বিশ্বব্যাপী কৃষি প্রযুক্তির বিস্তার এবং তার ফলস্বরূপ দানাদার খাদ্যশস্যের উৎপাদন বৃদ্ধির সাফল্যকে প্রকাশ করতে সবুজ বিপ্লব পরিভাষাটি ১৯৬৮ সালে প্রথম ব্যবহার করেন ইউনাইটেড স্টেটস এজেন্সি ফর ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট (ইউএসএআইডি)-র তৎকালীন পরিচালক উইলিয়াম গাউড। ১৯৪৩ সাল থেকে সত্তরের দশকের শেষাবধি চলমান গবেষণা ও উন্নয়ন এবং প্রযুক্তি সম্প্রসারণ কর্মকান্ড যা কৃষির উৎপাদন অনেকগুণ বাড়িয়ে দেয় তাই সবুজ বিপ্লব নামে খ্যাত। এসব কর্মকান্ডের মধ্যে ছিল প্রধানত দানা শস্যের উচ্চ ফলনশীল জাতের প্রবর্তন, সেচ অবকাঠামোর উন্নয়ন ও ভূগর্ভস্থ পানিনির্ভর সেচ ব্যবস্থার প্রচলন, রাসায়নিক সার ও বালাইনাশক এবং কৃষি যন্ত্রপাতির বিস্তার ইত্যাদি। সবুজ বিপ্লবের জনক হিসেবে খ্যাত এবং শান্তিতে নোবেল পুরষ্কার বিজয়ী বিজ্ঞানী নরম্যান বোরলগ ১৯৪৩ সালে মেক্সিকোতে উচ্চফলনশীল গমের জাত প্রবর্তনের মাধ্যমে গমের উৎপাদন বৃদ্ধিতে যে সাফল্য অর্জন করেন তা পরবর্তী কালে মার্কিন প্রতিষ্ঠান রকফেলার ফাউন্ডেশন সারা বিশ্বে বিস্তারের পরিকল্পনা গ্রহণ করে। এরই ধারাবাহিকতায় এশিয়া অঞ্চলে ধানের উচ্চফলনশীল জাত প্রবর্তনের লক্ষ্যে মার্কিন প্রতিষ্ঠান ফোর্ড ও রকফেলার ফাউন্ডেশন ১৯৬০ সালে ফিলিপাইনে আন্তর্জাতিক ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ইরি) প্রতিষ্ঠা করে। ১৯৬৬ সালে ইরি আইআর-৮ নামের একটি উচ্চফলনশীল জাত আবিষ্কার করে যা অতিদ্রুত ভারতীয় উপমহাদেশসহ এশিয়ার অনেক দেশে বিস্তার ঘটানো হয়। এখানে উল্লেখ্য যে, ফোর্ড ও রকফেলার ফাউন্ডেশন বিশ্বব্যাংক, ফুড এন্ড এগ্রিকালচারাল অর্গানাইজেশন (এফএও), (ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন ফর এগ্রিকালচারাল ডেভেলপমেন্ট (ইফাদ) এবং (ইউনাইটেড নেশনস ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম (ইউএনডিপি)-র সহযোগিতায় ১৯৭১ সালে ‘কনসালটেটিভ গ্রুপ অন ইন্টারন্যাশনাল এগ্রিকালচারাল রিসার্চ (সিজিআইএআর)’ নামক কৃষি গবেষণার একটি বিশ্বব্যাপী নেটওয়ার্ক গড়ে তুলে যা পরবর্তীতে সারা বিশ্বে বহু গবেষণা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলে। এসব গবেষণা প্রতিষ্ঠান সারা বিশ্বে বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে সবুজ বিপ্লব প্রযুক্তি বিস্তারে মুখ্য ভূমিকা পালন করে। এখানে প্রসঙ্গক্রমে স্মরণ রাখা প্রয়োজন যে, গবেষণা ও উন্নয়ন কার্যক্রম বিস্তারের পাশাপাশি বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশসহ বিশ্বব্যাপী সরকারি পর্যায়ে কৃষি সম্প্রসারণ সেবা ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং কাঠামোগত সংস্কার কর্মসূচি বাস্তবায়নের মাধ্যমে সবুজ বিপ্লব প্রযুক্তির বাজারজাতকরণে বহুজাতিক কোম্পানির পথ সুগম করে।
যাহোক এটা অনস্বীকার্য যে, সবুজ বিপ্লব প্রযুক্তির ব্যাপক বিস্তারের ফলে বিশ্বব্যাপী দানাদার শস্যের উৎপাদন অনেকগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে তা বিশ্বের কোটি কোটি দরিদ্র জনগোষ্ঠীর খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কতটা ভূমিকা রেখেছে তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। কারণ, গুটিকয়েক জাতের গম, ভূট্টা বা ধানের একক চাষের মাধ্যমে শর্করা জাতীয় খাদ্যশস্যের উৎপাদন বাড়লেও পুষ্টির জন্য অপরিহার্য অন্যান্য ফসলের উৎপাদন বরং হ্রাস পেয়েছে যা ভিটামিন ও আয়রনের মতো অত্যাবশ্যক পুষ্টি উপাদানগুলোর প্রাপ্যতাকে হ্রাস করেছে। আজও বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশগুলোতে পাঁচ বছরের কম বয়সে মুত্যুবরণকারী শিশুদের প্রায় ৬০% মারা যায় এসব পুষ্টি উপাদানের অভাবে। অন্যদিকে, ব্যাপকভাবে রাসায়নিক সার ও বালাইনাশক প্রয়োগ করার মাধ্যমে উৎপাদিত বিষাক্ত বাড়তি দানাদার খাদ্যও মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করেনা। বিশ্বের ক্ষুধা নিয়ে ১৯৮৬ সালে স্বয়ং বিশ্বব্যাংক পরিচালিত এক গবেষণায় এই চরম সত্যটিকে স্বীকার করা হয়েছে যে, খাদ্য উৎপাদন বাড়লেই খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়না। অবশ্য বিকল্প হিসেবে বিশ্বব্যাংক দরিদ্র মানুষের ক্রয় ক্ষমতা বাড়ানোর সুপারিশ করেছে। শুধু সুপারিশই করেনি এজন্য বিশ্বব্যাপী ক্ষুদ্র ঋণ বিস্তারের মাধ্যমে মানুষের খাদ্য ক্রয়ের অর্থ যোগানোর বন্দোবস্তও করেছে।
বাংলাদেশের কৃষিতে সবুজ বিপ্লবের প্রভাব
কৃষিপ্রধান বাংলাদেশে ১৯৬০ এর দশকে খাদ্যের অভাব পূরণের জন্য সবুজ বিপ্লব প্রযুক্তিনির্ভর বর্তমান কৃষি ব্যবস্থার প্রচলন করা হয়। ব্যয়বহুল এই কৃষি ব্যবস্থায় মূলত দানা জাতীয় শস্য যেমন: ধান, গম ইত্যাদি উৎপাদনের ব্যাপক উদ্যোগ গৃহীত হয়। সার্বিকভাবে দানা জাতীয় শস্যের উৎপাদন বৃদ্ধি পেলেও জমির উর্বরতা ও উৎপাদনশীলতা কমে যাচ্ছে। অন্যদিকে, অধিক হারে উচ্চ মূল্যে ক্রয়কৃত বিষাক্ত রাসায়নিক সার ও বালাইনাশক প্রয়োগের ফলে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে এবং লাভ কমে যাচ্ছে। দানা জাতীয় ফসল উৎপাদনের এলাকা বাড়াতে গিয়ে আমিষ ও ভিটামিন সরবরাহকারী নিত্য প্রয়োজনীয় খাদ্য যেমন: ডাল, সরিষা (তেল), পেঁয়াজ, রসুন অন্যান্য মসলাজাতীয় ফসল এবং শাক-সব্জি ইত্যাদির চাষ কমেছে যা বর্তমানে কৃষকদেরকে উচ্চ মূল্যে বাজার থেকে কিনতে হচ্ছে। আজ বিদেশী ডাল, পেঁয়াজ, রসুন ইত্যাদি এসে আমাদের বাজার ছেয়ে যাচ্ছে। এগুলো বিদেশ থেকে আমদানি করতে হচ্ছে বা চোরাই পথে আসছে। এতে আমাদের পরনির্ভরশীলতা বাড়ছে, অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অন্যদিকে, এসব ফসল মাটি থেকে ধানের চেয়ে অনেক কম খাদ্য গ্রহণ করে যা মাটির উর্বরতা বজায় রাখতে সাহায্য করে। কাজেই একই জমিতে উপর্যুপরি শুধু ধান চাষের ফলে জমির উর্বরতা দিন দিন কমে যাচ্ছে। বহুবিধ ফসলের পরিবর্তে একক ফসল চাষের ফলে বিলুপ্ত হচ্ছে এ দেশের সমৃদ্ধ ফসল ও জীববৈচিত্র্য। হারিয়ে যাচ্ছে কৃষিভিত্তিক সমাজ ব্যবস্থা, গ্রামীণ সংস্কৃতি ও সভ্যতা। পরিবেশ দূষণের ফলে মৎস্য ও জলজ সম্পদ, গবাদী পশু-পাখি, বন্যপ্রাণী ও মাটিতে অবস্থানকারী অনুজীব তথা মাটির প্রাণ ধ্বংস হচ্ছে। মাটি, পানি, বাতাস ও খাদ্য দূষণের ফলে মানুষের স্বাস্থ্য সমস্যা বাড়ছে, বাড়ছে প্রাকৃতিক বিপর্যয়। যাহোক, সবুজ বিপ্লব বাংলাদেশের কৃষিতে যে বৈপ্লবিক রপান্তর ঘটিয়েছে তার প্রভাবসহ সংক্ষিপ্ত আকারে নিম্নে তুলে ধরা হল।
১. মাটির জৈব পদার্থ ও উর্বরতা হ্রাস
বর্তমানে জমিতে প্রচুর পরিমাণে রাসায়নিক সার যেমন: ইউরিয়া, ফসফেট, পটাশ, জিপসাম, দস্তা সার ইত্যাদি প্রয়োগ করা হচ্ছে। কোন সারের কি কাজ এবং কোন সার কি পরিমাণে প্রয়োগ করা প্রয়োজন এসব সঠিকভাবে না জেনেই কৃষকরা যথেচ্ছা রাসায়নিক সার প্রয়োগ করে যাচ্ছে। এসব সার একদিকে যেমন মাটির স্বাভাবিক রাসায়নিক গঠনকে নষ্ট করে দিয়ে মাটিকে বিষাক্ত করে তুলে, অন্যদিকে তেমনি মাটির জৈব পদার্থ এবং অনুজীবের ক্রিয়া কমিয়ে দিয়ে জমির উর্বরতা হ্রাস করে।
সবুজ বিপ্লবের আগে জমিতে বছরে দুই-একটা ফসল ফলানো হতো এবং বাকি সময় জমি পতিত থাকতো। ফলে, পতিত জমিতে আগাছা এবং বিভিন্ন গাছ-গাছড়া জন্মাত। এগুলো মাটিতে মিশে যোগ হতো জৈব পদার্থ। তা ছাড়া সব কৃষকের বাড়িতেই প্রচুর গোবর, ছাই ও অন্যান্য জৈব আবর্জনা থাকতো যা তারা জমিতে প্রয়োগ করত। বর্তমানে শুধু রাসায়নিক সার প্রয়োগ করা হচ্ছে। তাই মাটির জৈব পদার্থ দিন দিন কমে নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে। একটি উর্বর মাটিতে কমপক্ষে ৫% জৈব পদার্থ থাকা অত্যাবশ্যক কিন্তু আমাদের অধিকাংশ মাটিতে তা ১% এর নিচে নেমে গেছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে একসময় হয়ত মাটি জৈব পদার্থশূন্য হয়ে পড়বে। তখন এই মাটিতে কোন ফসল ফলানোই অসম্ভব হয়ে পড়বে।
২. উচ্চ ফলনশীল ও হাইব্রিড জাতের চাষ বৃদ্ধি
বর্তমানে অধিক ফলন পাওয়ার জন্য ব্যাপকভাবে উচ্চ ফলনশীল ও হাইব্রিড জাতের চাষ করা হচ্ছে। এসব উচ্চ ফলনশীল ও হাইব্রিড জাত মাটি থেকে কম ফলনশীল দেশীয় জাতের চেয়ে অধিক হারে খাদ্য উপাদান গ্রহণ করে থাকে। ফলে, যত বেশি উচ্চফলনশীল ও হাইব্রিড ফসলের আবাদ করা হচ্ছে জমির খাদ্য ভাণ্ডার তত দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে।
৩. একক ফসলের আবাদ বৃদ্ধি
সব ফসলের শিকড় সমান বড় নয় এবং মাটির সমান গভীরতায় বিস্তার লাভ করে না। কাজেই, একই জমিতে ক্রমাগত একই ফসলের আবাদ করা হলে সে ফসল মাটির একটি নির্দিষ্ট স্তর থেকে খাদ্য গ্রহণ করে থাকে। ফলে, মাটির সেই নির্দিষ্ট স্তরের উর্বরতা দ্রুত হ্রাস পায়। যেমন: ধানের শিকড় মাটির খুব বেশি গভীরে যায় না। কাজেই, একই জমিতে বারবার ধান চাষ করা হলে উপরের দিকের মাটি থেকে ধান খাদ্য গ্রহণ করার ফলে উপরের স্তরের মাটি অধিক অনুর্বর হয়ে পড়ে। অন্যদিকে, পানিতে ধুয়ে যে খাদ্যোপাদান নিচে চলে যায় তা আর ধানের কোন কাজে লাগে না। এভাবে প্রয়োগকৃত সার এবং মাটির খাদ্যোপাদানেরও অপচয় ঘটে।
৪. শস্য চাষের নিবিড়তা বৃদ্ধি
এ দেশে মানুষ যখন কম ছিল তখন খাদ্যের চাহিদাও ছিল কম। তখন বছরে দু’একটা ফসল ফলানো হতো এবং বাকি সময় জমি পতিত থাকতো। বর্তমানে প্রায় সকল জমিতেই বছরে ৩-৪টি ফসল ফলানো হচ্ছে। বর্তমানে ফসল চাষের নিবিড়তা শতকরা প্রায় ২০০%-এ পৌছে গেছে। জমিকে কোনরকম বিশ্রামই দেওয়া হচ্ছে না। এভাবে ফসল চাষের নিবিড়িতা যত বাড়ছে মাটির খাদ্য ভাণ্ডারও তত দ্রুত নিঃশেষ হয়ে মাটি অনুর্বর হয়ে পড়ছে।
৫. পাটের চাষ হ্রাস
পাটকে একসময় সোনালি আঁশ বলা হতো। পাটের মৌসুমে মাঠে মাঠে শোভা পেত শুধু পাট আর পাট। পাট চাষে কোন রাসায়নিক সার, বালাইনাশক বা সেচের প্রয়োজন হতোনা। বীজ ও জমি চাষের খরচ ছাড়া অতিরিক্ত খরচ বলতে ছিল শুধু নিড়ানি খরচ। এভাবে প্রায় বিনা খরচে কৃষকেরা পাট ফলাত যা ছিল অত্যন্ত লাভজনক। তাছাড়া, পাট মাটি থেকে ধানের চেয়ে অনেক কম খাদ্য গ্রহণ করে। অন্যদিকে, পাটের পাতা পঁচে মাটিতে যোগ হতো জৈব পদার্থ যা মাটির উর্বরতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখত। আজকাল ধানের উৎপাদন বাড়াতে গিয়ে পাট চাষ গুরুত্ব হারিয়েছে। পাশাপাশি, নিজেদের সীমাহীন দুর্নীতি ও লুটপাট এবং ভারতের সাথে প্রতিযোগিতায় মার খেয়ে আমরা সারা বিশ্বে পাটের বাজার হারিয়েছি। একসময়ের সোনালি আশ গলার ফাঁসে পরিণত হয়েছে। লোকসানের যুক্তি সামনে রেখে মূলত বিশ্বব্যাংকের চাপে আদমজীসহ দেশের অনেকগুলো পাটকল একে একে বন্ধ করা হয়েছে। পাট ও পাটজাতদ্রব্যের রপ্তানি কমে যাওয়ায় পাটের মূল্য কমেছে। ফলে, কৃষকেরা পাট চাষ বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছে।
৬. রবিশস্যের চাষ হ্রাস
একসময় এ দেশের কৃষকের কাছে রবিশস্যের চাষ ছিল খুবই জনপ্রিয় এবং অপরিহার্য। সরিষা, তিল, তিষি ইত্যাদি তেলজাতীয় ফসল; মসুর, খেসারি, ছোলা, মুগ, মটর, মাসকলাই ইত্যাদি ডালজাতীয় ফসল ইত্যাদি রবিশস্যের চাষ মাটির জন্য খুবই উপকারী। কেননা, এগুলো মাটি থেকে ধানের চেয়ে অনেক কম পরিমানে খাদ্য গ্রহণ করে থাকে। কাজেই, জমিতে শুধু ধান চাষ না করে এসব ফসলের চাষ মাটির উর্বরতা রক্ষায় খুবই সহায়ক। অথচ বর্তমানে কৃষকেরা অধিক লাভের আশায় শুধু ধান চাষ করতেই বেশি আগ্রহী।
৭. সেচের সংখ্যা ও খরচ বৃদ্ধি
বর্তমানে বোরো মৌসুমে ধানের জমিতে প্রায় প্রতিদিন বা একদিন পর পর সেচ দিতে হচ্ছে। এমনকি বর্তমানে সেচ ছাড়া আমন ধান চাষও সম্ভব হচ্ছে না। এর প্রধান কারণ হল একদিকে, আধুনিক উচ্চফনশীল ও হাইব্রিড জাতগুলোর পানির চাহিদা খুব বেশি অন্যদিকে, জৈব পদার্থ খুব কমে যাওয়ায় মাটির পানি ধরে রাখার ক্ষমতাও কমে গেছে। কারণ, জৈব পদার্থ মাটির পানি ধরে রাখার ক্ষমতা বাড়ায়। কাজেই, সেচ দেওয়ার পর তা দ্রুত নিচের দিকে চলে যায়। আবার ডিজেলের দাম দিন দিন বেড়েই চলেছে। সুতরাং একদিকে সেচের চাহিদা বৃদ্ধি অন্যদিকে ডিজেলের মূল্য অত্যাধিক বৃদ্ধি, প্রধানত এই দুই কারণে বর্তমানে সেচ বাবদ প্রচুর অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। কোন কোন এলাকায় উৎপাদিত ফসলের একতৃতীয়াংশ শুধু সেচ খাতেই ব্যয় হচ্ছে।
৮. খরায় ফসলহানি এবং পানীয় জলের সংকট বৃদ্ধি
আমাদের অনেক দেশী জাত ছিল যেগুলোর খরা সহ্য করার ক্ষমতা ছিল বেশি এবং সেচের পানির প্রয়োজনও হতো কম। পক্ষান্তরে, উফশী ও হাইব্রিড জাতগুলো অতিমাত্রায় সেচনির্ভর। আজকাল খরা মৌসুমে নদী নালায় সেচের জন্য পর্যাপ্ত পানি থাকছে না। পাশাপাশি, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে বর্ষাকালেও পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত হচ্ছে না বিধায় আমন মৌসুমেও সেচ দিয়ে ধান চাষ করতে হচ্ছে। তাই গভীর ও অগভীর নলকূপের সাহায্যে মাটির নিচের পানি তুলে সেচ দিতে হচ্ছে। ক্রমাগতভাবে সেচের চাহিদা বৃদ্ধির ফলে ভ‚গর্ভস্থ পানি উত্তোলনের মাত্রা ক্রমাগত বেড়েই চলেছে যার ফলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ক্রমশ নিচে নেমে যাচ্ছে। ফলে, সেচের ভরা মৌসুমে দেশের অনেক স্থানে গভীর ও অগভীর নলকূপে পর্যাপ্ত পানি উঠছে না। তাই সেচকাজ ব্যাহত হওয়ায় ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। অন্যদিকে, শুষ্ক মৌসুমে টিউবয়েলে পানি উঠছেনা। দেখা দিচ্ছে পানীয় জলের সংকট। পাশাপাশি, ভূগর্ভস্থ পানির অত্যধিক ব্যবহারের কারণে অনেক স্থানে দেখা দিয়েছে আর্সেনিক সমস্যা।
৯. বন্যায় ফসলহানির ঝুঁকি বৃদ্ধি
আামাদের কিছু দেশী জাত ছিল যেগুলো বন্যার পানির সাথে সাথে বেড়ে উঠতো। নিচু জমিতে যেখানে বন্যার পানি উঠে সেখানে এগুলোর চাষ করা হলে ফলন কিছুটা কম হলেও ফসল নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি ছিল কম। কিন্তু বর্তমান জাতগুলোর সে ক্ষমতা নেই। তাই প্রতিবছর বন্যায় প্রচুর ধান নষ্ট হয়। তাছাড়া, বর্তমানে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বন্যার তীব্রতা ও স্থায়িত্ব বাড়ছে যা আরও বাড়বে বলে বিজ্ঞানীরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। আজ তাই বন্যা সহনশীল জাতগুলোর চাহিদা নতুন করে অনুভূত হচ্ছে। কিন্তু উফশী জাতের ব্যাপক প্রসারের ফলে এই জাতগুলো আজ বিলুপ্তপ্রায়।
১০. পোকামাকড় ও রোগবালাইয়ের আক্রমণ বৃদ্ধি
আমাদের দেশী জাতে রোগ-বালাই ও পোকার আক্রমণ হতো কম। কারণ, তখন ইকোসিস্টেমের মধ্যে ভারসাম্য বজায় ছিল বলে ক্ষতিকর পোকা প্রাকৃতিকভাবেই দমিত থাকতো। কিন্তু এখন নির্বিচারে রাসায়নিক বালাইনাশক প্রয়োগের ফলে ফসলের মাঠের ইকোসিস্টেম আজ ধ্বংসপ্রাপ্ত। অন্যদিকে, আধুনিক উচ্চফলনশীল জাতগুলোতে রোগ-বালাই ও পোকার আক্রমণ দিন দিন এত বাড়ছে যে, দফায় দফায় বালাইনাশক প্রয়োগ করেও তাদের দমন করা যাচ্ছে না। ফলে, বালাইনাশক বাবদ প্রচুর খরচ করেও ফসল রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়ছে। তা ছাড়া, বর্তমানে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ফসলের রোগব্যাধি ও পোকামাকড়ের আক্রমণ বাড়ছে। এরূপ অবস্থার সাথে খাপ খাওয়ানোর জন্য রোগ ও পোকা প্রতিরোধী জাতগুলো আবার গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। কিন্তু সেসব জাতের অনেকগুলোই আজ বিলুপ্ত।
১১. ফসলবৈচিত্র্য হ্রাস
একসময় কৃষকরা দানাদার ফসল, ডালজাতীয় ফসল, তেল জাতীয় ফসল, মসলা জাতীয় ফসল এবং নানারকম শাক-সব্জি ইত্যাদি বৈচিত্র্যময় ফসল চাষ করতেন। অথচ, আজকাল হাতেগোনা কয়েকটি জাতের শস্য চাষ করা হচ্ছে যা আমাদের সমৃদ্ধ ফসলবৈচিত্র্যকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। অন্যদিকে, কৃষকদেরকে উচ্চ মূল্যে এসব শস্য বাজার থেকে কিনতে হচ্ছে। তাছাড়া, এসব ফসল মাটি থেকে ধানের চেয়ে অনেক কম খাদ্য গ্রহণ করে যা জমির উর্বরতাও দিন দিন কমে যাচ্ছে। পাশাপাশি, ধবংস হচ্ছে জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশ।
১২. কৃষকরে সমস্যা ও সংকট বৃদ্ধি
সম্পূর্ণ বাজারনির্ভর বর্তমান রাসায়নিক কৃষি কৃষককে নানাবিধ সংকটে নিপতিত করেছে। বীজ, সার, বালাইনাশক, ডিজেল ইত্যাদি সকল কৃষি উপকরণের মূল্য দিন দিন বেড়েই চলেছে। অনেক সময় উচ্চ মূল্য দিয়েও কৃষক এসব কিনতে পারে না। কারণ, বাজারে পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকেনা। তা ছাড়া, অতি মুনাফালোভী ব্যবসায়ীরা অনেক সময় কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে এসব উপকরণের মূল্য বাড়িয়ে দেয়। অন্যদিকে, ভেজাল বীজ, সার ও কীটনাশকে আজ বাজার সয়লাব। এসব ভেজাল উপকরণ ব্যবহার করে কৃষক একদিকে যেমন আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে অন্যদিকে তেমনি ফসলটাও নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এরূপ নানা সমস্যা ও সংকটের কারণে কৃষকেরা আজ দিশেহারা।
১৩. কৃষকের নিজস্ব জ্ঞান ও প্রযুক্তির বিলুপ্তি
হাজার বছর ধরে এ দেশের কৃষকেরা তাদের নিজস্ব জ্ঞান ও প্রযুক্তি ব্যবহার করেই চাষবাস করে আসছে। তারা বংশানুক্রমে পূর্বপুরুষের কাছ থেকে বা তাদের নিজস্ব অভিজ্ঞতা থেকে এসব জ্ঞান লাভ করেছে। একসময় এ দেশে যে ১২,৫০০ জাতের ধান চাষ করা হত তার সবই ছিল কৃষকের নিজের আবিষ্কার। কৃষক যেমন ফসলের ভাষা বুঁঝতো তেমনি ফসলও বুঁঝতো কৃষকের মনে কথা। ফসলের কখন কি দরকার সবই ছিল তাদের নখদর্পনে। আজ যেসব প্রযুক্তি আসছে তার কলাকৌশল কৃষকের অজানা। তারা এর-তার কাছ থেকে শুনে সেসব প্রযুক্তি ব্যবহার করতে গিয়ে প্রায়শই ক্ষতির শিকার হচ্ছে। সার ও কীটনাশকের ডিলার বা ব্যবসায়ীর কাছ থেকে পরামর্শ নিতে গিয়ে তাঁরা প্রায়শই প্রতারিত হচ্ছে। আগে ফসল উৎপাদনের জন্য বীজ, সার, বালাইনাশক বা অন্য কোন উপকরণের জন্য কৃষকের বাজারমুখী হতে হতোনা, নিজস্ব সম্পদ ও প্রযুক্তি দিয়েই ফসল ফলাত। নিজে বীজ উৎপাদন ও সংরক্ষণ করত। সারের প্রয়োজন ছিল না কারণ, তাদের ছিল প্রচুর জৈব সার। আর কীটনাশকের প্রয়োজনই হতো না। কৃষক ছিল স্বয়ংসম্পূর্ণ ও আত্মনির্ভরশীল। আজ কৃষক সবদিক থেকেই পরনির্ভরশীল হয়ে পড়ছে যা তাদের জন্য খুবই বিপদজ্জনক।
যাহোক, একথা সত্য যে সবুজ বিপ্লব প্রযুক্তিনির্ভর রাসায়নিক কৃষি দেশের খাদ্য উৎপাদন অনেকগুণ বাড়িয়েছে। কিন্তু এতে দেশের সংখ্যাগরিষ্ট ক্ষুদ্র, প্রান্তিক ও ভূমিহীন কৃষকের কতটুকু লাভ হয়েছে তা ভেবে দেখার যথেষ্ট অবকাশ রয়েছে। এ দেশের মাটি, পানি, পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য, মানবস্বাস্থ্য ইত্যাদি বিভিন্ন দিকে রাসায়নিক কৃষির উপরে বর্ণিত ক্ষতিকর প্রভাবগুলোকে বাদ দিয়ে যদি শুধু কৃষকের প্রত্যক্ষ লাভটাকেই বিবেচনায় নেয়া হয় তবুও যে চিত্র পাওয়া যাবে তা মোটেও আশাব্যঞ্জক নয়। বাস্তব সত্য এই যে, সবুজ বিপ্লবের কল্যাণে কৃষির যে প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে তার সিংহভাগই চলে গেছে বহুজাতিক কোম্পানি, তাদের দেশীয় এজেন্ট এবং ব্যবসায়িদের পকেটে। হিসেব করে দেখা গেছে যে, ধানের উৎপাদন খরচের সাথে কৃষকের নিজস্ব শ্রম ও জমির মূল্য বিবেচনায় নিলে ধান চাষে লাভ দুরে থাকুক উৎপাদন খরচটাই কৃষক উঠাতে পারে না। অন্যান্য ফসলের ক্ষেত্রেও এটাই সত্য। এভাবে লোকসান দিয়েই কৃষক এই জাতির মুখে অন্ন তুলে দিচ্ছে। অথচ, রাতারাতি ফুলে-ফেঁপে উঠেছে সার-বীজ-বালাইনাশক ও কৃষি যন্ত্রপাতি বিক্রেতা কোম্পানি ও ব্যবসায়ি এবং মধ্যস্বত্বভোগীরা।
আজ রাসায়নিক সারের ক্রমবর্ধমান চাহিদার কারণে ব্যাঙের ছাতার মতো গজাচ্ছে ভেজাল সারের কোম্পানি। কৃষকের ফসল ক্ষতিগ্রস্ত করে তারা দেদারছে মুনাফা লুটছে। দেশে গড়ে উঠেছে অসংখ্য বালাইনাশক ও বীজ কোম্পানি। তারা দেদারছে ব্যবসা করে যাচ্ছে। পক্ষান্তরে, কৃষক ধার-দেনা করে, নিজের সর্বস্ব খুইয়ে সার, ডিজেল, বালাইনাশক কিনে যে ফসল ফলাচ্ছে তারও ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। মৌসুমে কম দামে ফসল বিক্রি করে ধার-দেনা শোধ করতে গিয়ে নিজের খাওয়ার মতো ধানও ঘরে রাখতে পারছে না। ডাল, তেল, পেয়াজ, রসুন – এসব কিনতে গিয়ে সে আরও দেনাদার হচ্ছে। এটাই যদি হয় দেশের সংখ্যাগরিষ্ট ক্ষুদ্র, প্রান্তিক ও ভূমিহীন কৃষকের প্রকৃত অবস্থা তবে কেন এই রাসায়নিক কৃষি, কেনইবা নিজের পকেটের পয়সা খরচ করে নিজের বিপদ ডেকে আনা – তা গভীরভাবে ভেবে দেখা দরকার।
রাসায়নিক সারের ক্ষতিকর প্রভাব
বিজ্ঞানীগণ পরীক্ষা করে দেখেছেন যে, যেকোন ফসলের জন্য ১৬টি পুষ্টি উপাদান অত্যাবশ্যক। অর্থাৎ এই ১৬টি পুষ্টি উপাদানের যে কোন একটিরও যদি অভাব ঘটে তবে সে ফসল আশানুরূপ ফলন দিতে পারবে না। যেমনঃ মানুষের জন্য আয়রন একটি অত্যাবশ্যক পুষ্টি উপাদান। কারও শরীরে এই আয়রনের অভাব হলে সে সুস্থ থাকতে পারে না; রক্তশূণ্যতায় ভোগে। বেশি অভাব হলে মারাও যেতে পারে। গাছের বা ফসলের অত্যাবশ্যক পুষ্টি উপাদানগুলো হল কার্বন, হাইড্রোজেন, অক্সিজেন, নাইট্রোজেন, ফসফরাস, পটাশিয়াম, সালফার, ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম, ম্যাঙ্গানিজ, দস্তা, লৌহ, মলিবডেনাম, বোরন, কপার ও ক্লোরিন। এ ছাড়া ডাল জাতীয় ফসলের জন্য একটি অতিরিক্ত পুষ্টি উপাদান প্রয়োজন হয়, তা হল কোবান্ট। এগুলোর মধ্যে কার্বন, হাইড্রোজেন ও অক্সিজেন বাতাস ও পানি থেকে গাছ পেয়ে থাকে। বাকি ১৩ টি পুষ্টি উপাদান গাছ নেয় মাটি থেকে। অর্থাৎ কোন মাটিতে এই ১৩ টি পুষ্টি উপাদানের একটিরও অভাব থাকলে সে মাটি থেকে ভাল ফসল পাওয়া সম্ভব নয়।
কোন মাটিতে ফসলের চাহিদা মোতাবেক সব ধরণের পুষ্টি উপাদান সুষম মাত্রায় বিদ্যমান থাকলে তাকে উর্বর মাটি বলা হয়। আর যদি কোন একটি পুষ্টি উপাদানেরও ঘাটতি থাকে তবে তাকে উর্বর মাটি বলা যায় না। অনেকে বলেন যে, এ দেশের মাটি খুব উর্বর যা বর্তমানে মোটেও সত্য নয়। কারণ, এ দেশের প্রায় সব মাটিতেই এযাবৎ নাইট্রোজেন, ফসফরাস, পটামিয়াম, সালফার, দস্তা ও বোরন – এই ছয়টি পুষ্টি উপাদানের মারাত্মক অভাব দেখা দিয়েছে। কোন কোন জমিতে এই ছয়টি ছাড়াও অন্য আরও কয়েকটি পুষ্টি উপাদানের ঘাটতি দেখা যাচ্ছে। কাজেই, এসব পুষ্টি উপাদানগুলো রাসায়নিক সার হিসেবে কৃত্রিমভাবে মাটিতে দিয়ে ফসল ফলানো হচ্ছে। এমন দিন দূরে নয় যখন মাটিতে ১৩টি পুষ্টি উপাদানেরই ঘাটতি দেখা দিবে। তখন ফসল চাষ করতে গেলে তের রকম সার প্রয়োগ করতে হবে। তবে একথা অবশ্যই সত্য যে, এক সময় এ দেশের মাটি অত্যন্ত উর্বর ছিল। তখন মাটিতে কোন পুষ্টি উপাদানের ঘাটতি ছিল না। তখন কোন সার ছাড়াই ফসল ফলানো সম্ভব ছিল।
আমরা জমিতে যেসব সার দিই সেগুলোতে এক বা একাধিক অত্যাবশ্যক পুষ্টি উপাদান থাকে। যেমনঃ ইউরিয়া সারে থাকে নাইট্রোজেন, টিএসপি সারে থাকে ফসফরাস, এমপি সারে থাকে পটাশিয়াম, জিপসাম সারে থাকে ক্যালসিয়াম ও সালফার ইত্যাদি। এভাবে গাছের প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান যোগান দেওয়ার জন্য বাইরে থেকে যেসব রাসায়নিক দ্রব্য আমরা জমিতে দিই তাই রাসায়নিক সার। তবে, শুধু কোন একটি পুষ্টি উপাদানকে সরাসরি মাটিতে প্রয়োগ করা যায়না। যেমনঃ নাইট্রেজেন এক প্রকার গ্যাসীয় পদার্থ। বাতাসের শতকরা প্রায় ৭৮ ভাগই নাইট্রোজেন। কিন্তু এই নাইট্রোজেন গাছ সরাসরি গ্রহণ করতে পারে না বা এটাকে সার হিসেবে মাটিতে দেওয়া যায় না। তাই নাইট্রোজেন মাটিতে দেওয়া হয় ইউরিয়া আকারে। এই ইউরিয়ায় নাইট্রোজেন থাকে মাত্র শতকরা ৪৬ ভাগ। বাকী শতকরা ৫৪ ভাগে থাকে কার্বন, হাইড্রোজেন ও অক্সিজেন। কাজেই কোন জমিতে যদি ১০০ কেজি ইউরিয়া সার প্রয়োগ করা হয় তবে ৪৬ কেজি নাইট্রোজেনের সাথে সাথে ৫৪ কেজি কার্বন, হাইড্রোজেন ও অক্সিজেন মাটিতে যুক্ত হয়। আমরা ইতোমধ্যেই জেনেছি যে, কার্বন, হাইড্রোজেন ও অক্সিজেন গাছ বাতাস ও পানি থেকে নিয়ে থাকে। কাজেই, ইউরিয়ার সাথে যে কার্বন, হাইড্রোজেন ও অক্সিজেন মাটিতে যুক্ত হয় তা মাটিতেই জমা থাকে। এভাবে অপ্রয়োজনীয় রাসায়নিক উপাদান মাটিতে জমে জমে মাটির স্বাভাবিক রাসায়নিক গঠনকে পাল্টে দেয় যা মাটির জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর।
রাসায়নিক সারকে কৃত্রিম ঔষধের সাথে তুলনা করা যায়। ভিটামিন বা আয়রনসমৃদ্ধ খাদ্য থেকেই আমরা আমাদের শরীরের প্রতিদিনকার চাহিদামত ভিটামিন বা আয়রন পেয়ে থাকি। কিন্তু যদি কখনও শরীরে ভিটামিন বা আয়রনের অভাব দেখা দেয় তবে ঔষধের দোকান থেকে কেনা ভিটামিন বা আয়রন সিরাপ খেয়ে সে অভাব পূরণ করা যায়। এখন যদি কেউ মনে করে যে, সে ভিটামিন বা আয়রনসমৃদ্ধ খাদ্য না খেয়ে শুধু সিরাপ খেয়েই বেঁচে থাকবে তবে সেটা কি সম্ভব হবে না সুবিচেনাপ্রসূত কাজ হবে? নিশ্চয়ই না। কাজেই, আমরা যেমন শুধু সিরাপ খেয়ে বেঁচে থাকতে পারব না তেমনি রাসায়নিক সার খাইয়েও মাটিকে বেশি দিন বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব নয়। মাটিকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে প্রয়োজন খাদ্যের। আর মাটির এরূপ খাদ্য হল জৈব সার।
আমাদের মাটিতে যেটুকু জৈব পদার্থ এখনও অবশিষ্ট আছে তা থেকে উপরোক্ত ছয়টি ছাড়া বাকি খাদ্য উপাদাগুলো এখনও গাছ পাচ্ছে, তাই সেগুলো সার হিসেবে প্রয়োগ করা ছাড়াই এখনও ফসল ফলানো সম্ভব হচ্ছে। কিন্তু বর্তমান অবস্থা চলতে থাকলে এমন দিন দূরে নয় যখন মাটি জৈবপদার্থশূন্য হয়ে পড়বে। আর তখন ১৩ প্রকার সার দিয়েও আশানুরূপ ফসল ফলানো সম্ভব হবে না।
বর্তমানে সারের পরিমাণ বাড়ানোর পরও ফসলের ফলন স্থবির রয়েছে বা দিন দিন কমছে। এরূপ দিন দিন সার বেশি লাগা এবং ফলন কমে যাওয়ার মূল কারণ হল মাটির জৈব পদার্থ কমে যাওয়া। আগে যেসব ফসল চাষ করা হত, যেমন লম্বা জাতের ধান, সেগুলোর একটা বড় অংশ মাঠেই থেকে যেত যা জমিতে জৈব পদার্থ যোগ করত। পাশাপাশি, জমিতে বছরে দুএকটা ফসল ফলানো হতো এবং বাকি সময় জমি পতিত থাকতো। ফলে পতিত জমিতে আগাছা এবং বিভিন্ন গাছ-গাছড়া জন্মাত। এগুলো মাটিতে মিশে যোগ হতো জৈব সার। তা ছাড়া সব কৃষকের বাড়িতেই প্রচুর গোবর ও ছাই হতো যা তারা জমিতে প্রয়োগ করত। কিন্তু আজকাল যান্ত্রিক চাষাবাদ করতে গিয়ে গবাদি পশুপাখির সংখ্যা ব্যাপকভাবে হ্রাস পেয়েছে। ফলে, জৈব সারের প্রধান উৎস গোবরের সহজলভ্যতা অনেক কমেছে। গোবর যেটুকু আছে জ্বালানির অভাবে তাও রান্নার কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। ফলে, জমিতে জৈব সারের ব্যবহার মারাত্মকভাবে হ্রাস পেয়েছে। বর্তমানে জমিতে প্রচুর পরিমাণে রাসায়নিক সার যেমনঃ ইউরিয়া, টিএসপি, এমপি, জিপসাম, দস্তা সার ইত্যাদি প্রয়োগ করা হচ্ছে। এসব সার মাটির স্বাভাবিক রাসায়নিক গঠনকে নষ্ট করে দিয়ে মাটিকে বিষাক্ত করে তুলছে। ফলে, মাটির জৈব পদার্থ এবং অনুজীবের ক্রিয়া কমে গিয়ে জমির উর্বরতা মারাতœভাবে হ্রাস পাচ্ছে। উর্বর মাটিতে কমপক্ষে ৫% জৈব পদার্থ থাকা দরকার কিন্তু আমাদের দেশের মাটিতে তা ১%-এরও নীচে নেমে গেছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে একসময় মাটি জৈব পদার্থশূন্য হয়ে পড়বে। তখন এ মাটিতে কোন ফসল ফলানো সম্ভব হবে না। কারণ-
১. জৈব পদার্থ মাটিতে গাছের জন্য খাদ্যের ভাণ্ডার বা গোলা হিসেবে কাজ করে। আমরা যেমন গোলায় ধান বা চাল জমা করে রাখি এবং সারাবছর সেখান থেকে প্রয়োজনমতো নিয়ে নিয়ে খাই ঠিক তেমনি জৈব পদার্থও মাটিতে গাছের জন্য খাদ্য জমা করে রাখে এবং গাছ সেখান থেকে তার প্রয়োজনমতো খাদ্য নিয়ে খায়। জমিতে যে সার দেওয়া হয় সেটাও গাছের জন্য সহজলভ্য হতে গেলে মাটিতে পর্যাপ্ত জৈব পদার্থ থাকা প্রয়োজন। কাজেই মাটিতে জৈব পদার্থ না থাকলে প্রয়োগকৃত সেসব সারের বেশির ভাগ অংশই মাটি থেকে পানির সাথে ধূয়ে নীচের দিকে চলে যায়।
২. জৈব পদার্থ মাটির পানি ধরে রাখার ক্ষমতা বাড়ায়। যে মাটিতে পর্যাপ্ত জৈব পদার্থ থাকে সে মাটিতে পানি দিলে তাতে অনেক দিন পর্যন্ত পানি থাকে। মাটির পানি ধরে রাখার ক্ষমতা কমে গেলে সে মাটিতে ভাল ফসল ফলানো সম্ভব নয়।
কাজেই জৈবপদার্থশূন্য মাটিতে ভাল ফসল ফলানো সম্ভব নয়। উদাহরণস্বরূপ, বেলে মাটির কথা ধরা যাক। বেলে মাটি পানি ধরে রাখতে পারে না তাই এরূপ মাটিতে ফসলও ভাল হয়না। এর একমাত্র কারণ হল বেলে মাটিতে জৈব পদার্থ থাকে খুবই কম।
জৈব পদার্থ মাটির প্রাণ। জৈব পদার্থ কমতে কমতে আমাদের মাটি ক্রমেই নিষ্প্রাণ হয়ে যাচ্ছে। আমরা শুধু কৃত্রিম স্যালাইন (রাসায়নিক সার) খাইয়ে মাটিকে বাঁচিয়ে রেখেছি। আজ আমাদেরকে ভাবতে হবে, আমরা আমাদের মাটিকে যে পর্যায়ে নিয়ে এসেছি তা আমাদের ভবিষ্যৎ বংশধরদের খাদ্যের যোগান দিতে পারবে কিনা। যেখানে ২০২০ সালে এ দেশের জনসংখ্যা বেড়ে দাড়াবে ১৮ কোটি অথচ এখনই ফলন কমতির দিকে। মাটির প্রাণ যদি মারা যায়, যতই রাসায়নিক সার আর উন্নত জাত চাষ করা হউক না কেন ফলন কিছুতেই বাড়বেনা, বরং কমবে। তা হলে আগামী বংশধরদের খাবার আসবে কোথা থেকে? সময় থাকতে বিষয়টি ভেবে দেখা অত্যন্ত জরুরী।