বাংলাদেশে বালাইনাশকের ব্যবহার

১৯৫৬ সালে তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের প্ল্যান্ট প্রোটেকশন উইং প্রথমবারের মতো বর্তমান বাংলাদেশ ভূখণ্ডে বালাইনাশকের আমদানি করে। সেসময় বিনামূল্যে এসব বালাইনাশক কৃষককে দেওয়া হয়েছে। স্বাধীনতাউত্তর বাংলাদেশ সরকারও ১৯৭৪ সাল পর্যন্ত বালাইনাশকের ক্ষেত্রে শতকরা ১০০ ভাগ ভর্তুকী দিয়েছে। ১৯৭৯ সালে ভর্তুকীর পরিমাণ কমিয়ে ৫০ শতাংশে নামানো হয়। বিশ্বব্যাংকের কাঠামোগত সংস্কার কর্মসূচির আওতায় সরকারি ভর্তুকী প্রত্যাহার এবং বেসরকারি খাতে বালাইনাশক আমদানির অনুমতি দেওয়া হয় ১৯৮০ সালে। ভর্তুকি প্রত্যাহার করা সত্তে¡ও ১৯৮৫ সাল থেকে ৯০ সালের মধ্যে দেশে বালাইনাশকের ব্যবহার দ্বিগুণ বেড়েছে যা বালাইনাশকের উপর কৃষকের অত্যধিক নির্ভরশীলতাকেই নির্দেশ করে। ১৯৮৫-৮৬ সালে ব্যবহৃত বালাইনাশকের পরিমাণ ছিল ৩০০০ মেট্রিক টন যা ১৯৯০ সালে বেড়ে দাড়ায় ৬০০০ মেট্রিক টন। পরবর্তীকালে বালাইনাশকের ব্যবহারের হার দ্রুত থেকে দ্রুততর হয়। ১৯৯৫-৯৬ সালে ব্যবহৃত বালাইনাশকের পরিমাণ ছিল ১৬,০০০ মেট্রিক টন এবং ২০০৩ সালে ২০,০০০ মেট্রিক টন। বিদেশ থেকে আমদানি করা এসব বালাইনাশকের শতকরা ৮০ ভাগই ব্যবহার করা হয ধান উৎপাদনের ক্ষেত্রে। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, বর্তমানে দেশে ৯১ লাখ হেক্টর কৃষি জমির ৮০ ভাগই ধান উৎপাদনের জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে।

বাংলাদেশ নিষিদ্ধ বালাইনাশকের অবাধ বাজার

বালাইনাশকের উপর কৃষকদের অত্যধিক নির্ভরশীলতা এবং সরকারি নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার দুর্বলতার সুযোগকে কাজে লাগিয়ে কোম্পানিগুলো পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর এবং শিল্পোন্নত দেশে নিষিদ্ধ বালাইনাশক বাংলাদেশে আমদানি ও বাজারজাত করে আসছে। দেশে আমদানিকৃত ও ব্যবহৃত বালাইনাশকের মধ্যে কয়েকটি অতি উচ্চমাত্রায় বিষাক্ত যেগুলো মানুষ ও পরিবেশের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। এই শ্রেণীর অন্তর্ভূক্ত বালাইনাশকগুলো ‘ডার্টি ডজন’ নামে পরিচিত। এ ধরণের বালাইনাশকের বর্তমান সংখ্যা ১৭টি। ডিডিটি, হেপ্টাক্লোর, কোরডেন, এনড্রিন, ডাইএলড্রিন, অরড্রিন, কেমকেবোর, লিনড্রেন, বিএইচসি, প্যারাথিয়ন, ডাইব্রোমো-ক্লোরোপেনটিন, প্যারাকোয়াট, টক্সাফেন, ২-৪ডি, এলডিকার্ব, পেন্টাক্লোরোফেনল, মিথক্সি-ইথাইল, মার্কারি ক্লোরাইড এবং ইথাইলিন ডাইব্রোমাইড। শিল্পোন্নত বিভিন্ন দেশে এই সবগুলো বালাইনাশকই নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এমনকি যেসব দেশ এসব বালাইনাশক উৎপাদন করে সেসব দেশেও এগুলোর ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে। অথচ দুঃখজনক হলেও সত্য যে, এসব বালাইনাশকের অনেকগুলোই বৈধ বা অবৈধভাবে আমাদের দেশে দেদারছে চলছে। আরও হতাশাজনক ব্যাপার হল, এসব বালাইনাশকের ব্যবহার বন্ধ করার জন্য কার্যকর কোন পদক্ষেপও নেওয়া হচ্ছে না।

যাহোক, এসব বালাইনাশক ব্যবহারের ফলে বাংলাদেশের মানুষের স্বাস্থ্য, পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য, মৎস্যসম্পদ ইত্যাদি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। নিম্নে এসব ক্ষতিকর প্রভাবগুলো সংক্ষেপে আলোচিত হল।

১. মানব-স্বাস্থের উপর প্রভাব

আজকাল প্রায় সব ফসলেই বিষাক্ত বালাইনাশক প্রয়োগ করা হচ্ছে যা আমরা প্রতিদিন জেনে বা না জেনে খাচ্ছি। আমাদের পুষ্টির জন্য সবুজ শাক-সব্জি ও রঙ্গিন ফলমূল খাওয়া অত্যন্ত জরুরী। কিন্তু আমরা যেসব শাক-সব্জি ও ফলমূল খাচ্ছি সেগুলোর উৎপাদন প্রক্রিয়া থেকে শুরু করে সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণ পর্যন্ত প্রতিস্তরে এসব বিষ প্রয়োগ করা হচ্ছে। বিষাক্ত বালাইনাশক প্রয়োগ করে উৎপাদনের পর এসব শাক-সব্জি এবং ফলমূল যেমনঃ আম, কাঁঠাল, কলা, লিচু, পেঁপে, টমেটো ইত্যাদি পাকানো ও টাটকা রাখা এবং ক্রেতাদের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য প্রয়োগ করা হচ্ছে কার্বাইড ও ইথারেল নামক বিষাক্ত পদার্থ। এসব রাসায়নিক পদার্থের একটি অংশ ফলের খোসার শুক্ষè ছিদ্র দিয়ে ভিতরে প্রবেশ করে। পরবর্তীতে এ ফল কেউ খেলে এসব বিষাক্ত পদার্থ তার দেহে প্রবেশ করে যা লিভার ও কিডনিসহ মানব দেহের বিভিন্ন ধরণের ক্ষতি সাধন করতে পারে। অথচ, প্রতিদিনই আমরা সেই বিষাক্ত ফল-ফলাদি ও শাক-সব্জি খাচ্ছি এবং আমাদের শিশুদেরকে খাওয়াচ্ছি। এসব বিষের প্রভাবে একদিকে যেমন দেখা দিচ্ছে নানান রোগ-বালাই অন্যদিকে তেমনি জীবনী শক্তিও হ্রাস পাচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসী অনুষদের অধ্যাপক চৌধুরী মাহমুদ হাসানের মতে, এসব রাসায়নিক পদার্থ রান্নাতেও দূর হয় না এবং তা লিভার ও কিডনির জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। কাজেই নীরব ঘাতকের মতো এসব আকর্ষণীয় খাদ্য আমাদেরকে নিশ্চিত মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

বিষাক্ত বালাইনাশক শুধু যে ফসল চাষেই ব্যবহৃত হচ্ছে তাই নয়, বিভিন্ন খাদ্যসামগ্রী প্রক্রিয়াজাতকরণ, সংরক্ষণ ও গুদামজাত করার কাজেও ব্যবহৃত হচ্ছে। আমাদের দেশে শুটকি মাছ প্রক্রিয়াজাত ও গুদামজাত করার জন্য নির্বিচারে ডিডিটি, নকরোজ, নগস, বাসুডিন প্রভৃৃতি অত্যন্ত ক্ষতিকারক বালাইনাশক ব্যবহার করা হয়। বাংলাদেশ আণবিক শক্তি কমিশনের গবেষণাগারের পরীক্ষায় দেখা গেছে যে, শুটকি মাছে যেসব বিষাক্ত বালাইনাশক ব্যবহার করা হচ্ছে সেগুলোর বিষাক্ত উপাদান গরম পানিতে ধোয়ার পরও শুটকি মাছে প্রচুর পরিমাণে থেকে যায়। অর্থাৎ রান্না করা শুকটি মাছ কোনভাবেই বিষমুক্ত হচ্ছে না। ফলে তা চুড়ান্তভাবে মানুষের খাদ্যচক্রে প্রবেশ করছে। বিজ্ঞানীদের দাবী বাংলাদেশে মানব দেহে গড়ে ১২.৫ পিপিএম ডিডিটি রয়েছে যা ইংল্যাণ্ডের মানুষের তুলনায় ৫ গুণ বেশি। বাংলাদেশে ১৪ বছর আগে ডিডিটি নিষিদ্ধ করা হলেও অদ্যাবধি এর ব্যবহার বন্ধ হয়নি।

ব্রাজিল, হংকং ও মেক্সিকোসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গবাদি পশুর দুধে এমনকি মায়ের দুধেও ক্যান্সার সৃষ্টিকারী বালাইনাশকের অবশেষ পাওয়া গেছে। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের সুদূর গ্রামাঞ্চলে মায়ের বুকের দুধে বালাইনাশকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। লন্ডনভিত্তিক সংগঠন উইমেনস এনভাইরোনমেন্টাল নেটওয়ার্কের মতে, এসব বালাইনাশক বিষ একেবারে মাতৃগর্ভ থেকে শিশুর মারাত্মক ক্ষতি সাধন করে থাকে। গবেষকদের দাবী খাদ্যে বালাইনাশকের অবশেষ শিল্পোন্নত দেশগুলোতে ব্যাপক স্তন ক্যান্সার সৃষ্টির জন্য দায়ী। এসব দেশে ৩৪-৫৪ বছর বয়সের মহিলাদের মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ হল স্তন ক্যান্সার।

স¤প্রতি জাতিসংঘের ইউরোপভিত্তিক অর্থনৈতিক কমিশন বলেছে উচ্চ বিষাক্ততাযুক্ত ১২টি বালাইনাশকের বিরূপ প্রতিক্রিয়ায় গত ৫০ বছরে পুরুষের সন্তান উৎপাদন ক্ষমতা শতকরা ৪২ ভাগ কমে গেছে। এর কারণ হিসেবে ধারণা করা হচ্ছে যে, চাষাবাদে ব্যবহৃত রাসায়নিক সারসহ বিষাক্ত কীটনাশক ব্যবহার করে উৎপাদিত ফলমূল, শাক-সব্জি এবং অন্যান্য ফসল দূষিত হয়ে পড়ছে যা খেয়ে মানুষ দীর্ঘমেয়াদি এ ধরণের বিরূপ প্রতিক্রিয়ার শিকার হচ্ছে।

ওয়ার্ল্ড রিসোর্স ইনস্টিটিউট-এর মতে, কৃষি খামার শ্রমিকদের মধ্যে এবং উন্নয়নশীল দেশে অধিকাংশ মৃত্যুর ঘটনা এবং বিশেষ করে ক্যান্সার, বিভিন্ন সংক্রামক ব্যাধি ও অন্যান্য অসুস্থতা বালাইনাশকের কারণে ঘটছে। তাদের মতে, বালাইনাশক শরীরের স্বাভাবিক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা নষ্ট করে দেয়।

কৃষকরা জমিতে জিঙ্ক ও অক্সি সালফেট অধিকহারে ব্যবহার করে থাকে। অথচ জিঙ্ক ও অক্সি সালফেটে রয়েছে বিষাক্ত ক্যাডমিয়াম ও সীসা। খাদ্যচক্র বা পানির মাধ্যমে ক্যাডমিয়াম এবং সীসা মানবদেহে প্রবেশ করলে ক্যান্সার, উচ্চ রক্তচাপ এবং ফুসফুসের জটিল রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। বালাইনাশকের প্রতিক্রিয়ায় মানুষের বমি বমি ভাব, অন্ত্রে ব্যথা, শারীরিক দুর্বলতা, দীর্ঘমেয়াদী মাংসপেশী সংকোচন ও শ্বাসকষ্ট, ফুসফুসের রোগ, মাথা ব্যথা, ডায়রিয়া প্রভৃতি অসুবিধা দেখা দেয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার শ্রেণীবিন্যাস অনুসারে অত্যন্ত বিষাক্ত হিসেবে চিহ্নিত হেপ্টাক্লোর পাখি ও মানুষের জন্য অধিক ক্ষতিকর। এই বালাইনাশকের সংস্পর্শে এলে মানুষ লিউকোমিয়ায় আক্রান্ত হতে পারে। তা ছাড়া, মাতৃগর্ভস্থ শিশুর মৃত্যু ও বিকলাঙ্গ হওয়ার আশঙ্কা থাকে। বালাইনাশকের কারণে মানবদেহে যেসব স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদী স্বাস্থ্য সমস্যা দেখা দেয় সেগুলো নিম্নের ছকে তুলে ধরা হল।

স্বল্পস্থায়ী সমস্যা দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা
স্নায়ুবিক সমস্যা
শারীরিক দুর্বলতা, মাথা ধরা, বমি বমি ভাব, জ্বর, অতিরিক্ত ঘাম, লালা ঝরা, মুর্ছা যাওয়া ইত্যাদি প্যারালাইসিস, অবশ, বিষন্নতা
চোখের সমস্যা
জ্বালাপোড়া, চোখ দিয়ে পানি ঝরা, চোখে চুলকানি। চোখে ক্ষত হওয়া, চোখ নষ্ট হওয়া, চোখের বল নষ্ট হওয়া
হার্টের সমস্যা
নাড়ী দুর্বলতা, হার্ট এ্যাটাক বুকে ব্যথা
ফুসফুসের সমস্যা
স্বাসকষ্ট এ্যাজমা, ব্রংকাইটিস, ফুসফুস ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া
মূত্র ও প্রজনন সমস্যা
ঘন ঘন প্রস্রাব, বাচ্চা নষ্ট হয়ে যাওয়া কিডনি নষ্ট হওয়া, বন্ধাত্ব
ত্বক, মাংসপেশী ও হাড়ের সমস্যা
চুলকানি, ফুসকা পড়া ত্বক ঝুলে পড়া, পেশি শক্তি কমে যাওয়া, মাংস পেশিতে খিচুনি, একজিমা
পাকস্থলির সমস্যা
প্রচণ্ড পিপাসা, বমি, পেটে ব্যথা, ডাইরিয়া অরুচি, ওজন হ্রাস, অন্ত্রে রক্তক্ষরণ
লিভারে সমস্যা
নেক্রোসিস জণ্ডিস
অন্যান্য সমস্যা
ক্লান্তি, অবসাদ, দুশ্চিন্তা ক্যান্সার, স্তন ক্যান্সার, স্মৃতি শক্তি ও মনযোগ লোপ পাওয়া

 

২. মৎস্যসম্পদ ও জলজ প্রাণীর উপর প্রভাব

একসময় আমাদের নদী-নালা, খাল-বিল, হাওড়-বাওড়, জলাশয়ে প্রচুর মাছ ছিল। “মাছে-ভাতে বাঙ্গালী” – এটি ছিল একটি সর্বজনবিদিত প্রবাদ। আজকাল ফসলের মাঠে প্রচুর পরিমাণে বালাইনাশক প্রয়োগ করা হচ্ছে যেগুলো বৃষ্টি ও সেচের পানির সাথে মিশে নদী-নালা, খাল-বিল, পুকুর, ডোবা ইত্যাদি জলাশয়ে চলে যাচ্ছে। ফ্লাড এ্যাকশন প্লান (ফ্যাপ) এবং পরিবেশ অধিদপ্তর যৌথভাবে ১৯৯২-৯৩ সালে এ বিষয়ে এক সমীক্ষা চালায়। দেশের বিভন্ন অঞ্চলের বিল যেমনঃ গাইবান্ধার বিল, কুমিল­ার নিগার বিল এবং নোয়াখালির বেগমগঞ্জের বিল থেকে পানি সংগ্রহ করে ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা করা হয়। এতে দেখা যায় যে, বিলের পানিতে বিষাক্ত বালাইনাশক ডাইএলড্রিন-এর অবশেষ প্রতিলিটারে ০.৬৪ মাইক্রোগ্রাম যেখানে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত সহনীয় মাত্রা হচ্ছে ০.১৯ মাইক্রোগ্রাম। অর্থাৎ সহনীয় মাত্রার চেয়ে তিনগুনেরও বেশী। অপর একটি বিষাক্ত বালাইনাশক লিনড্রেন এর অবশেষ প্রতিলিটারে ০.২৩১ থেকে ০.৫৪৭ মাইক্রোগ্রাম পাওয়া যায়। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা অনুষদের এক গবেষণায় দেখা গেছে যে, মাছে ডায়জিনন, ফোরাডান ও বাসুডিনের অবশেষ ক্ষতিকর মাত্রায় উপস্থিত। এসব বালাইনাশকের বিষক্রিয়ায় বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে মাছ মারা যাচ্ছে এবং মাছের বংশ বৃদ্ধির হারও কমে যাচ্ছে। বালাইনাশক এবং রাসায়নিক সারের মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহারের ফলে নদ-নদী, পুকুর এবং জলাশয়ের পানির দূষণ আশঙ্কাজনকহারে বেড়ে যাওয়ায় মাছসহ অনেক জলজ প্রাণী আজ বিলুপ্তির পথে।

৩. ফসলের উপকারী পোকামাকড় ও পশুপাখির উপর প্রভাব

সাধারণত ফসলের মাঠে যত ধরণের ক্ষতিকর পোকা থাকে উপকারী পোকামাকড় থাকে তার থেকে বেশি। এসব উপকারী পোকামাকড় ক্ষতিকর পোকামাকড় ধরে খায়, ফলে এরা বাড়তে পারেনা এবং ফসলের বেশি ক্ষতিও করতে পারে না। যখন জমিতে বালাইনাশক বিষ দেওয়া হয় তখন ক্ষতিকর পোকার চেয়ে উপকারী পোকা অনেক তাড়াতাড়ি মারা যায় এবং সাথে সাথে কেঁচো, ব্যাঙ ইত্যাদি উপকারী প্রাণীও মারা যায়। ক্ষতিকর পোকামাকড় এরূপ প্রতিকূল অবস্থায় টিকে থাকতে পারলেও উপকারী পোকামাকড় তা পারে না। এভাবে অনেক উপকারী পোকামাকড় আমাদের পরিবেশ থেকে বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে।

৪. জীববৈচিত্র্যের উপর প্রভাব

ইতোপূর্বেই বলা হয়েছে যে, জমিতে বালাইনাশক বিষ দেওয়ার ফলে আমাদের জমিতে নানারকম জীব যেমনঃ কেঁচো, সাপ, ব্যাঙ, শামুক ইত্যাদি মরে মরে ক্রমেই বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে এসব বিষ খাদ্য শিকলের মাধ্যমে গোটা জীবজগতে ছড়িয়ে গিয়ে ধ্বংস করে দিচ্ছে আমাদের অত্যন্ত সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্যকে। আমাদের চারপাশের নানা রকম জীব একে অপরকে খেয়ে বেঁচে থাকে। যেমনঃ পোকা গাছের বিভিন্ন অংশ খায়, সে পোকাকে খায় ব্যাঙ, ব্যাঙকে খায় সাপ, সাপকে খায় বাজপাখি। এভাবে এক জীব অন্য জীবকে খাওয়ার ফলে একটি চেইন বা শিকল সৃষ্টি হয় যাকে খাদ্য শিকল বলা হয়। এ খাদ্য শিকলের একটি জীব মারা গেলে তার উপর নির্ভরশীল অন্য জীবও খাদ্যের অভাবে বেঁচে থাকতে পারে না। কাজেই ক্ষতিকর পোকা মারার জন্য বিষ দিলেও সে বিষ খেয়ে খাদ্য শিকলের অন্যান্য প্রাণীও মরে যাচ্ছে। তা ছাড়া, পোকা না থাকলে ব্যাঙ খাবে কি? ব্যাঙ না থাকলে সাপ খাবে কি? সাপ না থাকলে পাখি খাবে কি? এভাবে খাদ্যের অভাবে অনেক জীবই ক্রমশ বিলুপ্তির পথে। আর এভাবেই প্রতিনিয়ত ধবংস হচ্ছে আমাদের এককালের অত্যন্ত সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্য।

৫. পরিবেশের ও ইকোসিস্টেমের উপর প্রভাব

আমাদের পরিবেশে যে সকল উপাদান যে পরিমাণে থাকলে উদ্ভিদ ও প্রাণী স্বাভাবিকভাবে বাস করতে পারে সেগুলো যদি কোন পরিবেশে সঠিক পরিমাণে থাকে তবে তাকেই আমরা বলব বিশুদ্ধ পরিবেশ। পরিবেশে কোন ক্ষতিকর উপাদান থাকলে অথবা কোন উপাদান স্বাভাবিক মাত্রার চেয়ে কম বা বেশি থাকলে সে পরিবেশকে বিশুদ্ধ বলা যাবে না। আজ আমাদের পরিবেশের বিভিন্ন উপাদান যেমনঃ মাটি, পানি, বাতাস মারাত্মকভাবে দুষিত হয়ে যাচ্ছে যার জন্য রাসায়নিক কৃষি অনেকাংশে দায়ী।

এই পৃথিবীতে একমাত্র সবুজ উদ্ভিদই নিজের খাদ্য নিজে তৈরি করতে পারে। মাটি থেকে পানি ও বিভিন্ন খনিজ লবণ এবং বাতাস থেকে কার্বন-ডাই-অক্সাইড গ্রহণ করে  সূর্যালোকের সাহায্যে সালোক-সংশ্লেষণ প্রক্রিয়ায় গাছ এ খাদ্য তৈরি করে। এ খাদ্য খেয়ে উদ্ভিদ নিজে বেঁচে থাকে, বড় হয় এবং বংশ বিস্তার করে এবং পৃথিবীর তাবৎ প্রাণীকূলকে বাঁচিয়ে রাখে। যেহেতু কোন প্রাণীই নিজের খাদ্য নিজে তৈরি করতে পারে না তাই সকল প্রাণীই তার খাদ্যের জন্য প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে উদ্ভিদের উপর নির্ভরশীল। যেমনঃ উদ্ভিদভোজী প্রাণী উদ্ভিদকে খায়, মাংসভোজী প্রাণী উদ্ভিদভোজী প্রাণীকে খায়, অন্যান্য প্রাণী আবার মাংসভোজী প্রাণীকে খায়। শেষ পর্যন্ত এসব প্রাণী ও উদ্ভিদ যখন মারা যায় তখন তাদের মৃত দেহের উপর শুরু হয় এক জৈব-রাসায়নিক ক্রিয়া যাকে বলা হয় পঁচন। ব্যাকটেরিয়ার মত অসংখ্য অনুজীব উদ্ভিদ বা প্রাণীর মৃতদেহকে পঁচিয়ে মাটির সাথে মিশিয়ে দেয় যেগুলোকে গাছ আবার খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে থাকে। এভাবেই খাদ্যচক্রের মাধ্যমে খাদ্যশক্তি এক জীব আর এক জীবে বাহিত হয়।

পরিবেশের উদ্ভিদ, প্রাণী ও অনুজীব একে অন্যের উপর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে নির্ভরশীল। এরূপ নির্ভরশীলতার ফলে যে অবিচ্ছিন্ন সিস্টেমের সৃষ্টি হয় তাকে বলা হয় ইকোসিস্টেম। প্রাণী হিসেবে মানুষও এই সিস্টেমের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। অনাদিকাল থেকেই এরূপ সিস্টেম বিরাজমান যা প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলেছে। কিন্তু রাসায়নিক সার ও বালাইনাশক ব্যবহারের ফলে এই ইকোসিস্টেম ও প্রাকৃতিক পরিবেশ আজ মারাত্মকভাবে বিপর্যস্ত।

জমিতে বিষ দিলে ক্ষেতের ফসলের ভিতর সে বিষ প্রাণীদেহে প্রবেশ করে। এ ফসল পোকায় খাচ্ছে ফলে পোকার দেহেও যাচ্ছে। আবার, এসব পোকাকে অন্য প্রাণী ধরে খাচ্ছে ফলে, পোকার দেহেও যাচ্ছে। আবার, এসব পোকাকে অন্য প্রাণী ধরে খাচ্ছে ফলে, সে প্রাণীর দেহেও বিষ যাচ্ছে। বিষ দেওয়া ধানের খড় গরু খায় এতে গরুর দেহেও বিষ যাচ্ছে, গরুর মাংস, দুধ আমরা খাচ্ছি ফলে এ বিষ আবার আমাদের দেহে চলে আসে। আবার সে বিষ পানি, বাতাসে মিশছে এবং তা মানুষ ও অন্যান্য প্রাণীর দেহে প্রবেশ করছে। এভাবে জমিতে দেওয়া বিষ খাদ্যচক্রের মাধ্যমে ইকোসিস্টেমের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে বিষাক্ত করে তুলছে আমাদের পরিবেশ।

পোকামাকড় দমনে কীটনাশকই শেষ সামাধান নয়

কীটনাশক প্রয়োগ করেও আজকাল অনেক ক্ষেত্রেই পোকামাকড় দমন করা যাচ্ছে না। অব্যাহতভাবে অতিরিক্ত মাত্রার কীটনাশক ব্যবহারের কারণে একদিকে যেমন উপকারী ও প্রয়োজনীয় কীট-পতঙ্গ বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে অন্যদিকে তেমনি নতুন প্রজাতির পোকা-মাকড়ের জন্ম হচ্ছে যা প্রচলিত মাত্রার কীটনাশক দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। বেগুনের কাণ্ড ও ফল ছিদ্রকারী পোকা-এর জলন্ত উদাহরণ। বর্তমানে বেগুন চাষীরা কয়েক জাতের কীটনাশক দিনে দুইবার করে প্রয়োগ করার পরও এ পোকা দমন করতে পারছে না। এর কারণ মূলত দুটো-

একঃ সাধারণত ফসলের মাঠে যত ধরণের ক্ষতিকর পোকামাকড় থাকে তার চেয়ে অনেক বেশি ধরণের উপকারী পোকামাকড় থাকে। এসব উপকারী পোকামাকড় ক্ষতিকর পোকামাকড় ধরে খায় বা নানাভাবে ধবংস করে থাকে। ফলে, এসব ক্ষতিকর পোকামাকড় বেশি বাড়তে পারে না এবং বেশি ক্ষতিও করতে পারে না। অথচ আমরা যখন জমিতে বিষ দিই তখন ক্ষতিকর পোকার চেয়ে উপকারী পোকা অনেক তাড়াতাড়ি মারা যায় এবং সাথে সাথে কেঁচো, ব্যাঙ ইত্যাদি উপকারী প্রাণীও মারা যায়। কিন্তু ক্ষতিকর পোকামাকড় সহজে মারা যায় না। কীটনাশক প্রয়োগ করার পরও যেসব পোকামাকড় বেঁচে থাকে সেগুলো তখন আরও দ্রুত ও ব্যাপকভাবে বেড়ে উঠে। কারণ, তখন তাদের জন্য ফাঁকা মাঠ, কোন শত্র“ মাঠে নেই। এমতাবস্থায়, একটি কম ক্ষতিকর পোকাও বেশি ক্ষতিকর হয়ে উঠতে পারে।

দুইঃ জমিতে কীটনাশক প্রয়োগ করা হলেও একেবারে সব পোকা মারা যায় না। কারণ, সব পোকার দেহে সমানভাবে কীটনাশক বিষ প্রবেশ করেনা। যেসব পোকার দেহে অল্প মাত্রায় কীটনাশক বিষ প্রবেশ করে তারা বেঁচে থাকে। এভাবে বিষ খেয়েও বেঁচে থাকা পোকার দেহে এক ধরণের প্রতিরোধ ক্ষমতা জন্মায়। তখন এসব পোকার দেহে কোন বিষই আর কাজ করে না, এমনকি বেশি মাত্রায় বারবার দিলেও না। যে সমস্যা বর্তমানে বেগুনের ফল ও ডগা ছিদ্রকারী পোকাসহ অনেক পোকার ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে।

১৮৭৪ সালে জার্মান রসায়নবিদ মিঃ থাইডলার ডিডিটি আবিষ্কার করেন। এই ডিডিটি যখন কীটনাশক হিসেবে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হতে থাকে তখন অল্পদিনের মধ্যেই দেখা গেল যে, কীটপতঙ্গেরা নিজেদের দেহের মধ্যে এ্যান্টি ডিডিটি তৈরি করে ফেলেছে। পরবর্তীকালে ডিডিটি-এর সূত্র ধরে আরো নানা ধরণের শক্তিশালী কীটনাশক বিষ তৈরি হয় যেগুলো এখন ব্যাপকভাবে পৃথিবীব্যাপী ব্যবহৃত হচ্ছে।

উপরোক্ত কারণগুলো বিবেচনায় নিলে নির্দ্বিধায় বলা যায় যে, কীটনাশক সব সময়, সব ক্ষেত্রে পোকামাকড় দমনের নিশ্চয়তা দিতে পারে না। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে বর্তমানে ৩০০টিরও অধিক প্রজাতির পোকা একাধিক কীটনাশক প্রতিরোধে সক্ষম। অর্থাৎ প্রচলিত কীটনাশকে এসব পোকা দমন করা সম্ভব হচ্ছে না।

পক্ষান্তরে, আজ একটা ব্যাপার গভীরভাবে ভাববার সময় এসেছে, সেটা হল, এই পৃথিবীতে কি মানুষ একাই বেঁচে থাকবে? পৃথিবীতে অন্য জীবজন্তু বিশেষ করে বন্য জীবজন্তু ও পশুপাখি যেগুলো সরাসরি মানুষের কাজে লাগেনা, তাই মানুষ যেগুলোকে লালন-পালনও করেনা, সেগুলো কি টিকে থাকতে পারবেনা! বিষয়টা কি এমন দাড়াবে যে, যেসব পশুপাখির বাণিজ্যিক মূল্য আছে কেবল সেগুলোই মানুষ পুষবে বা লালন পালন কররে আর অন্য সব প্রাণী বিলুপ্ত হবে! কারণ, মানুষ তার ফসল রক্ষার জন্য প্রথম ভোক্তা বা পোকামাকড় বিষ প্রয়োগ করে মেরে ফেলছে। আর এই বিষ ছড়িয়ে যাচ্ছে গোটা ইকোস্টিমে। ফলে, খাদ্য শিকল ধ্বংস হচ্ছে। আর প্রতিনিয়ত বিলুপ্ত হচ্ছে হাজারও প্রজাতির প্রাণী। কাজেই, মানব-স্বাস্থ্য, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের উপর বালাইনাশকের ক্ষতিকর প্রভাবসমূহ বিবেচনায় নিলে বালাইনাশকের ব্যবহার বন্ধ করার কোন বিকল্প নেই।