বীজ কেবল ফসল চাষের একটি উপকরণই নয় বরং তা সমগ্র কৃষি ব্যবস্থা এবং কৃষক জনগোষ্ঠীর জীবনাচার, সংস্কৃতি ও কৃষ্টিসহ সমগ্র জীবন ব্যবস্থার সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। কাজেই, বীজের উপর নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নটি এ দেশের কৃষক এবং হাজার বছরের ঐতিহ্যবাহী স্বনির্ভর কৃষি ব্যবস্থার অস্তিত্বের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কৃষিপ্রধান এ দেশের বীজের বিশাল বাজার দখলের মাধ্যমে গোটা কৃষি ব্যবস্থার উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার সুদুরপ্রসারী লক্ষ্য নিয়ে বহুজাতিক কোম্পানিগুলো প্রবর্তন করছে তাদের প্যাটেন্ট করা হাইব্রিড ও জেনিটিক্যালি মডিফাইড (জিএম) বীজ।

বিশ্বের ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার জন্য খাদ্য উৎপাদন বাড়ানোর কথা বলে আজ বহু কোম্পানি হাইব্রিড ও জিএম বীজ বাজারজাত করছে। হাইব্রিড, জিএম ও টার্মিনেটর বীজ (টার্মিনেটর প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরিকৃত বন্ধ্যা বীজ) বর্তমান বিশ্বের বিশেষ করে তৃতীয় বিশ্বের কৃষিতে এক দানবীয় রূপে আর্বিভূত হয়েছে। সারা বিশ্বের কৃষি ও খাদ্য নিয়ে একচেটিয়া ব্যবসা করা ও কাড়ি কাড়ি মুনাফা লুটার ফন্দি এটেছে বহুজাতিক কোম্পানিগুলো। এসব বীজ বাজারে ছাড়ার পেছনে কোম্পানির মূল লক্ষ্য হল কৃষকের নিজস্ব বীজগুলোকে সরিয়ে দিয়ে তাদের বীজের একচেটিয়া ব্যবসা প্রতিষ্ঠা করা। এক্ষেত্রে তৃতীয় বিশ্বের কৃষিপ্রধান দেশগুলোর দিকে কোম্পানিগুলোর নজর পড়েছে। কারণ, প্রযুক্তির দিক থেকে দূর্বল এসব দেশগুলোই হতে পারে তাদের একচেটিয়া ব্যবসার অবাধ ক্ষেত্র।

যতই খাদ্য নিরাপত্তার বুলি আওড়ানো হউক না কেন, কোম্পানির মূল লক্ষ্য নিশ্চয় মুনাফা অর্জন। আর কোম্পানির মুনাফা অর্জনের পথ তখনই নিরঙ্কুশ হবে যখন কৃষক প্রতি বছর সে কোম্পানির বীজ কিনবে। কোম্পানি যদি এমন বীজ বাজারে ছাড়ে যে বীজ থেকে কৃষক নিজে বীজ উৎপাদন ও সংরক্ষণ করে পরের বছর চাষ করতে পারবে সেরকম বীজ দিয়ে কোম্পানির মুনাফা অর্জনের পথ নিরঙ্কুশ হবে না। কারণ, ঐতিহ্যগতভাবেই এ দেশের কৃষক পরস্পরের মধ্যে বীজের আদান-প্রদান করে থাকে। ধরা যাক, একটা গ্রামে একজন কৃষক কোম্পানির কোন একটি জাতের বীজ বাজার থেকে কিনে এনে চাষ করল। এখন ধরা যাক, সেই কৃষকের কাছ থেকে বীজ নিয়ে পরের বছর আরও ১০ জন কৃষক ঐ জাতটি চাষ করল। তার পরের বার সেই ১০ জন থেকে আরও ১০০ জন কৃষক ঐ বীজ নিয়ে চাষ করবে। এভাবে পর্যায়ক্রমে কৃষকদের মাধ্যমে সারা গ্রামেই সে বীজ ছড়িয়ে পড়বে। কোম্পানির কাছ থেকে প্রতিবছর কৃষক আর বীজ কিনবে না। ফলে, কোম্পানির বীজ ব্যবসাও আর জমবে না।

তাই কোম্পানির ব্যবসা নিরঙ্কুশ করতে হলে এমন বীজ কৃষককে দিতে হবে যে বীজ থেকে কৃষক নিজে বীজ উৎপাদন করে পরের বছর চাষ করতে পারবে না। প্রতিবছর কোম্পানির কাছ থেকে বীজ কিনতে বাধ্য হবে। ঠিক এমন বীজই হল হাইব্রিড ও জিএম (টার্মিনেটর প্রযুক্তি ব্যবহার করে উৎপাদিত) বীজ। এই টার্মিনেটর প্রযুক্তি সম্পর্কে পূর্বেই ট্রিপস চুক্তি চ্যাপ্টারে আলোচিত হয়েছে।

একসময় এ দেশের মাঠে মাঠে চাষ হতো প্রায় ১২,৫০০ জাতের ধান, আজ সেগুলো বিলুপ্ত প্রায়। আজ যদি আমাদের কৃষকরা হাইব্রিড ও জিএম জাতের চাষ শুরু করে তবে বর্তমানে যে জাতগুলো আছে (যেগুলোর বীজ কৃষক নিজে উৎপাদন ও সংরক্ষণ করতে পারে) সেগুলো হারিয়ে যাবে। তখন কৃষক বীজের জন্য সম্পূর্ণরূপে কোম্পানির নিকট জিম্মি হয়ে পড়বে। আর তখন বীজ সংকট বর্তমানের চেয়ে আরও মারাতœক আকার ধারণ করবে। রাসায়নিক সার, বালাইনাশক, ডিজেল ইত্যাদি উপকরণগুলোর সংকট সৃষ্টি হলে ফলন কম হলেও বিকল্প উপায়ে ফসল ফলানো সম্ভব হতে পারে কিন্তু বীজ ছাড়া তা কোনভাবেই সম্ভব হবে না। অন্যদিকে, বর্তমানে কৃষিতে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি দিন দিন বাড়ছে। এসব ঝুঁকি মোকাবিলায় প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্ট জাতগুলোর গুরুত্ব আজ নতুনভাবে অনুভ‚ত হচ্ছে। কাজেই কোন নতুন জাত প্রবর্তনের ক্ষেত্রে আমাদের নিজস্ব ফসল বৈচিত্র্য তথা জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের বিষয়টি সর্বাধিক গুরুত্ব পাওয়া উচিত। পাশাপাশি বীজ যাতে সম্পূর্ণভাবে কৃষকের হাতছাড়া না হয়ে যায় সে বিষয়টি নিশ্চিত করাও অপরিহার্য।

কিন্তু অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয় এই যে, বাংলাদেশসহ তৃতীয় বিশ্বের দরিদ্র কৃষকেরা তাদের বীজের জন্য ক্রমেই কোম্পানির উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে এবং নিজেদের হাতের বীজ হারিয়ে জিম্মি হয়ে পড়ছে কোম্পানির হাতে। বাংলাদেশের কৃষকেরা এখনই মারাত্মক বীজ সংকটের সন্মুখীন। ২০০৫ সালের পাট বীজের মারাত্মক সংকট এর জলন্ত উদাহরণ। পাট বীজ উৎপাদন একটু সময়সাপেক্ষ ও ঝামেলাপূর্ণ হওয়ায় এবং মোটামুটি সুবিধাজনক দামে বাজারে উচ্চ ফলনশীল জাতের পাট বীজ পাওয়ায় কৃষকরা পাট বীজ উৎপাদন প্রায় ছেড়েই দিয়েছে। কাজেই কৃষকের হাতে এখন আর কোন পাট বীজ নেই এবং তারা বীজের জন্য পুরোপুরি বাজরের উপর নির্ভরশীল। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে ২০০৫ সালে ব্যবসায়ী মহল পাট বীজের কৃত্রিম সংকট কৃষ্টি করে। ফলে, আগের বছর যে বীজের দাম ছিল প্রতি কেজি মাত্র ৩০-৩৫ টাকা, ২০০৫ সালে তা প্রতি কেজি ৭০০-৮০০ টাকা পর্যন্ত দামে বিক্রি করে এবং কৃষককে বাধ্য হয়ে এ দাম দিয়েই বীজ কিনতে হয়। অনেক কৃষক বীজ কিনতে না পেরে ঐ বছর পাট চাষ বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়। গত ২০০৯ সালের বোরো মৌসুমে ব্যবসায়িরা কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে ৩০০ টাকার ধান বীজ ৬০০-৭০০ টাকায় বিক্রী করেছে। বীজের ক্ষেত্রে এ ধরণের ঘটনা সারাদেশে প্রতিনিয়তই ঘটছে। এ দেশের দরিদ্র কৃষকদের জন্য এটি একটি ভয়াবহ সংকট যা তাদের খাদ্য নিরাপত্তা ও জীবিকার নিরাপত্তার জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দেখা দিয়েছে।

কাজেই এ দেশের দরিদ্র কৃষকদেরকে কৃষিতে টিকে থাকতে হলে বীজের নিয়ন্ত্রণ থাকতে হবে কৃষকেরই হাতে। বীজ কৃষকের অধিকার যা কৃষকের হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে। এ অধিকার সংরক্ষণে এগিয়ে আসতে হবে কৃষকদেরকেই। এ ব্যাপারে সরকারের উপর সর্বাত্মক চাপ সৃষ্টি করতে হবে যাতে সরকারি নীতি কৃষকের এই অধিকারকে সংরক্ষণ করে। হাইব্রিড ও জিএম বীজ কৃষকের বীজ অধিকারের সম্পূর্ণ পরিপন্থী। নিন্মে হাইব্রিড ও জিএম বীজ সম্পর্কে আলোচিত হল।

হাইব্রিড বীজ

দুটি ভিন্ন জাতের উদ্ভিদের মধ্যে কৃত্রিম মিলন ঘটিয়ে নতুন জাত সৃষ্টি করার পদ্ধতিকে বলে শংকরায়ন বা হাইব্রিডাইজেশন। এরূপ শংকরায়নের মাধ্যমেই উচ্চফলনশীল (উফশী) ও হাইব্রিড জাত তৈরি করা হয়। দুটি ভিন্ন প্রজাতির উদ্ভিদের মধ্যে শংকরায়নের ফলে প্রথম যে বংশধর সৃষ্টি হয় তাকে হাইব্রিড বলা হয়। ধরা যাক, জাত-১ ও জাত-২-এর মধ্যে শংকরায়নের ফলে প্রথম বংশধর ফিলিয়াল-১ (এফ-১) পাওয়া গেল। এখন যদি এই এফ-১ এর বৈশিষ্ট্য বা ফলন জাত-১ ও জাত-২ থেকে উৎকৃষ্টতর হয় তবে তাকে হাইব্রিড জাত হিসেবে বাজারে ছাড়া হয়। এরূপ শংকরায়নের ফলে যে নতুন জাতের (হাইব্রিড) সৃষ্টি হয় তার বৈশিষ্ট্যগুলো হয় সম্পূর্ণ অস্থায়ী। কারণ, এই জাতের অর্ধেক বৈশিষ্ট্য আসে মাতৃজাত থেকে আর বাকি অর্ধেক আসে পিতৃজাত থেকে। এসব বৈশিষ্ট্যের মধ্যে যেগুলো প্রকট শুধু সেগুলোই প্রথম বংশধরের (হাইব্রিড) মধ্যে প্রকাশ পায়। বাকি বৈশিষ্ট্যগুলো প্রথম বংশধরের মধ্যে প্রচ্ছন্নভাবে থেকে যায় অর্থাৎ সেগুলো প্রকাশ পায় না। কিন্তু পরবর্তী বংশধরগুলোতে সেসব প্রচ্ছন্ন বৈশিষ্ট্যগুলো আবার প্রকাশ পায়। এই এফ-১কে নিজেদের মধ্যে শংকরায়ন (সেল্ফ ক্রসিং) করা হলে দ্বিতীয় বংশধর এফ-২ পাওয়া যাবে। একইভাবে সেল্ফ ক্রসিং-এর মাধ্যমে এফ-৩, এফ-৪ ইত্যাদি অসংখ্য বংশধর পাওয়া যাবে। এভাবে সেল্ফ ক্রসিং-এর মাধ্যমে প্রতিবার যে বংশধর পাওয়া যাবে তা থেকে যদি কাংখিত বৈশিষ্ট্যের গাছগুলোকে বাছাই করে তাদের মধ্যে সেল্ফ ক্রসিং করা হয় তবে সাধারণত ৭/৮ বংশধরের মধ্যে স্থায়ী কাংখিত বৈশিষ্ট্যের গাছ পাওয়া যায়। এভাবেই উচ্চফলনশীল বা উফশী জাত তৈরি করা হয় যেগুলোকে কম্পোজিট জাত বলা হয়। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটসহ দেশের বিভিন্ন কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ধানসহ বিভিন্ন ফসলের অনেকগুলো উচ্চফলনশীল বা উফশী জাত আবিষ্কার করেছে এবং কৃষকদের কাছে দিয়েছে। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট বিআর-১০, বিআর-১১, ব্রিধান-২৮, ব্রিধান-৩৩, ব্রিধান-৩৯ ইত্যাদি নামে এযাবৎ ৪৬টি উফশী ধানের জাত কৃষকদের মাঝে দিয়েছে। এই জাতগুলো নিয়ে তেমন-কোন বিতর্ক নেই। কারণ, এই জাতগুলো প্রথম পর্যায়ে গবেষণা প্রতিষ্ঠানের মাঠে ৮-১০ বছর ধরে চাষ করে তার ফলাফল দেখা হয় এবং পরবর্তী পর্যায়ে বাংলাদেশের বিভিন্ন কৃষি পরিবেশ অঞ্চলে চাষ করে এ দেশের মাটি, পরিবেশ ও ইকোসিস্টেমের উপর এর প্রভাব পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখা হয়। সর্বোপরি বৈশিষ্ট্যগুলো স্থায়ী হওয়ার ফলে এসব বীজ থেকে কৃষক নিজে উৎপাদন ও সংরক্ষণ করতে পারে এবং পরের বছর চাষ করতে পারে।

কিন্তু হাইব্রিড জাত নিয়ে  নানা বিতর্ক প্রচলিত আছে। হাইব্রিড নিয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে বিতর্কটি রয়েছে তা হল উফশী জাতের মত বাংলাদেশের মাটি, পরিবেশ ও ইকোসিস্টেমের উপর এর প্রভাব পরীক্ষা-নিরীক্ষা না করেই সরাসরি বিদেশ থেকে আমদানি করে এনে চাষের জন্য কৃষকের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে। হাইব্রিড নিয়ে অপর যে গুরুত্বপূর্ণ বিতর্কটি রয়েছে তা হল হাইব্রিড বীজ কৃষক নিজে উৎপাদন ও সংরক্ষণ করতে পারেনা। কারণ, শংকরায়নের ফলে যে নতুন জাতের (হাইব্রিড) সৃষ্টি হয় তার বৈশিষ্ট্যগুলো সম্পূর্ণ অস্থায়ী হয়ে থাকে। ধরা যাক জাত-১ এর ফলন একরে ৭০ মন আর জাত-২ এর ফলন একরে ৮০ মন। এই দুটি জাতের মধ্যে শংকরায়ন করার ফলে প্রথম যে বংশধর হল (হাইব্রিড) তার ফলন হল একরে ১০০ মন। এখন এই ধান থেকে বীজ রেখে যদি পরের বছর চাষ করা হয় তবে তা হবে দ্বিতীয় বংশধর। এই দ্বিতীয় বংশধরে গিয়ে প্রথম বংশধরের মধ্যে থাকা প্রচ্ছন্ন বৈশিষ্ট্যগুলো প্রকাশ পায়। যার ফলে পরের বছর এই জাত কতটা ফলন দিবে তা নিশ্চিভাবে বলা সম্ভব নয়। তবে ফলন যে কমবে এটা মোটামুটি নিশ্চিতভাবেই বলা যায়। কারণ, দ্বিতীয় বংশধরের বীজ চাষ করলে তা থেকে নানান বৈশিষ্ট্যের গাছ হয়। তাই হাইব্রিড জাতের ধান থেকে বীজ রেখে পরের বছর চাষ করা যায়না। প্রতিবার মাতৃজাত ও পিতৃজাত -এর মধ্যে শংকরায়ন করে প্রথম বংশধর (হাইব্রিড) বীজ তৈরি করে বাজারজাত করা হয়। এরূপ শংকরায়ন কৃষকের পক্ষে করা সম্ভব হয় না বিধায় কৃষক এই বীজ তৈরি করতে পারে না।

উল্লেখ্য যে, সব এফ-১ হাইব্রিডকেই হাইব্রিড জাত হিসেবে বাজারে ছাড়া হয় না। সেই এফ-১ হাইব্রিডকেই হাইব্রিড জাত হিসেবে বাজারে ছাড়া হয় যার ফলন ও অন্যান্য বৈশিষ্ট্য মাতৃ বা পিতৃজাত থেকে উৎকৃষ্টতর। তা ছাড়া, যেকোন দুটি জাতের মধ্যে শংকরায়ন করলেই হাইব্রিড জাত পাওয়া যায় না। এরূপ হাইব্রিড জাত বহুবার বহু জাতের মধ্যে শংকরায়ন করতে করতে হঠাৎ হঠাৎ পাওয়া যায়। কাজেই যে দুটো জাতের মধ্যে শংকরায়ন ঘটিয়ে হাইব্রিড জাত পাওয়া যায় প্রতিবার সে দুটো জাত থেকেই হাইব্রিড বীজ উৎপাদন করতে হবে। ফলে, এই মাতৃজাত ও পিতৃজাত যার কাছে থাকবে (যা সব সময় গোপন রাখা হয়) কেবল সেই এই বীজ উৎপাদন করতে পারবে এবং প্রতিবার তার কাছ থেকেই বীজ নিতে হবে। আমাদের দেশে যেসব হাইব্রিড জাত আসছে তার প্রায় সবই আসে চীন ও ভারত থেকে। যেসব চীনা ও ভারতীয় কোম্পানি এই বীজ এ দেশে বিক্রী করে তারা কখনই মাতৃজাত ও পিতৃজাত আমাদেরকে দেয়না বা কোনদিন দিবেওনা। ফলে, আমাদের বীজের জন্য চিরদিন চীন বা ভারতের উপর নির্ভরশীল থাকতে হবে। স¤প্রতি পত্রপত্রিকায় একটি সংবাদ প্রকাশিত হয়েছিল যাতে বলা হয়েছিল যে, চীন সরকার বাংলাদেশে হাইব্রিড বীজ বিক্রী বন্ধ করে দেওয়ার চিন্তাভাবনা করছে। এটি নিঃসন্দেহে একটি রাজনৈতিক চাল।

কাজেই বিদেশী হাইব্রিড বীজ ব্যবহারের সাথে এক মারাতœক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকট নিহিত রয়েছে। ধরা যাক, বাংলাদেশে ব্যাপকভাবে হাইব্রিড ধান চাষ করা শুরু হল এবং বাংলাদেশ বীজের জন্য চীনের উপর পুরোপুরি নির্ভরশীল হয়ে পড়ল। পক্ষান্তরে, ব্যাপকভাবে হাইব্রিড চাষ করার ফলে কৃষকের হাতেও কোন বীজ রইলনা। এমতাবস্থায়, যদি রাজনৈতিক কারণে চীনের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্কের অবনতি ঘটে এবং চীন যদি হাইব্রিড বীজ সরবরাহ বন্ধ করে দেয় তবে দেশে ধান চাষ বন্ধ হওয়ার উপক্রম হবে। ফলে, বাংলাদেশের কৃষি উৎপাদন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং সর্বোপরি খাদ্য নিরাপত্তা মারাতœক সংকটের মধ্যে পড়বে। অন্যদিকে, বাংলাদেশের এরূপ নাজুক ও সংবেদনশীল অবস্থার সুযোগ নিয়ে চীন নানা রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সুবিধা আদায় করে নিতে সক্ষম হবে যেমনটি বর্তমানে করছে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ আমাদের ঋণ নির্ভরশীলতার সুযোগকে কাজে লাগিয়ে।

বাংলাদেশের কৃষি মন্ত্রণালয়ের জাতীয় বীজ অনুমোদন কমিটি ১৯৯৮ সালে প্রথম যে হাইব্রিড জাত আমদানির অনুমতি দেয় তার নাম আলোক-৬২০১। ১৯৯৮ সালের ২০ নভেম্বর দেশের বিশিষ্ট কৃষি বিজ্ঞানী, শস্য ও উদ্ভিদ রোগতত্ব বিশেষজ্ঞ, রাজনীতিবিদ ও শিক্ষাবিদরা এক সেমিনারে হাইব্রিড বীজ সম্বন্ধে তাদের মতামত ব্যক্ত করেন। তারা বাংলাদেশে হাইব্রিড ধানের বীজ আমদানির কুফল সম্পর্কে বলেন যে, বিনা পরীক্ষায় বিদেশ থেকে হাইব্রিড ধানের বীজ আমদানি বাংলাদেশের জন্য একটি মারাত্মক আত্মঘাতি পদক্ষেপ হবে। এর মাধ্যমে এ দেশের ঐতিহ্যবাহী কৃষি ও কৃষককে চিরস্থায়িভাবে পঙ্গু করে ফেলা হবে। তারা আরও বলেন যে, হাইব্রিড আমদানির ফলে দেশের কৃষিক্ষেত্রে নতুন নতুন পোকামাকড় ও রোগ-বালাইয়ের আর্বিভাব ঘটবে যা আমাদের কৃষিকে আরও বিপদগ্রস্ত করে তুলবে। পক্ষান্তরে, বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর বালাইনাশক ব্যবসার হবে পোয়াবারো। কৃষি বিশেষজ্ঞ এবং কৃষি বিজ্ঞানীদের এসব আপত্তি উপেক্ষা করেই তখন হাইব্রিড জাত আমদানির অনুমতি দেওয়া হয়। অবশ্য তখন কোম্পানিগুলোকে শর্ত দেওয়া হয়েছিল যে, পরবর্তী তিন বছরের মধ্যে দেশেই এই বীজ উৎপাদন করতে হবে যা অদ্যাবধিও কোন কোম্পানি পূরণ করে নি। অথচ তারা দিব্যি বিদেশ থেকে বীজ আমদানি ও ব্যবসা করে যাচ্ছে।

পক্ষান্তরে, হাইব্রিড ধান একটি অতিমাত্রায় প্রযুক্তিনির্ভর সংবেদনশীল ধান। হাইব্রিড জাতের ধান চাষ আমাদের মাটি, পরিবেশ, প্রাণবৈচিত্র্য, কৃষকের আর্থ-সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অবস্থা ইত্যাদি কোন দিক থেকেই মানানসই নয়। অধিক সংবেদনশীল হওয়ার কারণে এসব জাতে পোকামাকড় ও রোগবালাইয়ের আক্রমণ হয় ব্যাপকভাবে। কৃষকরা হাইব্রিড জাত চাষ করলেই ভাল ফলন পাবে তার কোন নিশ্চয়তা নেই। হাইব্রিড জাতে যতেœর সামান্য ত্র“টি হলেই ফলন মারাত্মকভাবে হ্রাস পায়। সঠিক সময় ও সঠিক পরিমাণে সার প্রয়োগ, দফায় দফায় বালাইনাশক প্রয়োগ, পর্যাপ্ত সেচ দেওয়া, নিয়মিত আগাছা পরিষ্কার করা ইত্যাদি সকল কাজগুলো যথাযথভাবে করতে না পারলে ফলন কমে যায়। ধরা যাক, একটা হাইব্রিড ধানের জমিতে আজকে সার প্রয়োগ করা দরকার কিন্তু কৃষকের আর্থিক সংকট বা বাজারে সারের সংকটের (যা আমাদের কৃষকদের জন্য নিত্যদিনের ঘটনা) কারণে সার দিতে যদি কিছুদিন দেরি হয় তা হলে আর আশানুরূপ ফলন পাওয়া সম্ভব হবে না।

বাংলাদেশে প্রথম প্রবর্তিত হাইব্রিড আলোক ৬২০১ জাতটি নিয়ে তখন ব্যাপক প্রচার-প্রোপাগান্ডা চালানো হয় যে অতি উচ্চ ফলনের এই ধান চাষ করলে দেশের খাদ্য স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন হবে সময়ের ব্যাপারমাত্র। আজ এটা প্রমাণিত যে, ব্র্যাক ও আইসিআই-এর মাধ্যমে বাজারজাতকৃত প্রথম হাইব্রিড জাত আলোক ৬২০১ ধানের উচ্চ ফলনের দাবি ছিল নিতান্তই মিথ্যা। বহু কৃষক আলোক ৬২০১ ব্যবহার করে প্রতারিত হয়েছেন, সর্বশান্ত হয়েছেন। সারা দেশে এরকম অনেক উদাহরণ আছে। অথচ ৩০-৩৫ টাকা কেজি দরে আমদানি করা এই বীজ তখন কৃষকের কাছে ২০০-২৫০ টাকা দরে বিক্রী করে প্রচুর মুনাফা হাতিয়ে নিয়েছে এই কোম্পানিগুলো। ব্র্যাকসহ কোম্পানিরা হাইব্রিড ধানের পক্ষে একটি যুক্তি বারবার তুলে ধরেন যে হাইব্রিড বীজ যদি খারাপই হবে তবে কেন কৃষকরা নেয়? আপাতদৃষ্টিতে যুক্তিটা প্রণিধানযোগ্য মনে হলেও বাস্তবতা এই যে, ব্র্যাক যখন তার সদস্যদের ঋণ দেয় তখন ঋণের টাকা দিয়ে হাইব্রিড বীজ নিতে বাধ্য করে। অন্যদিকে, কোম্পানিগুলো নানান প্রচার-প্রোপাগান্ডা ও কৌশলে কৃষকদেরকে হাইব্রিড বীজ গ্রহণ করতে প্ররোচিত করে থাকে। অনেকসময় কোম্পানির প্রতিনিধিরা মিথ্যা তথ্য দিয়ে কৃষকদেরকে বিভ্রান্ত করে হাইব্রিড বীজ বিক্রি করে থাকে। ২০০৮ সালের বন্যা পরবর্তী পুনর্বাসন কর্মসূচির নামে সরকারও কোম্পানির হাইব্রিড বীজ কৃষকের হাতে তুলে দিয়েছিল। তবে একথা অনস্বীকার্য যে, অনেক কৃষক বিশেষ করে ধনী কৃষকরা হাইব্রিড ধান চাষ করে অনেকসময় ভাল ফলন পায়। কারণ তারা হাইব্রিড ধানের জন্য যে অতিরিক্ত খরচ ও পরিচর্যা প্রয়োজন তা ঠিকমতো করতে পারে। কোম্পানিও তাদেরকে প্রদর্শনীর জন্য নানান প্রনোদনা ও কারিগরি সহায়তা দিয়ে থাকে। ফলে, কিছুসংখ্যক কৃষক হাইব্রিড ধান চাষ করে ভাল ফলন পায়। তাই দেখে বাকি কৃষকরাও হাইব্রিড চাষে সহজে উদ্বুদ্ধ হয়। কিন্তু বাস্তবতা এই যে, সব কৃষকের জন্য বিশেষ করে দরিদ্র বা হতদরিদ্র কৃষকদের জন্য হাইব্রিড জাত মোটেও উপযোগি নয়।

আলোক ধানের পর বর্তমানে যেসব হাইব্রিড বীজ বাজারে আসছে সেগুলোর ফলাফলও খুব ভাল নয়। প্রথমবার খুব ভাল ফলন দিলেও সোনার বাংলা, জাগরণ, হীরা এগুলো যারা পরপর কয়েকবার চাষ করেছেন তাঁদের অনেকেই ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছেন। পত্রপত্রিকায় প্রতিনিয়ত কৃষকের প্রতারিত ও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার এসব খবর প্রকাশিত হচ্ছে। অন্যদিকে বাস্তবতা এই যে, আমাদের দেশের কৃষকরা শুধু বাড়তি ফলনটাই বিবেচনায় নেয়। উৎপাদন ব্যয়ের বিবেচনায় লাভ-ক্ষতির সঠিক হিসেব তাঁরা করে না। মাটির উর্বরতা, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের উপর ক্ষতিকর প্রভাবগুলোকেতো আমলেই নেয় না। অন্যদিকে, কোম্পানিগুলো তাদের বীজ বিক্রির কৌশল হিসেবে ব্যাপক প্রচারণার পাশাপাশি কৃষকদের নানাবিধ সুযোগ-সুবিধা দিয়ে থাকে। কোম্পানিগুলো মাঠ পর্যায়ে যেসব প্রদর্শনী প্লট স্থাপন করে সেখানে সার্বক্ষণিক কারিগরি সহায়তার পাশাপাশি বিনামূল্যে সার, সেচ, বালাইনাশকসহ বিভিন্ন উপকরণ ও আর্থিক সহায়তা প্রদান করে থাকে। কাজেই এসব প্রদর্শনী প্লটে কৃষকের মাঠে চাষকৃত অন্যান্য জাতের তুলনায় বেশি ফলন পাওয়া যায়। ফলে, অধিক ফলনের আশায় কৃষক হাইব্রিড ধানের প্রতি সহজেই আকৃষ্ট হয়।

হাইব্রিড বীজের সমস্যাসমূহ

মাঠ পর্যায়ে কৃষকদের অভিজ্ঞতা থেকে হাইব্রিড বীজের বা জাতের যেসব সমস্যার কথা জানা যায় এবং যেসব কারণে হাইব্রিড বীজ/জাত বিতর্কিত সেগুলো নিন্মে তুলে ধরা হলঃ

১.   হাইব্রিড বীজ উৎপাদন প্রক্রিয়া অত্যন্ত জটিল বিধায় কৃষকরা ব্যক্তিগতভাবে এই বীজ উৎপাদন করতে পারে না;

২.   বীজ উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় মাতৃজাতগুলো প্রতিবছর কোম্পানির কাছ থেকে কিনতে হয়। ফলে, বীজের উপর কোম্পানির একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ বজায় থাকে;

৩.   কৃষকরা এই বীজ থেকে বীজ রেখে পরের বছর চাষ করতে পারে না। তাই প্রতিবছর বীজ কিনতে হয় ফলে কৃষকরা বীজের জন্য কোম্পানির উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে;

৪.   হাইব্রিড বীজের বৈশিষ্ট্যগুলো খুবই অস্থায়ী হয়ে থাকে। তাই ফলন সম্পর্কে নিশ্চিতভাবে কিছু বলা যায় না।

৫.   পোকামাকড় ও রোগবালাইয়ের আক্রমণ হাইব্রিড জাতে অত্যধিক বেশি।

৬.   বীজের মূল্য অত্যন্ত বেশি যা গরীব কৃষকের ক্রয় ক্ষমতার বাইরে।

৭.   হাইব্রিড জাতে অধিক পরিমাণে রাসায়নিক সার ও বালাইনাশক লাগে। অনেক ক্ষেত্রে বালাইনাশক দিয়েও পোকা দমন করা যায় না।

৮.   বীজের ভেজাল হওয়ার সম্ভবনা বেশি থাকে তাই কৃষকরা প্রায়শঃই ক্ষতিগ্রস্থ হয়।

৯.   একই জমিতে প্রথমবার বেশি ফলন দিলেও দ্বিতীয়/তৃতীয় বছর থেকে ফলন কমতে থাকে।

১০.  হাইব্রিড ধানের ফসল উফশী ধানের তুলনায় ২০-৩০ শতাংশ বেশি দাবি করা হলেও এ বীজের মূল্য উফশী বীজের চেয়ে ১৫-২০ গুণ বেশি।

১১.  দেশীয় হাইব্রিড বীজের উদ্ভাবন না করে এ ধরনের বিদেশী বীজ আমদানি এবং বাণিজ্যিক চাষাবাদের উদ্যোগ কৃষিক্ষেত্রে বিপর্যয় ডেকে আনবে।

১২.  ধানের প্রচলিত অনেক হাইব্রিড জাতের গাছ খুবই নরম হয়। তাই একটু জোরে বৃষ্টি বা বাতাস হলে হেলে পড়ে। ফলে ব্যাপক ক্ষতি হয়।

১৩. ধানের প্রচলিত অনেক হাইব্রিড জাতে চিটার পরিমাণ অনেক ক্ষেত্রে ৫০ ভাগেরও বেশি এবং পাকা ধান ঝরে পড়ার হারও বেশি।

১৪.  অন্যান্য ধানের তুলনায় এসব ধানে রাসায়নিক সার, বালাইনাশক ও শ্রমিকসহ উৎপাদন খরচ অনেক বেশি।

১৫.  এসব ধানের জমিতে সব সময় পানি থাকতে হয়। অর্থাৎ সেচ বেশি লাগে এবং সেচ খরচও বেশি হয়।

১৬. এসব ধান কাঁচা অবস্থায় কেটে নিতে হয় কারণ নিচের ধান পাকতে পাকতে উপরের ধান ঝরতে শুরু করে।

১৭.  এসব ধানের ভাতের স্বাদ কম। অনেক জাতের ভাত খুব আঠালো হয় এবং ঠাণ্ডা হওয়ার পর তা প্লাস্টিকের মতো হয়ে যায়।

১৮. বাজারে এসব ধানের চাহিদা ও বাজার মূল্যও কম।

পরিশেষে উল্লেখ্য যে, এ দেশে হাইব্রিড ধান প্রবর্তিত হয়েছে ১৯৯৮ সালে তৎকালীন মাননীয় কৃষিমন্ত্রী বেগম মতিয়া চৌধুরীর হাত দিয়ে যিনি কৃষক-বান্ধব মন্ত্রী হিসেবে পরিচিত। উপরোক্ত আলোচনা থেকে এই প্রশ্ন উঠা স্বাভাবিক যে, হাইব্রিড জাতের যেহেতু এতসব ক্ষতিকর দিক রয়েছে তা হলে মতিয়া চৌধুরীর মতো এমন একজন ব্যক্তি কেন হাইব্রিড জাত প্রবর্তন করলেন? এর পশ্চাতে প্রধান যে যুক্তিটি খুঁজে পাওয়া যায় তা হল বাংলাদেশের জনসংখ্যা দ্রæতহারে বাড়ছে আর তেমনি দ্রæতহারে কমছে ফসলি জমি। এমতাবস্থায়, দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে একক পরিমান জমিতে ফলন বৃদ্ধির কোন বিকল্প পথ খোলা নেই। হাইব্রিড জাত যেহেতু প্রচলিত উফশী জাতগুলো থেকে অধিক ফলনশীল তাই হাইব্রিড জাত প্রবর্তন করা যুক্তিযুক্ত হয়েছে। যুক্তিটি অবশ্যই প্রণিধানযোগ্য কারণ বেশকিছু সমস্যা ও সীমাবদ্ধতা থাকা সত্তে¡ও প্রযুক্তি হিসেবে এটি প্রবর্তন করা যে একেবারেই অগ্রহণযোগ্য তা নয়। তবে, কোন বাছ-বিচার ছাড়াই ঢালাওভারে এবং যে প্রক্রিয়ায় বিদেশী হাইব্রিড জাত প্রবর্তন করা হচ্ছে তা কখনই দেশের গোটা কৃষি ব্যবস্থা, ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষক, মাটি, পরিবেশ এমনকি খাদ্য নিরাপত্তার জন্যও যে কল্যাণকর নয় তা ইতোপূর্বেই আলোচনা করা হয়েছে। আমাদের খাদ্যশস্যের (প্রধানত দানাদার) উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য যদি হাইব্রিড জাত প্রবর্তন করতেই হয় তবে আমাদের নিজস্ব হাইব্রিড জাত আবিষ্কার করা উচিত। যদি সঠিক পরিকল্পনা ও কর্মসূচি  হাতে নেওয়া হয় এবং পর্যাপ্ত বিনিয়োগ করা হয় তবে আমাদের গবেষণা প্রতিষ্ঠানসমূহের পক্ষে হাইব্রিড জাত আবিষ্কার করা মোটেও অসম্ভব নয়। তবে, ধানের হাইব্রিড জাত যেহেতু মাটি থেকে অধিক পুষ্টি উপাদান গ্রহণ করে, বেশি সেচ লাগে এবং অনেক বেশি সংবেদনশীল তাই সারাদেশে ঢালাওভাবে হাইব্রিড জাত ছড়িয়ে না দিয়ে তা কেবল নিচু ও একফসলী বোরো ধানের জমিতে সীমাবদ্ধ রাখা উচিত।

জিএম বীজ

জিএম বীজ কি তা বুঝতে হলে প্রথমে জিন এবং ডিএনএ সম্পর্কে ধারণা থাকা প্রয়োজন। নিম্নে এ দুটি বিষয় সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোচনা করা হল।

১. জিন (Gene)

জিন হল বংশগতির ধারক ও বাহক। এই পৃথিবীতে হাজারো রকমের জীব অথচ কোন জীবের সাথে অন্য কোন জীবের হুবহু মিল নেই। একেকটি জীবের বৈশিষ্ট্য একেক রকম। এমনকি শুধু মানুষের কথা ধরা হলেও দেখা যাবে যে, একই বাবা মার সন্তানদের বৈশিষ্ট্যের মধ্যেও হুবহু মিল খুঁজে পাওয়া যায় না। জীবের এরূপ বৈশিষ্ট্য নিয়ন্ত্রণ করে জিন। প্রত্যেক জীবের দেহে থাকে কোষ; কোষে থাকে নিউক্লিয়াস; নিউক্লিয়াসে থাকে ক্রমোসোম; আর ক্রমোসোমে থাকে এই জীন।

২. ডিএনএ (DNA)

ডিএনএ থাকে জিনের মধ্যে র্অথাৎ জিন গঠিত হয় ডিএনএ দ্বারা। জিনের মধ্যে যে ডিএনএ থাকে তার গঠনের উপরই জীবের বৈশিষ্ট্য নির্ভর করে। কাজেই ডিএনএ-এর গঠনের পরিবর্তন করা হলে জীবের গঠনেরও পরিবর্তন ঘটে।

আজকাল এক বিশেষ ধরণের প্রযুক্তি ব্যবহার করে ডিএনএ-এর গঠনের পরিবর্তন ঘটিয়ে উদ্ভিদ ও প্রাণীর নতুন নতুন জাত তৈরি করা হচ্ছে। এই প্রযুক্তির নাম জৈব প্রযুক্তি বা জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং। জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং-এর মাধ্যমে ডিএনএ তথা জিনের গঠন পরিবর্তন করে যেসব নতুন জীব তৈরি করা হয় তাদের বলা হয় জিএমও (GMO=Genetically Modified Organism) এবং এভাবে যে উদ্ভিদ তৈরি করা হয় তাকে বলা হয় জিএম উদ্ভিদ এবং এসব উদ্ভিদ থেকে যে বীজ হয় তাকে জিএম [Genetically Modified (GM)] বীজ বলা হয়। জিএম বীজ উৎপাদনের ক্ষেত্রে অন্য প্রজাতির উদ্ভিদ এমনকি প্রাণীর ডিএনএ-এর অংশ বিশেষ কেটে এনে এক জটিল প্রক্রিয়ায় কাংখিত উদ্ভিদের দেহে ঢুকিয়ে তার জিনের স্বাভাবিক গঠনকে রূপান্তরিত করে জিএম উদ্ভিদ বা ফসল তৈরি করা হয়।

বিশ্বব্যাপী জিএম বীজের বিতর্ক

নানা কারণে জিএম শস্য আজ বিশ্বব্যাপী বিতর্কিত। জিএম শস্যের স্বাস্থ্য ও পরিবেশগত ঝুঁকি এবং খাদ্য নিরাপত্তা ও দরিদ্র কৃষকের বীজ নিরাপত্তার প্রশ্নে সারাবিশ্বের পরিবেশবাদী বিজ্ঞানীসহ সর্বস্তরের সচেতন মানুষ এর বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছেন। পাশাপাশি কোন জীবের জীনের গঠন পরিবর্তন করার নৈতিক ভিত্তি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন কেউ কেউ। কারণ, জিনের গঠনই জীবের বৈশিষ্ট্য নিয়ন্ত্রণ করে থাকে অর্থাৎ জিনের গঠনের ভিন্নতার কারণেই একটি জীব বা কোন উদ্ভিদ বা প্রাণীর একটি জাত স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের অধিকারী হয়। কাজেই, জিনের গঠনগত পরিবর্তন সাধন করার ফলে জীবের আসল বৈশিষ্ট্যই আর অক্ষুন্ন থাকে না। তা ছাড়া, জীনের গঠনের এরূপ পরিবর্তনের ফলে নতুন যে জাত তৈরি হয় তা আর সেই প্রজাতি থাকবে কি-না তাই প্রশ্ন সাপেক্ষ।

অন্যদিকে, জিনের গঠনের এরূপ রূপান্তরের ফলে পরিবেশ দূষণের বড় ধরণের ঝুঁকি থেকে যায়। তা ছাড়া, টার্মিনেটর প্রযুক্তি ব্যবহার করে এসব বীজকে বন্ধ্যা করে দেওয়া হয় যাতে কৃষকরা এরূপ বীজ একবারের বেশি ব্যবহার করতে না পারে। কাজেই জিএম বীজ-এর ব্যবহার বিশ্বের বিশেষ করে আমাদের মতো দরিদ্র দেশের কৃষি ব্যবস্থায় চরম বিপর্যয় ডেকে আনবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এসব বীজ ব্যবহার করে কৃষকেরা আপাতদৃষ্টিতে কিছুটা লাভবান হলেও নানাভাবে তারা ক্ষতিগ্রস্থ হবে।

অন্যদিকে, ক্রমবর্ধমান জনগোষ্ঠীর খাদ্য যোগানোর জন্য জিএম শস্য প্রবর্তনের কথা বলা হলেও এ পর্যন্ত এমন কোন জিএম জাত আবিষ্কৃত হয় নি যা ফলন বাড়াতে পারে। ভবিষ্যতেও এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে কোন উচ্চ ফলনশীল জাত আবিষ্কার করা যাবে কি-না সন্দেহ কারণ কোন ফসলের ফলন একক কোন জিন নিয়ন্ত্রণ করেনা। জিএম প্রযুক্তি ব্যবহার করে শুধু জাতের কিছু গুণাগুণের পরিবর্তন করা হয়। যেমনঃ বর্তমানে বাংলাদেশে জিএম প্রযুক্তি ব্যবহার করে লবণাক্ততা প্রতিরোধী, রোগ ও পোকা প্রতিরোধী জাত আবিস্কারের চেষ্টা করা হচ্ছে। সাধারণ শংকরায়নের মাধ্যমেও এসব গুণাবলী পাওয়া সম্ভব।

জিএম শস্যের স্বাস্থ্য ঝুঁকি সম্পর্কে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ‘জাতীয় বিজ্ঞান একাডেমি’র এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে, জিএম খাদ্য থেকে অপ্রত্যাশিত এলার্জি ও বিষাক্ততা সৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। পাশাপাশি পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য ও মাটিস্থ অনুজীবের উপর জিএম ফসলের সুদুরপ্রসারী ক্ষতিকর প্রভাব পড়বে। ২০০৩ সালে বৃটেনে দেশব্যাপী এক বিতর্কে অর্ধেকেরও বেশি মানুষ সেদেশে জিএম ফসল প্রবর্তন একেবারে নিষিদ্ধ করার পক্ষে মত দেয়। বাকি অর্ধেকের অধিকাংশই যথাযথ পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর জিএম ফসল প্রবর্তনের পক্ষে মত দেন।

২০০৩ সালে ভারতে ‘বিটি কটন’ নামক জিএম তুলার জাত প্রবর্তন করা হয়েছিল যা চাষ করে হাজার হাজার কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ ক্ষতির কষ্ট সহ্য করতে না পেরে অনেক কৃষক আতœহত্যার পথ বেছে নেয়। এটা ইতোমধ্যেই প্রমানিত যে, জিএম শস্য ফসলের স্থানীয় জাতগুলোতে কৌলিক দূষণ ঘটায়। ইটিসি গ্র“পের এক গবেষণায় দেখা গেছে যে, মেক্সিকোর স্থানীয় ভূট্টার মধ্যে মোনমান্টো কোম্পানি প্রবর্তিত জিএম ভূট্টার জিন পাওয়া গেছে যা ঐসব জাতের আদি বৈশিষ্ট্যগুলোকে নষ্ট করে দিয়েছে। কাজেই বাংলাদেশের মতো জীববৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ দেশের জন্য বিদেশী কোম্পানির জিএম শস্য প্রবর্তন নিঃসন্দেহে অত্যন্ত অবিবেচনাপ্রসূত কাজ হবে।

সর্বোপরি, জিএম বীজ কৃষক নিজেরা উৎপাদন ও সংরক্ষণ করতে পারবে না। ফলে, এসব বীজের ফসল চাষ করা হলে এখনও কৃষকের হাতে যেসব বীজ আছে সেগুলোও একসময় অবধারিতভাবেই হারিয়ে যাবে। বীজের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ চলে যাবে কোম্পানির হাতে। তখন, কৃষক কী ফসল চাষ করবে না করবে তা নির্ধারণ করবে কোম্পানি। একদা যে নীল চাষ করানোর জন্য ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে ভয়ভীতি প্রদর্শন ও অমানুষিক নির্যাতনের আশ্রয় নিতে হয়েছে নব্য ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে তা করতে মোটেও বেগ পেতে হবেনা। উদাহরণস্বরূপ তামাক ও ভূট্টা চাষের কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। এ দেশে যখন নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যশস্য উৎপাদনের জন্য জমি কমছে তখন তামাক চাষের জমি বেড়ে চলেছে। ধুমপান এবং তামাক চাষের নানারকম ক্ষতিকর প্রভাবের কথা আমরা সবাই জানি এমনকি কৃষক নিজেরাও জানে। তামাক চাষীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে যে, তামাক চাষ অত্যন্ত শ্রমসাধ্য, ব্যয়বহুল ও ঝুঁকিপূর্ণ, স্বাস্থ্যের ও পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর – এসবই তাঁদের জানা। তবুও তাঁরা তামাক চাষ করে কারণ তামাক চাষের সবচেয়ে বড় সুবিধা হল বাজারজাতকরণের নিশ্চয়তা। অর্থাৎ কোম্পানি কৃষকের উৎপাদিত সব তামাক ভাল দামে কিনে নেয় যে সুবিধা অন্যান্য ফসলের ক্ষেত্রে কৃষক পায় না। তা ছাড়া, কোম্পানি বীজ (যে বীজ কোন কৃষকের কাছে নেই) সার, বালাইনাশকসহ অন্যান্য উপকরণ কৃষককে সরবরাহ করে থাকে। কাজেই কৃষক তামাক চাষ করতে অধিক আগ্রহী। কোম্পানি যদি চায় এ দেশের অর্ধেক জমিতে শুধু তামাক চাষ হবে তবে তাই কৃষকরা করবে। এখন ভূট্টার কথা ধরা যাক। শিল্পোন্নত দেশগুলো ইদানিং ভূট্টা থেকে গাড়ির জন্য জ্বালানি তৈরি করছে। এখন যদি কোম্পানি এ দেশের কৃষকদেরকে দেখায় যে, ভ‚ট্টা চাষ অন্য সকল ফসল থেকে বেশি লাভজনক। তা ছাড়া, কোম্পানি ভূট্টা চাষের জন্য অতি উচ্চফলনশীল বীজ দিবে যা ঐ কোম্পানি ছাড়া অন্য কারও কাছে নেই। এছাড়া, রাসায়নিক সার, বালাইনাশক ইত্যাদি উপকরণগুলোও কোম্পানি সরবরাহ করবে এবং প্রয়োজনে কৃষককে স্বল্পসুদে বা বিনাসুদে ঋণও দিবে। এবং সর্বোপরি ভাল দামে সেই ভ‚ট্টা কৃষকের কাছ থেকে কোম্পানি কিনে নিবে। এমতাবস্থায়, সব ফসল ফেলে কৃষক যে ভ‚ট্টা চাষের দিকে ঝুঁকবে তাতে সন্দেহের কোন অবকাশ নেই।

যাহোক, যেসব কারণে জিএম বীজ নিয়ে সারা বিশ্বে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে তা নিন্মে তুলে ধরা হল।

যেসব কারণে জিএম বীজ বিতর্কিত

১.   জিএম বীজের রূপান্তরিত জিনের প্রভাবে মাটির অনুজীব, মানুষ এবং প্রাণীদেহে এন্টিবায়োটিক রেজিস্টান্স সৃষ্টি হয়।

২.   জিএম শস্যের প্রভাবে জীবদেহে নানারকম অপ্রত্যাশিত ও অনাকাঙ্খিত বৈশিষ্ট্য জন্ম নিতে পারে।

৩.   জিএম খাদ্য মানুষ ও প্রাণিদেহে বিষাক্ত দ্রব্য তৈরি করে এবং এলার্জির লক্ষণ দেখা যায়।

৪.   জিএম ফসলের ফুলের রেণু আশেপাশের অন্য ফসলে গিয়ে পড়লে তার কৌলিক বৈশিষ্ট্য নষ্ট হয়ে যেতে পারে।

৫.   এসব ফসল প্রাকৃতিক ইকো-সিস্টেম, পরিবেশ এবং জীববৈচিত্র্যের জন্য হুমকিস্বরূপ।

৬.   এসব ফসল অতিমাত্রায় ব্যয়বহুল প্রযুক্তিনির্ভর।

৭.   এ পর্যন্ত এমন কোন জিএম জাত আবিষ্কৃত হয় নি যা ফলন বাড়াতে পারে। জিএম প্রযুক্তি ব্যবহার করে শুধু জাতের কিছু গুণাগুণের পরিবর্তন করা হয়।

৮.   এসব ফসলের ক্ষতিকর প্রভাব, অনিশ্চয়তা ও ঝুঁকিসমূহ পরীক্ষা না করেই বাজারজাত করা হচ্ছে।

৯.   জিএম প্রযুক্তির একচ্ছত্র মলিক গুটিকয় বহুজাতিক কোম্পানি। ফলে, সারা বিশ্বের খাদ্য নিরাপত্তা গুটিকয়েক কোম্পানির হাতে জিম্মি হয়ে পড়বে।

১০.  জিএম বীজ প্যাটেন্টকৃত হওয়ায় তা উচ্চমূল্যের হয়ে থাকে যা তৃতীয় বিশ্বের দরিদ্র কৃষকদের ক্রয় ক্ষমতার মধ্যে থাকবে তার কোন নিশ্চয়তা নেই।

১১.  জিএমও-র দূষণ একবার পরিবেশে ছড়িয়ে পড়লে তা রোধ করা খুব কঠিন হয়ে পড়বে।

জিএম ও প্যাটেন্ট বিতর্ক

বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার ট্রিপস চুক্তি অনুযায়ী জিএম জাত প্যাটেন্টযোগ্য। পূর্বেই আলোচিত হয়েছে যে, বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার ট্রিপস চুক্তির প্যাটেন্ট আইনের আর্টিকেল ২৭.৩ (বি) ধারা এবং উপোভ চুক্তিতে নতুন উদ্ভাবিত জাতের উপর বাণিজ্যিক প্রজননবিদদের একচ্ছত্র মালিকানা লাভের অধিকার দেওয়া হয়েছে যা আমাদের সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্য ও কৌলিক সম্পদের (জেনেটিক রিসোর্স) উপর বহুজাতিক কোম্পানির একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পথকে সুগম করছে। এরূপ প্যাটেন্ট কৃষক এবং রাষ্ট্রীয় গবেষণা প্রতিষ্ঠানসমূহের প্রজননবিদদের জন্য বীজ ও কৌলিক সম্পদের সহজপ্রাপ্যতাকে বাধাগ্রস্ত করবে। কারণ এই প্যাটেন্ট আইন বীজ সম্পদের উপর কোম্পানির একক মালিকানা ও একচেটিয়া বাণিজ্যের গ্যারান্টি দেয়। ফলে বীজের মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে কোন প্রতিযোগিতার সুযোগ না থাকায় বীজের মূল্য সাধারণ কৃষকের ক্রয় ক্ষমতার মধ্যে থাকবে তার কোন নিশ্চয়তা নেই। অথচ কৃষক এসব বীজ থেকে নিজেরা বীজ উৎপাদন ও সংরক্ষণ করতে পারবে না বিধায় প্রতিবছর কোম্পানির কাছ থেকেই বীজ কিনতে বাধ্য হবে।

বিশ্বব্যাপী জিএম শস্য প্রতিরোধ সংগ্রাম

আজ সারা বিশ্বেই জিএম ফসল প্রবর্তন প্রতিরোধের জন্য সংগ্রাম চলছে। জিএম ফসল প্রবর্তক বহুজাতিক কোম্পানির বিরুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক, ভোক্তা ও সচেতন নাগরিক সমাজ কর্তৃক বিক্ষোভ প্রদর্শন, প্রতিরোধ আন্দোলন ক্রমেই তীব্রতর হচ্ছে। স¤প্রতি শুধুমাত্র বৃটেনেই জিএম ফসল ধ্বংস ও পুড়িয়ে ফেলার মতো ঘটনা ঘটেছে ৩০০ টিরও বেশি। কিন্তু বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর প্রভাব এতটাই যে, তাদের টিকিটি স্পর্শ করার ক্ষমতা বিশ্বের বেশিরভাগ সরকারেরও নেই। তাই এত বিতর্ক, এত প্রতিবাদ সত্বেও আইন করে জিএম শস্য প্রবর্তন রোধ করতে আগ্রহী নয় অনেকেই। কারণটাও খুবই সুস্পষ্ট। মার্কিন কোম্পানি মোনসান্টো একাই নিয়ন্ত্রণ করছে বিশ্বের প্রায় ৯১% জিএম বীজের বাজার। তবুও আশার কথা এই যে, জনতার শক্তি ও জনপ্রতিরোধের মুখে আজ হউক কাল হউক সকল শক্তিই পরাভূত হয়। যেমন, ১৯৯৪ সালে মোনসান্টো ‘ফ্ল্যাভার সেভার’ নামক একটি জিএম টম্যাটোর জাত বাজারজাত করে যা দীর্ঘদিন যাবৎ রেখে দিলেও পঁচন ধরেনা। কিন্তু এর ক্ষতিকর প্রভাবের কারণে ভোক্তাদের প্রতিবাদের মুখে ১৯৯৬ সালে এ জাতের উৎপাদন বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়। কাজেই, কৃষকের বীজের অধিকার প্রতিষ্ঠা, দেশের জীববৈচিত্র্য ও কৌলিক সম্পদ রক্ষা এবং এ দেশের কৃষি ব্যবস্থার আশু বিপর্যয় রোধে সময় থাকতে সোচ্চার হওয়া জরুরী। এ ব্যাপারে কৃষক এবং সচেতন মহলের সোচ্চার ও জোড়ালো ভূমিকা গ্রহণ এখন সময়ের দাবী।

বাংলাদেশে জিএম বীজ প্রবর্তন ও ‘গোল্ডেন রাইস’ বিতর্ক

বাংলাদেশে বৈধভাবে এখনও কোন জিএম শস্য প্রবর্তিত হয় নি। তবে, অবৈধভাবে কোন জিএম বীজ বাংলাদেশে ইতোমধ্যে প্রবেশ করেছে কি-না তা বলা মুশকিল। কারণ, বাংলাদেশ বিভিন্ন ফসলের বিশেষ করে শাক-সব্জির প্রচুর বীজ বাইরে থেকে ঢুকছে। এসব বীজের সাথে কোন জিএম বীজ ঢুকছে কি-না এবং তা যথাযথভাবে রোধ করা হচ্ছে কি-না তা নিয়ে সংশয়ের অবকাশ রয়েছে। তবে, কোন জিএম খাদ্য যে বাংলাদেশে প্রবেশ করছেনা তা নির্দ্বিধায় বলা সম্ভব নয়।

যাহোক, সম্প্রতি দেশে জিএম ধান “গোল্ডেন রাইস” প্রবর্তনের জন্য আন্তর্জাতিক ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ইরি) ও বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) যৌথভাবে একটি গবেষেণা কার্যক্রম পরিচালনা করছে। আমরা জানি যে, ধানে ভিটামিন-এ খুব একটা থাকেনা। ভিটামিন-এ এর ধারক হল বিটা কেরোটিন। সবুজ শাক-সব্জি ও হলুদ ফলমূলে প্রচুর পরিমানে এই বিটা কেরোটিন বা ভিটামিন-এ থাকে। ডেফোডিল নামক ফুলেও এই বিটা কেরোটিন থাকে। কোন উদ্ভিদে এই বিটা কেরোটিন থাকবে কি থাকবেনা তা নিয়ন্ত্রণ করে নির্দিষ্ট এক জিন। ডেফোডিল ফুলের বিটা কেরোটিন নিয়ন্ত্রণকারী এই জিনের ডিএনএ’র নির্দিষ্ট অংশ কেটে নিয়ে ধানের কোন জাতের জিনের মধ্যে সেই অংশটি ঢুকিয়ে দিয়ে এই নতুন একটি জাত সৃষ্টি করা হয় যার নাম দেওয়া হয়েছে গোল্ডেন রাইস। গবেষেণাকর্মটি পরিচালিত হচ্ছে বহজাতিক কোম্পানি সিনজেন্টার টাকায় ইরির মাধ্যমে। সামনে ইরি পেছনে সিনজেন্টা। এ দেশের মানুষের ভিটামিনের অভাব দূর করে অন্ধত্বের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য সিনজেন্টার যেন ঘুম হারাম। আমরা বেশি ভাত খাই বলে ধানের মধ্যে ভিটামিন-এ ঢুকিয়ে আমাদের ভিটামিনের অভাব দূর করার এক হাস্যকর যুক্তি দেখিয়ে এই গোল্ডেন রাইস তৈরি করা হচ্ছে। গোল্ডেন রাইসের ভাত খেয়ে যদি ভিটামিন-এ এর অভাব দূর করতে হয় তবে একজন পূর্ণবয়স্ক মহিলার প্রতিদিন ৭.৫ কেজি ভাত খেতে হবে তাও যদি শরীর সবটা হজম করতে পারে। প্রতি ১০০ গ্রাম গোল্ডেন রাইস থেকে মাত্র ৩০ মাইক্রোগ্রাম বিটাক্যারোটিন বা ভিটামিন-এ পাওয়া যাবে। অথচ, আমাদের দেশী জাতের লাল চালে এর চেয়ে আনেক বেশি বিটাক্যারোটিন আছে যেসব ধান আজ বিলুপ্তির পথে। বনে-বাদাড়ে অবহেলায় পড়ে থাকা ১০০ গ্রাম হেলেঞ্চা শাকে ১৩৭০০ মাইক্রোগ্রাম, থানকুনি শাকে ১৩১০০ মাইক্রোগ্রাম, কলমী শাকে ১০৭৪০ মাইক্রোগ্রাম, কালোকচু শাকে ১২০০০ মাইক্রোগ্রাম এবং সবুজকচু শাকে ১০২৭৮ মাইক্রোগ্রাম বিটাক্যারোটিন আছে। যেসব গ্রামীণ দরিদ্র জনগোষ্ঠীর কথা চিন্তা করে গোল্ডেন রাইস তৈরি করা হচ্ছে তাদের আশেপাশে ভিটামিন-এ সমৃদ্ধ এমন অসংখ্য খাদ্যবস্তু রয়েছে যা নিতান্ত অসচেতনতার জন্য তারা খায়না। এজন্য সবার আগে প্রয়োজন ছিল সচেতনতা সৃষ্টির উপর সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া। তা না করে বাংলাদেশের সবচেয়ে বেশি ফলনশীল জাত ব্রিধান-২৯(কৃষকের মাঠে যার ফলন অনেক ক্ষেত্রে হাইব্রিডের ফলনকেও ছাড়িয়ে গেছে)-কে জিএম ধানে রুপান্তরের চেষ্টা চলছে যা কোম্পানি পেটেন্ট করে নিতে পারবে। কারণ, এই ‘গোল্ডেন রাইস’ প্রযুক্তি কোম্পানির প্যাটেন্ট করা। যদিও বলা হচ্ছে যে, এই গোল্ডেন রাইস মানব কল্যাণে সিনজেন্টার দান তাই এটি প্যাটেন্ট করা হবেনা।

অন্যদিকে, দেশে চারটি জেনেটিক্যালি মডিফাইড (জিএম) শস্য প্রবর্তনের জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের করনেল ইউনিভার্সিটি এবং মার্কিন দাতা সংস্থা ইউএসএআইডি (USAID=United States Agency for International Development)-এর সাথে বাংলাদেশ সরকারের একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে এবং গবেষণা কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে। এই গবেষণার উদ্দেশ্য হল, ফল ও ডগা ছিদ্রকারী পোকা প্রতিরোধী বেগুন ও মটর, লেইট বøাইট রোগ প্রতিরোধী গোলআলু এবং লবণাক্ততা প্রতিরোধী ধানের জিএম জাত উদ্ভাবন করা। সন্দেহ নেই যে, উল্লেখিত বৈশিষ্ট্যের জাত আবিষ্কার করা আমাদের জন্য খুবই দরকারী। তবে তা জিএম প্রযুক্তি ব্যবহার করেই করতে হবে তা বোধহয় ঠিক নয়। কারণ, সাধারণ শংকরায়ন বা মিউটেশন প্রযুক্তি ব্যবহার করেও এমন জাত আবিষ্কার করা সম্ভব। তা ছাড়া, এসব নতুন আবিষ্কৃত জাতের মালিকানার ব্যাপারে চুক্তিতে কি ধরণের শর্ত রয়েছে তা সুস্পষ্ট নয়। এখানে প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ্য যে, একদা ‘বন্ধাকরণ’ প্রক্রিয়ায় পোকামাকড় দমনের জন্য একটি কার্যকর পদ্ধতি আবিষ্কৃত হয়েছিল যা উৎপাদন ও বাজারজাতকরণের জন্য কোন কোম্পানিই আগ্রহ দেখায়নি। কারণ একটাই, এখানে মুনাফা অর্জনের সুযোগ ছিল কম। সুতরাং কোম্পানি পৃথিবীর ক্ষুধার্ত মানুষের খাদ্য নিরাপত্তার জন্য গলদঘর্ম হবে – এমনটা ভাবা আর বোকার স্বর্গে বাস করা একই কথা। বরং ক্ষুধা নিয়ে বাণিজ্য করাই যে কোম্পানির প্রধান লক্ষ্য এতে সন্দেহের কোনই অবকাশ নেই। কাজেই কোম্পানির মোটা অংকের বেতনভোগী দেশী-বিদেশী গবেষক-বিজ্ঞানীদের চটকদার যুক্তিতে ভুলে জিএম শস্য প্রবর্তনের সিদ্ধান্ত হবে একেবারেই আতœঘাতী। কারণ, আমাদের এখনও যেসব নীতি আছে তাতে জিএম বীজ এ দেশে ঢুকতে পারেনা। কাজেই, বহুজাতিক কোম্পানি ও তাদের দেশী-বিদেশী এজেন্টরা আজ উঠে-পড়ে লেগেছে যাতে বাংলাদেশ জিএম শস্য প্রবর্তনের জন্য আশু উদ্যোগ গ্রহণ করে। এজন্য একদিকে রয়েছে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা কর্তৃক কার্যকর সুই জেনেরিস সিস্টেম হিসেবে উপভ চুক্তি গ্রহণের চাপ আর অন্যদিকে রয়েছে উপরোল্লেখিত গবেষণার মাধ্যমে দেশে জিএম শস্য প্রবর্তনের গবেষণা পর্যায়ের উদ্যোগ। এসব গবেষণার ফলাফল যাই হোক না কেন বহুজাতিক কোম্পানি বা তাদের এজেন্টদের উপরোল্লেখিত বিনিয়োগের আসল উদ্দেশ্য যে বাংলাদেশের বাজারে তাদের জিএম প্রযুক্তি প্রবেশের পথ পরিষ্কার করা তাতে বোধহয় সন্দেহের অবকাশ নেই।

কৃষির যেকোন নীতি এখন আর দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার সদস্য হওয়ার ফলে স্বাধীনভাবে নীতি প্রণয়ের সুযোগ এখন সীমিত। কিন্তু তবুও আমাদের স্বার্থবিরোধি কোন অন্যায় নীতি যাতে আমাদের উপর চেপে না বসে তা প্রতিরোধ ও তার জন্য দরকষাকষি করার সুয়োগ এখনও আমাদের রয়েছে। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় এই যে, আমাদের বীজ নীতিতে এ দেশের বাজারে বহুজাতিক কোম্পানির অবাধ অনুপ্রবেশকে উৎসাহিত করা হয়েছে।

ইতিপূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ১৯৯৮ সালে তৎকালীন সরকার কর্তৃক গঠিত একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি “প্ল্যান্ট ভ্যারাইটি অ্যাক্ট অব বাংলাদেশ” নামক একটি বিধিমালা প্রস্তাব করে যাতে এ দেশে জিএম শস্যের অনুপ্রবেশ রোধে সুস্পষ্ট বিধান রাখা হয়েছে। এই বিধিতে বলা হয়েছে যে, যদি কোন জাত জেনেটিক ও সাংস্কৃতিক দুষণ ঘটায় তবে তা সংরক্ষণ করা যাবেনা। কিস্তু প্রস্তাবিত এই আইনটি কার্যকর করার কোন উদ্যোগ লক্ষ করা যাচ্ছেনা। এর প্রধান কারণ, এ দেশে জিএম বীজ প্রবর্তনের জন্য অনুক‚ল নীতি গ্রহণের জন্য বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা, বিভিন্ন দাতা সংস্থা ও দেশ এবং তাদের বহুজাতিক কোম্পানিগুলো আমাদের নীতি নির্ধারক মহলের উপর নানাভাবে প্রভাব বিস্তার ও চাপ সৃষ্টি করে চলেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপিয়ান ইউনিয়নসহ বিভিন্ন দাতা দেশ ও সংস্থাগুলো ক্রমাগত চাপ দিয়ে যাচ্ছে যাতে বাংলাদেশ বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার ট্রিপস চুক্তিতে বর্ণিত “সুই জেনেরিস সিস্টেম” হিসেবে “উপভ” গ্রহণ করে।

আজ থেকে প্রায় চলি­শ বছর আগে উচ্চফলনশীল জাত উদ্ভাবন এবং সেচ, রাসায়নিক সার ও বালাইনাশক খাতে ব্যাপক বিনিয়োগের ম্যাধমে পৃথিবীর দক্ষিণ ভূখণ্ডে তথাকথিত যে ‘সবুজ বিপ্লব’ সূচীত হয়েছিল জিএম-ফসল তাতে নতুন সংযোজন। আজ বিশ্বনেতৃবৃন্দ ও কৃষি ব্যবসায়ী মহল কৃষির সকল সমস্যা সমাধান, বিশ্ব থেকে ক্ষুধা ও দারিদ্র দূরীকরণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কৃষি বিপ্লবের দ্বিতীয় ধাপ হিসেবে জৈব প্রযুক্তি প্রয়োগের প্রয়াস পাচ্ছেন। কিছু মুনাফালোভী বহুজাতিক কোম্পানির নিয়ন্ত্রণাধীন নানাবিধ ক্ষতিকারক রাসায়নিক উপকরণের উপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল এমন অস্থায়িত্বশীল কৃষি প্রযুক্তির দ্বারা কৃষির বর্তমান অবস্থায় স্থায়িত্বশীল উন্নয়ন কতটা সম্ভব তা বর্তমানে পরিবেশ ও মানবতাবাদী কৃষি বিজ্ঞানী এবং সচেতন মহলের কাছে এক বিরাট প্রশ্ন হয়ে দেখা দিয়েছে।

এটা অনস্বীকার্য যে, বর্তমান বিশ্বের বিপুল সংখ্যক নিরন্ন মানুষের খাদ্যের যোগান দেওয়া কৃষিখাতের জন্য এক বিরাট চ্যালেঞ্জ হয়ে দাড়িয়েছে। এ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় প্রয়োজন কৃষকনির্ভর একটি স্থায়িত্বশীল কৃষি ব্যবস্থা। অথচ আর্তমানবতার এরূপ সংকটকে পুঁজি করে জনগোষ্ঠীর স্বার্থ, কৃষকের অধিকার, পরিবেশের ভারসাম্য, জীববৈচিত্র্য ও ইকোসিস্টেম সংরক্ষণ ইত্যাদি অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোকে উপেক্ষা করে একদল অর্থলোভী তথাকথিত বিজ্ঞানী অর্থের বিনিময়ে নিজেদেরকে বিভিন্ন বহুজাতিক কোম্পানির কাছে বিক্রি করে দিয়ে কোম্পানির ফরমায়েশে এমন ধরণের কৃষি প্রযুক্তি উদ্ভাবন করছেন যাতে কোম্পানির একচেটিয়া ব্যবসা নিশ্চিত হয়। এজন্য শুধু প্রযুক্তির চটকদার কারিশমায় না ভুলে প্রযুক্তির পশ্চাতের মানুষ এবং তাদের উদ্দেশ্য সম্পর্কে সতর্ক হওয়া জরুরী। কারণ, যেকোন প্রযুক্তিরই ভাল-মন্দ দুটো দিকই থাকে যা হাইব্রিড ও জিএম প্রযুক্তির ক্ষেত্রেও আছে নিঃসন্দেহে। কোন প্রযুক্তি মানুষের কল্যাণে ব্যবহৃত হবে, না ধ্বংসাতœক কাজে ব্যবহৃত হবে তা নির্ভর করে কে কোন উদ্দেশ্যে সে প্রযুক্তিটি ব্যবহার করছে। হাইব্রিডাইজেশন এবং জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং নিঃসন্দেহে বৈজ্ঞানিক অগ্রযাত্রায় যুগান্তকারী সংযোজন। কিন্তু এই প্রযুক্তিগুলো যেভাবে গুটিকতক দৈত্যসম বহুজাতিক কোম্পানির কুক্ষিগত হয়ে যাচ্ছে তা বাংলাদেশের মত দরিদ্র দেশের দরিদ্রতর কৃষকদের জন্য ভয়াবহ বিপদের কারণ হয়ে দাড়াতে পারে। কাজেই প্রযুক্তির এরূপ কুক্ষিগত হওয়ার বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া যেমন জরুরী তেমনি জরুরী ঢালাওভাবে এসব প্রযুক্তি আমদানি না করে নিজেদের সক্ষমতা বৃদ্ধির দিকে অধিকতর নজর দেওয়া।

প্রকৃতপক্ষে, তড়িঘড়ি করে ঢালাওভাবে বিদেশি বহুজাতিক কোম্পানির হাইব্রিড ও জিএম ফসলের প্রবর্তন আমাদের জন্য একেবারেই অপরিহার্য নয়। তদুপরি, আমাদের নিজস্ব হাইব্রিড ও জিএম ফসল উদ্ভাবনের সম্ভাবনাও রয়েছে। এজন্য আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি এবং বর্তমান কৃষি ব্যবস্থার আমূল সংস্কার প্রয়োজন। এজন্য আমাদের স্বীকার করতে হবে যে, দেশের ক্ষুধার্ত মানুষের জন্য নিরাপদ ও পুষ্টিসম্পন্ন খাদ্য উৎপাদনে গত কয়েক দশক যাবৎ আমাদের প্রচেষ্টা একটি চরম ভুল পথে পরিচালিত হয়েছে যার ফলে আমাদের নিজস্ব একটি সমন্বিত ও স্থায়িত্বশীল কৃষি ব্যবস্থা গড়ে উঠতে পারেনি। আজ আমরা জোর গলায় খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের কথা বলি অথচ, দেশের অর্ধেকেরও বেশি জনগোষ্ঠী তাদের প্রয়োজনীয় ক্যালরি থেকে বঞ্চিত। বিষাক্ত খাদ্য আমাদেরকে নীরব ঘাতকের মত ক্রমান্বয়ে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে। আমাদের সমস্যা ও চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আমরা কেবল বিদেশী সাহায্য ও প্রযুক্তির মুখাপেক্ষি হয়ে থেকেছি। এ দেশের মাটি, পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য, আর্থ-সামাজিক অবস্থা, কৃষ্টি ও সংস্কৃতির সাথে একাত্ম হয়ে উঠে এমন লাগসই প্রযুক্তি উদ্ভাবনে আমাদের মনোযোগ ছিল চরম হতাশাব্যঞ্জক। এখনও যদি আমাদের বোধোদয় হয় তবে এ মুহূর্তে করণীয় হবে-

১.   ভোক্তা, কৃষক, ব্যবসায়ী, নীতি নির্ধারক, সুশীল সমাজসহ সকলকে কৃষিতে বহুজাতিক কোম্পানির হাইব্রিড ও জিএম বীজ ব্যবহারের ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন হওয়া।

২.   রাষ্ট্রীয় গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোতে বিদেশী সাহায্য এবং বহুজাতিক কোম্পানির টাকায় পরিচালিত গবেষণা নয়, সম্পূর্ণ নিজস্ব অর্থায়নে জনকল্যাণমুখি, স্থায়িত্বশীল ও লাগসই প্রযুক্তি উদ্ভাবনের জন্য গবেষণা কর্মকাণ্ড জোরদার করা।

৩.   কৃষকদেরকে তাদের নিজস্ব বীজ এবং স্থানীয় জাত সংরক্ষণে উদ্যোগী করে তোলা এবং বীজ উৎপাদন ও সংরক্ষণে তাদের নিজস্ব ব্যবস্থা গড়ে তুলতে প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান করা।

৪.   পরিবেশগত ও স্বাস্থ্য ঝুঁকি সম্পর্কে পর্যাপ্ত পরীক্ষা-নীরিক্ষা ছাড়া এ দেশের কৃষিতে বিদেশী হাইব্রিড ও জিএম বীজের ঢালাও প্রবর্তন বন্ধ করা।

৫.   বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার চুক্তি থেকে কৃষিকে বাদ দেওয়া এবং ট্রিপস চুক্তি থেকে জীবের উপর প্যাটেন্ট বাতিল করার জন্য উন্নয়নশীল ও স্বল্পোন্নত দেশসমূহের আন্দোলনের সাথে সম্পৃক্ত হওয়া।

বীজ ছাড়া ফসল উৎপাদন সম্ভব নয়। কাজেই বীজের নিয়ন্ত্রণ যদি কোম্পানির হাতে চলে যায় তবে আমাদের কৃষি এবং খাদ্য নিরাপত্তা দুটোই চলে যাবে কোম্পানির একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণে। কোম্পানি থেকে বীজ পেলে আমাদের চাষাবাদ হবে এবং পেটের ভাত জুটবে, অন্যথায় নয়। এরূপ অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ নিশ্চয় আমাদের কাম্য নয়। যদি তাই হয় তবে এখনই সময় এই বহুজাতিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া; প্রয়োজন রুখে দাঁড়ানোর। কোম্পানির প্রযুক্তি ব্যবহার না করলে যদি আমাদের আহার না জুটে তবে না খেয়ে মরাও ঢের ভাল।

বর্তমান বাণিজ্যিক বিশ্বায়নের ফলে মানুষের সকল মৌলিক অধিকারগুলোও কোম্পানির হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে। আজ আামাদের খাওয়া-পরা, সুস্থভাবে বেঁচে থাকা, শিক্ষা ও অন্যান্য সেবা সবই নিশ্চিত করবে কোম্পানি এবং তা করবে অবশ্যই অর্থের বিনিমিয়ে। কাজেই অবস্থা এমন দাড়াবে যে, অর্থ আছে তো বাঁচো, র্অথ নেই তো মরো। আমরা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসন-শোষণ দেখেছি। আমরা দেখেছি কৃত্রিমভাবে দুর্ভিক্ষ সৃষ্টি করে দুহাতে মুনাফা লুটতে। একথা বলার অপেক্ষা রাখেনা যে, মুনাফা যেখানে মুখ্য মানবতা সেখানে উপেক্ষিত। আজ নতুন করে ফিরে আসছে নব্য ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসন। সুতরাং সময় থাকতে আমাদেরকে সাবধান হতে হবে।