নয়াউদারনীতির বাজার অর্থনীতির গ্যারাকলে পড়ে এ দেশের কৃষির উপর কৃষকের নিয়ন্ত্রণ ক্রমেই শিথিল হচ্ছে। ক্রমেই এ নিয়ন্ত্রণ চলে যাচ্ছে বাজার নিয়ন্তাদের হাতে যেখানে কৃষকের কোন স্থান নেই। অথচ একসময় কৃষি ছিল সম্পূর্ণভাবে কৃষকের নিয়ন্ত্রণাধীন। ১৯৫০ সালের দিকে জমিদারদের হাত থেকে কৃষক তার জমির মালিকানা পুণরায় ফিরে পাওয়ার পর থেকে কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থা আবারও কৃষকের নিয়ন্ত্রণাধীনে আসে। কিন্তু মাত্র এক দশকের মাথাতেই অর্থাৎ ষাটের দশকের গোড়ার দিকে শুরু হওয়া ‘সবুজ বিপ্লব’ কৃষি ব্যবস্থাকে আবারও কৃষকের কব্জা থেকে বাজারে তুলে এনেছে। কৃষি এখন বাণিজ্যের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সেক্টর। কৃষকের স্থায়িত্বশীল কৃষি ব্যবস্থাকে ‘মান্ধাতার আমলের’ আখ্যা দিয়ে গবেষণা ও উন্নয়নের নামে সবুজ বিপ্লবের স্রোতধারায় যে ভাঙ্গন শুরু হয়েছিল তা আজ কৃষকের জীবন ব্যবস্থাকেই বিপর্যস্ত করে দিয়েছে। আর এ বিপর্যয়ের সূচনা হয়েছিল বীজের মাধ্যমেই।
বীজের নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নটি তাই এ দেশের কৃষক ও হাজার বছরের ঐতিহ্যবাহী স্বনির্ভর কৃষির অস্তিত্বের জন্য এক মারাত্মক হুমকি হয়ে দেখা দিয়েছে। কৃষিপ্রধান এ দেশের বীজের বিশাল বাজার দখলের সুদুরপ্রসারী লক্ষ্য নিয়ে বহুজাতিক কোম্পানিগুলো প্রবর্তন করছে হাইব্রিড ও জেনিটিক্যালি মডিফায়েড (জিএম) বীজ। কোম্পানির প্যাটেন্ট করা এসব বীজ কৃষক নিজেরা উৎপাদন ও সংরক্ষণ করতে পারবে না। অন্যদিকে, এসব বীজের ফসল চাষ করলে এখনও কৃষকের হাতে যেসব বীজ আছে একসময় অবধারিতভাবে সেগুলোও হারিয়ে যাবে। এতে করে শুধু কৃষক নয় দেশের গোটা কৃষি ব্যবস্থাই জিম্মি হয়ে পড়বে বহুজাতিক কোম্পানির উপর যা প্রকারান্তরে এ দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকেও মারাত্মক হুমকির মধ্যে ফেলে দিবে।
বাংলাদেশ জীববৈচিত্র্যে অত্যন্ত সমৃদ্ধশালী একটি দেশ। হাজারো জাতের ফসল, পশুপাখি, গাছপালা অতুলনীয় সমৃদ্ধি দান করেছে এ দেশের জীববৈচিত্র্যকে। উফশী ধানের ক্রমবর্ধমান চাষ আমাদের ফসল বৈচিত্র্যকে ধ্বংস করছে। আগের দিনের সুগন্ধি আতপ চালের পোলাও, নানা ধরণের পিঠা-পায়েস, শালি ধানের চিড়ে, বিন্নি ধানের খৈ ইত্যাদি মিলে আমাদের ছিল বিচিত্র খাদ্যাভ্যাস। এসবই এখন অতীত। একসময় বাঙালীর ঘরে ঘরে ছিল ‘বারো মাসে তের পার্বন’। বিশেষ জাতের ধানের চিড়া, মুড়ি, খৈ, পিঠা-পায়েস ছিল এসব পার্বনের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। ধানের উৎপাদন বাড়াতে গিয়ে আজ এসবই আমরা হারিয়েছি। অন্যদিকে, ধানের ফলন ও উৎপাদন বাড়লেও ডাল জাতীয়, তেল জাতীয়, মসলা জাতীয় ফসল এবং শাক-সব্জির উৎপাদন কমেছে যা আমাদের পুষ্টি চাহিদা পূরণে অত্যাবশ্যকীয়। আমাদের দেশী জাতগুলো আমাদের পরিবেশের সাথে খাপ খেয়ে বেড়ে উঠতো। পরিবেশের বর্তমান বিপর্যয় বহিরাগত জাত চাষ করার দীর্ঘমেয়াদি ফল। আমাদের এ সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্য ও ফসলবৈচিত্র্য আজ বিলুপ্তির পথে। এই ফসলবৈচিত্র্যের ধারক ও বাহক যে বীজ সে বীজ সম্পদের কোন সঠিক হিসাব আজ পর্যন্ত করা হয় নি।
বীজ সম্পদের উপর বহুজাতিক কোম্পানির নিয়ন্ত্রণ
বহুজাতিক কোম্পানির বীজ বাণিজ্যের ইতিহাস বেশি পুরনো নয়। ১৯৩৫ সালে নরিন-১০বি জাতের উচ্চফলনশীল গম বীজ প্রবর্তনের মাধ্যমে কোম্পানির বীজ বাণিজ্যের সূচনা হয়। এসময় গবেষণা ও উন্নয়নের নামে সারা বিশ্বের কৃষি বাণিজ্যকে গ্রাস করার জন্য মরিয়া হয়ে উঠে বহুজাতিক কোম্পানিগুলো। অন্যদিকে, যেহেতু এশিয়া মহাদেশের অধিকাংশ দেশের অন্যতম প্রধান ফসল ধান তাই এশিয়ার কৃষির উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে মার্কিনী প্রতিষ্ঠান রকফেলার এন্ড ফোর্ড ফাউন্ডেশন ১৯৬০ সালে ফিলিপাইনে প্রতিষ্ঠা করে আন্তর্জাতিক ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ইরি)। এটা ছিল সবুজ বিপ্লবের সূচনা পর্ব যা বহুজাতিক কোম্পানির জন্য খুলে দেয় বীজ, কৃষি রাসায়নিক দ্রব্যাদি এবং কৃষি যন্ত্রপাতির বাণিজ্যের অপার সম্ভাবনার দ্বার।
১৯৭০-এর দশক জুড়ে বিশ্বের মূলত বালাইনাশক উৎপাদনকারী বহুজাতিক কোম্পানিগুলো তাদের শক্তি-সামর্থ্যকে সুসংহত করে এবং কৃষি বাণিজ্যের উপর একচ্ছত্র ও একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে একে অপরকে আত্ত¡ীকরণের মাধ্যমে দানবীয় আকার ধারণ করে। যেমনঃ নোভার্টিস ও এস্ট্রাজেনেকা একসাথে মিলে হয়েছে সিনজেন্টা, রোন-পোলেন্ক ও এগ্রো-ইভো মিলে হয়েছে এভেন্টিস ক্রপ সায়েন্স ইত্যাদি। এরূপ পাঁচটি শীর্ষস্থানীয় বহুজাতিক কোম্পানি যেমনঃ সিনজেন্টা, এভেন্টিস, মোনসান্টো, বিএএসএফ ও ডু-পন্ট বর্তমান বিশ্বের বীজ, বালাইনাশক, কৃষি যন্ত্রপাতির বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে। বিশ্বের বীজ বাণিজ্যের দুই-তৃতীয়াংশ এবং জিএম বীজের প্রায় ১০০% নিয়ন্ত্রণ করছে এই পাঁচটি কোম্পানি। মোনসান্টো একাই নিয়ন্ত্রণ করছে বিশ্বের প্রায় ৯১% জিএম বীজের বাজার। ধান, গম, ভূট্টাসহ প্রধান প্রধান ফসলের জাতের উপর এ পর্যন্ত প্রায় ৯০০০টি প্যাটেন্ট দেওয়া হয়েছে যার ৪৪%ই মাত্র চারটি বড় বহুজাতিক কোম্পানির দখলে। বীজের উপর কোম্পানির এরূপ একক মালিকানা প্রতিষ্ঠা যে সাধারণ জনগোষ্ঠীর খাদ্য নিরাপত্তাকে মারাত্মক হুমকির মধ্যে ফেলে দিবে তাতে কোন সন্দেহ নেই। কারণ, বীজের উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা গোটা খাদ্য চক্রের উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠারই নামান্তর।
‘ট্রিপস’ চুক্তি, ‘উপোভ’ এবং কৃষকের বীজের অধিকার
খাদ্য ও কৃষির জন্য কৌলিক সম্পদের (জেনেটিক রিসোর্স) উপর প্যাটেন্ট বীজের উপর বহুজাতিক কোম্পানির নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠাকেই ত্বরান্বিত করছে যা ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকের খাদ্য নিরাপত্তা এমনকি জীবিকার জন্যও মারাতœক হুমকির সৃষ্টি করছে। এরূপ প্যাটেন্ট কৃষক ও প্রজননবিদদের জন্য বীজ ও কৌলিক সম্পদের সহজপ্রাপ্যতাকে বাঁধাগ্রস্ত করবে। কারণ, এই প্যাটেন্ট আইন কোম্পানির একচেটিয়া বাণিজ্যের গ্যারান্টি দেয়। ফলে, বীজের বাজার মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে কোন প্রতিযোগিতার সুযোগ না থাকায় তা সাধারণ কৃষকের ক্রয় ক্ষমতার মধ্যে থাকবে তার কোনই নিশ্চয়তা নেই। অথচ কৃষক এসব বীজ থেকে নিজে বীজ উৎপাদন ও সংরক্ষণ করতে পারবে না বিধায় প্রতিবছর কোম্পানির কাছ থেকেই বীজ কিনতে বাধ্য হবে।
ফসলের নতুন জাত উদ্ভাবনের জন্য কৃষক বা প্রজননবিদের জন্য উদ্ভিদের কৌলিক সম্পদের (চষধহঃ এবহবঃরপ জবংড়ঁৎপবং-চএজং) সহজলভ্যতা অপরিহার্য। আবহমান কাল ধরে যেসব জাত কৃষকরা চাষ করে আসছিল সেগুলো কৃষকেরই আবিষ্কার। প্রাকৃতিক প্রজনন ও নির্বাচনের মাধ্যমে কৃষক ও আদিবাসী জনগোষ্ঠী হাজারো স্থানীয় ও বন্য জাতের ফসল উদ্ভাবন করেছেন যেগুলো বর্তমানে আবিষ্কৃত সকল উচ্চফলনশীল (উফশী), হাইব্রিড ও জিএম জাতের মূল ভিত্তি। এসব স্থানীয় ও বন্য জাতের ফসল সকল গবেষক ও বাণিজ্যিক উদ্ভিদ প্রজননবিদের জন্যই সহজলভ্য। কারণ, এসবের কোন প্যাটেন্ট নেই। কিন্তু বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার ‘ট্রিপস’ চুক্তির প্যাটেন্ট আইনের আর্টিকেল ২৭.৩ (বি) ধারা এবং ‘উপোভ’-এ নতুন উদ্ভাবিত সকল জাতের উপর বাণিজ্যিক প্রজননবিদের একচ্ছত্র মালিকানা লাভের অধিকার দেওয়া হয়েছে। প্যাটেন্টকৃত এসব জাতের উপর কৃষক জনগোষ্ঠীর কোন অধিকারতো থাকছেইনা বরং জনকল্যাণে পরিচালিত সরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠানসমূহের গবেষকদের জন্যও এসব জাত নিয়ে গবেষণার কোন শর্তহীন সুযোগ থাকছে না।
‘ট্রিপস’ এবং ‘উপোভ’ চুক্তি দুটি জাতিসংঘ গৃহীত কনভেনশন অন বায়োলজিক্যাল ডাইভারসিটি (সিবিডি, ১৯৯২) এবং ইন্টারন্যাশনাল ট্রিটি অন প্লান্ট জেনেটিক রিসোর্সেস ফর ফুড এন্ড এগ্রিকালচার (আইটিপিজিআর, ২০০১)-এর সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। কারণ সিবিডি ও আইটিপিজিআর চুক্তি দুটিতে উদ্ভিদের কৌলিক সম্পদের উপর কৃষক ও আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকারের নিশ্চয়তা দেওয়া হয় যা ‘ট্রিপস’ এবং ‘উপোভ’ চুক্তি দুটিতে অস্বীকার করা হয়েছে। পরিতাপের বিষয় এই যে, সিবিডি ও আইটিপিজিআর চুক্তি দুটি কার্যকর করার ব্যাপারে কোন উদ্যোগ নেওয়া হয় নি যেমনটি হয়েছে ‘ট্রিপস’ চুক্তির বেলায়।
বাংলাদেশের সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্য ও কৌলিক সম্পদ সংরক্ষণের জন্য কোন আইনগত ব্যবস্থা নেই। এ ব্যাপারে আইন প্রণয়নের জন্য ১৯৯৮ সালে উদ্ভিদ কৌলিক সম্পদ বিষয়ক জাতীয় কমিটি গঠন করা হয় যে কমিটি চষধহঃ ঠধৎরবঃরবং অপঃ ড়ভ ইধহমষধফবংয (বাংলাদেশের উদ্ভিদ জাত সংরক্ষণ আইন)-এর একটি খসড়া তৎকালীন সরকারের বিবেচনার জন্য পেশ করে যা কার্যকর করার কোন উদ্যোগ অদ্যাবধি গ্রহণ করা হয় নি। প্রস্তাবিত এই আইন অনুসারে কোন হাইব্রিড বা জিএম শস্য ঢালাওভাবে এ দেশে প্রবেশ করতে পারবে না। পক্ষান্তরে, দাতা দেশ ও সংস্থাগুলো ক্রমাগত চাপ দিয়ে যাচ্ছে যাতে বাংলাদেশ বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার ট্রিপস চুক্তিতে বর্ণিত সুই জেনেরিস সিস্টেম হিসেবে উপভ গ্রহণ করে। হয়ত এরূপ চাপের কারণেই এ আইনটি অদ্যাবধি কার্যকর করা হচ্ছে না। যাহোক, প্রস্তাবিত প্ল্যান্ট ভ্যারাইটি অ্যাক্ট-এর আর্টিকেল-৭ -এ বর্ণিত গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি বিশেষ ধারা সংক্ষেপিত আকারে নিম্নে উল্লেখ করা হল।
ধারা-২: এই আইনের জন্য উদ্ভিদের সকল জাত, যেগুলো বর্তমানে বিদ্যমান বা নতুন উদ্ভাবিত জাত হিসেবে দাবীকৃত, বাংলাদেশের জনগণের “পূর্ববর্তী জ্ঞান” হিসেবে বিবেচিত হবে। অতএব, এই জাতগুলোকে ব্যক্তিগত বুদ্ধিজাত সম্পত্তির অধিকার, সংরক্ষণ বা বাণিজ্যিক স্বার্থে ব্যবহার করা যাবে না। উদ্ভাবিত জাতটি যে নতুন এবং তার অস্তিত্ব পূর্বে কখনও ছিলনা এবং উদ্ভাবনের সামাজিক প্রক্রিয়ার উপর একটি স্বাধীন মানব সংস্থার প্রতি কমিউনিটির স্বীকৃতি রয়েছে এটা প্রমাণ করা উদ্ভাবনকারীর একক দায়িত্ব।
নোট: এই আইনে “সংরক্ষণ” বলতে সবসময় ‘জাতীয় জীববৈচিত্র্য কর্তৃপক্ষ’ কর্তৃক কোন উদ্ভাবনকারীর অনুক‚লে অনুমোদিত ও বরাদ্দকৃত, সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হউক বা না হউক, কোন সংজ্ঞায়িত এবং সুনির্দিষ্ট ব্যবসায়িক সুবিধাদি বুঝাবে এবং তা কোন সাধারণকৃত বুদ্ধিজাত সম্পত্তির অধিকার তৈরি করবে না, এবং আবিষ্কারের ধরণ অনুসারে বিভিন্ন আবেদনকারীর ক্ষেত্রে ভিন্নরকম হতে পারে।
ধারা-৩: কোন জাতের বাণিজ্যিক অধিকার লাভের জন্য কেবল প্রজনন বা কিছু উৎকর্ষসাধনমূলক প্রজননই যথেষ্ট হবেনা। এরূপ অধিকার লাভের যোগ্য বলে বিবেচিত হতে গেলে নতুন জাতটিকে বাংলাদেশের মানুষের সুনির্দিষ্ট ও প্রয়োজনীয় চাহিদা মিটাতে সক্ষম হতে হবে। কোন জাত বাংলাদেশের মানুষের জন্য তাৎক্ষণিকভাবে, সরাসরি এবং যথেষ্ট পরিমানে লাভজনক বিবেচিত না হলে জাতীয় জীববৈচিত্র্য কর্তৃপক্ষ তা প্রত্যাখ্যান করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। হাইব্রিড জাতকে শুধুমাত্র তখনই সংরক্ষণ করা যাবে যদি তার মাতৃজাতগুলো কমিউনিটির জাত হিসেবে জনগণের কাছে সহজলভ্য হয়।
ধারা-৫: যদি কোন নতুন জাত পরিবেশ, জীবজগৎ, স্বাস্থ্য এবং জনমানুষের কল্যাণের ক্ষেত্রে ক্ষতিকর বলে বিবেচিত হয় তবে তা এই আইন দ্বারা সংরক্ষণ করা যাবেনা।
ধারা-৬: যদি কোন নতুন জাতের জীববৈচিত্র্য এবং/অথবা বিদ্যমান জৈবিক ও কৌলিক সম্পদ এবং কৌলিক ও সাংস্কৃতিক অবক্ষয়সহ সংশ্লিষ্ট বুদ্ধিজাত ও সাংস্কৃতিক জ্ঞান ও চর্চার উপর ঋণাতœক প্রভাব থাকে তবে তা এই আইনে সংরক্ষণ করা যাবেনা।
ধারা-৭: কোন ট্রান্সজেনিক (জিএম) জাত সংরক্ষণ করার যোগ্য হবে না যদি না সে জাতের –
ক. জাতীয় জীববৈচিত্র্য কর্তৃপক্ষ কর্তৃক নির্ধারিত সংশ্লিষ্ট কোন সংস্থা/বিভাগ কর্তৃক পরিবেশের উপর প্রভাব মূল্যায়ন করা হয়;
খ. বাংলাদেশকে জৈব দুষণ থেকে মুক্ত রাখার জন্য ‘জৈব নিরাপত্তা কমিশন’ কর্তৃক জৈব-নিরাপত্তা মূল্যায়ন করা হয়;
গ. সেই ট্রান্সজেনিক (জিএম) জাত ব্যবহার বা নাড়াচাড়ার ফলে যদি কোন বিপদ বা ক্ষতি সাধিত হয় তবে সে জাতের মালিক তার জন্য ক্ষতিপূরণ দিতে রাজি থাকে এবং জাত সংরক্ষণের দরখাস্তের সাথে এই মর্মে লিখিত অঙ্গীকার করে;
ঘ. জাত সংরক্ষণের জন্য আবেদনকারী এই মর্মে অঙ্গীকার করে যে, জাতের ট্রান্সজেনিক বৈশিষ্ট্য জনসমক্ষে ঘোষণা করা হবে এবং লেবেল, লোগো এবং সংশ্লিষ্ট সকল তথ্য উপকরণে তা সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা থাকবে;
ঙ. জাতীয় জীববৈচিত্র্য কর্তৃপক্ষ কর্তৃক নির্ধারিত হয় যে দুর্যোগের দায় বহন করার মত আবেদনকারীর যথেষ্ট আর্থিক সামর্থ রয়েছে।
ধারা-১০: কোন জাতীয় সরকারী গবেষণা প্রতিষ্ঠান যেমনঃ সরকারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, জাতীয় কৃষি গবেষণা কেন্দ্র, স্বায়ত্বশাসিত বা আধা-স্বায়ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠান কর্তৃক আবিষ্কৃত জাতগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাংলাদেশের জনগণের সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হবে। রাষ্ট্রীয় আর্থিক সহায়তায় বা জনগণের অর্থায়নকৃত সম্পদ বা উন্নয়ন সহযোগিতা হিসেবে প্রাপ্ত টাকায় আবি®কৃত জাতও সাধারণ সম্পত্তি হিসেবে গণ্য করা হবে।
ধারা-১১: কোন ব্যক্তি, এনজিও বা অন্য কোন সংস্থা যারা স্থানীয় বা বৈদেশিক উন্নয়ন তহবিল ব্যবহারে করে বা করেছে যে তহবিল নীতিগতভাবে জনকল্যাণে দান করা হয়েছে তাদের উদ্ভাবিত নতুন জাতও সাধারণ সম্পত্তি হিসেবে গণ্য করা হবে এবং এসব জাত সংরক্ষণযোগ্য হবে না বা কোন বাণিজ্যিক সুবিধা দাবী করা যাবে না।
ধারা-১২: উপরোক্ত জাতগুলো যেগুলো আইনগতভাবে জনগণের সাধারণ সম্পত্তি কেউ যাতে সেগুলোর বুদ্ধিজাত সম্পত্তির অধিকার দাবী করতে না পারে জাতীয় জীববৈচিত্র্য কর্তৃপক্ষ সে ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।
প্রস্তাবিত এই আইনটি কার্যকর করা হলে তা দেশের কৌলিক সম্পদ এবং কৃষক জনগোষ্ঠীর স্বার্থ সংরক্ষণে যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হতে পারত। কাজেই, দেশের সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্য ও কৌলিক সম্পদ সংরক্ষণে এই আইনটি কার্যকর করা অত্যন্ত জরুরী।
বাংলাদেশের বীজ-সম্পদ এবং বীজবাণিজ্য
বাংলাদেশ জীববৈচিত্র্যে অত্যন্ত সমৃদ্ধশালী একটি দেশ। হাজারো জাতের ফসল, পশুপাখি, গাছপালা অতুলনীয় সমৃদ্ধি দান করেছে এ দেশের জীববৈচিত্র্যকে। কিন্তু পরিতাপের বিষয় এই যে, আমাদের এই সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্য আজ বিলুপ্তির পথে। আমাদের বীজ সম্পদের কোন সঠিক হিসাব আজ পর্যন্ত করা হয় নি। ১৯১৫ সালে ঢাকাস্থ তৎকালীন কৃষি গবেষণা কেন্দ্রের এক হিসেব মতে বাংলাদেশে একসময় ১৫,০০০ জাতের ধানের চাষ হতো। এর প্রায় ৭০ বছর পর বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট প্রায় ৬০০০ জাতের ধান সংগ্রহ করে। সংগৃহীত এসব জাতের মধ্যে মাত্র ২০০০ টি জাত প্রজননবিদদের জন্য সহজলভ্য হয়। আশির দশকে পরিচালিত এক জরিপে ১২,৪৭৯ জাতের ধানের তালিকা করা হয় যার অধিকাংশই আজ বিলুপ্ত। বর্তমানে দেশজুড়ে চাষ হচ্ছে গুটিকয় স্থানীয়, উচ্চফলনশীল ও হাইব্রিড জাতের ধান।
ষাটের দশকের শেষের দিকে ফোর্ড ফাউন্ডেশনের সৌজন্যে এ দেশে প্রথম উচ্চফলনশীল জাতের ধান বীজ আমদানি করা হয়। এরপর সত্তরের দশকে ফিলিপাইনস্থ ইরি ও ইন্ডিয়া থেকে প্রচুর উচ্চফলনশীল জাতের ধান বীজ আমদানি করা হয়। অতঃপর ১৯৭০ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট যা একটি হাইব্রিডসহ এ পর্যন্ত ধানের ৪৬ টি নতুন জাত আবিষ্কার করেছে। অন্যদিকে, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট ২১ টি গমের জাত, ৪ টি ভূট্টার জাত, ৩২ টি গোল আলুর জাত, ২৪ টি ডাল জাতীয় ফসলের জাত, ২১ টি তৈলবীজ ফসলের জাত, ৪১ টি শাক-সব্জির জাত এবং ২৬ টি ফলের জাত আবিষ্কার করেছে। সরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান কর্তৃক আবিষ্কৃত হওয়ায় এসব জাতের কোন প্যাটেন্ট নেওয়া হয় নি। ফলে, এগুলো কৃষকের কাছে সহজলভ্য এবং কৃষক নিজেরাই এসব জাত থেকে বীজ তৈরি করতে পারে (হাইব্রিড ছাড়া)।
কাজেই নতুন জাতের আবিষ্কার এবং তার বীজের নিয়ন্ত্রণ অন্ততঃ সরকারের হাতে থাকলেও কৃষকেরা কিছুটা হলেও স্বস্তিতে থাকতে পারে। কারণ, সে যে সরকারই হউক জনগণের কাছে তার কমবেশি দায়বদ্ধতা থাকে যা কোম্পানির মোটেও থাকে না। মুনাফা অর্জনই কোম্পানির একমাত্র লক্ষ্য সে যে করেই হউক। মুনাফার জন্য যদি কৃষককে জিম্মি করে ফেলতে হয়, কৃত্রিম সংকটের ফাঁদে ফেলতে হয়, কৃষকের স্বনির্ভর ব্যবস্থাকে ধ্বংস করতে হয় কোম্পানি তা করতে কখনও পিছপা হবে না। কিন্তু সরকারের লক্ষ্য কখনই এমনটি হতে পারে না। তাই বীজ সম্পদের মালিকানা বা নিয়ন্ত্রণ কৃষকের হাতে থাকা উচিত। কেবলমাত্র যেসব বীজ কৃষক নিজেরা উৎপাদন করতে পারবে না যেমন: হাইব্রিড ও ব্রিডার মানের বীজ সেগুলো বড়জোড় সরকারি মালিকানায় রাখা যেতে পারে। পাশাপাশি যদি বিদেশি কোম্পানির কোন বীজ প্রবর্তন করতেই হয় তবে তা কঠোর নিয়ন্ত্রিত অবস্থায় করা উচিত, ঢালাওভাবে কখনই নয়।
বাংলাদেশের বীজ সম্পদের নিয়ন্ত্রণ এবং বিএডিসি
এ দেশে সরকারি নিয়ন্ত্রণে একমাত্র বীজ উৎপাদন ও বাজারজাতকারী সংস্থা হল বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএডিসি) যেটি প্রতিষ্ঠিত হয় সবুজ বিপ্লবের সূচনালগ্নে ষাটের দশকে। এখানে প্রসঙ্গক্রমে বিএডিসির প্রতিষ্ঠা থেকে শুরু করে বর্তমান অবস্থার দিকে একটু আলোকপাত করা প্রয়োজন যাতে এ দেশে বহুজাতিক কোম্পানির বাণিজ্যের প্রসারে এই সংস্থার ভূমিকা এবং তার পিছনের রাজনীতি সম্পর্কে ধারণা লাভ করা যায়। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, শুরুতে এই সংস্থা শুধু বীজ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ছিলনা। শুরুতে এই সংস্থার প্রধান কাজ ছিল সেই সময়ে আসা উচ্চফলনশীল জাতের চাষাবাদের জন্য প্রয়োজনীয় বীজ, রাসায়নিক সার, বালাইনাশক, সেচ যন্ত্রসহ অন্যান্য কৃষি উপকরণ ও যন্ত্রপাতি কৃষকের হাতে তুলে দেওয়া। সেসময় বিএডিসি এসব কৃষি উপকরণ ও যন্ত্রপাতি কৃষকদেরকে দিত উচ্চহারে ভর্তুকি মূল্যে, এমনকি কখনও কখনও বিনামূল্যে। আর এই ভর্তুকির ভার বহন করা হত বিশ্বব্যাংকসহ বিভিন্ন বিদেশী দাতা সংস্থার ঋণের টাকায়। তবুও সে সময় এসব নতুন জাতের বীজ ও প্রযুক্তি কৃষকরা সহজে গ্রহণ করতে চায়নি কারণ তারা সম্ভবত তাদের হাজার বছরের স্বনির্ভর কৃষি ব্যবস্থার পরিবর্তন চায়নি। এ কারণেই বিএডিসির মাধ্যমে এসব প্রযুক্তির বিস্তার হচ্ছিল অত্যন্ত ধীর গতিতে। ধীর গতিতে হলেও ইতোমধ্যে সুসংহত হওয়া বহুজাতিক কোম্পানির জন্য এ দেশের বাজারে প্রবেশের পথ সুগম করার ক্ষেত্রে তা যথেষ্ট সহায়ক হয়। আর এ সুযোগেই বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের মতো দাতা সংস্থাগুলো একদিকে যেমন ভর্তুকি প্রত্যাহার করতে থাকে অন্যদিকে তেমনি ঋণের শর্ত হিসেবে কাঠামোগত সংস্কার কর্মসূচি চাপিয়ে দিয়ে এ দেশের সরকারগুলোকে বাধ্য করে বিএডিসি কর্তৃক সরবরাহকৃত কৃষি উপকরণ ও প্রযুক্তির বাণিজ্যকে বেসরকারি খাতে ছেড়ে দিতে যাতে বহুজাতিক কোম্পানির বাণিজ্যের প্রসার সহজতর হয়। এরই ধারাবাহিকতায় তৎকালীন সামরিক সরকার আশির দশকে এ দেশের কৃষি বাণিজ্যের ক্ষেত্রে ঢালাও বেসরকারিকরণ ও উদারিকরণ নীতির বাস্তবায়ন ঘটায় যা বাংলাদেশের কৃষির ইতিহাসে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ রূপান্তরের দশক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। এখানে স্মরণ রাখা দরকার যে, শুধু বাংলাদেশে নয় তৃতীয় বিশ্বের বহু দেশেই অগণতান্ত্রিক, স্বৈরাচারী ও সামরিক সরকারকে ক্ষমতায় বসানো এবং টিকিয়ে রাখার ক্ষেত্রে বিশ্ব ব্যাংকসহ এসব দাতা সংস্থার নগ্ন পৃষ্ঠপোষকতার কথা সর্বজনবিদিত। যাহোক, ঐ সময় থেকেই বীজ, রাসায়নিক সার, বালাইনাশক এবং কৃষি যন্ত্রপাতির সরবরাহ বা বাজারজাতকরণ ব্যবস্থা বিএডিসির কাছ থেকে ধীরে ধীরে চলে যেতে থাকে বহুজাতিক কোম্পানির হাতে। আর এই নিয়ন্ত্রণকে একচ্ছত্র করতে বর্তমানে এসব দাতা সংস্থা বিএডিসিকেই বন্ধ করে দেওয়ার জন্য সরকারকে ক্রমাগত চাপ দিয়ে যাচ্ছে। বর্তমানে এ দেশের বীজ, রাসায়নিক সার, বালাইনাশক এবং কৃষি যন্ত্রপাতি বাণিজ্যের প্রায় সবটুকুই নিয়ন্ত্রণ করছে বহুজাতিক কোম্পানি ও তাদের দেশীয় এজেন্টরা।
বীজ ফসল উৎপাদনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপকরণগুলোর একটি। ‘ভাল বীজে ভাল ফসল’ – এটি একটি বৈজ্ঞানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত সত্য। কৃষি গবেষকদের মতে বাংলাদেশের গবেষণা প্রতিষ্ঠানসমূহ যেসব উচ্চ ফলনশীল জাত কৃষকের হাতে তুলে দিয়েছে সেগুলোর কৃষকের মাঠের ফলন গবেষণা খামারের ফলনের তুলনায় অনেক কম। এর অন্যতম প্রধান কারণ কৃষকরা যে বীজ ব্যবহার করে তা মোটেও উৎকৃষ্ট মানের নয়। বিজ্ঞানীদের মতে শুধু উৎকৃষ্ট মানের বীজ ব্যবহার করা গেলে ধানের ফলন শতকরা ২০ ভাগ পর্যন্ত বাড়ানো সম্ভব। আজ দেশের খাদ্য নিরাপত্তা মারাতœক সংকটাপন্ন। দেশের জনসংখ্যা বাড়ছে, কমছে ফসলি জমি। এমতাবস্থায়, একক পরিমান জমিতে শস্যের ফলন বাড়ানো অপরিহার্য। অথচ আজ পর্যন্ত সরকারি-বেসরকারি খাত মিলে দেশের প্রধান ফসল ধানের বীজের চাহিদার শতকরা মাত্র ১০/১২ ভাগ সরবরাহ করা সম্ভব হয়েছে। অথচ দুঃখজনক হলেও সত্য এই যে, মানসম্মত বীজ কৃষকের হাতে পৌছে দেওয়ার জন্য যেখানে বিএডিসিকে আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন ছিল সেখানে বিএডিসিকে বন্ধ করে দেওয়ার চিন্তাভাবনার কথা শোনা যাচ্ছে।
জাতীয় বীজ নীতি ও কৃষকের বীজের অধিকার
অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে, এ দেশের সমৃদ্ধ বীজ সম্পদ ও কৃষকের বীজের অধিকার সংরক্ষণে বাংলাদেশ সরকারের ভূমিকা অত্যন্ত হতাশাজনক যা পূর্বেই আলোকপাত করা হয়েছে। আরও দুঃখজনক ব্যাপার এই যে, আমাদের সরকারি নীতি ও পরিকল্পনা বীজ সম্পদের উপর বহুজাতিক কোম্পানির নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় সহায়ক।
সরকার ২০০৬ সালে একটি জাতীয় বীজ নীতি প্রণয়ন করেছে যার প্রধান লক্ষ্য হল বেসরকারি খাতে বীজ শিল্প স্থাপনকে উৎসাহিত করা। এবং এই লক্ষ্যকে সামনে রেখে ১৯৭৭ সালের সীড এ্যাক্ট সংশোধন করে সীড এ্যাক্ট ১৯৯৭ প্রবর্তন করা হয়েছে। জাতীয় বীজ নীতির প্রায় সকল ধারায় কোম্পানির বীজ বাণিজ্যকেই উৎসাহিত করা হয়েছে। এই বীজ নীতিতে বীজ উৎপাদন ও বাজারজাতকরণে একমাত্র সরকারি প্রতিষ্ঠান বিএডিসি বর্তমানে এ দেশের বীজের চাহিদার মাত্র ৫-৬% সরবরাহ করছে। অথচ বিএডিসির ক্ষমতাবৃদ্ধির কোন সুস্পষ্ট দিক নির্দেশনা এই বীজ নীতিতে নেই।
পক্ষান্তরে, এই বীজ নীতি বেসরকরি খাতে হাইব্রিড বীজ আমদানির শর্তসাপেক্ষ অনুমোদনকে আরও সুসংহত করবে। কারণ, এই বীজ নীতি অনুসারে বাংলাদেশের কোন গবেষণা প্রতিষ্ঠান যদি কোন জাত আবিষ্কার করে এবং তা কৃষক পর্যায়ে চাষের জন্য ছাড় করতে চায় তবে দেশের বিভিন্ন কৃষি পরিবেশ অঞ্চলে পরীক্ষাসহ দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হয়। কিন্তু বেসরকারি খাতে বীজ আমদানি ও বাজারজাতকরণের জন্য এরূপ কোন পরীক্ষার দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হয় না। অথচ, দেশের ইকোসিস্টেম সুরক্ষার জন্য এই ধরণের পরীক্ষা জরুরী। অন্যথায় বাইরে থেকে আসা কোন জাত দেশের ফসল বৈচিত্র্যের জন্য বিপদজ্জনক হতে পারে। অন্যদিকে অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য যে, দেশীয় বীজ সম্পদ সংরক্ষণের কোন কথাই এ বীজ নীতিতে বলা হয় নি যদিও সরকার তা করার জন্য জাতিসংঘের জীববৈচিত্র্য সনদ ও পরিবেশ উন্নয়ন সম্মেলনের এজেন্ডা-২১ অনুযায়ী অঙ্গীকারাবদ্ধ।
আমাদের এখনও যেসব নীতি আছে তাতে হাইব্রিড বা জিএম বীজ সহজে এ দেশে ঢুকতে পারেনা। কিন্ত বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থাসহ বিভিন্ন দাতা দেশ ও সংস্থার চাপে আমাদের নীতিগুলো পরিবর্তন করা হচ্ছে। যারা আমাদের বাজার দখল করতে চায় তারাতো বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করবেই। হুমকি-ধামকি ও চাপ প্রয়োগ করবেই। কিন্তু একটি দেশপ্রেমিক, মেরুদন্ডসম্পন্ন সরকারের উচিত এসব হুমকি-ধামকি ও চাপ উপেক্ষা করে দেশের স্বার্থে, কৃষকের স্বার্থে নীতি প্রণয়ন করা।