্গাচাষী বর্গাকৃত জমিতে গোবর বা জৈব সার ব্যবহার, চারিদিকে স্থায়ি গাছ লাগানো ইত্যাদির মতো জমির দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থাপনায় কখনও উৎসাহিত হবে না। কারণ, এক্ষেত্রে দীর্ঘদিন জমি তার অধিকারে থাকবে এমন কোন নিশ্চয়তা নেই। তাই সে চাইবে যত অল্প সময়ে জমি থেকে যতবেশি লাভ তুলে নেওয়া যায়। ফলে, বর্গাকৃত জমিতে অধিক রাসায়নিক সার, বালাইনাশক প্রভৃতি ব্যবহার হয়ে থাকে যা দীর্ঘমেয়াদে জমির উপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে।
কৃষিতে নারী শ্রম দেয় কিন্তু জমি ও উৎপন্ন ফসলের উপর তার নিয়ন্ত্রণ থাকে না। অন্যদিকে, বাজারে নারীর প্রবেশাধিকার না থাকায় উৎপাদিত ফসল বিক্রিত অর্থের উপরও তার কোন নিয়ন্ত্রণ থাকেনা। উৎপাদিত ফসলের উপর নারীর অধিকার ও নিয়ন্ত্রণ না থাকায় সমস্ত মন, মেধা ও শ্রম দিয়ে উৎপাদন করার ক্ষেত্রে তার উৎসাহ অনেক সময় কমে যায়। এরূপ উৎসাহ কমে যাওয়ায় সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্থ হয় কৃষি। কৃষি থেকে অধিক উৎপাদন পেতে হলে পুরুষের পাশাপাশি নারীকেও সম্পদের নিয়ন্ত্রণ ও অধিকার দিতে হবে। সম্পদের নিয়ন্ত্রণে সমতা এলে নারীর সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতাও বৃদ্ধি পায় যা কৃষির জন্য প্রয়োজনীয়। সমাজের অর্থনৈতিক কাঠামোর তিনটি স্তরের সম্পদ নিয়ন্ত্রণ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া বিশ্লেষণ করলে সম্পদের উপর নারীর নিয়ন্ত্রণের একটি চিত্র পাওয়া যাবে। নিম্নের ছকে বিষয়টি উপস্থাপন করা হল।
চাষী পরিবার | উৎপাদন কাজে শ্রমদান | সম্পদের উপর নিয়ন্ত্রণ | সিদ্ধান্ত গ্রহণ ক্ষমতা |
বড় চাষী | দেয়না | নেই | নেই |
মাঝারী চাষী | দেয় | নেই | সামান্য |
ক্ষুদ্র চাষী/দিনমজুর | দেয় | সামান্য | মোটামুটি |
সুতরাং দেখা যাচ্ছে যে, বড় চাষী পরিবারে নারীরা সাধারণতঃ উৎপাদন কাজে শ্রম দেয়না এবং তাদের সম্পদের উপর নিয়ন্ত্রণ নেই তাই সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতাও নেই। মাঝারী চাষী পরিবারে নারীরা সাধারণতঃ উৎপাদন কাজে শ্রম দেয় কিন্তু সম্পদের উপর নিয়ন্ত্রণ নেই তাই সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতাও সামান্য। পক্ষান্তরে, ক্ষুদ্র চাষী/দিনমজুর পরিবারে নারীরা সাধারণতঃ উৎপাদন কাজে শ্রম দেয় এবং তাদের সম্পদের উপর সামান্য হলেও নিয়ন্ত্রণ থাকে তাই সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতাও মোটামুটি থাকে।
তাই স্থায়িত্বশীল কৃষি ব্যবস্থায় নারীর অংশগ্রহণকে অধিক কার্যকর করতে হলে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ক্ষমতা ও সম্পদের উপর নিয়ন্ত্রণ নারীকে দিতে হবে। এজন্য প্রয়োজন-
ক. বনায়ন, নার্সারী প্রতিষ্ঠা, হাঁস-মুরগী পালন, গরু-ছাগল পালন ইত্যাদি আয়বর্ধক ক্ষুদ্র উদ্যোগগুলোতে নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধি করা;
খ. নারীদের উৎপাদিত দ্রব্য বাজারজাতকরণের সুযোগ সৃষ্টির লক্ষ্যে বাজারে নারীর প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা;
গ. পুরুষকে নারীর কাজের প্রতি সহানুভূতিশীল ও অংশীদার হতে উদ্বুদ্ধ করা;
ঘ. বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক পদে নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধিতে সহায়তা করা;
ঙ. স্থায়িত্বশীল কৃষিতে নারীর দক্ষতা বৃদ্ধিতে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা;
চ. নারীর দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতাকে স্বীকৃতি দেওয়া এবং অভিজ্ঞতা বিনিময় করা।